Wednesday, 30 September 2026

83.বামাঞ্চলের অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক ও কৃষ্টিগত জীবনধারা-1: শ্ৰীমতি সুনন্দা পুরকায়স্থ

 

আমাদের এই সোনার বামাঞ্চল, কয়েকটি গ্রাম লইয়াই গঠিত। বামাঞ্চল এই নামের প্রকৃত অর্থ হইতেছে বরাক নদীর বামতীরস্থ অঞ্চল। ইহা শিলচর নামক একটি শহরের দক্ষিণে অবস্থিত। বামাঞ্চলের আরেকটি অর্থ হইল শান্তির অঞ্চল। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। এই অধিবাসীদের কৃষ্টি ও সভ্যতা পৃথক পৃথক।

প্রকৃতির লীলাভূমি বামাঞ্চল এক বিচিত্র অঞ্চল। ইহার পূর্বপ্রান্তে বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ ও পশ্চিম প্রান্তে রহিয়াছে জঙ্গলাকীর্ণ সুউচ্চ পাহাড়। এই জঙ্গলে বিভিন্ন রকম মূল্যবান কাঠ আছে। এই কাঠগুলি বন বিভাগ কর্তৃক সুরক্ষিত। এই দুই প্রান্তের মধ্য দিয়া রুকনি নদী কুলুকুল রবে প্রবাহিত হইয়াছে। বর্ষার প্রবল বৃষ্টি ধারার ফলে নদীটি মাঝে মাঝে দুইকুল ছাপাইয়া পার্শ্ববর্তী অঞ্চল প্লাবিত করিয়া দেয়। বর্তমানে অবশ্য নদীর উভয় তীরে বাঁধ তৈরী করা হইয়াছে। এই রুকনি নদীটি আমাদের অঞ্চলটিকে উর্বরা করিয়া সুজলা, সুফলা ও শস্য শ্যামলা করিয়া তুলিয়াছে। প্রকৃতি যেন বিলাসবশে অকৃপণ হস্তে এই বামাঞ্চলটিকে বৈচিত্রে ভরপুর করিয়া তুলিয়াছে। তাই বলা যায় সুজলা, সুফলা ও শস্য শ্যামলা এই বামাঞ্চল। প্রকৃতির লীলাভূমি বামাঞ্চলের বৈচিত্র্য নানা ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। ভৌগলিক বা প্রাকৃতিক বৈচিত্রের বৈচিত্র্যের  দিক দিয়া বিচার করিলে এই অঞ্চলের বিভিন্নতার প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। এই বামাঞ্চলকে একটি ক্ষুদ্র ‘ভারতবর্ষ’ বলিলেও অত্যুক্তি হয়না।

এই বামাঞ্চলটি প্রথমে ছিল একটি জঙ্গলাকীর্ণ জনমানবহীন এলাকা। অন্যান্য অঞ্চল হইতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক এখানে আসিয়া জঙ্গল পরিষ্কার করিয়া জমি বাহির করিয়া যে যতটুকু আবাদ করিয়াছে ততটকু তাহার অধিকারে আসিয়াছে। এই ভাবে জঙ্গলাকীর্ণ বামাঞ্চলটি ধীরে ধীরে জনবসতি পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। এই বামাঞ্চলটি ডেভিডসনাবাদ পরগণার অন্তৰ্গত। এই ডেভিডসনাবাদ নামের একটি ইতিহাস আছে। যখন এই বামাঞ্চলে জনবসতি শুরু হয় তখন এই অঞ্চলটি বৃটিশ শাসনের অধীনে আসে। এই অঞ্চলটি শাসন করিবার ভার এক জন বৃটিশের উপর ন্যস্ত হয়, তাহার নাম ছিল ডেভিড্‌ সন সাহেব। এই ডেভিড্‌ সন সাহেবের নামানুসারে এই পরগণার নাম হয় ডেভিড্‌ সনবাদ। ডেভিড সাহেব নিৰ্দেশ দিয়াছিলেন নদীর পশ্চিমপ্রান্তে মুসলমান এবং অন্যান্য শ্রেণীর লোক বসবাস করিবে। আর পূর্বদিকে শুধু সর্বশ্রেণীর হিন্দুরা বসবাস করিবে । অধুনা এই ব্যবস্থার কিছু পরিবৰ্তন পরিলক্ষিত হয়। রুকনি নদীর পূর্বদিকে সুখতলা এবং অন্যান্য স্থানে কিছু, মৎস্য-জীবি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকের বসতি দেখা যায়।

বামাঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের অধিবাসীরা বসবাস করছে। এই সকল অধিবাসীদের মধ্যেঃ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়, কায়স্থ সম্প্রদায়, পাটনী সম্প্ৰদায়, নমঃশূদ্ৰ সম্প্ৰদায়, নাথ সম্প্ৰদায়, মুসলমান সম্প্রদায়, মণিপুরী সম্প্রদায়, বৰ্মণ সম্প্রদায়, হিন্দুস্থানী সম্প্রদায়, নাগা সম্প্রদায়, খাসিয়া সম্প্রদায়, মিজো সম্প্রদায়, কুকী সম্প্রদায়, মার সম্প্ৰদায়, টিপরা সম্প্ৰদায় এবং আরও অন্যান্য সম্প্রদায়। এই সকল সম্প্রদায়ের নিজ নিজ জাতিগত বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। বেশভূষা, আচার আচরণ সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদিরও পাৰ্থক্য আছে। প্রত্যেক সম্প্ৰদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি রহিয়াছে। এই অঞ্চলের লোকের বিভিন্নতা থাকিলেও তাহাদের মধ্যে কোন বিভেদ নাই। সর্বশ্রেণীর লোকেরা পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়া শান্তিপূর্ণভাবে এই বামাঞ্চলে বসবাস করিতেছে।

ভাষা ও ধর্মের দিক হইতে দেখিতে গেলে বামাঞ্চলের বৈচিত্র দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল বৈচিত্রময় ভাষা, ধর্ম ও আচার আচরণের পার্থক্য থাকা সত্বেও বামাঞ্চলের জনসমাজের মধ্যে গভীর একাত্মতাবোধ অনন্তকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষা ও আচার আচরণের বৈচিত্ৰ থাকিলেও বামাঞ্চলবাসী যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিয়াছে তাহা অতুলনীয়। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোক নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য পূর্ণ সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিয়াছে।

 

…………………………………………………………………………………………………

No comments:

Post a Comment