বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকার হওয়ার আগে ফেরত আসা বামের বিবাহের একটি ঐতিহ্য ছিল।
তখন
যৌতুক দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না । তবে, অভিভাবকেরা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং রান্নাবান্নার
জিনিসপত্র প্রদান করতেন যাতে তাদের মেয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। সেদিন রাত আমি
একই ল্যান্ড মাস্টার গাড়িতে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম এবং পরের দিন নববধূর আগমনের উৎসবগুলি
দেখতে পাইনি। তখন বামে কোনো রিসেপশন পার্টির প্রচলন ছিল না, যেমন বর্তমানে হয়ে থাকে। রীতি অনুযায়ী,
গ্রামের মহিলারা এবং আত্মীয়রা পরবর্তী দুই-তিন দিনে নববধূকে দেখতে আসতেন, যাকে স্থানীয়
ভাষায় "কইনা" দেখা বলা হয়। নববধূকে মাটিতে রাখা পাটির উপরে বসানো হত, সম্পূর্ণ
গুমটায় ঢাকা থাকতেন।পরিবারের
মহিলারা কনের গুমটা তুলে তুলে দর্শকদের তার মুখ দেখাতেন । কনে দেখে মহিলারা
‘মুখচানি’ বাবত টাকা বা অন্য কিছু দান করতেন ।মহিলাদের মধ্যে নববধূর পোশাক, অলংকার
এবং রূপ নিয়ে প্রাণবন্ত ও মুখ্রুচক খোশগল্প
চলত।প্রথম কয়েকদিন নববধুকে চলাফেরায় অনেক সংযত
থাকতে হত।খুব ধীর পদক্ষেপে মাটির দিকে থাকিয়ে অবগুণ্ঠন অবস্থায় হাটতে হত।স্থানীয় ভাসায়
যাকে ‘কইনাপাড়া’ বলা হত।একজন মহিলা তাকে সাহায্য করতেন।
আমি
আমার কৈশোরে বিয়ের অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগ করেছিলাম এবং বাম ও এর মূল্যবান সামাজিক
রীতিনীতির প্রতি একটি ধারণা পেয়েছিলাম, যেগুলি আজও আমার স্মৃতিতে আছে। আমার দ্বিতীয়
বাম ভ্রমণ ছিল ১৯৬২ সালে, যখন আমি ভাগাবাজারের পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে ভুবন পাহাড়ের
পাদদেশে অবস্থিত বিদ্যারাতনপুরে গিয়েছিলাম। আমার পূর্বপুরুষের গ্রাম বারিক নগর (যা
১৮৫৩ সালে একটি বন্ধ চা বাগানে প্রতিষ্ঠিত) থেকে একজন প্রতিবেশী বিদ্যারাতনপুরে চলে
গিয়েছিলেন। তার কাছে সীমিত জমি ছিল, যা তার পরিবারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল
না। শিলচর শহরের কাছে থাকার কারণে সেখানে জমির দাম অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল। প্রতিবেশী
তার জমি বিক্রি করে এবং শিলচরের আশেপাশের অনেক কৃষকের মতো, বামে বিদ্যরাতনপুরে গিয়ে
আরও অধিক জমি কিনে সেখানে বসতি স্থাপন করেন।
বামের
প্রথম পর্যায়ের বসবাসকারীরা ব্রিটিশ ভারতের পক্ষ থেকে এক 'হাল' (১২ কেয়ার) পর্যন্ত
বিনামূল্যে জমি পেয়েছিলেন। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে সেটিকে বাসযোগ্য করে জমির মালিক
হন এবং বার্ষিক জমি রাজস্ব পরিশোধ করতেন। এটি আমাকে চার্লস ডিকেন্সের গল্প "একজন
মানুষের কত জমির প্রয়োজন?" গল্পের চরিত্র পাহোমের কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পে, একজন
লোভী কৃষক পাহোমকে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যে পরিমাণ জমি ঘুরে
আসতে পারবে, সেই পরিমাণ জমি দখল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
বামে,
পরবর্তী কালের বসবাসকারীদের বামের আদি বাসিন্দাদের নিকট থেকে জমি ক্রয় করতে হত। যখন
আমি বিদ্যরাতনপুরে আমার প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলাম, আমি তাকে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত কৃষক
হিসেবে দেখতে পেলাম। তার যথেষ্ট পরিমাণ জমি ছিল, এবং তার উত্তরসূরীরা এখন মধ্য আয়ের
গোষ্ঠীর সদস্য, যারা মাছ চাষ, বাগান এবং উর্বর ধান ক্ষেতের চাষে নিযুক্ত।
ভুবন
পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বিদ্যারতনপুর গ্রামটি ছিল সুন্দর, এবং মানুষগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ,
সহজ, আতিথ্যপূর্ণ এবং কঠোর পরিশ্রমী। গ্রামবাসীরা "নিষ্কর বাজার" (অর্থাৎ
"কর মুক্ত বাজার") নামে পরিচিত স্থানীয় একটি হাটে জমায়েত হত। বাজারটি শুধুমাত্র
কেনাবেচার জন্যই নয়, বরং সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। আজকের মতো বিনোদনের
উপায় খুব কম ছিল; গ্রামবাসীরা চা দোকানের বাঁশের বেঞ্চে বসে এক গ্লাস চা উপভোগ করতে
করতে কথাবার্তা ও গল্পগুজবে মেতে উঠত।
আমি
আমার চাকরির সময় এবং অবসর নেওয়ার পর কয়েকবার বামে গিয়েছি। বামের ক্রমবিকাশ আমার চোখের
সামনে ঘটেছে। বাম অঞ্চলের অগ্রগতি কাছাড়ের অন্যান্য অংশের তুলনায় দ্রুত হয়েছে—চাই সেটা শিক্ষা,
সংস্কৃতি,ব্যবসা-বাণিজ্য বা সড়ক যোগাযোগই হোক।.
যদি
এই গতিতে অগ্রগতি (বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে)
বজায় থাকে, তাহলে বাম বারাক উপত্যকার একটি শীর্ষস্থানীয় গ্রামীণ অঞ্চল হয়ে
উঠবে।
…………………………………………………………………………………………………………………
লেখক পরিচিতিঃ-
আবু নছর নজমুল ইসলাম লস্কর গুয়াহাটিতে বসবাস
করেন ।তিনি অসমের সেচ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত
সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার। গুয়াহাটি রোটারি ক্লাব ও,গুয়াহাটি সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরামের( উত্তর-পূর্বাঞ্চল ) প্রাক্তন সভাপতি তথা বর্তমানে
ভারতের সরকারি সংস্থা NEDFi-তে সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত লস্কর বিভিন্ন এনজিওর সাথে জড়িত থেকে সামাজিক কাজ করে চলেছেন ।
………………………………………………………………………………………………………………
No comments:
Post a Comment