Friday, 11 September 2026

66.আমার ‘বাম’ সফরর -1 আবু নসর নজমুল ইসলাম লস্কর

 

আমার ‘বাম  সফর

শৈশবে পরিবারের আত্মীয় এবং বয়স্কদের কথাবার্তায় আমি প্রায়ই কাছাড় জেলার দক্ষিণ অংশে 'বাম' নামক স্থানের কথা শুনতাম ।আমার পূর্বপুরুষদের গ্রাম বারিকনগর থেকে কিছু পরিবার ইতিমধ্যেই বামে চলে গিয়েছিল।বাম সম্পর্কে যে তথ্যগুলো আমি শুনেছিলাম, তাতে বাম আমার কাছে  লুসাই পাহাড়ের (বর্তমানে মিজোরাম) কাছে অবস্থিতএক দূরবর্তী ও অনুন্নত স্থান হিসেবে মনে হতো,

 পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে বাস পরিষেবা কেবল শিলচর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে কাবুগঞ্জ পর্যন্ত ছিল তখনকার দিনে যারা শিলচর থেকে বামে যেতেন, তারা প্রথমে বাসে করে কাবুগঞ্জ পর্যন্ত যেতেন এবং তারপর ১৪ কিমি পথ হেঁটে ভাগাবাজারে পৌঁছাতেন। বামের বিদ্যারতনপুরে পৌঁছাতে হলে কাবুগঞ্জ থেকে ২২ কিমি পথ হেঁটে যেতে হতো। আবার, কাবুগঞ্জ থেকে ২৮ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে মিজোরামের সীমান্তবর্তী বামের বিষ্ণুপুর গ্রামে পৌঁছাতেন।

    শিলচর থেকে কাবুগঞ্জ পর্যন্ত বাস পরিষেবা চালু হওয়ার আগে, শিলচর থেকে বামে বা বাম থেকে শিলচরে যাওয়া আসার  জন্য লোকেদের ৩৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হত। সেই সময়ে পথে কোনো হোটেল ছিল না। তাদের কষ্টকর যাত্রার দুপুরের খাবার  জন্য “মছা” সঙ্গে   নিয়ে যেতে হত ।কাছাড়ের ঐতিহ্যবাহী “মছা” হল কোমল  কলাপাতা দিয়ে মোড়ানো ভাজা মুরগী বা মাছ সহ  ”বিরইন “ চালের পিঠা ।

বামের পাশাপাশি, শিলচর থেকে পূর্বদিকে সোনাইয়ের অনতিদূরে অবস্থিত  নতুন বসতি স্থান 'বাউরী' নামও মাঝে মাঝে উল্লেখ করা হত। এই দুটি স্থানের নাম একত্রিত হয়ে কাছাড় জেলার মূলভূমির লোকেদের অভিধানে ‘ বাম-বাউরী'  শব্দযুগল পিছিয়ে পড়া এবং দূরবর্তী স্থান অর্থে ব্যবহার করা হত। এটি এখনও বিদ্যমান। বাম আমার শৈশবের স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কখনো মনে হয়নি যে আমি একদিন বাম ভ্রমণ করব।

কিন্তু ১৯৬০ সালে যখন আমি শিলচর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম, তখন একদিন বাম ভ্রমণের সুযোগ এসেছিল ।

১৯৬০ সালের গ্রীষ্মের ছুটি ছিল এবং উপলক্ষ ছিল ভাগবাজারের মিরজান আলী লস্করের ছেলে তুরফান আলী লস্করের বিয়ের অনুষ্ঠান ।

আমার প্রথম বাম যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের মেহেরপুর বাড়ি থেকে। আমাদের পরিবার বারিকনগর থেকে মেহেরপুরে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সে সময় রাস্তায় কোনো যানবাহনের প্রাদুর্ভাব ছিল না, তাই আমরা মেহেরপুর থেকে প্রেমতলা বাস স্টেশন পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার পথ রিকশায় চড়ে চার আনা ভাড়া দিয়েছিলাম।

প্রেমতলা ছিল শিলচরের কেন্দ্রস্থল এবং গ্রামীণ কাছাড়ের বিভিন্ন গন্তব্যের জন্য একটি প্রধান বাস স্টেশন হিসেবে কাজ করত। টিকেট কাউন্টার প্রেমতলা পুলিশ পয়েন্টের কাছে চেন্ট্রাল রোডের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ছিল। প্রেমতলা এলাকার গুলধীগি থেকে বিভিন্ন গন্তব্য- যেমন ভাগবাজার, সোনাই, মতিনগর ও আমড়াঘাটের বাস ছাড়ত। বর্তমানে গুলধীগি মল এই গুলধীগি বাস স্ট্যান্ডের স্থলে স্থাপিত হয়েছে। এটি এখন একটি ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকা, তবে সে সময় এটি ছিল খালি। এটি আন্দোলনকারী এবং বামপন্থী দলগুলির জন্য মাঝে মাঝে ছোটোখাটো জনসভা করার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। একজন ক্যামেরাম্যান তার বড় ক্যামেরা একটি স্ট্যান্ডে রেখে কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় ছবি তোলার জন্য ওপেন স্পেসে দাঁড়াতেন ।সাধারণত পাসপোর্ট ছবি তোলা হত।

গুল দিঘির তীরে "নয় আনি দোকান" নামে পরিচিত কয়েকটি ফেরিওয়ালা দোকান ছিল, যেগুলো প্রতিদিনের ছোটখাটো নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি সামগ্রী নয় আনা দামে বিক্রি করতো। গোল দিঘির বিপরীতে, সেন্ট্রাল রোডের পশ্চিম পাশে, প্রয়াত খান সাহেব গাব্রু মিয়া চৌধুরীর  বিখ্যাত তিনতলা জিএমসি বিল্ডিং দাঁড়িয়ে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নির্মিত এটি শিলচরের প্রথম তিনতলা ভবন ছিল এবং ১৯৫০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত শিললচরের একমাত্র তিনতলা ভবন হিসেবে পরিচিত ছিল।

 

৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বামএর ভাগার উদ্দ্যেশ্যে আমাদের তিন ঘণ্টার বাসযাত্রা  শুরু হলো গুলধিঘি, প্রেমতলা থেকে। বাসটি, তখনকার কাছাড়ের  অন্যান্য বাসগুলির মতোই দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল: আপার ও লওয়ার । বাসের সামনে অংশে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে মোড়া দুটি  কাঠের বেঞ্চ ছিল।এটাই আপার ।আপার অংশের পেছনে তিনটি কাঠের  বেঞ্চ ছিল উল্লম্বভাবে রাখা এবং একটি বেঞ্চ ছিল বাসের পেছনে, যা ছিল লওয়ার ক্লাস।

……………………………………………………………………………………………………


No comments:

Post a Comment