Monday, 7 September 2026

64:বৈচিত্রময়ী বামঃএক স্মৃতিচারণ-20- নিশি কান্ত লস্কব়

 বামের মেলা-

বামের মহাদেবপুর গ্রামের মধ্যভাগে এক অনতিউচ্চ টিলার উপর  দেবাদিদেব মহাদেবের মন্দির ।এই মন্দিরকে হরগৌরী আশ্রমও বলা হয় । নিত্য পূজার্চনা ছাড়াও তিথি বিশেষে এই মন্দিরে পূজা ও উৎসব পালিত হয় ।চৈত্র মাসে   মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে এখানে ঘাটে বারুণী  গঙ্গাস্নান ,তর্পণ ও পূজা হয়ে থাকে । ঐ দিন ভোর থেকেই লোকের ভীড় , স্নান তর্পণ করে মন্দিরে এসে  ভগবান শিবের পুজা দেন । মহিলারা স্নানের পর  তেল ,সিন্দুর , ফল, ফুল ,দৈ , চিড়া প্রভৃতি মা গঙ্গাকে  অর্পণ করেন ।

আনুমানিক ১৯১৪ সন থেকে বারুণী উপলক্ষে  সপ্তাহ ব্যাপী  এখানে মেলা বসত। এই মেলা হরগৌরী মেলা নামে পরিচিত ।শুধু পার্শ্ববর্তী  গ্রামই নহে  দূর দূরান্ত থেকে  ও লোক এখানে মেলা দেখতে আসতেন ।তখনকার দিনে রাস্থাঘাট  গাড়ী ঘোড়ার ব্যবস্থা ছিলনা ,তাই তারা এই গ্রামেই রাত্রি যাপন করতেন ও গ্রামের লোকেরা তাদের থাকা খওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন ।খেলায় ফুটবল ,বলীবল ,হাডুডুডু( কপাটী) ও লাঠিখেলার  প্রতিযোগিতা হতো ।বিস্তীর্ণ  ক্ষেতের মাঠে  ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল বিশেষ আকর্ষণীয় ।

জামা কাপড,  জুতা ,গয়না, চুড়ী ,প্রসাদন ও নানারকম  সাজসজ্জার দোকান বসতো । গ্রামের লোকেরা তাদের উৎপন্ন শাক সব্জী,ফল মূল বিক্রী করতেন , হস্ত শিল্পীরা  বাঁশ বেতের  তৈরী ধান শুকানো ও সংরক্ষনের জন্য -ডাম,চাটাই ,টুকরী ,ডুংরী,খরাই,ডালা,কোলা ,পাটের রসি ,চালনি,মুড়া ,ঝাপি ,খলই ;মাছ ধরার পারণ , ডরি , জাল ,প্রভৃতি ,ক্ষেতের জন্য লাঙ্গল,জুয়াল , ইশ ,কুদাল,দা ,খুরপী ,কাস্তে ,পাতার ছাতা ,ধান ভানার জন্য কাঠের ঘাইল , ছিয়া (ভারসা)      ),কাপড় ধোঁওয়ার জন্য কাঠের গামলা ,পাটের তৈরী রসি ,ছিকা  আর বাচ্চাদের জন্য নানা রকম খেলনা । চলতো চরকী , ম্যাজিক শো ,লেন্টারন লেকচার ,বায়স্কোপ ,লটারী খেলা । কেউ চড়ছে  চরকী ,কেউ বাজাচ্ছে বাঁশী , কেউ দেখছে বায়স্কোপ ,আবার কেউ খেলছে লটারী,কেউ কিনছে  চুড়ী,কেউ শুনছে মন্দিরে কীর্তন ,সব্ দিকে আনন্দ আর আনন্দ । সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে উঠে মশাল,হেজাক ,আর   লণ্ঠন কারণ ঐ সময় বিদ্যুৎ ছিলনা ।

এই মেলার  পরিচালনায় থাকতেন স্বর্গীয় কৃষ্ণ জীবন পুরকায়স্থ ,ধনঞ্জয় চক্রবর্তী ,চিন্তামনি পুরকায়স্থ,রূপচরণ  বড়ভুইয়া ,রাস মনি লস্কর ,সূর্য মনি লস্কর ,দীনেশ চন্দ্র পুরকায়স্থ ,উমেশ বিশ্বাস প্রমুখ,বাম নিত্যানন্দ স্কুলের শিক্ষকগণ পরিচালনা  ,এই স্কুলের ছাত্ররা সেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করতেন ।

 হরগৌরী মেলা ছিল এক গ্রাম্য মেলা যেখানে শুধু আনন্দ নয়  গ্রামের লোকের তাদের  নিজের কৃষিজ সামগ্রী ,হাতে তৈরী করা বাঁশ ,বেত ,কাঠ পাট প্রভৃতি সামগ্রী বিক্রী করে  কিছু টাকাও রোজগার করতেন ।এই মেলার মাধ্যমে বন্ধুত্ব ,ভ্রাতৃত্ব ,ও  সদ্ভাবের বিকাশ হত ।

দুঃখের বিষয় ১৯৫৩-৫৪ সনে বামের এই ঐতিহ্য বাহী  মেলা  বন্ধ হয়ে যায় ।অঞ্চলের সদ্ভাব, আর্থিক ও সামাজিক  উন্নয়নের  জন্য এই মেলা পুনরায়  চালু করা আবশ্যক ।এটা সম্ভব হবে যদি  স্থানীয় লোক ও যুবকরা আন্তরিকতার সহিত মেলা চালুর সক্রিয় ভূমিকা নেন ।

স্থান বিশেষে ও অবস্থা বিশেষে বাসন্তী পূজায়ও জাঁকজমক , নিষ্ঠা  তথা সাত্বিকতা  দৃষ্ট হয় । যেমন মিজোরামের সীমান্তবর্তী গ্রাম সিঙ্গেরহাওর  ফরেস্ট  ভিলেজে অনুষ্ঠিত সর্ব জনীন  বাসন্তী পূজা । গত ৯৭ বছর ধরে অত্যন্ত উৎসাহের সহিত এই  পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ।  দেবী বাসন্তীর  আশীর্বাদ লাভের  জন্য  বিস্তৃত আচার অনুষ্ঠান ছাড়াও  পাঁচ দিন ব্যাপী মেলা  অনুষ্ঠিত হয় । প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার  মানুষ মেলায় অংশ গ্রহন করেন ।

………………………………………………………………………………………………………….

No comments:

Post a Comment