Thursday, 29 October 2026

106.‘বামে’ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান-3:সাদুল্লাহ চৌধুরী ,রাজঘাট ,অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র লেকচারার, ডি.আই.ই.টি, উধারবন্দ । সহযোগিতায়- করুণাময় নাথের কন্যা শুভণা নাথ।

  

মানিক্য চন্দ্র নাথ  লস্কর

প্রারম্ভিক জীবন ও পটভূমি

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর বাম অঞ্চলে শিক্ষার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ১৮৯২ সালে কাছাড় জেলার দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কালীচরণ নাথ লস্কর এবং মাতা শ্রীমতি রাজ্যেশ্বরী দেবী । মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর এমন এক সময় বেড়ে ওঠেন যখন শিক্ষার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। এই প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও, তিনি অল্প বয়স থেকেই ব্যতিক্রমী শিক্ষার প্রতিভা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯১৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন এবং ১৯২০ সালে সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজ থেকে ডিস্টিংশন সহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি কাছাড় জেলা থেকে দ্বিতীয় স্নাতক হন, যা তার শিক্ষাগত যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য  হিসেবে পরিগণিত হয়।


মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর

 

কর্মজীবন এবং অবদান

"১৯২২ সালে মাননীয় শ্রী কৃষ্ণজীবন পুরকায়স্থ, কৃষ্ণচরণ বর্মণ, এবং কৃষ্ণধন বর্মণের উদ্যোগ, পৃষ্ঠপোষকতা ও ভূমি দানের পাশাপাশি অন্যান্য মহৎ ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে এবং নিত্যানন্দ বর্মণের অর্থদান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাম নিত্যানন্দ এম.ই. স্কুল।

১৯২৩ সালে, মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর বাম নিত্যানন্দ এম.ই. স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর কর্মকাল ১৯৬০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তিনি ১৯৩৮ সালে স্কুলটিকে একটি উচ্চ মাধ্যমিক  বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। ৩৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে বিএনএমপি স্কুল বরাক উপত্যকায় একটি প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তার কার্যকালে স্কুল শিক্ষার উৎকর্ষতা এবং নৈতিক বিকাশ অর্জন করে।

  তিনি বাম অঞ্চলের মত একটি প্রত্যন্ত এবং অনুন্নত এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তখনকার সময়ে তার ছাত্ররা বাম থেকে লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স, লন্ডন এয়ার  ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি এবং দিল্লি ইউনিভার্সিটির মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে  চলে গিয়েছিলেন।বিএনএমপি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা রাষ্ট্রীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, যা মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্করের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ মানের প্রতিফলন করে।        

    বাম অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ও প্রচার সুন্দর থেকে সুন্দরতম হয়ে ওঠে। যে অঞ্চল শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, আজ সেই অঞ্চল শিক্ষার আলোয়  উদ্ভাসিত। এই অঞ্চলের ছাত্ররা আজ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন উচ্চ পদে কর্মরত আছেন।সেসব সম্ভব হয়েছে মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্করের আত্মত্যাগের ফলস্বরূপ ।

শিক্ষাগত দর্শন ও শৃঙ্খলা

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর তার আত্মমর্যাদা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার একটি দৃঢ় আত্মসম্মানবোধ ছিল। তার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রায়শই তার ঐতিহ্যবাহী পোশাকে প্রতিফলিত হত: একটি ধুতি, তিন পকেট বিশিষ্ট সাদা শার্ট এবং গ্রীষ্মে একটি ছাতা, শীতকালে উপরের দিকে বোতামযুক্ত একটি কোট। ডানে-বায়ে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে এবং গম্ভীরভাবে হেঁটে তিনি তার পানিভরা বাড়ি থেকে স্কুল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিমি দূরত্ব অতিক্রম করতেন। বাস চালকরা শ্রদ্ধা বশত লিফট দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতেন।

প্রতিদিন ঘড়ীর কাঁটায় কাঁটায় ৯.৩০ মিনিটের সময় ধীর গতিতে এবং গাম্ভীর্য সহকারে স্কুলে প্রবেশ করতেন।তাঁকে দেখা মাত্র স্কুলে  গভীর নীরবতা নেমে আসতো ।ছাত্ররা সবাই শ্রেণী কক্ষে গিয়ে নীরব হয়ে যেত । শিক্ষকরা একইভাবে তার সুশৃঙ্খল সময়সূচী মেনে চলতেন। মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর একজন কঠোর শৃঙ্খলাবাদী ছিলেন, প্রয়োজনে শারীরিক শাস্তি বিধান করতে দ্বিধা করতেন না। যাইহোক, তার পদ্ধতিগুলি অভিভাবকদের দ্বারা সম্মানিত ছিল, যারা তার শৃঙ্খলাকে তাদের সন্তানদের সাফল্যের পথ হিসাবে দেখত। অনেক ছাত্র যারা তার কঠোরতা অনুভব করেছিল, তারা দক্ষ পেশাদার হয়ে উঠেছে। তার কঠোরতা সত্ত্বেও, তার ছাত্রদের প্রতি মানিক্য চন্দ্র নাথ  লস্করের স্নেহ স্পষ্ট ছিল এবংছাত্ররাও তাঁকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত। । তিনি নিজের পুত্রবধূকে "মা" সম্বোধন করতেন এবং বলতেন, "যেভাবে আমি তোমাকে মা বলছি, আমার শত শত ছাত্রও যেন তোমার মধ্যে সেই মাকে খুঁজে পায়।"

তিনি তার ছাত্রদের শিক্ষাগত ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি নিম্ন শ্রেণীতে ইংরেজি ব্যাকরণ ও উচ্চারণ শিখাতেন। বিএনএমপি স্কুলের ছাত্ররা কলেজে পৌঁছানোর পর ইংরেজি ভাষার উপর তাদের দক্ষতা উপলব্ধি করতে পারত। স্কুলে তিনি ইংরেজি উচ্চারণে অ্যাকসেন্ট, পজ এবং এমফ্যাসিসের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিতেন।

 মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর বাম অঞ্চলের প্রতি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে নিজের বাড়িতে গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন নিজের খরচে।

মাণিক্য চন্দ্র নাথকে বাম নিত্যানন্দ বিদ্যালয় থেকে বিদায় দেওয়া হয়নি। কেউই তাঁকে স্কুল চত্বর থেকে বিদায় জানাতে পারেনি। পরবর্তীতে, তাঁর নিজ বাসভবনে দ্বিতীয় শিক্ষক ও দ্বিতীয় পণ্ডিতের তত্ত্বাবধানে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

 ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর ছিলেন একজন সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তি যিনি তাঁর ছাত্রদের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠনে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ সরস্বতী পূজার পাশাপাশি, স্কুলে মাঝে মাঝে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করত, যেমন ১৯৫৯ সালে রাধারমন গোস্বামীজির  বক্তৃতা। কিছু অনুষ্ঠানে বাউলদের দ্বারা ভক্তিমূলক ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হত।

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর  প্রায়ই নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের উপাখ্যান  বর্ণনা  করতেন।সব সময় পুত্রবধূকে "সারদা" মায়ের আদর্শ গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁর পুত্র এবং পুত্রবধূ তাঁর আদর্শ ও ঐতিহ্য পরবর্তী কালে ধরে রাখেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সীমিত সংখ্যক মুসলিম ছাত্ররা মিলাদ আয়োজন করতে চাইলে মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর মিলাদ করার জন্য ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা একটি কক্ষের ব্যবস্থা করে দিতেন। স্কুলের পার্সি শিক্ষক মৌলভী আব্দুল রজ্জাক চৌধুরী পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে মক্কা থেকে হজ সম্পন্ন করে ফেরার পর, মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্করের উদ্যোগে মৌলভী সাহেব  স্কুলের ছাত্রদের সামনে তাঁর হজযাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। এছাড়া, ছাত্রদের মক্কা থেকে আনা খেজুর ও শুষ্ক ফলমূল পরিবেশন করেন।

 ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য এবং উত্তরাধিকার

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। স্কুল সম্পূর্ণ তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্লাসের আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবে একটি বেত হাতে নিয়ে স্কুলের বারান্দায় টহল দিতেন। তিনি শিক্ষক মহলের কমন রুমে যেতেন এবং শিক্ষকদের বিনীতভাবে মনে করিয়ে দিতেন যে তাদের একটি ক্লাস রয়েছে। স্কুলের নতুন শিক্ষক, তাঁর ছেলে করণাময় নাথের সঙ্গেও তিনি পেশাদার সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। যদি কোনোদিন তিনি  ক্লাসে যেতে দেরি করতেন মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর করুণাময়বাবাবুকে  বলতেন, “করুণা বাবু—আপনার এখন একটি ক্লাস আছে”

   মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর সিলেট আয়ূর্ব্বেদ কলেজ থেকে ডঃ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং উনি নিজে বাড়িতে আয়ূর্ব্বেদিক ঔষধ তৈরি করতেন। উনি ছিলেন নাড়ীজ্ঞ চিকিৎসক । নাড়ী দেখে অনেক রোগ ধরে দিতে পারতেন। এই চিকিৎসা দ্বারা তিনি গরীবের সেবা করতেন শুধু ঔষধ তৈরীর যৎ সামান্য মূল্য নিয়ে। পরবর্তী সময়ে উনার সুপুত্র করুণা ময় নাথ লস্কর ও উনার সেবামূলক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান।

  উপসংহারঃবামবাসী মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্করকে তাদের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিল এবং তিনি সেই দায়িত্ব অটুট  নিষ্ঠা ও সম্মানের সাথে পালন করেছিলেন। ৩৭ বছর ধরে, মাণিক্য চন্দ্র নাথ তাঁর জীবন উৎসর্গ করে বাম নিত্যানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়কে লালন-পালন করেছেন এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। শিক্ষাদান করা ছাড়াও, তিনি স্কুলের জন্য ২ বিঘা ৮ কাটা ভূমি দান করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও, তার আত্মত্যাগের উপযুক্ত স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। সাম্প্রতিক অতীতে  বিদ্যালয়টি তার শতবর্ষ উদযাপন করছে। এটি বামবাসী ও বাম নিত্যানন্দ বহুমুখী  উচ্চতর বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের জন্য তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখা নিশ্চিত করার   এক উপযুক্ত সময় । অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি না থাকলে যুক্তরাজ্য আজ যা আছে তা হতো না। একইভাবে বাম নিত্যানন্দ বহুমুখী  উচ্চতর বিদ্যালয়  না থাকলে বাম শিক্ষাগতভাবে আজকের মতো এগিয়ে থাকত না।মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর এই স্কুলটির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ।তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র ।


 

Tuesday, 27 October 2026

105.‘বামে’ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান -2:সাদুল্লাহ চৌধুরী সহযোগিতায় :মনমোহন সিকদারের কন্যা মিতা ব্রহ্ম ।

 


১৯৫৫ সাল পর্যন্ত, চান্নিঘাট এমভি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রদের তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে শিলচর যেতে হতো। পন্ডিত সিকদার নিজেই এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন । পায়ে হেঁটে অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করে তিনি  ছাত্রদের শিলচরে নিয়ে যেতেন ।

তার জীবদ্দশায়, পণ্ডিত সিকদার দক্ষিণ বামের একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছিলেন। জাতি-সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রতিজন গ্রামবাসী,  সপ্তাহিক বাজারদিন শনিবার ও মঙ্গলবারে  ভাগাবাজারে তাঁর সঙ্গে দেখা হলে -তাকে ‘আদাব’ দিয়ে অভিবাদন জানাতেন।

তার নেতৃত্বে চান্নিঘাট এমভি স্কুল মানসম্মত শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়। যদিও বর্তমান বামের অনেক  হাইস্কুলে  এখনও একটি স্কুল লাইব্রেরির অভাব রয়েছে, পণ্ডিত সিকদার চান্নিঘাট এমভি স্কুলে একটি সুসজ্জিত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা গ্রামবাসী এবং প্রাক্তন ছাত্রদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এই গ্রন্থাগারটি গ্রামীণ গ্রন্থাগার হিসেবে কাজ করত।তার অধিকাংশ ছাত্র সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।তার অসংখ্য ছাত্র বামকে শিক্ষাক্ষেত্রে  আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

 

 বামে আসার পর  সুখতলায়  কিছুদিন বসবাস করে তিনি আরাধনপুরে বসতি স্থাপন করেন। মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদার তিন বছর ধরে আরাধনপুর গ্রামের পঞ্চায়েতের সভাপতি হিসেবেও কাজ করেছেন। এল.পি. শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সময়, তিনি মাত্র ২৫০ টাকায় এই গ্রামে জমি কিনেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫৬ বিঘা জমির মালিক হয়ে উঠেছিলেন।

মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদার দু’বার বিবাহিত ছিলেন। প্রথম স্ত্রী মহিনীর  সাথে তাঁর দুটি সন্তান ছিল- একজন পুত্র, মানমোহন শিকদার এবং একজন কন্যা, চারু প্রভা শিকদার। মানমোহন শিকদার, যিনি বর্তমানে ৯১ বছর বয়সী, শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এবং পরে ১৯৯০ সালে এন.এফ. রেলওয়ে, মালীগাঁও থেকে অডিট অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। চারু প্রভা শিকদার শিলচরে কান্দিগাঁও  লোয়ার প্রাইমারি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং ২০২০ সালে ৯১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


‘পণ্ডিত মহেন্দ্রচন্দ্র স্মৃতিসদন’-১৯৯৯ সনে স্থাপিত এই স্মৃতিসদন  বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।এই স্মৃতিসদনকে একটি গ্রামীণ গ্রন্থাগার রূপে  ব্যবহার করা যেতে পারে।

 মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী প্রবালিনী থেকে চারটি পুত্র ছিলেন। বড় পুত্র মৃত্যুঞ্জয় সিকদার শিলচরে ডাক বিভাগের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। শিকদারের দ্বিতীয় পুত্র মন্মথ সিকদার জামালপুরে নর্মাল শিক্ষক হিসেবে এবং চান্নিঘাঠ এম.ভি. স্কুলের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে কাজ করেছিলেন। তৃতীয় পুত্র মোহিত সিকদার মালিগাঁও, গুয়াহাটি  থেকে সিনিয়র রেলওয়ে অডিট অফিসার হিসেবে কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন। সবচেয়ে ছোট পুত্র মলয় সিকদার শিলচরে এলআইসি-তে কাজ করে ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।


Monday, 26 October 2026

104.‘বামে’ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান-1 :সাদুল্লাহ চৌধুরী সহযোগিতায় :মনমোহন সিকদারের কন্যা মিতা ব্রহ্ম ।

 মহেন্দ্র চন্দ্র সিকদার

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে দক্ষিণ বাম অঞ্চলে আধুনিক স্কুল শিক্ষার উপস্থিতি ছিল না। উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে কাছাড়ের  বিভিন্ন স্থান থেকে লোকেরা এই অঞ্চলে চলে আসে। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল আর্থিকভাবে দুর্বল মুসলমান, হিন্দু এবং আদিবাসী জনগণ। লোকেরা ছিল নিরক্ষর। তাঁরা আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না ।দক্ষিণ বাম অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না।মুসলমান  শিক্ষার্থীদের ইসলামিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করার জন্য, মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরী তাঁর রাজঘাট বাসভবনে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন । তখনকার দিনে হিন্দু ছাত্রদের শিক্ষার জন্য দক্ষিন কাছাড়ে  কোনো  “টুল” হয়ত ছিল না ।এমন পরিস্থিতিতে  সন্তানদের আধুনিক শিক্ষা  প্রদান করা ছিল অভিভাবকদের কল্পনারও বাইরে। এমন একটি মুহূর্তে মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদার ১৯২০ সালে চান্নিঘাঠ এল.পি. স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল কাছাড়  জেলার দূরবর্তী দক্ষিণ অংশে আধুনিক শিক্ষার সূচনা।

তিলক রাম শিকদার এবং গুণময়ী দেবীর পুত্র মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদার  ১৯০০ সালের জুলাই  মাসে হাইলাকান্দির মনাছড়া চা-বাগানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা একজন চাষী এবং মাতা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ গৃহিনী। গুণোময়ী দেবী ছিলেন সদয় প্রকৃতির মহিলা এবং তাঁকে তাঁর নাতি-নাতনিরা ভালোবেসে “ঠাকুর দুধু” বলে ডাকতেন।

মহেন্দ্র চন্দ্র শিকদার ১৯১৬ সালে লালা মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তী কালে তিনি  বামের শুকতলায়  চলে আসেন এবং ১৯২০ সালে চান্নিঘাঠ এল.পি. স্কুল স্থাপন করেন।পরবর্তী দিনে  এই স্কুলে তিনি বাংলা মাধ্যমে  চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী শুরু করেন এবং ১৯৩০ সালে স্কুলটি  চান্নিঘাট এম ভি স্কুল হিসাবে বিভাগীয় স্বীকৃতি পায়। তিনি প্রধান পণ্ডিতের পদে যোগ্য না থাকায়, শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে তিনি দুই বছরের মধ্যে নর্মাল স্কুল পাস করেন। ১৯৩২ সালে তিনি শিলচর নর্মাল স্কুল থেকে নর্মাল পাস করেন এবং চান্নিঘাট এম ভি  স্কুলের হেড পণ্ডিত হন যেখানে তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কৃতিত্বের  সঙ্গে শিক্ষাদান করে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি হাওয়াইথাং  এম. ই স্কুলে প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তাঁর মূল্যবান সেবা প্রদান করেনএবং  ১৯৮৫ সালে তিনি  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।


                                                     মহেন্দ্র চন্দ্র সিকদার

তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক  এবং মনপ্রাণ দিয়ে শিক্ষা বিস্তারের জন্য কাজ করে গেছেন । সেই সময়ে, নারী শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয়  বলে মনে করা হত এবং পরিবারগুলি খুব অল্প বয়সে তাদের মেয়েদের বিয়ে দিতে পছন্দ করত। ছেলেদের স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে প্রায়ই খামারের কাজের জন্য তৈরি করা হত। এই পরিস্থিতিতে, পণ্ডিত মহেন্দ্র সিকদারের জন্য নতুন স্কুলে ছাত্রদের আকৃষ্ট করা একটি কঠিন কাজ ছিল। মুসলিম পরিবার থেকে ছাত্রদের স্কুলে আনা  আরও বেশি কঠিন কাজ ছিল, কারণ বামের মুসলমানরা সাধারণত স্কুল শিক্ষার প্রতি বিরূপ ছিল এবং তার পরিবর্তে মাদ্রাসা শিক্ষায় মনোনিবেশ করেছিল।

পণ্ডিত সিকদার তৃণমূল পর্যায়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে রাজি করান। এমনকি তিনি রাজঘাটের মওলানা আরজদ আলী চৌধুরীকে তার বড় ছেলে মাহমুদ হাছন চৌধুরী, যিনি একজন মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন, তাকে স্কুলে ভর্তি করতে রাজি করান। এই সিদ্ধান্ত একটি দিকনির্দেশক ঘটনা হিসাবে প্রমাণিত।. রাজঘাটের অন্যান্য মুসলমান গ্রামবাসীরা যখন দেখল যে একজন মওলানা তাঁর ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছেন, তখন তাদের অনেকেই তা অনুসরণ করেছিল। এটি রাজঘাটের মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার সূচনা করে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।

 (ক্রমশ)

……………………………………………………………………