২০১৫ ইংরাজীত যখন রাজঘাট
(ভাগাবাজার) দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার একশত বছর পূর্ণ হয় তখন মাদ্রাসা
পরিচালন সমিতির উদ্যোগে এবং বামের কৃতি সন্তান বর্তমান গুয়াহাটী নিবাসী আসাম সমবায়
বিভাগের আয়রপ্রাপ্ত আধিকারিক জিয়া উদ্দিন চৌধুরীর অনুপ্রেরনায় মাদ্রাসাটিৰ শতবৰ্ষ পূর্তি
উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এই উপলক্ষে একটি স্মরণিকা প্রকাশের ও প্রস্তাব গৃহীত
হয় যেটি সম্পাদনার দায়িত্ব আমার উপরে ন্যস্ত করা হয় ।
স্মরনিকার সম্পাদনার সেই দায়িত্ব পালান করতে
গিয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠালগ্নের ইতিহাস ও তথ্যাদির প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। মাদ্রাসা
প্রতিষ্ঠার সঠিক স্থান ও জমি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য মাদ্রাসা পরিচালন
সমিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং এ অঞ্চলের প্রবীন নাগরিকদের কাছ হতে প্রাপ্ত-তথ্যের
উপরে আমাদের নির্ভর করতে হয়েছে। প্রাপ্ত মৌখিক তথ্যমতে মাদ্রাসাটি ১৯১৫ ইংরাজীর
কোন এক সময়ে সপ্তগ্রাম নিবাসী মরহুম তুতিরাজা বড়ভূইয়ার ‘টঙ্গি’ ঘরে আরম্ভ করা
হয়েছিল। বছর খানেক পরে মাদ্রাসাটিকে সেখান হতে রাজঘাট নিবাসী মরহুম মৌলানা আরজদ
আলী চৌধুরীর (যিনি লাম্বা মৌলবী নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন) বাড়ীতে স্থানান্তরিত
করা হয়। মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরী মহোদয়ের পুত্র আসাম সরকারের সমবায় বিভাগের অবসর
প্রাপ্ত সঞ্চালক জানাব জিয়া উদ্দিন চৌধুরীর নিকট হতে প্রাপ্ত মৌখিক তথ্যমতে
রাজঘাটস্থ তাঁদের পৈত্রিক বাড়ীতে দীর্ঘ কয়েক বছর মাদ্রাসাটির পঠন পাঠন চলেছিল।
রামপুর হতে সনদ প্রাপ্ত মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরীকে তখন মাদ্রাসাটিকে পরিচালনার
দায়িত্ব দেয়া হয়। অবৈতনিক ভাবে দীর্ঘদিন তিনি যে দায়িত্ব পালন করেন। কয়েক বছর
পর যেখান হতে মাদ্রাসাটিকে আবার ভাগাবাজারে নিয়ে আসা হয় এবং বর্তমানে বিলুপ্ত
বাজরের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত সরকারী দীগির নিকটে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পরবর্তীতে
বিভিন্ন কারণে মাদ্রাসাটি ভাগাবাজার দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা
এবং রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা নামে
দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রথমোক্ত মাদ্রাসাটি ভাগাবাজার মাধ্যমিক প্রাঙ্গনে থেকে
যায় এবং দ্বিতায়টি রাজঘাট (রাঙ্গাউটি) দারুল ফায়েজ মাদ্রাসা নামে রাজঘাট
(রাঙ্গাউটি) নিবাসী মরহুম রাশিদ আলী লস্কর, হারুণ রাশিদ লস্কর এবং ইদ্রিছ আলী লস্কর ভাতৃত্ৰয়
কর্তৃক দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং অদ্যাবধি মাদ্রাসাটি সে জায়গাতেই
রয়েছে। প্রারম্ভিক সময়ে বিভিন্ন জয়াগায় এভাবে মাদ্রাসাটিকে স্থানান্তারের সঠিক
তারিখ-সন ইত্যাদি বিষয়ে লিখিত কোন তথ্য প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। সমস্ত কিছুই
প্রাপ্ত মৌখিক ভাষ্য ও প্রবীণদের স্মৃতি-ভিত্তিক বর্ণিত তথ্যের উপরই আমাদেরকে
নির্ভরশীল হতে হয়েছে। সেই হেতু মূল প্রতিষ্ঠা তথা বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরের
সন, তারিখ এবং সেসব জায়গায় মাদ্রাসার অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কিত তথ্যাদির
মধ্যে যথেষ্ঠ অসঙ্গতি ও মতানৈক্য বিদ্যমান রয়েছে। স্মৃতি নির্ভর তথ্যের মধ্যে
এরকম অমিল থাকাটা স্বাভাবিক ব্যাপারে বলেই ধরে নেয়া যায় ।
মাদ্রাসার নামে ওয়াকফকৃত
জমি-জমার লিখিত তথ্যরূপে আমাদের হাতে যে দলিলটির প্রত্যায়িত নকল (Certified Copy) রয়েছে
যেটি সম্পাদনার তারিখ হ'ল ২৬/০২/১৯২৪ ইংরাজী এবং সেটির সরকারী পঞ্জীয়নের তারিখ হ'ল ২৮/২/১৯২৪ ইংরেজী। দালিলটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে
আর্থিক প্রতিকূলতাহেতু দারুল ফয়েজ মাদ্রাসাটি চালানো প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়ার
কারণে বনগ্রাম নিবাসী মৃত ইদন মিয়ার পুত্র মুনসী ইব্রাহীম আলী মোট পনরশত
(১৫০০.০০) টাকা মূল্যের জমি মাদ্রাসার নামে ওয়াকফ করে দেন এবং বনগ্রাম নিবাসী মৃত
মুনসী ছনা মিয়ার পুত্র মুনসী মাহমদ আলী সাহেবকে উক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি তথা
মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করা হয়। তৎসঙ্গে মরহুম মহমদ হুছন
মিয়ার পুত্র মামদ খুরশিদ, বনগ্রাম নিবাসী হাজী ইছন মিয়ার পুত্র ইব্রাহীম মিয়া মুনসী এবং রাজঘাট নিবাসী
কাছিম মুফতির পুত্র মৌলবী আর্জদ আলী সাহেবকে সদস্য মনোনীত করা হয়।
এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য
যে মাদ্রাসার সাথে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং বাম অঞ্চলের অনেকে প্রবীণ
নাগরিক অনেকেই তাদের স্মৃতিচারণে পীর খুরশিদ আলী নামে এক সুফির স্বহস্তে সিলেটি
নাগরী হরফে লিখিত একখানা বই এর পাণ্ডলিপির
কথা বার বার উল্লেখ করেছেন এবং সেই পাণ্ডলিপিতে
মাদ্রাসা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য লিপিবদ্ধ আছে বলে মত ব্যক্ত করেছিলেন। মরহুম সুফি
খুরশেদ আলী সম্পর্কে জানা যায়যে তিনি অবিভক্ত ভারতের
শ্রীহট্ট জেলার চাপঘাট মৌজার অন্তর্গত খলাজাল গ্রামের আদি বাসিন্দা ছিলেন। প্রচলিত
তথ্যানুসারে ১৯১২ ইংরাজীতে তিনি বাম অঞ্চলে আগমণ করেন এবং সপ্তগ্রামে অবস্থান
করেন। এতদঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদ্গা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অগ্রণী ভূমিকা সর্বজনবিদিত।
ধলাইবাজারে অবস্থিত মমজি মসজিদটি (যা বর্তমানে মুসলিম মহল্লা বঞ্চিত) তারই হাতে
প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া বাম অঞ্চলের অন্যান্য অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাথে তাঁর নাম
জড়িত রয়েছে। উপরে উল্লেখিত বাংলা হরফে অনুবাদকৃত খুরছিদ আলী সাহেবের ওয়াকফ
নামার পাণ্ডলিপির এক জায়গায় এতদঞ্চলের
তখনকার দিনের মসজিদে সংখ্যার সুস্পষ্ট উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন তিনি
লিখেছেন— “২১ খানা মসজিদ আছে এ পরগণার মাঝে।” শতবর্ষ প্রাচীন দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা
প্রতিষ্ঠা ও পরিচালন ব্যবস্থা তথা মাদ্রাসার নামে ওয়াকফকৃত জমির তত্ত্বাবধান সব
কিছুর সাথেই খুরশেদ আলী সাহেবের নাম জড়িত রয়েছে। যতদূর জানা যায় জীবনের শেষভাগে
এই জ্ঞানতাপস, শিক্ষানুরাগী, সুফি পবিত্র মক্কা নগরে চলে যান; সেখানে অবস্থান কালে তাঁর মৃত্যু হয় এবং মক্কার
পবিত্র জান্নাতুল মোয়াল্লা গোরস্থানে তাকে দাখল করা হয়।
............................................................................................................................