Wednesday, 3 June 2026

11.বামে জনবসতির ধারাঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী


ত্রিপুরীদের রাজধানী বামের রাজঘাট থেকে কৈলাশহরে এবং সেখান থেকে আগরতলায় কবে সরে গিয়েছিল সে সঠিক সংবাদ আমাদের অজানা হলেও বাম থেকে ত্রিপুরীদের রাজধানী যে অন্যত্র সরে গিয়েছিল কথা সুধীমণ্ডলী স্বীকার করেছেন। রাজার রাজপাট সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর জনমুখর পরিবেশও নীরব হয়ে গিয়েছিল। রাজার  রাজন্য বর্গ, রক্ষী বাহিনী,  সজ্জনমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ অংশটি রাজার সঙ্গে নিশ্চয়ই চলে গিয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তার ভয়ে জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। জন্যই পরবর্তীকালে জনবসতির চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেছে।

জঙ্গল কেটে মানুষ বসতি শুরু করে। ফলে বনভূমিও লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। ঠিক উল্টোদিক থেকে দেখলে জনবসতি উঠে গেলে বসতি এলাকাও বনবাদাড়ে ঢেকে গিয়ে জনমানবহীন অরণ্য ভূমিতে পরিণত হতে পারে। বাম এর ব্যাপারে এই ঘটনাই ঘটেছিল। এক সময়ের জনমুখর এলাকা হয়ে গিয়েছিল জনমানবহীন গভীর বনাঞ্চল।  

ব্রিটিশেরা   কাছাড়ের শাসনভার হাতে নেওয়ার পর শুল্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নতুন জনবসতি স্থাপনের কাজে হাত দেয়। জনবসতি বিরল নতুন নতুন এলাকায় লোকবসতির বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কৃষক গৃহস্থদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া শুরু করে।

এতে এক সময়ের জনাকীর্ণ রাজ্যাংশ পরবর্তী সময়ে বনাঞ্চলে পরিণত হলেও ইংরেজ সরকারের নতুন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান শুরু করায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষিপাগল কৃষক গৃহস্থদের দল নতুন আবাদি উর্বর কৃষিযোগ্য ভূমির মালিকানা লাভের আশায় বিপুল সংখ্যক গ্রামবাসী বাম এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। তবে জনবসতি একই সঙ্গে এক দফায় নয় একভাবেও নয়

আনুমানিক ১৮৮৫ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার কৃষক গৃহস্থ পরিবারকে জমি বন্দোবস্ত দিতে শুরু করে। একর প্রতি ১৫ আনা খাজনা (রাজস্ব) নির্ধারিত করে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার এই প্রথায় ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০০০ একর জমি আগ্রহী গৃহস্থদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল। ১৯০৩ সালে ডেভিডসনাবাদ নামে এক নতুন পরগনার পত্তন করে জমি জরিপের কাজ নতুনভাবে আবার শুরু হয়েছিল। পরিবার প্রতি হাল  (১২ কেয়ার   বা   ১৪ বিঘা- ১ কেয়ার =১ বিঘা ৪কাটা ৪ ছটাক ) পতিত জমি পক্ষান্তরে বনভূমির খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়ে জনবসতি ব্যবস্থা শুরু করা হয়েছিল।

     এই সময়কালকে বলা হয় বনফারা - ইংরেজি শব্দ বনফায়ারের স্থানীয় উচ্চারণ যার অর্থ আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করা। বামের গভীর জঙ্গল ছিল গাছ গাছড়ায় ভরা ।জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য কোন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়নি।জমি বরাদ্দকৃতদেরকে কুঠার, দা এবং কোদাল এর মত সাধারণ হাতিয়ার ব্যবহার করে নিজেরাই জঙ্গল পরিষ্কার করতে হয়েছিল। এমনকি এই সাধারণ সরঞ্জামগুলি স্থানীয় কারিগরদের দ্বারা তৈরি করা হয়নি। এগুলো ঢাকা ও চাতক থেকে আগত কামাররা তৈরি করত। তাই আগুন জ্বালিয়ে বাকি থাকা গাছ-গাছালি কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করা সহজ ছিল।বনরাজ পরগনা,  লক্ষিপুর পরগনা এবং কাটলিছড়ার মতো অন্যান্য এলাকায় প্রায় বামের সঙ্গে নতুন বসতি গড়ে ওঠে। তারাও সেই সময়কে বনফারা কাল বলে থাকেন।

 

শ্রম বাঁচানোর পাশাপাশি বনফায়ারের বাড়তি সুবিধা ছিল। বামের গভীর জঙ্গল ছিল বাঘ, চিতাবাঘ, হায়েনা, চিতা, হাতির মতো হিংস্র বন্য প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। আগুন নিরস্ত্র নতুন বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হিংস্র প্রাণীদের দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এই বনফারা বা বনফায়ার বামের উদ্ভিদ প্রাণীজগতকেও  অনেকটা ধ্বংস করেছে।

………………………………………………………………………………………………………..