উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা প্রবর্তিত “ইনার লাইন রেগুলেশন” পদ্ধতি চালু করার দরুন বাম এলাকা ছিল সংরক্ষিত অঞ্চল। এই ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ “ইনার লাইন” হাইলাকান্দির রণটিলা থেকে রামপ্রসাদপুরের মধ্য দিয়ে কাছাড় মণিপুর সীমান্তের বরাক তীরের ময়নাডর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল । ‘ইনার লাইন’ এর দক্ষিন অঞ্চলে প্রবেশ করতে হলে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হত। নতুন ভূমি বণ্টন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর এই অনুমতি গ্রহণ পদ্ধতি শিথিল করা হয়। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে আগ্রহী কৃষক ও গৃহস্থকুল বামে গিয়ে বসতি শুরু করে
বামে জমি বরাদ্দের জন্য ব্রিটিশ শাসন কিছু মৌলিক
নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল, যার মূল নিয়ম ছিল যে একটি পরিবারকে যতটা জমি একটি হাল দিয়ে
চাষ করা সম্ভব ততটা জমি দেওয়া হবে । হিসাব করা হয়েছিল যে একটি লাঙ্গল ও ১ জোড়া গরুর (যাকে "হাল" বলা হয়) সাহায্যে একজন কৃষক
১৪ বিঘা জমি চাষ করতে পারে, যা "এক হাল জমি" নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অভিবাসী
কৃষকদের পরিবার প্রতি এক হাল বা ১৪ বিঘা জমি
বসতি স্থাপনের জন্য বরাদ্দ করা হতো।তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করতো ।
জমি পরিষ্কার করা, চাষ করা এবং সেখানে বসবাস করা
বরাদ্দপ্রাপ্ত কৃষকের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এরপরে নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কি না তা
নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশ রাজস্ব কর্মকর্তারা পরিদর্শন করতেন । কৃষক জমিতে উপস্থিত
থাকলে জমি বরাদ্দ নিশ্চিত করা হতো, আর অনুপস্থিত থাকলে বরাদ্দ বাতিল করা হতো।
অনুপস্থিতির কারণে অনেক কৃষক তাদের জমি হারিয়েছেন
এমন ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতি থেকেই বামে স্থানীয় প্রবাদ “আ্ঘিতে(হাঘিতে) বাম যায়” এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো "বামে প্রকৃতির
ডাকে সাড়া দিতে গেলে জমি হারাতে হয়।"
এই প্রবাদটি একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে। এখানে এক
কৃষক জমি পরিদর্শনের সময় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে জমি
থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রাজস্ব কর্মকর্তারা এসে তাকে জমিতে না পেয়ে তার বরাদ্দ বাতিল
করে দেন। ফিরে এসে কৃষক বুঝতে পারেন যে তিনি তার জমি হারিয়েছেন এবং দুঃখ করে বলেন,
"আ্ঘিতে বাম যায়।" সেই থেকে এই প্রবাদটি এমন পরিস্থিতির জন্য ব্যবহৃত হয়
যেখানে আপনি সঠিক মুহূর্তে উপস্থিত না থাকলে মূল্যবান কিছু হারাতে পারেন।
জনবসতির এই পর্যায়ে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি রোগের আক্রমণ,বন্য-হিংস্র পশু আর বিষাক্ত পোকামাকড় সরীসৃপের প্রাণঘাতি আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নতুন বসতকারী জনমণ্ডলী বাম এলাকাকে আবার জনবসতিপূর্ণ এলাকারূপে গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। এর ফলে এলাকায় ৮০ টি নতুন গ্রাম গড়ে উঠে। কলেরা এবং গুটিবসন্ত বামে বনফারার সময় মহামারী আকার ধারণ করত এবং বিশাল জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন করে দিত। মানুষ রোগের কারণ বা চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুই জানত না । তারা একে মড়কের অপভ্রংশ রূপ ‘মরকি’ বলে অভিহিত করতেন। এটি কখনও কখনও পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিত। ১৯১৮ সালের শুরুর দিকে ধলাই আব্দুল মজিদ ডিস্পেন্সারী প্রতিষ্ঠিত হয়। ডিস্পেন্সারী থেকে ম্যালেরিয়া ইনজেকশন এবং গুটিবসন্তের টিকা দেওয়া হত। প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে মহামারী কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে ।জয়নগরের আব্দুল মজিদ লস্করের ইস্টেইট থেকে দানকৃত
জমিতে ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সরকারী ডিসপেনসারিটি তার নামানুসারে নামকরণ করা হয়। জয়নগরের এই আব্দুল মজিদ লস্কর ইস্টেইটের ধলাইবাজারে ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে এবং বর্তমানে ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি খাজনা সংগ্রহ করে থাকেন।