Saturday, 13 June 2026

21.বামের বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় বৈশিষ্টঃ-২জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 মসজিদ ও ঈদ্গাহঃ

বামের মুসলমানদের প্রতিদিন পাঁচবার নির্দিষ্ট সময়ে নমাজ পাঠ বা প্রাত্যহিক উপাসনা অবশ্যই করণীয় কর্ম এই বাধ্যতামূলক প্রাত্যহিক উপাসনা বা নমাজ পাঠে আবার এককভাবে একা একা সম্পন্ন করার চাইতে সমবেতভাবে সম্মিলিত উপাসনাতে অনেক বেশি পূণ্যার্জন হয়।

এজন্য রোজ পাঁচবার সমবেতভাবে নামাজ পাঠ  করার জন্য এবং শুক্রবারে সমবেতভাবে জুম্মার নমাজ পাঠ করবার জন্য উপাসনালয় বা মসজিদ মুসলমান সমাজের এক অপরিহার্য ধর্মীয় অনুষঙ্গ। মসজিদ হচ্ছে মুসলমান সমাজের বৌদ্ধিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক অর্থনৈতিক প্রগতির  কেন্দ্রস্থল। মসজিদগুলো সামাজিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।    “ তথ্য ভিত্তিক বামের মসজিদ সমুহ” গ্রন্থে অধ্যাপক সাবির আহমেদ চৌধুরী বামের প্রতিটি মসজিদের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বইটি বামের প্রতিটি মসজিদের ঐতিহাসিক তথ্যের একটি মূল্যবান উৎস । তথ্য অনুসারে বর্তমানে বাম এলাকায়  মসজিদের  সংখ্যা ৬৫ টি।

   বামের এই সকল ৬৫ টি মসজিদের উদ্দেশ্য, মৌলিক কাঠামো, উপাদান, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থব্যবস্থা একই রকম, শুধুমাত্র মহল্লার আকার এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে মসজিদের আকার এবং আয়তনে পার্থক্য রয়েছে।  নিম্নে বামের মসজিদসমূহের এক রূপরেখা তুলে ধরা হল।

বামের প্রতিটি মসজিদ একটি গ্রাম বা একাধিক গ্রাম নিয়ে গঠিত মহল্লার ব্যবহারের জন্য নিবেদিত ।

প্রতিটি মসজিদ সাধারণ সভায় মহল্লার বাসিন্দাদের দ্বারা নির্বাচিত একটি ম্যানেজিং  কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। এক একটি  ম্যানেজিং কমিটিতে একজন সভাপতি, সেক্রেটারি -কাম-কোষাধ্যক্ষ এবং মতওয়াল্লি মুতাওয়াল্লি হলেন একজন তত্ত্বাবধায়ক বা ট্রাস্টি, যিনি একটি মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন।

বামের মসজিদগুলিতে নিম্নলিখিত অবকাঠামো পাওয়া যায়।

মিহরাব- মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে একটি কুলুঙ্গি যা মক্কার দিক নির্দেশ করে (কিবলা), যার দিকে মুখ করে মুসলমানরা প্রার্থনা করে। ইমাম মিহরাব থেকে জামাতের নামাজের নেতৃত্ব দেন।

 মিম্বর-একটি মিম্বর( ছোট এবং উচ্চতর প্ল্যাটফর্ম)  যেখান থেকে ইমাম জুমার নামাজ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভাষণ (খুতবা)  দেন।

 অযু এলাকা : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য নামাজের আগে রীতি অনুযায়ী হাত, মুখ পা ধোয়ার সুবিধা সহ স্থান।

মিনার: একটি লম্বা মিনার যেখান থেকে আযান দেওয়া হয়। এটি প্রায়শই একটি স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য যা মসজিদের উপস্থিতির প্রতীক।

 চেহন-  মসজিদের পূর্ব অংশে একটি খোলা স্থান রয়েছে যা প্রার্থনা , শিশুদের ইসলামিক শিক্ষা এবং সম্প্রদায়ের সমাবেশের জন্য একটি অতিরিক্ত স্থান হিসাবে কাজ করে।

ওয়াশরুম -যারা এখানে নামাজের জন্য আসে তাদের প্রস্রাব এবং মলত্যাগের জন্য তৈরি ওয়াশরুম এই সুবিধাগুলো ইসলামিক অনুশীলনে পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

জলের পুকুর - প্রতিটি মসজিদে ওজু এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যবহারের একটি জলের পুকুর রয়েছে। এটি  মসজিদের একটি অপরিহার্য উপাদান। আজকাল জলের পুকুরের  জায়গায় পাইপের জল আসছে ।

 উপরোক্ত সাধারণ সুবিধার পাশাপাশি বামের অনেক মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য কর্মীদের জন্য আবাসিক কোয়ার্টার রয়েছে।

Friday, 12 June 2026

20.বামের বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় বৈশিষ্ট-১ : জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

                                                                                

.বাম প্রধানত হিন্দু ,মুসলমান, এবং সীমিত সংখ্যক খ্রিস্টান দ্বারা অধ্যুষিত।প্রতিটি সম্প্রদায়ই তাদের নিজনিজ ধর্মীয় রীতিনীতি, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিরাজমান রয়েছে।বাম বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ঐতিহ্যের একটি অঞ্চল। বামের ধর্মীয় আচার উপাসনার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সবুজ নির্মল পরিবেশে, মন্দির, মসজিদ, গীর্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়গুলি বামের মানুষকে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য সম্পর্কে প্রতিনিয়ত  স্মরণ করিয়ে দেয়। হিন্দু স্তোত্রের সুরেলা মন্ত্র, মিনার থেকে নামাজের আহ্বান এবং গীর্জার স্তোত্র গুলি বামে ধর্মীয় প্রেরণার উৎস। বামে অসংখ্য মন্দির, মসজিদ, গীর্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের উপস্থিতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নির্দশন।

বামের মুসলমান  সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্টঃ

বরাক উপত্যকার বিভিন্ন স্থান থেকে বামে আগমনের পর প্রথম পর্যায়ের মুসলমান বসতকারীরা নামাজ সম্পাদনের জন্য মসজিদ নামাজ পরিচালনার জন্য ইমামের প্রয়োজন অনুভব করে।এছাড়াও, সাবাহী মক্তবে শিশুদের ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি শেখানোর জন্য ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল কিন্তু প্রথমপর্বের বসতকারীদের মধ্যে ইমাম বা ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না।

 

১৯১৫ সনে সিলেটের পীর খুরশেদ আলী সাহেব এসে পুরো ধর্মীয় উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। তিনি ১৯১৫ সনে বামের সপ্তগ্রামেদারুল ফয়েজ' নামে প্রথম মাদ্রাসা স্থাপন করেন। পরে ১৯১৭ সনে রাজঘাটের মুফতি গোষ্ঠীর মওলানা আরজদ আলী চৌধুরী তার চাচাতো ভাই মওলানা আব্দুল হামিদ চৌধুরী উত্তর প্রদেশের রামপুর থেকে ইসলামী শিক্ষার উচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ফিরে এসে নতুন বসতকারীদের পথ নির্দেশনায় নিজেদের একান্তভাবে নিয়োজিত করেন ইসলামী তরিকায় জীবন পরিচালনায় সাহায্য করেন। সে সময় বামে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল কম এবং উপযুক্ত শিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে সপ্তগ্রামেদারুল ফয়েজ' মাদ্রাসা চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাই মাদ্রাসাটি ১৯১৮ সনে স্থানান্তরিত হয় রাজঘাটে মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরী সাহেবের বসতবাড়ির এলাকাভূক্ত স্থলে। মৌলানা সাহেব সেখানেই মাদ্রাসা শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন। অতি শীঘ্র মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ফলস্বরূপে পরবর্তীতে মাদ্রাসাটি ভাগাবাজারে স্থানান্তর করা হয় এবং সর্বশেষে তিরিশের দশকের মাঝামাঝিতে রাজঘাটের বা রাঙাউটির স্থায়ী স্থলে স্থানান্তরিত হয়। মৌলানা সাহেব এজন্য মাদ্রাসার জন্য এক বিঘা জমিও ওয়াকফ করে দেন ।পীর খুরশেদ আলী সাহেব ১৯১৫ সালে ধলাই বাজার মসজিদ স্থাপন করেন। শেষ বয়েসে তিনি মক্কায় গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন তাঁর বাম ত্যাগের সঠিক তারিখ নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এভাবে বাম এলাকায় ইসলামি শিক্ষার প্রয়াস সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়দারুল ফয়েজ' মাদ্রাসাই এলাকায় ইসলামি শিক্ষার প্রথম প্রদীপটি জ্বালিয়েছিল।

 

     বাম অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষা প্রসারেদারুল ফয়েজমাদ্রাসার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা লাভ করে বহু ইসলামি পণ্ডিত উত্তর প্রদেশের রামপুর, দেওবন্দ এবং কাছাড়ের বাঁশকান্দি মাদ্রাসায় উচ্চতম ডিগ্রী নিয়ে মৌলানা হয়ে বাম এলাকায় এবং বামের বাইরে সুনাম অর্জন করে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

ছিল বামে নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক প্রয়াস। জনবসতির প্রথমপর্ব থেকে ক্রম প্রচেষ্টার ফলে যে আদর্শ গড়ে উঠেছিল সে আদর্শের সূচনা অনুসন্ধান করতে গেলে জনবসতির প্রথম পর্বের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়।

জনবসতির প্রথম পর্বে বিক্ষিপ্ত ভাবে লোকজনের বসবাস ছিল। ফলে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের দায়বদ্ধতা ছিল নিতান্ত দুর্বল ইসলামি শিক্ষার আলোকে সেই উদাসীনতার অভিশপ্ত অধ্যায় উঠে গিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধ জাগরিত হয়ে উঠতে শুরু করে। মাদ্রাসা দারুল ফয়েজ মানুষের মধ্যে নৈতিক চেতনাবোধ জাগিয়ে তোলেশৃঙ্খলাবদ্ধ বলিষ্ঠ সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠার ভাবনা নিয়ে এলাকায় আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে।

বাম   অঞ্চলজুড়ে বসবাস করা মুসলমান জনবসতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ১২খানা ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অঞ্চলের মুসলমান সমাজকে নৈতিক মূল্যবোধের পাঠ দিয়ে চলেছে সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতারও শিক্ষাদান করছে।

এলাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহু বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত বাম এলাকায় এবং এলাকার বাইরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান দিয়ে সার্থক নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন

………………………………………………………………………………..