Tuesday, 13 October 2026

91.বিলুপ্তির পথে বামের কথ্যভাষার কিছু শব্দ-1 : জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


         “নানা ভাসা,নানা মত , নানা পরিধান,   বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”

                  বৈচিত্রময় ভারতবর্ষের আদর্শ সম্বন্ধে কবিগুরুর এই মহা মুল্যবান  মন্ত্যবটি   মূর্তিমান সত্য  হয়ে পরিস্ফুট হয়েছে আমাদের এই বাম অঞ্চলে ।বাম অঞ্চলে  বহু ভাষাভাষী মানুষ তাদের পরম্পরাগত  পোষাক পরিচ্ছদ আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে  পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন ,কারো স্বাধিকারে অন্য কেউ  হস্থক্ষেপ করেনা ।তথাপি কালের প্রভাব থেকে কেউই  মুক্ত হতে পারে না ।তাই দিনে দিনে সরা পৃথিবী ব্যাপী  চলছে ভাষার সংমিশ্রণ । সম্ভবত আজকের পৃথিবীতে সভ্যতার সংস্পর্শে আসা এমন কোনোও ভাষা নেই ,যা নির্ভেজাল ভাবে টিকে  আছে  ( জরোয়াদের মত আদিবাসী ছাড়া ) । তবে কোথাও কোথাও এই মিশ্রণ আগ্রাসী রূপ ধারণ করে অপর ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার পথ অনুসন্ধান করছে ।ভারতবর্ষের প্রতিটি ভাষায়,আজ অন্য ভাষার ,বিশেষ করে  হিন্দি , আর ইংরেজী ভাষার  প্রভাব  খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় । মানুষের সাধারণ  কথাবার্তার মধ্যে  হুট করে হিন্দি কিংবা ইংরেজী প্রবেশ আজকাল জল ভাত হয়ে গেছে । বাংলার উপর  ইংরেজীর প্রভাব এমন পর্যায়ে       পৌচেছে      যে  বাংলার অস্তিত্ব সঙ্কট  নিয়ে  ভাষাবিদেরা চিন্তায়  পড়ে গেছেন ।  বাংলার বাবা- মা    আর আব্বা আম্মাকে কবেই ঘর ছাড়া করে দিয়েছে  পাপা- মাম্মী । ইদানিংকালে দাদা দিদিকেও ব্রো আর সিসি তাড়া করে বেডাচ্ছে। সম্পর্কের নিবিড় মাধুর্য তো সিকেয় উঠেছে  ভিন্ন  ভাষার   প্রভাবে । ।ফুল কাকা ,রাঙ্গা পিসি ,ভালো জেঠু , সোনা মামা ,  মিষ্টি মাসি সবাই তো একসারিতে  এসে আংকল আর আন্টি হয়ে  বসে আছেন ।এই আগ্রাসন থেকে বাদ যায়নি বামাষ্ণলের প্রচলিত কথ্য ভাষাও । আসামের বরাক উপত্যকা এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের প্রচলিত বাংলার মধ্যে  যে মাধুর্য ও গভীরতা ছিল  তাও আজ বিলুপ্তির পথে । দিনে দিনে এ ভাষার অবক্ষয়  ঘটছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে । বাংলাদেশের জনৈক ভাষাবিদ যিনি বর্তমানে পশ্চিমী কোনোও দেশের বাসিন্দা , কিছুদিন আগে বদরপুরে  এক জনসভায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন ,আমাদের এতদঞ্চলের একটামাত্র শব্দ দিয়ে , যে কথাটা বুঝানো যায় , অন্য ভাষায় বলতে গেলে তিন লাইনের একটা বাক্য দিয়ে তা যথার্থ ভাবে বুঝানো যায় না । দৃষ্টান্ত রূপে তিনি “  উষ্টা “ শব্দটিকে উপস্থাপিত করেছিলেন ।

…………………………………………………………

Monday, 12 October 2026

90.দক্ষিণ আসামের ‘বাম’ অঞ্চলের কিছু লুপ্তপ্রায় খেলা-6 :দেবতোষ নাথ

              মেয়েদের মধ্যে,- বিশেষ করে কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে 'পুতুলর বিয়া' শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাম অঞ্চলের লোক-বিশ্বাসও। কাপড়ের ন্যাকড়া দিয়ে বর-কনে বানিয়ে যথারীতি অধিবাস থেকে বিয়ে, বাসি বিয়ে ইত্যাদি সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা মেনেই মহা ধুমধামের সাথে বর ও কনে রূপী পুতুলদের বিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি এ জন্য ভোজেরও আয়োজন করা হয়। অন্যান্য বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো পুতুলের বিয়েতেও অধিবাস, মালা-বদল, ঘাটস্নান ইত্যাদি বিষয়ক ধামাইল গাওয়া হয়। যেমন ঘাটস্নানে যাওয়ার সময় হাসি-তামাসা করে একটি গান করা হয়, -

          চল গো সখি যাইগো জলে /

           ঘর থাকি জামাইর মা বাইরয় না। 

          চউকর চশমা, হাতর ঘড়ি /

          জামাইর মা-য় খুজিয়া পাইলো না ।। 

          মাথার তৈল, সিথির সিন্দূর/

          জামাইর কাকিয়ে খুজিয়া পাইলো না ।

         আয়না তুলিয়া চাইয়া দেখে/

         সাজ-তো ভালা অইলো না ।।

     অনেকের বিশ্বাস, এভাবে পুতুলের বিয়ে দিলে অনাবৃষ্টির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ।অবশ্য একই উদ্দেশ্যে কখনো কখনো দু'টি ব্যাঙ-কে ধরে তেল-সিদুঁর মাখিয়ে ছড়া কেটে কেটে তাদেরও বিয়ে দেওয়া হতো। ছড়াটি এরূপ, -

             বেঙর বিয়া, তেল সিন্দূর দিয়া, 

             বেঙর বিয়া,  ছাত্তা মুড়িত দিয়া । 

      বৈচিত্র্যে ভরা এই ধরিত্রীর বুকে অসংখ্য প্রাকৃতিক উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা থেকে প্রচুর আনন্দ লাভ করা যায়। তবে সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি বদলাচ্ছে, চাহিদা পাল্টাচ্ছে, - সেই সাথে আনন্দ উপভোগের অনেক নতুন নতুন উপকরণ আজ সহজলভ্য। তাই নতুন কিছু পাওয়ার নেশায় বা অধিক থেকে অধিকতর পাওয়ার লোভে আমরা ছোট ছোট, অথচ অনাবিল-নির্মল আনন্দগুলোকে উপেক্ষা করেই চলেছি। 

        কালের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারো নেই। অপ্রতিরুদ্ধ তার গতি। গতিশীল এই পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে আমরা বন্ধ করতে পারবো না ঠিক, কিন্তু কালের করাল গ্রাসে দ্রুত হারিয়ে যাওয়াকে তো কিছুটা বিলম্বিত করতে পারি। কিন্তু সে চেষ্টা থেকেও তো আমরা নিবৃত থেকে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি। আমাদের অবহেলা, অনীহা আর সর্বোপরি উন্নাসিক মানসিকতার জন্য চোখের সামনে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেখেও এগুলো সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপই নিচ্ছি না। 

        সভ্যতার এই সঙ্কট আজ শুধুমাত্র বাম অঞ্চলেই নয়,- পৃথিবীর সব স্থানেই এই একই ছবি ভীষণভাবে দৃশ্যমান। আমরা ভুলে যেতে বসেছি যে ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে নয়, নবীনকে বরণ করার সাথে সাথে প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাকেও সঙ্গে করে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আজ উন্নয়নের মোহ লৌকিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে জীবনটাকে আমরা একটা যন্ত্রের মতোই করে তুলেছি,- যেখানে সব কিছুই একটা নিয়ম বা ছকে বাঁধা। জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার নাম করে তাই আমরা সবাই এক একটা অর্থ উপার্জনের যন্ত্র তৈরিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। হৃদয়টাকে সরিয়ে ফেলে মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়াতে নানা রকম চিপস লাগিয়ে দিচ্ছি। মানুষ থেকে যন্ত্রমানব তৈরিতেই আজ আমাদের অধিক আগ্রহ। ফলে নতুনত্বের সন্ধানে পুরোনো বস্তুর কদর যেমন কমছে, তেমনি বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। 

 

 ………………………………………………………………………………………………

লেখক পরিচিতিঃ-

দেবতোষ নাথ : বরাক উপত্যকার  নৃত্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র  অধুনা শিলচরে বসবাসকারি দেবতোষ নাথ  সাহিত্য জগতেও সমধিক প্রসিদ্ধ । সঙ্গীত বিষয়ক বিভিন্ন রচনা(কত্থক, রবীন্দ্র নৃত্য,তবলা বাদ্য বিষয়ক) ছাড়াও তাঁর রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস,রহস্য উপন্যাস গুলোও পাঠক চিত্ত জয় করতে সমর্থ হয়েছে ।খুব শীঘ্রই গবেষণামূলক গ্রন্থ “ভারতীয় শিল্প সাধক “(তিন খণ্ড) প্রকাশিত হতে চলেছে ।

………………………………………………