Friday, 9 October 2026

88.দক্ষিণ আসামের ‘বাম’ অঞ্চলের কিছু লুপ্তপ্রায় খেলা -4 :দেবতোষ নাথ

 

   আরেকটি মজার খেলা, যেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই এক জায়গায় চক্রাকারে বসে হাতের আঙ্গুল সোজা রেখে মাটিতে রাখে। তারপর একটির পর একটি হাতের পৃষ্ঠদেশে কিল মেরে মেরে ছড়া আওড়ানো হয়, -

            আড়কি শিছইন, দাড়কি পিছইন /

            রাজার ঘরো কুকুড়ি / মোরে দিলা বাকুড়ি /

            এর পা সের পা, রাজায় কইচইন /

            কাটিতা কুটিতা / দলোর তলো কুয়াইতা /

            দল দুল ভাঙিয়া / বুম্বাই মাত্তম / থেং থেঙ্গা ।

       এই  'থেঙ্গা' শব্দটির সাথে যার হাতে কিল পড়বে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে পেছন দিকে লুকিয়ে রাখবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে প্রত্যেকের হাত লুকানোর পালা শেষ হলে তাদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে, -

           ও ছুড়ি তর আত কানো?     চিলে নিছে । 

           চিল কানো  ?                       বা-বনো  ।

           বা-বন কানো ?                     

       শেষ প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে সবাই তখন হাত বের করে দেখাতে থাকবে। 

       কতটা পুরোনো বলতে পারবো না, তবে প্রায় এ রকমই  আরেকটা ছোট বাচ্চাদের খেলা, সাধারণত বাচ্চারা 'আঙ্গুল আঙ্গুল খেলা' বলে থাকে, - এখনো কোথাও কোথাও বাচ্চাদের খেলতে দেখা যায়। খেলাটি দু'হাতের আঙ্গুল গুণে গুণে করা হয়। যতজন খুশি একসাথে খেলা যায়। আঙ্গুল গুণতে গিয়ে যে ছড়াটি বলা হয়, তা এরূপ, -

               আঙ্গুল আঙ্গুল তাড়াতাড়ি 

               ইস্টিশনে মিষ্টি ফুল, 

               সাধুবাগানে গোলাপ ফুল ।

         এ রকম অনেক গ্রাম্য খেলা আছে, যেগুলো থেকে একদিকে যেমন ছড়ার আনন্দ লাভ করা যায়, তেমনি তৎকালীন সমাজ-জীবনের টুকরো ছবিও ফুটে ওঠে। যেমন, রেলগাড়ি খেলাটির এই ছড়া, -

         এপ্রেনটি ভাসকর / লাইবেরী ঠেসকর /

         সুলতানা বিবিয়ানা / সাহেব বাদূর বৈঠকখানা /

          সাহেব বলে কে হে / পান সুপারি এনে দে /

          পানের আটা মরিচ বাটা /

         ইস্কাবনের ছবি আকা / আমার নাম রেণুবালা  /

          গলায় পরি হিরণমালা, - ঘোমটা। 

     এই খেলায় দু'জন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দু'হাত তোলে একে অপরের হাত ধরে একটি তোরণের মতো বানাবে। বাকি খেলোয়াড়রা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে রেলগাড়ির মতো সারি বেধে লম্বা লাইন করে ছড়া কাটতে কাটতে তোরণটির নিচ দিয়ে যাওয়া আসা করবে। ছড়াটির শেষ শব্দ অর্থাত 'ঘোমটা' উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনের যে খেলোয়াড় তোরণের মধ্যে থাকবে, তাকে আটক করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে সে কোন দলে যোগ দেবে। তখন সে তার পছন্দমতো দল বেছে নিতে পারবে। এভাবে এই খেলাটি অন্য কোন খেলার জন্য দল গঠনের উদ্দেশ্যেও করা হয়। আবার কখনো কখনো শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকবে, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করে খেলা শেষ করা হয়। 

       স্থানভেদে ছড়াটির পাঠান্তর আছে। যেমন, শেষের কয়েকটি লাইন কোথাও কোথাও এভাবেও পাওয়া যায়, -

             সাহেব বলে যাইতে / পান সুপারি খাইতে /

             পানের আটা মরিচ বাটা / 

             ইস্পিরিং-এর চাবি আটা /

             যার নাম রেণুবালা /তারে দিমু মুক্তার মালা ।

        ফুলটুকা বা টুকাটুকি খেলাটিও বেশ মজার খেলা। এই খেলায় দু'টি দলের প্রয়োজন। একদলের দলপতি তার দলের খেলোয়াড়দের হয়তো নানা রকম ফুলের নামে নামকরণ করবে, তেমনি অন্য দলপতি তার দলের খেলোয়াড়দের নামকরণ করবে হয়তো বিভিন্ন ফলের নামানুসারে। অনেক সময় আবার শুধু ফুলের নাম দিয়েই উভয় দলের সদস্যদের নামকরণ করা হয়। তারপর দু'দল মুখোমুখি বসার পর একদলের দলপতি প্রতিযোগী দলের একজন খেলোয়াড়ের দু'চোখ হাত দিয়ে চেপে ধরে তার দেওয়া নাম নিয়ে 'আয়রে আমার টগরফুল', বা 'আয়রে আমার কদমফুল' ইত্যাদি বলে নিজের দলের একজনকে ডাকবে। সেই টগরফুল বা কদমফুল নামের খেলোয়াড়টি এসে চোখে ধরা খেলোয়াড়টির কপালে হালকা করে টোকা দিয়ে নিজের স্থানে গিয়ে অন্যদের মতো মাথা নিচু করে বসে থাকবে। চোখ খোলার পর যদি খেলোয়াড়টি বলে দিতে পারে যে কোন খেলোয়াড়টি তাকে টোকা দিয়েছে, তা হলে সে লাফ দিয়ে একধাপ এগিয়ে যাবে। এভাবে শেষ পর্যন্ত যে দলের খেলোয়াড় শেষ ধাপ অতিক্রম করতে পারবে, সে দলই বিজয়ী ঘোষিত হবে। অনেকে খেলাটিকে গোলাপ-টগর, আবার অনেকে টগর-টগর খেলাও বলে থাকেন। 

……………………………………………………………………………

Thursday, 8 October 2026

87.দক্ষিণ আসামের ‘বাম’ অঞ্চলের কিছু লুপ্তপ্রায় খেলা-3 :দেবতোষ নাথ

 


        ছোট মেয়ে থেকে বয়স্কা মহিলাদের মধ্যে যে খেলাটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল, তা হলো 'টটা' বা ফুলঘুঁটি। অনেকে এই খেলাকে পাঁচঘুঁটি খেলাও বলে থাকেন। পাঁচটি পাথরের নুড়ি দিয়ে 'এক একে এক', 'দুই একে দুই' ইত্যাদি ছড়া কেটে পয়েন্ট বানানোর ক্রিয়াটির মধ্যে শুধুমাত্র খেলার আনন্দই সীমিত ছিল  না, নুড়িগুলো ওপরের দিকে ছুড়ে ভারসাম্য এবং সময়ের অনুপাত ঠিক রেখে মাটি থেকে নুড়ি কুড়িয়ে একই সাথে ওপরে ছোড়া নুড়িগুলো লুফে নেওয়ার মধ্যে এক অশিক্ষিত পটুত্ব ও সৌন্দর্যবোধের পরিচয় মেলে। তাছাড়া অক্ষর জ্ঞানহীন গ্রাম্য মহিলা বা ছোট ছোট স্কুল ছাত্রীদেরচ এক থেকে কুড়ি পর্যন্ত গণনাও অক্লেশে শেখা হয়ে যায়। স্থানভেদে ছড়াটির অনেক পাঠান্তর আছে। যেমন, -

          ফুল ফুল ফুলটি/ দুইয়ে দুলটি / তিনে তেলটি /

           চাইরে চৌচিকাটা / পাচে পানর বাটা /

           ছয়ে ষষ্ঠি / সাতে সালু / আটে আলু /

           নয়ে নবঘণ্ট / দশে কড়কড়ি ঘণ্ট /

           এগারোয় একটি / বারোয় ঝাপটি /

           তেরোয় তেরচি কাটা / চৌদ্দয় রুপি আটা /

           পনেরোয় পানর খিল্লি / ষোল্লয় ষষ্ঠী তুলি /

           সতেরোয় সাজের মাটি / আঠারোয় আমের আটি /

           উন্নিশে মেষ / কুড়কুড়ি আতে শেষ। 

      কোন কোন স্থানে ছড়াটি আবার ভিন্ন রূপেও বলা হয়। যেমন, -

           ফুল ফুল ফুলটি / একে দুলটি / তেলটি /

           জামন জামন জামনটি / একে দুর্জামনটি /

           সুসম সুসম সুসমটি / একে দুর্সুসমটি /

           বকুল বকুল বকুলটি / একে দুর্বকুলটি /

           তার্জম তার্জম তার্জমটি / একে দুতার্জমটি /

           মন্তন মন্তন মন্তনটি / একে দুর্মন্তনটি /

           সাচ্চা বাঘের বাচ্চা সাচ্চাটি /

           নন্ট কাটাঘন্ট (স্থানভেদে- কড়িঘণ্ট) নন্টটি /

           সাড়ের গুটি বদলে / গুটি কাটা কে বলে /

           পঞ্চে পাখা / মুখে ঢাকা / ছয়ে রিকা /

           সাতে সালু / আটে আলু / নয়ে নুরা /

          দশে ঝুরা / এগারোয় একটি /বারোয় ঝাপটি /

           তেরোয় তেরচি কাটা / চৌদ্দয় রূপার বাটা /

           পনোরোয় পানর খিল্লি / ষোল্লয় ঝাপটি তুলি /

           সতরোয় সতরো ইঞ্চি / আঠারয় বাশর কঞ্চি /

           উন্নিশে মেষ / বিশে অইলো শেষ। 

      'ইকড়ি-মিকড়ি' খেলাটিও পছন্দ ছিল তার মজার ছড়াটির জন্য। আঙ্গুল লুকিয়ে সেই খেলাটির ছড়াতেও স্থানভেদে রূপান্তর লক্ষ করা যায়। যেমন, -

           ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি /

           চামর আগা মজুমদার /

           মজুমদারর হাড়ি কুড়ি /

           দুয়ারো বইয়া চাউল কুড়ি /

           চাউল কুটতে অইলো বেলা /

           ভাতো পইল্ল মাছি / কুদাল দিয়া চাছি /

           কুদাল অইলো বুথা / খেক শিয়ালর মাথা। 

      রূপান্তরে ছড়াটি এভাবেও পড়া হয়, -

           ইকড়ি মিকড়ি ঘাঘের গুটি /

           চাউল চানা মট মটি /

           দাদিয়ে আইনছইন বুয়াল মাছ /

           বউয়ে দিলা খুলা /

           আরিয়ে পরিয়ে জুকাড় দেইন /

           বউর পেটো উলা। 

       হাসি-তামাসার মধ্য দিয়েই ছড়াটির সৃষ্টি এবং খেলাটিও বেশ আনন্দদায়ক। 

     

…………………………………………………………………………………..