Wednesday, 4 November 2026

112.শতবর্ষের আলোকে রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা ও ‘বাম’ অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার পত্তনের কিছু কথা:2 সাবির আহমদ চৌধুরী

 

 

২০১৫ ইংরাজীত যখন রাজঘাট (ভাগাবাজার) দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার একশত বছর পূর্ণ হয় তখন মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির উদ্যোগে এবং বামের কৃতি সন্তান বর্তমান গুয়াহাটী নিবাসী আসাম সমবায় বিভাগের আয়রপ্রাপ্ত আধিকারিক জিয়া উদ্দিন চৌধুরীর অনুপ্রেরনায় মাদ্রাসাটিৰ শতবৰ্ষ পূর্তি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এই উপলক্ষে একটি স্মরণিকা প্রকাশের ও প্রস্তাব গৃহীত হয় যেটি সম্পাদনার দায়িত্ব আমার উপরে ন্যস্ত করা হয় ।

    স্মরনিকার সম্পাদনার সেই দায়িত্ব পালান করতে গিয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠালগ্নের ইতিহাস ও তথ্যাদির প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সঠিক স্থান ও জমি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং এ অঞ্চলের প্রবীন নাগরিকদের কাছ হতে প্রাপ্ত-তথ্যের উপরে আমাদের নির্ভর করতে হয়েছে। প্রাপ্ত মৌখিক তথ্যমতে মাদ্রাসাটি ১৯১৫ ইংরাজীর কোন এক সময়ে সপ্তগ্রাম নিবাসী মরহুম তুতিরাজা বড়ভূইয়ার ‘টঙ্গি’ ঘরে আরম্ভ করা হয়েছিল। বছর খানেক পরে মাদ্রাসাটিকে সেখান হতে রাজঘাট নিবাসী মরহুম মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরীর (যিনি লাম্বা মৌলবী নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন) বাড়ীতে স্থানান্তরিত করা হয়। মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরী মহোদয়ের পুত্র আসাম সরকারের সমবায় বিভাগের অবসর প্রাপ্ত সঞ্চালক জানাব জিয়া উদ্দিন চৌধুরীর নিকট হতে প্রাপ্ত মৌখিক তথ্যমতে রাজঘাটস্থ তাঁদের পৈত্রিক বাড়ীতে দীর্ঘ কয়েক বছর মাদ্রাসাটির পঠন পাঠন চলেছিল। রামপুর হতে সনদ প্রাপ্ত মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরীকে তখন মাদ্রাসাটিকে পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। অবৈতনিক ভাবে দীর্ঘদিন তিনি যে দায়িত্ব পালন করেন। কয়েক বছর পর যেখান হতে মাদ্রাসাটিকে আবার ভাগাবাজারে নিয়ে আসা হয় এবং বর্তমানে বিলুপ্ত বাজরের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত সরকারী দীগির নিকটে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে মাদ্রাসাটি ভাগাবাজার দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা এবং রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা  নামে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রথমোক্ত মাদ্রাসাটি ভাগাবাজার মাধ্যমিক প্রাঙ্গনে থেকে যায় এবং দ্বিতায়টি রাজঘাট (রাঙ্গাউটি) দারুল ফায়েজ মাদ্রাসা নামে রাজঘাট (রাঙ্গাউটি) নিবাসী মরহুম রাশিদ আলী লস্কর, হারুণ রাশিদ লস্কর এবং ইদ্রিছ আলী লস্কর ভাতৃত্ৰয় কর্তৃক দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং অদ্যাবধি মাদ্রাসাটি সে জায়গাতেই রয়েছে। প্রারম্ভিক সময়ে বিভিন্ন জয়াগায় এভাবে মাদ্রাসাটিকে স্থানান্তারের সঠিক তারিখ-সন ইত্যাদি বিষয়ে লিখিত কোন তথ্য প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। সমস্ত কিছুই প্রাপ্ত মৌখিক ভাষ্য ও প্রবীণদের স্মৃতি-ভিত্তিক বর্ণিত তথ্যের উপরই আমাদেরকে নির্ভরশীল হতে হয়েছে। সেই হেতু মূল প্রতিষ্ঠা তথা বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরের সন, তারিখ এবং সেসব জায়গায় মাদ্রাসার অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কিত তথ্যাদির মধ্যে যথেষ্ঠ অসঙ্গতি ও মতানৈক্য বিদ্যমান রয়েছে। স্মৃতি নির্ভর তথ্যের মধ্যে এরকম অমিল থাকাটা স্বাভাবিক ব্যাপারে বলেই ধরে নেয়া যায় ।

মাদ্রাসার নামে ওয়াকফকৃত জমি-জমার লিখিত তথ্যরূপে আমাদের হাতে যে দলিলটির প্রত্যায়িত নকল (Certified Copy) রয়েছে যেটি সম্পাদনার তারিখ হ'ল ২৬/০২/১৯২৪ ইংরাজী এবং সেটির সরকারী পঞ্জীয়নের তারিখ হ'ল ২৮/২/১৯২৪ ইংরেজী। দালিলটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে আর্থিক প্রতিকূলতাহেতু দারুল ফয়েজ মাদ্রাসাটি চালানো প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়ার কারণে বনগ্রাম নিবাসী মৃত ইদন মিয়ার পুত্র মুনসী ইব্রাহীম আলী মোট পনরশত (১৫০০.০০) টাকা মূল্যের জমি মাদ্রাসার নামে ওয়াকফ করে দেন এবং বনগ্রাম নিবাসী মৃত মুনসী ছনা মিয়ার পুত্র মুনসী মাহমদ আলী সাহেবকে উক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি তথা মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করা হয়। তৎসঙ্গে মরহুম মহমদ হুছন মিয়ার পুত্র মামদ খুরশিদ, বনগ্রাম নিবাসী হাজী ইছন মিয়ার পুত্র ইব্রাহীম মিয়া মুনসী এবং রাজঘাট নিবাসী কাছিম মুফতির পুত্র মৌলবী আর্জদ আলী সাহেবকে সদস্য মনোনীত করা হয়।

এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য যে মাদ্রাসার সাথে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং বাম অঞ্চলের অনেকে প্রবীণ নাগরিক অনেকেই তাদের স্মৃতিচারণে পীর খুরশিদ আলী নামে এক সুফির স্বহস্তে সিলেটি নাগরী হরফে লিখিত একখানা বই এর  পাণ্ডলিপির কথা বার বার উল্লেখ করেছেন এবং সেই পাণ্ডলিপিতে মাদ্রাসা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য লিপিবদ্ধ আছে বলে মত ব্যক্ত করেছিলেন। মরহুম সুফি খুরশেদ আলী   সম্পর্কে জানা যায়যে তিনি অবিভক্ত ভারতের শ্রীহট্ট জেলার চাপঘাট মৌজার অন্তর্গত খলাজাল গ্রামের আদি বাসিন্দা ছিলেন। প্রচলিত তথ্যানুসারে ১৯১২ ইংরাজীতে তিনি বাম অঞ্চলে আগমণ করেন এবং সপ্তগ্রামে অবস্থান করেন। এতদঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদ্‌গা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অগ্রণী ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ধলাইবাজারে অবস্থিত মমজি মসজিদটি (যা বর্তমানে মুসলিম মহল্লা বঞ্চিত) তারই হাতে প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া বাম অঞ্চলের অন্যান্য অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাথে তাঁর নাম জড়িত রয়েছে। উপরে উল্লেখিত বাংলা হরফে অনুবাদকৃত খুরছিদ আলী সাহেবের ওয়াকফ নামার  পাণ্ডলিপির এক জায়গায় এতদঞ্চলের তখনকার দিনের মসজিদে সংখ্যার সুস্পষ্ট উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন তিনি লিখেছেন— “২১ খানা মসজিদ আছে এ পরগণার মাঝে।” শতবর্ষ প্রাচীন দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালন ব্যবস্থা তথা মাদ্রাসার নামে ওয়াকফকৃত জমির তত্ত্বাবধান সব কিছুর সাথেই খুরশেদ আলী সাহেবের নাম জড়িত রয়েছে। যতদূর জানা যায় জীবনের শেষভাগে এই জ্ঞানতাপস, শিক্ষানুরাগী, সুফি পবিত্র মক্কা নগরে চলে যান; সেখানে অবস্থান কালে তাঁর মৃত্যু হয় এবং মক্কার পবিত্র জান্নাতুল মোয়াল্লা গোরস্থানে তাকে দাখল করা হয়।

............................................................................................................................

Tuesday, 3 November 2026

111.শতবর্ষের আলোকে রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা ও ‘বাম’ অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার পত্তনের কিছু কথা-1 :সাবির আহমদ চৌধুরী

 

জাগতিক কর্মক্ষেত্র এবং ধর্মীয় সাধনা উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার অপরিহার্যতা ইসলামের প্রারম্ভিক সময় হতেই মুসলিমদের চিন্তাধারায় সর্বাধিক প্রাধান্য লাভ করেছিল। মহানবী (সাঃ) এর ঘোষণা ছিল 'প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর পক্ষে জ্ঞান-শিক্ষা অর্জন করা ফরজ।' পবিত্র কোরআনে আল্লাহর প্রত্যাদেশের সর্বপ্রথম বাণী ‘পাঠ কর' –এর মধ্যেও শিক্ষার কথাই সর্বাগ্রে ব্যক্ত করা হয়েছে। জ্ঞান সাধনার উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্বনবীর অবিস্মরণীয় উক্তি হল — 'জ্ঞান সাধকের দোয়াতের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।' শিক্ষার অতুলনীয় মান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এ ধরণের দ্বিতীয় উক্তি ইতিহাসে বিরল। ইসলামের ইতিহাসে তাই শিক্ষা ছিল অত্যন্ত গর্বের বিষয় এবং যুগে যুগে মুসলিমরা এক্ষেত্রে চরম দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রোর মত জায়গায় মুসলমানরা যে সব শিক্ষাকেন্দ্র, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তা আজও বিশ্বের বিস্ময় উদ্রেক করে। মুসলিমরাই প্রথম শিক্ষার জন্য প্রাথমিক স্কুল (মক্তব) এবং ধারাবাহিক শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের শিক্ষা ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক। মসজিদ ছিল সর্বসাধারণের মিলনস্থল, যেখানে জ্ঞানীদের পাশে সাধারণ মানুষ জমায়েত হতো, তাঁদের বক্তব্য শুনতো, তাঁদের সাথে বই পুস্তক পড়তো এবং এভাবে জ্ঞান আহরণ করতো। ইসলামের অনেক প্রখ্যাত মণিষী এরকম ভাবেই জ্ঞানার্জন করেছিলেন এবং তাঁরা তাঁদের ছাত্রদেরকেও একই পদ্ধতিতে জ্ঞান দান করতেন। ইসলামী আইনের মূল চার ব্যাখ্যাকার— ইমাম আবু হানিফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম শাফি (রঃ) সাধারণত মসজিদে একত্রিত পণ্ডিতদের সাথে বসে আলোচনা করতেন এবং ইসলামী আইনে শিক্ষা অর্জন করতেন। মুসলিম বিশ্বের স্থানে স্থানে শিক্ষাচর্চার সেই প্রথার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও অল্পবিস্তর চালু ছিল। ইসলামের তিনটি পবিত্রতম স্থান পবিত্র মক্কা নগরীর হরম শরীফ, মদীনা শরীফের মসজিদে নবয়ী এবং জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায়

ইসলামী পণ্ডিতগণ নিয়মিত বসতেন, বক্তৃতা দান করতেন— যা সবার শুনার এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

প্রচলিত মাদ্রাসা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাদান সর্বপ্রথম মরক্কোর ফেজ নগরীতে শুরু হয়েছিল। ৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত জমিয়ত আল-কার উইনকে বিশ্বের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলে গণ্য করা হয়। ফাতেমা আল ফিহরি নামক এক মহীয়সী নারী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্বের দিকে দিকে ইসলামের বিস্তারের সাথে সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাও বিস্তার লাভ করে।

আমাদের বরাক উপত্যকার মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। যতদূর জানা যায় চতুর্দশ শতাব্দীতে হজরত শাহ জালাল ইয়ামেনীর (রঃ) ঘনিষ্ঠ শিষ্য শাহ জিয়াউদ্দিন বর্তমান করিমগজ্ঞ জেলার বদরপুরে অবিভক্ত সুরমা বরাক উপত্যকার প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় বারাক উপত্যকার সেই প্রতিষ্ঠিত প্রথম মাদ্রাসাটি এবং তৎসংলগ্ন মসদিজটি বরাক নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়।

    বর্তমান নিবন্ধে আমরা যে মাদ্রাসাটির শত বছর পূর্বেকার পেক্ষাপট পর্যালোচনা করতে চেষ্টা করছি সেটি ১৯১৫ ইংরাজীর কোন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে বরাক উপত্যকার প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচশত বছর পরে রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। একুশ শতকের বামের অধিবাসী আমরা। যোগাযোগ, শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছোঁয়া থেকে আমরাও সম্পূর্ণ বঞ্চিত নই এখন। নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা তো এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু আজ থেকে একশ বছর পূর্বে আক্ষরিক অর্থেই প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক তথা শৈক্ষিক পরিবেশের মধ্যে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা করা এবং সে চিন্তাকে বাস্তব রূপ দান করা যে আজকের দিনের মত সহজ ছিল না সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বুঝানোর অপেক্ষা রাখে না।

বাম তো দূর, ১৮৩২ খৃষ্টাব্দর পূর্ব পর্যন্ত অবিভক্ত কাছাড়ে (বর্তমান কাছাড় ও হাইলাকান্দির সন্মিলিত রূপ) আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবিক অর্থে ছিলনা বললে অত্যুক্তি হবে না । কাছাড়ের প্রত্যন্ততম বাম অঞ্চলে তো ব্যাপারটা এক কথায় অচিন্তনীয় ছিল। তখন পর্যন্ত সমগ্র কাছাড়ে মক্তব, মাদ্রাছা এবং টোলের প্রচলন ছিল যা মৌলবী ও পণ্ডিতদের পাঠদানের মাধ্যমে চলতো। বস্তুতঃ ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দেই শিলচর উচ্চ গ্রামার স্কুল (Silchar High Grammer School) স্থাপিত হয় যা পরবর্তীতে শিলচর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় (Silchar Government High School) নামে নামাকরণ করা হয়। সেটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক স্কুল শিক্ষার পত্তন হয়। এমনকি কাছাড়ের সদর শহর শিলচরে সে স্কুল প্রতিষ্ঠার পরও কিন্তু গ্রামীণ কাছাড় থেকে স্কুলটিত ছাত্রদের উপস্থিতি অত্যন্ত নগন্যই ছিল। ১৮৯১-৯৪ ইংরাজীর মধ্যে শিলচর সরকারী স্কুলের ১৪০জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২০জন ছাত্র প্রকৃত পক্ষে কাছাড়ের মূল বাসিন্দা ছিল। এই ২০জনের মধ্যে ১৭ জনই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের যাতে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে তদানীন্তন গ্রাম কাছাড়ের হিন্দুরাও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে ছিল। শিলচর সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ের বেশীরভাগ ছাত্রই শিলচরের আমলা, চা বাগানের কর্মচারী এবং সিলেট মূলেরই ছিল। ১৮৮৫-৮৬ ইংরাজীর প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে একটি মজার বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায় যে ১৮৮৫-৮৬ ইংরাজী শিলচর উচ্চ ইংরাজী স্কুলের ১৬৪জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২২জন ছাত্র খাঁটি কাছাড়ের ছাত্র ছিল।

সমগ্র অবিভক্ত কাছাড়ের শিক্ষার হাল-চিত্র যখন এরকম তখন বাম অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার প্রসারকল্পে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা যে কতটা দূরূহ ব্যাপার ছিল তা সহজে অনুমেয়। সুদূর অতীতে পরম প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সেই দুরূহ কাজ সম্পাদন করে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজেকে প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের আলোকে উজ্জীবিত করার সুমহান উদ্যোগ যারা সর্বপ্রথম নিয়েছিলেন মাদ্রাসাটির শতবর্ষ পূর্ত্তিতে তাঁদের সেই অবিস্মরণীয় অবদানের কথা সশ্রদ্ধভাবে স্মরণ করা উচিত।

  .............................................................................................................................................

 

Monday, 2 November 2026

110.বাম বিদ্যাপীঠ কাহিনী : মহীউদ্দিন আহমদ

 

কাহিনীই বলা যায়। এ স্কুলের জীবন কথা নানা কাহিনীতে ভরা। তবে সাত কাহন নয়। অনেকটা রূপকথার মতই সে কাহিনী সততই সূখকর।

অর্ধশতাব্দীরও আগের কথা। বিগত শতাব্দীর সাতান্ন সালের মাঝামাঝি । আসাম সরকারের সমবায় বিভাগের চাকরি। বদলি হয়েএসেছি শিলচরে। দেখতে এসেছি ভাগাবাজারে, সমবায় বেংক আর গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা সমবায় সমিতি । বেশির ভাগই উপজাতি এলাকায়। কাজ ফেলেই ঘুরে বেড়াতাম পাহাড়ী জনপদের পায়ে হাঁটা পথে পথে । মন ভরে গেল। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে জনসেবার যুবকসুলভ যে আদর্শ মনে মনে লালন করতাম, বুঝলাম এই স্থানই তার সার্থক রূপায়নের উর্বর ভূমি। সহচর ইলিয়াস আলি মাষ্টারকে একদিন মনের কথা খোলেই বললাম। আকাংখিত ধন পাওয়ার খুশিতে তিনি আমায় নিয়ে গেলেন ভাগাবাজার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে। সেখানে  এক চালাঘরে বসেছিলেন শিক্ষক হরভজন নমশূদ্র, চার-পাঁচ জন ছাত্র ও একজন ছাত্রী নিয়ে। ভাগাবাজার হাইস্কুল তথা বাম বিদ্যাপীঠ কাহিনীর সূচনা ওই দিনেই। সে ছিল নভেম্বরের প্রথম দিক, ১৯৫৮ ইংরেজি।ছেড়ে দিলাম চাকরি, লেগে গেলাম কাজে। চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুকভরা সাহস নিয়ে।

স্কুল খোলার অনুমতি চেয়ে দরখাস্থ গেল। প্রধান শিক্ষক আমি, সহকারি শিক্ষক হরভজন নমশূদ্র, ফার্সি শিক্ষক হাফেজ আব্দুস সালাম। সংস্কৃত ভাষাটা দেখবেন হরভজন বাবু নিজেই। তিনি ছিলেন Matric Normal, সরল মনের আদর্শবান যুবক। দক্ষিন আসামের স্কুল পরিদর্শক তখন জনাব নুরুল ইসলাম সাহেব। কটন কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক। সৌভাগ্যবশত তিনি আমায় চিন্‌তে পারলেন, প্রাক্তন ছাত্র  হিসেবে। দিন কয়েক পরে আটান্ন সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এক পড়ন্ত বেলায় তিনি একদিন নিজেই আসলেন ভাগাবাজারে স্কুল কমিটির সম্পাদক হাজি মসাহিদ আলি চৌধুরী সাহেবের বর্হিবাড়িতে।বসে প্রয়োজনীয় জন সংযোগ করলেন এবং জনসমক্ষেই মৌখিক অনুমতি  দিয়ে গেলেন। অনুমতি পত্র আসল পরের মাসে Permission  for opening of classes VII & VIII w.e.f. 1st March 1958.

এখানে একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়। নূরুল ইসলাম সাহেব না হলে স্কুল খোলার সরকারি অনুমতি পাওয়া কঠিন হত। কারণ আমাদের  আগেই নিকটবর্তী হাওয়াইথাং বাজারে একটা হাইস্কুল খোলাছিল।পরে যখন বিভাগীয় স্বীকৃতির (Departmental Recognition) প্রশ্ন আসল তখন লাগল রশি টানাটানি। স্কুল পরিদর্শক তখন জনাব সাহাবুদ্দিন সাহেব।সহকারি পরিদর্শক রামকুমার দাস। রামকুমারবাবু একটা Educational Servey report দেখিয়ে বললেন হাইস্কুল হাওয়াইথাং-এ হতে পারে, ভাগায় নহে। কারণ আসাম সরকারের ঐ রিপোর্টে স্কুলের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা আছে হাওয়াইথাং। ভাগাবাজারের নাম নেই।স্কুল পরিদর্শক সাহাবুদ্দিন সাহেব তখন রিপোর্টখানা হাতে নিয়ে তাতে লিখে ছিলেন Under Changed Circumstances High School should be located in between Bhagabazar & Howaithang. মন্তব্যের তলায় নিজের সহি দিয়ে বড়বাবুকে বললেন- নেন, লিখে দিল সাহাবুদ্দিন । আর আমাকে বললেন, বাবা, তোমার স্কুল ঘরটা একটু হাওয়াইথাং-এর দিকে এগিয়ে নিয়ে স্থাপন কর।

স্থান নির্বাচন করা হলো বনগ্রাম গোচরা ভূমি, বর্তমান অবস্থানে।আর তখনই প্রকাশ পেল স্কুল নিয়ে স্থানীয় মানুষের ঐকান্তিক আগ্রহ, অকৃত্রিম ভালবাসা আর উদ্যোগ। কোন আপত্তি না করে সকলেই দানপত্রে সহি করে দিল। নির্দিষ্ট পথ ধরে বছরের মাথায় এসে গেল স্বয়ং রাজ্যপালের অনুমতি - Six bighas of land alloted to Bhagabazar High School from Bongram V.G.R. আর যায় কোথায়, বন কেটে বসত হলো । টুনটুনি আর শিয়ালের আবাস ভূমি, যেখানে ভূতের ভয়ে দিনের বেলাতেই লোক যেত না সেখানে তৈরি হলো স্কুল ঘর। একশ দশ ফুট লম্বা বাঁশ ও ছনের কাঁচা ঘর। সে ১৯৫৯ ইংরেজির শুরুতে। স্কুল পরিদর্শনে আসলেন, সহকারি পরিদর্শক গুপ্তবাবু। যোগ্যতার বলেই বিভাগীয় স্বীকৃতি অচিরেই এসে গেল। আর পেছন ফিরে তাকাতে হলো না।৫৯ এ খোলা হলো নবম ও ৬০ ইংরেজিতে দশম শ্রেণি । প্রথম একবছর প্রাইভেট হিসেবে পরীক্ষায় বসলো ছাত্ররা। ১৯৬২ থেকে নিয়মিত অর্থাৎ Regular সরকারি সাহায্য পেতেও আমাদের বেশি অপেক্ষা করতে হয় নি। ১৯৬৪ ইংরেজি অর্থাৎ ১৬/১/৬৪ থেকে Deficit grant আর সেই সুবাদে প্রথম সুযোগে অর্থাৎ ১/১০/৭৭ ইংরেজিতে প্রাদেশিক মর্যাদা। শুনতে মনে হবে - নিজ হাতে ধরা অনায়াস লব্ধ মধুভাণ্ড থেকে অকাতরে শুধুই পান করা । কিন্তু না। এই প্রাপ্তিরপেছনে অবশ্যই ছিল নিরলস প্রচেষ্টা, আর এই প্রচেষ্টার পেছনে শক্তির উৎস ছিল জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং অকৃত্রিম ভালবাসা, আঞ্চলিক সম্মানের সঙ্গে জড়িত স্কুলটিকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় সংকল্প।

বিদ্যালয়ের কথা ও কাহিনী এখানেই শেষ নয়। আমাদের মূখ্য  উদ্দেশ্য ছিল মানুষ ও বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য  এবং সদ্ভাব গড়ে তোলা। কারণ স্বাধীনতার প্রথম দশকে দেশভাগ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাম অঞ্চলের জনমন ছিল বিধ্বস্থ । সে কাজ ছিল বড়ই কঠিন আর সংবেদনশীল। সৌভাগ্যবশত স্কুলের জন্মলগ্ন থেকেই যে শিক্ষক সম্প্রদায় আমরা পেয়েছিলাম তাদের নির্মল চরিত্র, ঐকান্তিক ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এই কঠিন কাজকেও সহজেই ফলপ্রসূ করেছিল।স্কুল প্রাঙ্গনে তারা সকলেই মিলেমিশে থাকতেন।অবসর সময়ে দল বেধে জনসংযোগ করতেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জনাব মুজাম্মিল আলি লস্কর, শ্রী নীরেশ দাস, গিরিন্দ্র কুমার মল্লিক, কুতুব আহমদ এবং আরও অনেক। তাঁদের প্রেরণায় যে দুর্লভ কস্মপলিটান ভাবধারা জন্ম নিয়েছিল তাহা আজও বিদ্যমান। শতাব্দীর মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে এই বিদ্যালয়ের প্রাপ্তির একটা মূল্যায়ন আমরা অবশ্যই করব। সেটা হবে স্থূলভাবে কতজন পাশ করল, কতজন দেশ ও সমাজে প্রতিষ্ঠা পেল। কিন্তু আজকের এই হিংসায় উন্নত উন্মত্ত পৃথিবীতে পারস্পরিক সহনশীলতায় যে আদর্শ ও শিক্ষা এই স্কুলে জন্ম নিয়েছিল এবং যাহা আজও ফল্গু ধারার মত এই অঞ্চলের সমাজ দেহে সঞ্জিবিত হয়ে আছে তাহাই আসল শিক্ষা, আসল মহতী লাভ। এই ভাবধারা অক্ষয় থাকুক, আমরা এই কামনা করব।

তবে এত সার্থকতার মাঝে ও একটা না পাওয়ার বেদনা সকলের মনকেই ব্যথিত করে, যে বামবিদ্যাপীঠ কেন উচ্চতর বিদ্যালয়ে উন্নিত হল না। সে কাহিনী বড়ই লজ্জার।পরিপূর্ণ যেগ্যতা ও বিভাগীয় অনুমোদন থাকা সত্বেও কোনও কোনও সরকারি আমলা আর মন্ত্রীদের একপেসে ইচ্ছার ফলে আমরা বঞ্চিত হয়ে ছিলাম। কিন্তু বামবিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের শিক্ষা ও প্রেরণার বলে বলীয়ান ভাগাবাজারের জনসাধারণ এই বঞ্চনায় দমে থাকেনি। আপন অধিকার রক্ষা করেছে একটি কলেজও প্রতিষ্ঠা করে, যে কলেজের পরিচালকও অধ্যাপক বৃন্দ বাম বিদ্যাপীঠের সন্তান। তাইদেখছি বাম বিদ্যাপিঠের সার্থকতা শুধু শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেই আবদ্ধ থাকেনি এলাকায় উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞে ও আপনার স্থান করে নিয়েছে I

………………………………………………………………

 

লেখক পরিচিতিঃ- মহীউদ্দিন আহমদ বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন।এই নিবন্ধটি বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী স্মরণিকাতে   প্রকাশিত হয়েছিল ।