Tuesday, 9 June 2026

17.পরম্পরাগত সমাজ -3:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


চিরাচরিত স্বাস্থ্য সেবাঃ

যদিও  বামের প্রথম পর্যায়ে ন্যূনতম সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা উপস্থিত ছিল, তবুও রোগ চিকিৎসার জন্য লোকেরা চিরাচরিত  চিকিৎসা   পদ্ধতির  উপর নির্ভর করত। এটি আয়ুর্বেদিক প্রতিকার, আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং লোক বিশ্বাসের একটি সমৃদ্ধ সংমিশ্রণ ছিল।এই সময়ে বামের   ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি  এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। লোকেরা বিভিন্ন ধরণের  চিকিৎসক  এবং চিকিৎসা পদ্ধতির উপর নির্ভর করত, যা দেশীয় জ্ঞান, ধর্মীয় প্রভাব এবং লোক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ মিশ্রণকে প্রতিফলিত করত।

প্রারম্ভিক বাম অঞ্চলের মধ্যে নিম্নলিখিত ঐতিহ্যগত চিরাচরিত  চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন ছিলঃ

.কবিরাজ: বামে, কবিরাজ ঐতিহ্যবাহী ঔষধি গাছপালা এবং ভেষজ দিয়ে লোকেদের চিকিৎসা করতেন। তারা বিভিন্ন রোগের প্রতিকার করতে  স্থানীয় গাছপালা এবং ভেষজ ব্যবহার করতেন। সাধারণ মানুষও সাধারণ অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য স্থানীয় উদ্ভিদ ভেষজ ব্যবহারে পারদর্শী ছিলেন। .

মোল্লা: যদিও মোল্লারা সাধারণত ইসলামী ধর্মীয় অনুশীলনের সাথে যুক্ত থাকেন , বামের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশে , তারা জাতি এবং ধর্ম নির্বিশেষে তাদের অনুসারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবদান রাখতেন । মোল্লারাতাবিজদিতেন ‘ এবং সুরক্ষা নিরাময়ের জন্য ধর্মগ্রন্থ থেকে আয়াত পাঠ করে ’ ফু’ (ফুৎকার)   এবং’ পানিপড়া ‘ দিতেন।  সাধারণত, মহিলারা পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে এবং দাম্পত্য কলহ থেকে স্বস্তি পেতে  মোল্লাদের কাছে যেতেন।

হাতুড়ে ডাক্তার : বামের মতো গ্রামীণ এলাকায়, হাতুড়ে ডাক্তাররা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিভিন্ন রোগের নিরাময় করার দাবি করে লোকের চিকিৎসা করতেন। তাদের চিকিৎসা এবং সমাজে তাদের ভূমিকা স্থানীয় বিশ্বাস দ্বারা নির্ধারিত হত।

ভূত- প্রেতাত্মা  দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাঃ

লোকেদের মধ্যে  ভূত- প্রেতাত্মা  এবং অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল ।যখন অসুস্থতার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নির্ণয় করা কঠিন হত, তখন ধারাণা করা হত -রোগীকে ভূত এবং অশুভ আত্মায় পেয়েছে । বলা হত  রোগীকে “ভূতে পাইছে “ । ভূত আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক  চিকিৎসকরা (এক্সরসিস্ট ) ভুতুড়ে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। এই ভৌতিক  চিকিৎসকরা ভূত-প্রেতাত্মাকে তাড়ানোর জন্য আচার, আবৃত্তি এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া সম্পাদন করতেন।

জ্যোতিষী ও গণক: জ্যোতিষশাস্ত্র বামের ঐতিহ্যগত চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। জ্যোতিষীরা জ্যোতিষী চিহ্ন এবং গ্রহের অবস্থান ব্যাখ্যা করে স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সমাধান প্রদান করতেন। তারা  নভস্থিত প্রভাব সম্পর্কে তাদের বোঝার ভিত্তিতে চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের পরামর্শ দিতেন। অনেকে হস্তরেখা  বিচার করে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন । কবিরাজ ও গণকরূপে পরিচিত তেলিচিবার মাইবী এতই পরিচিত ছিলেন যে তার বাড়ীর সামনে শিলচর আইজল রোডে এক জায়গা ‘মাইবী  স্টেশন’ নামে পরিচিত ছিল।বরাক উপত্যকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষ বাস চালককে মাইবী   স্টেশনে নামিয়ে দেওয়ার জন্য বলে রাখত।

ওঝা :বামের প্রথম দিকে ওঝরা সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতেন। তারা স্থানীয় কাব্য এবং লোককাহিনী যেমন বেহুলা-লখিন্দর  আখ্যান থেকে  আবৃত্তি করে বিষ ঝাড়তেন। এই প্রথার মূল বিশ্বাস ছিল ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করলে বিষের প্রভাব প্রতিরোধ করা যায় এবং সুরক্ষা প্রদান করা যায়। এমনকি মুসলমান ওঝাও ছিলেন । গত শতাব্দীর চল্লিশের  দশকে রাজঘাটের ওহাব আলী লস্কর  নামে একজন জনপ্রিয় ওঝা ছিলেন ।তিনি  সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতেন। বেহুলা-লখিন্দর  আখ্যান থেকে  গানের সুরে আবৃত্তি করতঃ উঠানে খোলা আকাশের নীচে একটি ঘাইলের উপর বসে থাকা সাপের কামড়গ্রস্ত ব্যক্তির  চারপাশে প্রদক্ষিণ করতেন এবং মাঝে মাঝে  কাঁধের গামছা দিয়ে সাপের কামড় গ্রস্থ ব্যক্তির গায়ে আঘাত করে “হায়রে বিষ দৌড়ে লাম“(হে বিশ-তুমি তাড়াতাড়ি নেমে যাও) বলে আদেশ দিতেন।গ্রামের লোক চারপাশে বসে দেখত।

হোমিওপ্যাথিঃ

 ঐতিহ্যগত চিকিৎসার পাশাপাশি, বামের কিছু স্ব-শিক্ষিত হোমিওপ্যাথ কম খরচে চিকিৎসার বিকল্প প্রদান করতেন। এই হোমিওপ্যাথরা শিলচর থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ  আনতেন।  কিছু ক্ষেত্রে এটি বিনামূল্যে  প্রদান করা হত।

গ্রামীণ ধাত্রীগণ: বামের প্রাথমিক অবস্থায় হাসপাতালে শিশুর জন্মের বিষয়টি অকল্পনীয়  ছিল। সন্তানের জন্ম একটি ব্যক্তিগত ওপারিবারিক ব্যাপার ছিল।গোপনীয়তা বজায় রাখা হত ।এই জন্য বামের চিরাচরিত  প্রসব প্রক্রিয়ার জন্য গ্রামীণ ধাত্রীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞ মহিলারা প্রসবের ক্ষেত্রে  এবং মাতৃত্বের সহায়তা প্রদানে যত্নবান ছিলেন। তাঁরা সন্তান জন্মদানে শ্রম সহায়তা সহজ করার জন্য ভেষজ প্রতিকারের ব্যবহার সম্পর্কে গভীরভাবে জ্ঞানী ছিলেন।

গ্রামের ধাত্রীগণ নতুন মাকে প্রসবোত্তর নিরাময়ে সাহায্য করার জন্য দায়ী ছিলেন।  তাঁরা পুষ্টিকর খাদ্য, বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন ও নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করতেন , যাতে মা এবং শিশু উভয়ই সুস্থ থাকে।এটা ছিল কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সম্মানজনক সেবা।

 

Monday, 8 June 2026

16.পরম্পরাগত সমাজ -2:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 

 


 

আর্থিক জীবনযাত্রাঃ 

 বাম অঞ্চলের জীবন ছিল অতিশয় সহজ সাদাসিধা। জমি উর্বর হওয়া সত্ত্বেও পরম্পরাগত পুরাতন জাতের ধানের  বীজ ব্যবহার করার জন্য উৎপাদন হত তুলনামূলক ভাবে কম । বামে পুরানো পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হতো। স্বাধীনতার পর বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বামে চাষের উন্নত পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য সরকারর প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে, সরকার উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ধরণের বীজ এবং সার প্রয়োগ প্রথা প্রবর্তন করতে শুরু করে। প্রগতিশীল কৃষকদের মধ্যে নতুন ধরণের ছোট খাটো কৃষি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বিতরণ করা  আরম্ভ হয়। ভাগাবাজারে একজন কৃষি  ডেমনস্ট্রেটার নিয়োগ করা হয়েছিল যিনি অধিক ফলনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিতেন এবং বীজ ও সার বিতরণ করতেন।একই সময়ে, ভাগাবাজারে একটি ভেটেরিনারি হেলথ সেন্টার খোলা হয়েছিল এবং একজন ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট   নিয়োগ করা হয়েছিল। সরকার থেকে  রেশম উৎপাদনের  প্রচেষ্টা চালু হয়েছিল যার জন্য একজন রেশম প্রদর্শক কৃষকদের রেশম চাষে যেতে কৃষককে উৎসাহিত করতেন। এগুলি ছিল বামে আধুনিকতার দিকে উত্তরণের পথে  স্বাধীন ভারত সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ ।

বামের অর্থনীতিতে টাকার ভূমিকা ছিল ন্যূনতম । যদিও  এটাকে ঠিক বিনিময় অর্থব্যবস্থা বলা যায় না । লোকেরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই উৎপাদন করত কিন্তু লবণ, দেশলাই-বাক্স,লবণ, কেরোসিন তেলের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তাদের কিছু অর্থের প্রয়োজন ছিল। শিক্ষা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ছিলনা বললেই চলে। তারা ন্যূনতম পোশাক ব্যবহার করেছে। তারা খালি পায়ে হেঁটেছে।

লোকেরা নগদ টাকা পেত  উদ্বৃত্ত ধান, সুপারি, কলা, ডিম, হাঁস-মুরগী, ফল পারিবারিক ব্যবহারের  জন্য ফলানো শাক-সব্জী বিক্রির মাধ্যমে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রধানত তফসিলি জাতি ,হাতে তৈরি বাঁশের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। এই বাঁশের      কারুকাজগুলি ছিল একজন কৃষকের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস যেমন ধান শুকানোর জন্য বাঁশের চাটাই যাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডাম’ বলা হয়, ধান সংরক্ষণের জন্য উঁচু বাঁশের পাত্র যাকে স্থানীয়ভাবে 'জুঙ্গি' বলা হয়, ধান রাখার ও বহন করার জন্য 'টুকরি' নামে বাঁশের পাত্র; বিভিন্ন ধরণের মাছ ধরার ফাঁদ বা সরঞ্জাম যা স্থানীয়ভাবে ‘ডরি, রুঙ্গা, ওছু, পারণ, পলো ,খলই,চেপা  নামে পরিচিত ও গ্রীষ্মে উপশমের জন্য বাঁশের হাতপাখা।

      গ্রামবাসীরা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য 'মুর্তা' থেকেও বিভিন্ন জিনিস তৈরি করত। এগুলি ছিল মাটিতে বসা ও ঘুমানোর জন্য বা নামাজের 'চাটি' ও ‘পাটি’।  ছোট আকারের 'চাটি' বা 'পাটি'র প্রচুর চাহিদা ছিল কারণ প্রতিটি মুসলমান পরিবারে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ার জন্য দুই বা তিনটি 'চাটি' বা 'পাটি'র প্রয়োজন ছিল।  কৃষক পরিবাররা  এসব পণ্য বিক্রি করে কিছু নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারত। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে এসব হস্তশিল্প জাত সামগ্রীর বাজার প্রায় হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন অনেক কারিগর আর অবশিষ্ট নেই।

    বামের মণিপুরি সম্প্রদায়ের আলাদা এক দক্ষতা ছিল। মণিপুরি মহিলারা 'মুড়ি' ও 'চিড়া' তৈরি করে সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করতেন। তারা ‘মণিপুরি গামছা’ নামে এক নিত্য ব্যবহারিক কাপড় বুনতেও জানতেন যার বাজারে চাহিদা ছিল। এটি সাপ্তাহিক কেনাকাটা করার জন্য পরিবারের কাছে অর্থ এনে দিত।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রথম পর্বে একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের মাসিক বেতন ছিল ৩০ টাকা এবং এক কাঠি ( কেজি) চালের দাম ছিল আট আনা তথা বর্তমান পঞ্চাশ পয়সা।

কিন্তু যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে টাকার ব্যবস্থা করা কঠিন ছিল। ব্যাংক ঋণের কোনো সুবিধা ছিল না। ঋণের জন্য মানুষকে নির্ভর করতে হতো গ্রামের মহাজনদের ওপর। কাবুলি ঋণদাতারাও ছিল। কোন কোন  গ্রামে  কৃষি ঋণের জন্য কৃষি সহায়ক সমবায় সমিতিও ছিল।জরুরি অবস্থার সময় ঋণ পাওয়ার একটি সাধারণ পদ্ধতি ছিল কৃষি জমি ইজারা দেওয়া।কিন্তু  একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল।অনেক সময় জমি বাড়ী খুঁয়াতে হত ।