প্রাকৃতিক পরিবেশের সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্রের সঙ্গে অঞ্চলের বনজসম্পদ বন্যপ্রাণীর বিষয়টিও এসে যায়। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই বলতে হয়— দক্ষিণ কাছাড়ের ‘বাম’ অঞ্চল হল প্রকৃতির এক লীলাভূমি। এ অঞ্চলের ঢেউ খেলানো পাহাড় আর গহণ অরণ্য ঘেরা বনাঞ্চলে যেমন রয়েছে রকমারি বনবৃক্ষের দর্শনীয় প্রজাতি, তেমনি রয়েছে বনাঞ্চল আশ্রয় করে অসংখ্য ছোটবড় নানা রঙের পাখি, বিভিন্ন প্রজাতির জংলী পশু ও সরীসৃপ। এদের চেহারা যেমন আলাদা তেমনি আকার ,প্রকার, বৈচিত্রেও তারা স্বতন্ত্র। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ায় ৷
এখানকার প্রশস্ত বনাঞ্চলে মূল্যবান গাছ-গাছড়া ছিল প্রচুর। এসব গাছ-গাছালির মধ্যে মূল্যবান দুই ধরণের বন্যগাছ চাম ,সুন্দি ছাড়াও জনপ্রিয় বনজ বৃক্ষ গামারি এর সঙ্গে অতিটিকসই দুষ্প্রাপ্য নাগেশ্বর, গৃহনির্মাণ সরঞ্জামের
জন্য রামডালা, নৌজান তৈরির জনপ্রিয় বনজ বৃক্ষ জারুল ;তাছাড়া অধুনা লুপ্তপ্রায় বিশেষ ধরণের গাছ কুরতা, রাতা, পুমা, জাম, গন্দরই, তুলা, কদম, শিরিশ ইত্যাদি অসংখ্য প্রজাতিতে ভরপুর। কত ধরণের বাঁশ, টিলার ঢালুপাশে ইকড় আর খাগ, তেরা, তাছাড়া নানা প্রজাতির বেত- গল্লা বেত, জালি বেত, সুন্দি বেত, অন্নাহ বেত ইত্যাদি। এতদসঙ্গে ভেষজ উপকরণের নানা দুষ্প্রাপ্য গাছ-গাছড়া এ অঞ্চলকে বনসম্পদে ভরপুর করে বিরাজিত ।স্বাভাবিকভাবেই, জঙ্গলের নানা ধরণে ফুল মৌমাছিদেরে
বামের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং বাম তার মধুর জন্য বিখ্যাত । এক সময়ে প্রচুর পরিমাণে বনজমধু পাওয়া যেত। এর স্বাদ ছিল অনন্য। অবশ্য এখনও
পাওয়া যায়।
জীব-জন্তু আর পশু-পাখির কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলা যায়— এলাকাগুলো এক সময়ে ছিল ঘনবনে আবৃত গা ছমছম করা অরণ্য ভূমি। এলাকায় বিচরণ করত জংলাহাতী, হিংস্র বাঘ, সন্ত্রস্ত হরিণ, নানা প্রজাতির বানর, নেকড়ে, বন বিড়াল, ডোরাকাটা বনবিড়াল আর খাটাস,( যার স্থানীয় নাম টলা) ইত্যাদি বিচিত্র ধরণের জন্তু-জানোয়ার, সরীসৃপ সাপ ইত্যাদি ৷
রুকনি উপত্যকা তথা বাম অঞ্চল
প্রকৃতি প্রদত্ত পাখির দেশ। কত ধরণের ছোট-বড় পাখি এ উপত্যকায় বিচরণ করে খেয়াল করলেই দেখা যায়। দক্ষিণে মিজো পাহাড় ঘেঁষা এই এলাকায় লোকবসতির মাঝেও রকমারি পাখির অবাধ বিচরণ এক সময়ে ছিল বৈশিষ্টের প্রতীক। স্থানীয় পাখি, পরিযায়ীপাখির সমাবেশে এলাকা ছিল কলমুখর।টিয়া, তোতা, হাড়গিলা, জংলি হাস, রকমারি বক, ডাহুক, মাছরাঙা, রংবেরঙের চিল, ঈগল, ধণেশ, একাধিক প্রজাতির শকুন, হরিওল, গুড়মাকড় (জংলি পায়রা), নীল ঘুঘু, রকমারি ময়না, জংলি মোরগ, মউকা, মউদরা, হলদে পাখি, বুলবুল, কাঠঠোকরা, ছোট ছোট চড়ুই (ফুল খাউরি, মণিয়া, টেকই) ইত্যাদি পাখির মধুর কলতানে আর কুহু কুজনে জনজীবন ছিল উজ্জীবিত।
গাছ-গাছালি আর বনজঙ্গলে পশু-পাখি সরীসৃপ আর বৈচিত্রে ভরা প্রাণীকুল স্থলভাগে যেমন বৈচিত্র রচনা করেছে বিলবাদাড়, নদী-নালার জলেও তেমনি কত রকমের মাছ, নদীতে কাঠুয়া-কচ্ছপ, শুশুক (স্থানীয় নাম ‘ফু’)। জলজ সাপ ইত্যাদি দেখা যেত।
বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি বাঘ চলে আসত লোকালয়ে । অবাধে গ্রামবাসীদের পালিত পশু হত্যা করত । মাঝে মাঝে হরিণ এসে ইতস্তত ঘুরে বেড়াত। সন্ধ্যায় মনুষ্য-বসতির কাছাকাছি টিলাগুলোতে উল্লুকের দল সমস্বরে চিৎকার করত। অসংখ্য পাখির কিচির-মিচির বামের বাসিন্দাদেরকে ভোরের আগমন জানিয়ে দিত। সম্ভবত তখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কোন আইন বিদ্যমান ছিল না। গ্রামীণ শিকারীরা বাঘ মেরে তা বয়ে নিয়ে গিয়ে ধলাই পুলিশ ফাঁড়িতে হস্তান্তর করত। বাঘ ও চিতা হত্যার জন্য শিকারীকে পুরস্কৃত করার রেওয়াজ থেকে থাকতে পারে কারণ ১৯০৪ সনে কাছাড় জিলায় ১৭টা বাঘ ও ১৬টা চিতা বাঘ হত্যার জন্য সরকার পুরস্কার দিয়েছিল।
কথিত আছে যে বামের মিজোরাম সীমান্ত ঘেসা ফ্রেঞ্চ নগর (স্থানীয়ভাবে পেরেছ নগর
হিসাবে উচ্চারিত) গ্রামটির নাম এসেছে একজন ব্রিটিশ সাহেব জে ফ্রেঞ্চর নাম থেকে যিনি এখানে বাঘ শিকারের জন্য আসতেন।
বামে, হাতি খেদার মাধ্যমে ছোট হাতি ধরা হতো। বন বিভাগের
লাইসেন্স নিয়ে পেশাদাররা বামের বন থেকে অল্পবয়সী হাতি ধরে তাদের প্রশিক্ষণ
দিয়ে গৃহপালিত করতেন। জানামতে, বামে হাতি খেদায় শেষ হাতিটি ১৯৫৭ সালে ধলাই বাজারের
পূর্বদিকে
ভূবনডহরের কাছে ভূবন পাহাড়ী অঞ্চলে ধরা
পড়েছিল। গৃহপালিত হওয়ার আগে হাতিটিকে চান্নিঘাট গ্রামে এক মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া
হয়েছিল।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি বশত বামের বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে না থাকলেও এদের সংখ্যা দ্রুত কমে এসেছে ।
প্রথম দিকের বাম ছিল জীব বৈচিত্রের এক লীলাভূমি। সরকার যদি মানুষের বসবাসের জন্য বন্দোবস্ত না দিয়ে বনভূমিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিত তবে বাম বন্য জন্তুদের এক সুন্দর অভয়ারণ্য হয়ে উঠত।এক খড়্গযুক্ত গণ্ডার ও থাকতো ।
কালের প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। প্রকৃতির খেয়ালে যে সম্পদ এলাকায় সঞ্চিত ছিল— এর অনেক কিছুই এখন আর নেই। মানুষের অপরিনামদর্শী যথেচ্ছ অপব্যবহারে অনেক কিছুই এখন বিলুপ্তির পথে । বামের জনগণের জন্য একটি আনন্দের
খবর এই যে ,সম্প্রতি আসাম সরকার সোনাই নদী এবং বরাক নদীর মধ্যবর্তী বামের পূর্ব অংশকে
“ বরাক ভুবন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ” হিসাবে ঘোষণা করেছে।