Thursday, 25 June 2026

34.বর্তমান বাম-এর অর্থনীতি -এক নতুন দিশাঃ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 কৃষিকাজ এখন আর বামবাসীর প্রধান জীবিকা নয় এটি একটি লাভজনক অর্থনৈতিক কার্যক্রম হিসাবেও আর বিবেচিত হয় না এর প্রধান কারণ কৃষিকর্মীর অভাব এবং বিকল্প আয়ের সুযোগের প্রসার বেশিরভাগ পরিবারই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত চাল পায় তাই মানুষ কৃষি কার্যক্রম ছেড়ে দিয়েছে । বেশীর ভাগ জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। নতুন প্রজন্ম কৃষিকাজের কষ্ট স্বীকার করতে আগ্রহী নয় এবং অধিকাংশই নতুন ব্যবসায়িক পেশাগত ক্ষেত্রগুলোর প্রতি আকৃষ্ট  এবং তারা কৃষিকাজ সম্পর্কে অজ্ঞ এটি একটি অশুভ সংকেত যদি কখনও সরকার বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত চাল দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে মানুষ আবার কৃষি শুরু করতে পারবে না

বামে পরিসেবা ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, কেনাকাটা-বেচাকেনা, শিক্ষকতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, কৃষিকাজের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে একইসাথে, বামবাসীরা  মিস্ত্রি,  বিদ্যুৎকর্মী,  নলকূপ পাইপ ফিটার,  রঙের কাজ,  আসবাবপত্র নির্মাণ,   কম্পুটার এবং  ডেস্কটপ পাবলিশিং,  ব্লগিং,  গাড়ি ধোয়া,  বৃক্ষ নার্সারি,  আগর গাছের চাষ, মৎস্যচাষ, মুরগি পালন,ডায়াগনস্টিক সেন্টার,সরকারি ও বেসরকারি খন্ডে চাকুরি, মোটর মেকানিক , পর্যটন শিল্প ,এবং হোটেল রেস্তোরাঁর মতো আধুনিক পেশার দিকে ঝুঁকছে 

বাম-এর ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে বাম কাছাড় এবং মিজোরামের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থলের  ভূমিকা পালন করে এর ফলে মিজোরাম এবং তার বাইরের বাজারগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হয়েছে 

.বাম হল মিজোরামের বনজ সম্পদ, উদ্যানফল এবং কৃষিজাত পণ্যের বিক্রয়ের প্রবেশদ্বার, যেমন রেমা, মরিচ, সুপারি, গন্ধী, কাঠ, বাঁশের বাঁশি, আদা, হলুদ এবং অন্যান্য পণ্য বামের ভাগবাজার এবং ধলাইবাজার মিজোরামের জন্য নির্মাণ সামগ্রী, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং অন্যান্য ভোক্তা সামগ্রীর বাজার হিসেবেও পরিচিত

ভারত সরকার প্রায় ২০/২৫ বছর  ধরেলুক ইস্টনীতি এবং ২০১৪ সালে এনডিএ সরকারেরঅ্যাক্ট ইস্টনীতি নিয়ে কাজ করছে কিন্তু বামবাসীরা অনেক আগেই মিজোরামের দক্ষিণের সীমানা সংলগ্ন দেশগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সুযোগের বিষয়ে সচেতন হয়েছিলেন সড়ক যোগাযোগের উন্নতি, যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং পরিবহন খাতের বিকাশ বামবাসীর সামনে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে 

ফলস্বরূপ, বাম-এর অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে পুরনো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এখন ইতিহাসের অংশ তবে ইট প্রস্তুত শিল্প ছাড়া উৎপাদন ক্ষেত্রের প্রসার তেমন লক্ষণীয় নয় যদিও মিজোরামের বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য এই শিল্প গড়ে উঠেছে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যবান কৃষিজমি ধ্বংস এবং পরিবেশ দূষণ এই শিল্পের প্রধান সমস্যা  বর্তমান প্রজন্মের নতুন পেশাগত উদ্যোগ এবং পরিসেবার মাধ্যমে বামবাসীরা শুধু তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছেন না, বরং অঞ্চলের অর্থনীতিতেও নতুন শক্তি গতিশীলতা যোগ করছেন তবে পরিবেশ সংরক্ষণ , দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা এখন বাম-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ   প্রত্যাহ্বান । .এই ক্ষেত্রে বামের  অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং এনজিও কাজ করছে।

 

 

 

 

 

 

 

Wednesday, 24 June 2026

33. বামের রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যৱস্থা-৩ঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী

  বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে বাম থেকে মিজোরামে যাওয়ার জন্য কোন মোটরযানযোগ্য রাস্তা ছিল না। শিলচর আইজল সড়কের লাইলাপুর-ভাইরেংটে অংশটি  ১৯৫৪ সালের দিকে নির্মিত  এবং যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এই রাস্তাটি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মিজোরামের সাথে বামের সংযোগ স্থাপন করেছে।

     আমরা উপরে দেখেছি যে বামে বসতি স্থাপনের প্রাথমিক বছরগুলিতে পরিবহনের জন্য কোনও রাস্তা ছিল না। একইভাবে, তথ্য প্রেরণ এবং গ্রহণের জন্য যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না এবং একটি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে  এটি  উল্লেখযোগ্য প্রত্যাহবান  ছিল। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে বামের মানুষকে   বার্তাবাহকের ( স্থানীয়ভাবে খবরিয়া নামে পরিচিত )   উপর নির্ভর করতে হতো। তারা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ  সরবরাহের জন্য পায়ে হেঁটে স্বল্প দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতেন। অনেকটা আগের দিনের ডাক রানারদের মত ।অসুস্থতা, মৃত্যু বা পরিবারের মধ্যে বিবাহের মত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বার্তাবাহকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

স্বল্প দূরত্বের জন্য, যোগাযোগ ছিল মূলত উচ্চ কণ্ঠ স্বরে ঘোষণার মাধ্যমে ।   হাটবাজারে ও গুরুত্বপূর্ণ  জায়গায়   ঢোল বাজিয়েও  গুরুত্বপূর্ণ খবর জনসমক্ষে ঘোষণা করা হত । বামের কুকিরা যারা কুঙ্গা পুঞ্জি, ককাই পুঞ্জি মতো পুঞ্জি নামে এক একটি  পাহাড়ী গ্রামে  বাস করত তাদের যোগাযোগের এক অনন্য পদ্ধতি ছিল। রাতে ঢোলের তালে বার্তা পাঠাতো তারা। এটি মোর্স কোড ব্যবহার করে ডট এবং ড্যাশ সহ টেলিগ্রাফিক বার্তা পাঠানোর সাথে সমান্তরাল  ছিল ৷ পরিবেশ দূষণমুক্ত, এবং পুঞ্জিগুলি পাহাড়ে অবস্থান করায়,  ঢোলের শব্দ রাতের বেলা বেশ দূরে চলে যেত। বার্তা আদান-প্রদান হত দুই  ঢোল বাদকের মধ্যে।   বিনিময় বেশ কিছুক্ষণ চলত। ঢোল বাদকদের   মধ্যে বার্তার আদান-প্রদান একটি সংলাপের মতো ছিল, যেখানে  একজন  বার্তা প্রেরণ করে এবং অন্য পক্ষ প্রতিক্রিয়া জানায় ।এই প্রক্রিয়াটি  যথেষ্ট সময়কাল ধরে প্রসারিত হতে পারত।

  ধলাই বাজারস্থিত ডাকঘরের আওতাধীন ছিল পুরো বাম অঞ্চল। ধলাই ডাকঘরটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯১৪ সনে-বামের পুনর্বসতির প্রায় প্রথম পর্যায়।১৯৫০ এর দশকে   শণি মঙ্গল এই দুই বাজার বারে ডাকপিয়ন ভাগাবাজারে আসতো। একটি কাপড়ের চাদর মেলে সেখানে চিঠি পত্র গুলো রেখে দিত এবং তা থেকে পোষ্টকার্ডের চিঠিগুলো বিলি করতো। চিঠির প্রাপক অথবা তার পরিচিতজনেরা চিঠি সংগ্রহ করতে পারতো।যে কেউ অন্যের চিঠি পড়ে রেখে  যেতে পারত। কোন গোপনীয়তা ছিল না।

চিঠি আসলেও চিঠি পড়ার লোক ছিল কম।চিঠি পাড়ানোর জন্য চিঠির প্রাপককে -বিশেষত মুসলমান প্রধান অঞ্চলে -এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হত।এখন ভাগাবাজারে স্বয়ংসম্পূর্ণ পোষ্ট অফিস রয়েছে। ভাগাবাজার পোষ্ট অফিসের অধীন ৮টি এবং ধলাই পোষ্ট অফিসের অধীন ৮টি শাখা কার্যালয় নিয়ে মোঠ ১৮ টি ডাক পরিসেবা রয়েছে পুরো বামে। ১৯৯০ ইংরেজীতে ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড কর্তৃক লেণ্ড লাইন টেলিফোন সেবা চালু করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সে ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রায় সবাই এখন মোঠো ফোন ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন।