কৃষি নির্ভর সমাজ
বনফারার সময় বাম অঞ্চলটি মূলত কৃষি নির্ভর এলাকা ছিল। অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিযোগ্য ভূমির লোভনীয় পরিবেশ কৃষক গৃহস্থকে প্রলুব্ধ করেছে, আকর্ষণ করেছে। উর্বর মাঠে ধানের ফসল দেখে উপত্যকার নানা প্রান্ত থেকে কৃষক গৃহস্থরা বনবাদাড়ের অসহনীয় পরিবেশ গায়ে মেখে জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে বসতি স্থাপন করে জনবিহীন গহন নির্জন স্থানগুলোকে জনমুখর করে তুলেছে। এতদসঙ্গে সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈশিষ্ট দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে ।
এখানকার জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ধান চাষ। চাষির আনন্দ তার ফসলের সজীব সুন্দর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে। ফলানো ফসলের অক্ষত সংগ্রহ থেকে। বামের কৃষকেরা প্রকৃতির প্রসন্ন মদত পেয়েছে। খেতের ফসল কৃষকের মনে প্রেরণা যুগিয়েছে। দ্বিগুণ উৎসাহে ফসল ফলিয়েছে।
ফসলের মধ্যে প্রধান ফসল ধান। দু'ধরণের ধানের চাষ ছিল— আউশ বা আশু আর শাইল বা হৈমন্তিক ধান ৷ আউশ ধানের চাষ শুরু হত চৈত্র-বৈশাখ থেকে। ফসল উঠত শ্রাবণ-ভাদ্রমাসে। শাইল ধানের চাষ শুরু হত আষাড়-শ্রাবণ মাসে। ফসল উঠার সময় অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ।ভাদ্রমাস কৃষক গৃহস্থের সমস্ত কৃষি মরশুমের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়। শাইল ধান চাষের সর্বশেষ মরশুম ভাদ্র মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত । আউশ ফসল তোলার অন্তিম সময় ভাদ্র মাস ৷
তাই কৃষক গৃহস্থের কৃষি কর্মকাণ্ডের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম সময় ভাদ্র মাস । ভাদ্রমাসে কৃষকের চরম ব্যস্ততার আভাস দিতে গিয়ে প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছে—
“ভাদো মাসো মা মরে
কুলা আওড়দি খেত্ করে।”
অর্থাৎ ভাদ্র মাসে মা মারা গেলেও তার সৎকার কর্ম স্থগিত রেখে খেতের কাজ শেষ করবার প্রয়াস চলে।
কৃষক গৃহস্থের বাৎসরিক অর্থ উপার্জনের অন্যপথ ছিল পশুপাখি পালন, পশুর মধ্যে প্রধান সম্পদ গরু। হাল চাষের জন্য গরু, দুধের জন্য গরু। বিক্রি করে অর্থ সঞ্চয় অথবা বিপদ উদ্ধারের জন্য গরু। গৃহস্থকুলের গরুর গুরুত্ব বুঝাতে প্রবাদ রচিত হয়েছিল—“যার নাই গরু হে (সে) দুনিয়ার হরু (অবহেলিত)।” গরু-মহিষ ছিল এলাকার কৃষক গৃহস্থকুলের সক্ষম-অক্ষম যাচাইয়ের মাপকাঠি। ছাগল পালন ছিল গৃহস্থকুলের বাড়তি উপার্জনের আর এক উপায়।
ফসল ফলানো, ফসল তোলা— ফসলের পরিচর্যা করা ইত্যাদি কাজের ফাঁকে সংস্কৃতি চর্চারও রেওয়াজ ছিল। শ্রম ক্লান্ত জীবনের অবসাদ কাটিয়ে মনকে চাঙ্গা করবার জন্য মনোরঞ্জনের উপাদন রূপে কোনও গৃহস্থ ঘরের আঙ্গিনায় জড়ো হয়ে পুত্তি (পুথি) পড়ার আসর বসত। ধর্মীয় আখ্যানের আধারে লেখ্য-আখ্যান কাব্য হাল্লতুন নবী, ইছুব জুলেখা, জঙ্গনামা, জঙ্গে খয়বর, জঙ্গে হাসর, নিজাম পাগলার কিচ্চা ইত্যাদি মধ্যযুগীয় সমাজ-সংস্কৃতি ভিত্তিক কথা সাহিত্য পাঠের আয়োজন ছিল চিত্ত বিনোদনের অবলম্বন। গ্রামোফোনে রেকর্ড করা গান বাজানো ছিল বিনোদনের
একটি বড় উৎস।
আশ্বিন-কার্তিক মাস ছিল কৃষকের কর্মবিরতির মরশুম। এ সময়ে রসিকজনেরা গাট্টার গান (তর্জাগান) এর আয়োজন করত। কোনও কোনও গৃহস্থবাড়িতে গাজির গানের মহড়া চলত; কোথাও বসত মারিফাতি গান, বাউল গানের আসর। রাতভর অনুষ্ঠানের আয়োজন শ্রোতৃমণ্ডলীকে মোহিত করে রাখত।
কবিগান গাওয়া ও প্রচলিত ছিল ।কবি গান ছিল গ্রামের
কবিদের দ্বারা রচিত বাংলা কবিতার একটি জনপ্রিয় রূপ, যা কাছাড়ের সংবাদযোগ্য সংবেদনশীল ও খবরযোগ্য ঘটনা
যেমন বিধ্বংসী অগ্নীকাণ্ড,দুঃসাহসিক ডাকাতি বা প্রেম
ঘটিত হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনাগুলি "কবি গানের" মাধ্যমে বর্ণনা করা হত। এই কবিরা তাদের "কবিগান"
গেয়ে বিক্রি করতে ভাগাবাজার এবং ধলাইবাজারে আসতেন।প্রথম দিকে, আলাউদ্দিন এবং অন্ধ সইফুল মিয়ার
মতো কবি তাদের কবিগানের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত
ছিলেন। তারা একটি একতারা সহকারে কবি গান গাইতেন
।আর তাদের রচিত কবিগান বিক্রয় করতেন। গ্রামবাসীরা এই চার বা পাঁচ পৃষ্ঠার কবিগান দুই আনা দিয়ে ক্রয় করতঃ তাদের অবসর
সময়ে উচ্চস্বরে গাইতেন ।
আউশ ফসল তোলার পর ভগিনী এবং কন্যার প্রতি অপত্য স্নেহে পিঠা-চিরা-ফল-ফসলের ঝুড়িভরা খাবার পাঠানো ছিল গ্রামীণ গৃহস্থ সমাজে প্রচলিত প্রথা ৷
অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে শাইল মরশুমে চুঙ্গাপিঠার লোভনীয় ভোজনায়োজনের বিশেষ অংশরূপে বিবাহিত ভগিনী এবং কন্যাদের বাড়িতে অতি পরিপাটি মোড়কে পাঠিয়ে দিয়ে কৃষক গৃহস্থ তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিত। চুঙ্গা পিঠার লোভনীয় স্মৃতি কি ভুলা যায়!
সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আধ্যাত্মিক ভাবনায় ধর্ম চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত আলোচনার অঙ্গরূপে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ‘ওয়াজমহফিল’-এর আয়োজন হত শীতের শুকনা মরশুমে বিশেষ করে মাঘ-ফাল্গুন মাসের অবসর সময়ে। অমুসলমান গ্রামগুলিতেও চলত ধরমীয় কীর্তন এবং সামাজিক নানা অনুষ্ঠান
ইত্যাদি। এও ছিল সংস্কৃতি চর্চার এক বিশেষ দিক।
………………………………………………………………………………………………………..