Monday, 29 June 2026

38.বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থানঃ-3 পঞ্চমী নাথ মাজুমদার

 

মহা শিবরাত্রিঃ

“মহা শিবরাত্রি" বা শিবের মহান রাত, ধ্বংস এবং পুনর্জন্মের দেবতা শিবকে উৎসর্গ করা হয়৷ চান্দ্র  ফাল্গুনের    কৃষ্ণ   পক্ষের  ১৪ তম রাতে মহা শিবরাত্রি পালিত হয়।ভক্তরা দিনরাত উপবাস, প্রার্থনা এবং আচার-অনুষ্ঠানের সাথে মহা শিবরাত্রি পালন করে।তারা  বাম অঞ্চলে  গড়ে উঠা বিভিন্ন  শিব মন্দিরে যান, এবং বিশেষ প্রার্থনা  বা পুজা করেন ।মহা শিবরাত্রি মহা ধুমধাম ও উৎসাহের সাথে পালিত হয়।মহা শিবরাত্রি অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয়, অজ্ঞতার ওপর জ্ঞান এবং মন্দের ওপর পুণ্যের প্রতীক।দুধ,দৈ, ঘি, মধু মহাকাল কে উৎসর্গ করে ভক্তরা  মনোমতো বর প্রার্থনা করে  এই তিথিতে ।

দোল যাত্রাঃ

দোল যাত্রা, যা দোল পূর্ণিমা উৎসব নামেও পরিচিত।এটি বামে বসন্তের সূচনাকে চিহ্নিত করে এবং ভগবান কৃষ্ণ ও রাধার ঐশ্বরিক প্রেমকে স্মরণ করে। দোলযাত্রা পালিত হয় ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ।এটি রঙের উৎসব হোলির সাথে মিলে যায়, যা ভারত জুড়ে মহা উৎসাহের  সাথে উদযাপিত হয়।ভক্তরা একে অপরকে রঙিন গুঁড়ো (আবির বা গুলাল) ছিটিয়ে দেয় এবং রঙিন জল স্প্রে করে, ঐতিহ্যবাহী হোলি গান এবং ভজন ,ভগবান কৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে পরিবেশিত হয়   দোল যাত্রা হল একটি প্রাণবন্ত এবং আনন্দের উৎসব যা প্রেম, বন্ধুত্ব এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যকে উদযাপন করে   এই উৎসবটি  মানুষের মনে আনন্দ ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেয়।

আসলে বসন্ত উৎসব শুধুমাত্র হালকা বিনোদন বা নিছক আনন্দ হৈ হুল্লোড় নয় ।এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশ্বপ্রেমের গভীর তাৎপর্য ।বৃন্দাবনের  কৃষ্ণকে মানা হয় প্রেমের অবতার । এ প্রেম  অপার্থিব,সর্বব্যাপী । তিনি শুধু রাধারাণীর নন,স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে বৃন্দাবনের সকল গোপ- গোপীর প্রেমিক ,অভিন্ন-হৃদয় গোপ বালকগণ তাঁর সখা । তাঁর প্রেমে  ‘যমুনা উজান বয়’ ,তাঁর  নামে বৃন্দাবনের  তরু লতায় শিহরণ জাগে । তাঁর বিরহে বৃন্দাবনের  গাভীগণ তৃণ খায় না ,মায়ূর নৃত্য করে্‌ না ,শুক -সারি নীরব হয়ে রয় ।বৃন্দাবনের পথের ধূলো তাঁর চরণ চিহ্ন বুকে ধরে রাখার জন্য উদ্গ্রীব  হয়ে থাকে । অর্থাৎ নদ নদী ,গাছ-পালা , পশু-পাখী ,দেশের মাটি, সব কিছুকেই তিনি ভালবাসেন । তিনি প্রকৃতিপ্রেমী,তিনি মানব প্রেমী,তিনি বিশ্ব প্রেমিক । এ প্রেম ভাংতে জানে না ,শুধু গড়তে জানে । সৃষ্টির আনন্দে তাই বসন্ত উৎসব বা দোল উৎসব বিশ্বপ্রেমের রঙ ছড়িয়েই চির রঙীন ।

দোল উৎসব পালনের আর একটি তাৎপর্য পূর্ণ বিষয় হলো -এ সময় বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে আর   এই রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সর্বাঙ্গে বিশেষ ওষধি গুণ সম্পন্ন আবির মাখা প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের নিদান ।.

বিশ্বকর্মা পূজাঃ

  বাংলা ভাদ্র মাসের শেষ দিনে বামে পালিত হয় দেবতাদের স্থপতি ও কারিগর বিশ্বকর্মার  পূজা। বিশ্বকর্মা পূজায় দেবশিল্পী  বিশ্বকর্মাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়, যিনি হিন্দু পুরাণে মহাবিশ্বের ঐশ্বরিক স্থপতি এবং স্রষ্টা হিসেবে সম্মানিত।  বিশ্বকর্মা পূজায় কারিগর এবং কারখানার মালিকরা তাদের নিজ নিজ ব্যবসা এবং পেশায় সাফল্য, সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার জন্য ভগবান বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ কামনা করে। মন্ত্র এবং স্তোত্রের সাথে বিশেষ আরতি  সঞ্চালিত হয় ।বিশ্বকর্মা পূজা ব্যাপক উৎসাহ সামূহিক উচ্ছ্বাসের সাথে পালিত হয়। কারখানার শ্রমিক এবং কর্মচারীরা একত্রিত হয়ে পূজা উদযাপন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ভোজের আয়োজন করে, যা সকল অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একতা সৌহার্দ্যের বোধ জাগিয়ে তোলে। .কারখানার যন্ত্রপাতি ও যানবাহনে ,মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সিঁদুর পরিয়ে  দেন পুরোহিত  । সিঁদুরকে মঙ্গলের প্রতীক হিসাবেই ধরা হয় ।

 ...........................................................................................................................

প্রিয় পাঠকমণ্ডলী,

বাম হিস্ট্রি ব্লগ আপনাদের আন্তরিক সাড়া ও উৎসাহে ক্রমশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ পর্যন্ত ১১,৯৫৩ বার পাঠকরা ব্লগটি পরিদর্শন করেছেন।

যারা বামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছে অনুগ্রহ করে ব্লগটির লিংকটি শেয়ার করুন:

bam-history.blogspot.com

এছাড়াও, ব্লগের Comment বিভাগে আপনাদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া জানালে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত হব।

আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাই আমাদের অনুপ্রেরণা।


ধন্যবাদান্তে,
বাম হিস্ট্রি ব্লগ


 

 

 

 

 

 

Sunday, 28 June 2026

37.বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থানঃ-2পঞ্চমী নাথ মজুমদার


 বাম অঞ্চলের হিন্দুদের স্থায়ী মন্দির ও অস্থায়ী  মণ্ডপে পালিত  বিভিন্ন উৎসব ও পূজার বিবরণ দেওয়া হল-

দুর্গাপূজাঃ

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল একটি প্রধান বাঙালি হিন্দু উৎসব যা চান্দ্র আশ্বিন মাসে বামে জাঁকজমক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে  উদযাপিত হয়। দুর্গাপূজা মহিষাসুরের উপর দেবী দুর্গার বিজয়ের জন্য উদযাপন করা হয়। এটি মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রতীক।মহালয়া থেকেই শুরু হয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি।।দুর্গাপূজার কেন্দ্রবিন্দু হল পূজার জন্য সুসজ্জিত প্যান্ডেলগুলিতে স্থাপন করা  অন্যান্য দেব-দেবীর সাথে দেবী দুর্গার মূর্তি। দুর্গা পূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক  ও সামাজিক অনুষ্ঠানও। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক এবং শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। নতুন জামাকাপড়, খেলনা, উপহার সামগ্রী  কেনাকাটা দুর্গোৎসবের একটি অপরিহার্য অংশ। জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই পুজোর কেনাকাটায় মেতে উঠে। দুর্গা পূজার  একটি জনপ্রিয় কার্যকলাপ হল "প্যান্ডেল হপিং", যেখানে লোকেরা তাদের সেরা পোশাক পরে, প্রতিমার সাজসজ্জা, থিম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে সারা রাত বিভিন্ন পূজা প্যান্ডেল ঘুরে বেড়ায়। দূর্গাপুজার পর বামের গ্রামবাসীরা সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ হিসেবে যাত্রাপালার আয়োজন করে যেখানে স্থানীয় শিল্পীরা অংশ নেয়।সর্বজনীন দুর্গাপূজা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়।দুর্গাপূজার সময় ঢাক, শঙ্খ  ও মন্ত্র উচ্চারণের শব্দে বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে এবং একটি উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।

চান্দ্র আশ্বিন মাসের শুক্লা সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী তিথিত্রয়ে মহা ধূমধামে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় ।কিন্তু নবমীর নিশি শেষে দশমীর আগমনেই বেজে উঠে  বিষাদের সুর । শোনা যায়  বিজয়ার করুণ রাগিনী । দেবীর বিসর্জনে ভগ্নহৃদয় ভক্তগণ  সান্ত্বনা  খুঁজে বেড়ায় আত্মীয়- স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ।গুরুজন দের প্রণাম  আর বন্ধুদের আলিঙ্গনে  আবদ্ধ করা বিজয়ার বিশেষ রীতি । এই সময় শত্রুকেও মিত্র করার রেওয়াজ আছে । জাতি-ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে  আপন করে নেওয়াই বিজয়ার  বিশেষত্ব ।  এই সৌভ্রাতৃত্ব বোধটাকেই দুর্গাপূজার ফল বা দেবী দুর্গার  আশীর্বাদ বলে মনে করা হয় ।

লক্ষ্মী পূজাঃ

দেবীপক্ষের শেষ হয় শারদ পূর্ণিমায় আর এই পূর্ণিমা তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয় লক্ষ্মী পূজা ।লক্ষ্মী মানে শ্রী,লক্ষ্মী মানে সুরুচি।লক্ষ্মী সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী ।লক্ষ্মী পূজার দিনে   বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে,বামের প্রায় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে  চালের পিটুলি দিয়ে  আলপনা দেওয়া হয়।সে আল্পনায় থাকে ধানের ছড়া,লক্ষ্মীর চরণ চিহ্ন ,ক্ষেতের সরঞ্জাম,লতাপাতা প্রভৃতি ।হৈমন্তিক ধান ঘরে তোলার প্রাক মুহূর্তে  লক্ষ্মীর আরাধনা কৃষিভিত্তিক সমাজের মানস কল্পনাকে প্রতিফলিত করে। প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ প্রাপ্তির জন্যই লক্ষ্মী পূজার আয়োজন।

কার্তিক  পূজাঃ

কার্ত্তিক সংক্রান্তি অর্থাৎ কার্ত্তিক মাসের শেষ দিনে কার্ত্তিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । এখানে কোনও তিথি নক্ষত্র বারের বিধি নিষেধ নেই ।দেবসেনাপতি কার্ত্তিক বীরত্ব আর শৌর্য বীর্যের প্রতীক । তাঁর আশীর্বাদে সন্তান লাভ হয় -এই বিশ্বাসে বিশেষতঃ নববিবাহিতা বধূরাই কার্তিকের পূজা করে থাকেন । কার্তিকের মতো বীর যোদ্ধা সুদর্শন সন্তান লাভের আশায়,ময়ুরাসনে বিরাজিত কার্তিকের সঙ্গে তীর ধনুকের ও পূজা করা হয় । সাধারনতঃ কয়েকজন ব্রতী  একত্রিত হয়ে ,সমবেত ভাবে ,একই স্থানে কার্ত্তিক পূজা করে থাকেন ।

সারাদিন উপবাস করে ,  সারা রাত জেগে থেকে প্রহরে প্রহরে পূজা হয় । সেই সঙ্গে ধান ,মাস কলাই,মুগ  ইত্যাদি শস্যের  নবাঙ্কুর অর্থাৎ নব অঙ্কুরিত শস্যে জলাভিষেক করা হয় । সম্ভবতঃ এই আচার অনুষ্ঠানটি নবপ্রজন্মকে স্বাগত জানাবার ইঙ্গিত বাহী । কার্তিক পূজার পরে আসে ফসল কাটার মৌসুম । কৃষকরা প্রচুর  ফলনের জন্য  আশা প্রকাশ করে  এবং আসন্ন কৃষি চক্রে অনুকূল আবহাওয়া  ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা জানায় ।

মকর  সংক্রান্তিঃ

বাম অঞ্চলের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে   মকর সংক্রান্তি এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে । কৃষি প্রধান এই অঞ্চলে  কৃষির সঙ্গে  সম্পর্কিত এই অনুষ্ঠানটি বিশেষ  অর্থবহ ।পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে অর্থাৎ বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে  এই উৎসব পালিত হয় ।

   ইংরেজী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী  জানুয়ারী মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখে পড়ে এই সংক্রান্তি  । এ সময় শীতকালীন  ফসলের মৌসুমের   সমাপ্তি ঘটে অর্থাৎ এতদঞ্চলের ‘শাইল‘ (শালি) ধান  কাটা শেষ হয় । হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর  সোনালী ধানে গোলা যখন  ভরে যায় তখন কৃষকের মনও ভরে উঠে আনন্দে । সদ্য ঘরে তোলা  নতুন ধানের চাল দিয়ে  তৈরী হয়  নানা রকম পিঠে পুলি । বামের ঐতিহ্যবাহী উপাদেয় সব স্থানীয় খাবারের সাথে ‘ চুঙ্গাপিঠা’র উপস্থিতি গৃহস্থের রসুইকে পরিপূর্ণ করে তুলে । প্রত্যেকের বাড়ীতে প্রত্যেকের আমন্ত্রণ থাকায় উৎসবের মেজাজটা সর্বজনীন রূপ ধারণ করে ।

এছাড়াও  মকর সংক্রান্তির আর একটি  তাৎপর্য  আছেমহাভারত খ্যাত  পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় শায়িত ছিলেন তিনি ছিলেন  ইচ্ছামৃত্যুর বরপ্রাপ্ত । এই  সংক্রান্তির দিনেই তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করেন । এ জন্য হিন্দুরা ব্রাহ্ম মুহূর্তে স্নান সেরে ‘তিল’ গ্রহণ করেন সর্বপ্রথম । তাই ঘরে ঘরে তিলের নাড়ু তৈরী হয় । এই সংক্রান্তিকে এই জন্য তিল সংক্রান্তি  ও বলা হয় ।

………………………………………………………………..

প্রিয় পাঠকমণ্ডলী,

বাম হিস্ট্রি ব্লগ আপনাদের আন্তরিক সাড়া ও উৎসাহে ক্রমশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ পর্যন্ত ১১,৮৫০ বার পাঠকরা ব্লগটি পরিদর্শন করেছেন।

যারা বামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছে অনুগ্রহ করে ব্লগটির লিংকটি শেয়ার করুন:

bam-history.blogspot.com

এছাড়াও, ব্লগের Comment বিভাগে আপনাদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া জানালে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত হব।

আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাই আমাদের অনুপ্রেরণা।


ধন্যবাদান্তে,
বাম হিস্ট্রি ব্লগ


Saturday, 27 June 2026

36.বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থানঃ-1: পঞ্চমী নাথ মাজুমদার

 

“যাহা ধারণ করে তাহাই ধর্ম ।“ অর্থাৎ, আমাদের দেহ ,সমাজ বা জীবনটাকে  সুন্দরভাবে ধরে রাখতে  যে কর্ম পদ্ধতি বা নীতি নিয়মের  অবস্থিতি আবশ্যক তা-ই ধর্ম।  এটা সব জীবনের জন্য প্রযোজ্য ।তাই ধর্ম সবার জন্য এক এবং অভিন্ন । তবে জীবন টাকে যাপন করার জন্য বেছে নেওয়া পথ এক না-ও হতে পারে।তাই ভিন্ন হয় “ধর্ম মত “ ।যেমন -হিন্দু,মুসলমান , বৌদ্ধ  জৈন ,খৃষ্টান ইত্যাদি ।তবে এই মতগুলোই ধর্ম বলে ব্যাপকভাবে পরিচিত ।

.বাম প্রধানত হিন্দু ,মুসলমান, এবং সীমিত সংখ্যক খ্রিস্টান দ্বারা অধ্যুষিত।প্রতিটি সম্প্রদায়ই তাদের নিজনিজ ধর্মীয় রীতিনীতি, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসবাস করছে।

 কথায় বলে  বাঙ্গালী হিন্দুদের”বার মাসে তেরো পার্বন”।বলা যায় বামের ক্ষেত্রে এই কথাটি আক্ষরিক  অর্থে প্রযোজ্য। কথাটা নতুন নহে ,বরং অতি পুরাতন ।কারণ অতি প্রাচীন কাল থেকেই নানা রীতি নীতি ,পূজা পার্বণ এই সমাজে প্রচলিত । এবং এর   যথোপযুক্ত  কারণ ও আছে ।কারণ হলো- শৈব,শাক্ত, সৌর ‌, গাণপত্য ছাড়াও বৈষ্ণব মতের  প্রচুর সংখ্যক মানুষ বামের বাঙালি হিন্দু সমাজে বর্তমান । বাঙালি ছাড়াও কিছু সংখ্যক হিন্দুস্থানী ও মনিপুরী ভাষাভাষী হিন্দুও এখানে বসবাস করেন ।

প্রত্যেক মতের অনুসারী মানুষ নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী ইষ্টদেবতার পূজার্চনা করে থাকেন।  এই পূজার্চনাকে কেন্দ্র করে উৎসব অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারেন সবাই ।শৈব রা  শিবের, শাক্তরা দুর্গা-কালি-মনসা প্রভৃতি শক্তির ,সৌরাগণ সূর্যের ,গানপত্যরা গণেশের পূজা করে থাকেন । নিজস্ব বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অনুযায়ী একাধিক মতের অনুসারী হতেও কোনও আপত্তি নেই । এছাড়াও ভাইফোঁটা ,জামাইষষ্ঠী ,বিয়ে ,আন্নপ্রাশন প্রভৃতি সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো বামের সব হিন্দুরাই পালন করে থাকেন ।ফলে এগুলো পার্বণের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেয় ।

 বাম অঞ্চলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দেবালায় যেমন বিদ্যমান ,তেমনই  অস্থায়ী মণ্ডপ বানিয়ে একক বা সামূহিক পূজার্চনার প্রচলনও দেখা যায় । স্থায়ী দেবালয়গুলোতে অধিষ্ঠিত দেবদেবীর পূজাই হয়ে থাকে । অস্থায়ী  মন্ডপে যে কোনও দেবদেবীর পূজা করা যায় । কিন্তু কোনও  নির্দিষ্ট স্থানে বার বার একই পুজা অনুষ্ঠিত হলে স্বাভাবিক ভাবেই স্থানটি ঐ নির্দিষ্ট পূজার নামেই খ্যাতি পেয়ে যায় ।

 

 

 

 

…………………………………………………………………………………………….

Friday, 26 June 2026

35.পরিবর্তনের পথে বামঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


 

১৯১২ সালে ঐতিহাসিক উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ তার কাছাড়ের ইতিবৃত্ত বইতে পূর্বাভাষ দিয়েছিলেন যে বাম অদূর ভবিষ্যতে বিকশিত হবে এবং অতীতের ঐতিহ্যকে পুণঃসংস্থাপিত করবে। তার ভবিষ্যৎ বাণীর পঞ্চাশ বছরের কম সময়ের মধ্যে বাম তার অতীতের চেয়েও বেশী পরিমাণ উন্নত হয়ে উঠছে। বাম আজ সঠিক ভাবে প্রাচুর্য্যে ভরপুর আধুনিকতার দিকে ধাবমান এক উন্নত জনপদ। বর্তমানের বামের অগ্রগতির যে মাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা দেখে প্রযুক্তিগত আগ্রগতি   এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে যদি কেউ উপেন্দ্র চন্দ্র গুহের মত ভবিষ্যদবাণী   করতে চায় যে আজ থেকে ১০০ বছর পরে ২১২৫ সনে বাম কি হবে তা 'লে তাকে নিঃসন্দেহে গভীর সমস্যায় পড়তে হবে। দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবেবামনামের পরিচিতি ভাগাবাজার, ধলাইবাজার ইত্যাদি উন্নয়নশীল কেন্দ্রগুলোর পরিচিতির আড়ালে  হারিয়ে যাচ্ছে। আজ মানুষ ভাগাবাজার বা ধলাইবাজারে যায়, বামে যায় না।বামনামটি টিকিয়ে রাখতে লে বামের জনগণকে  নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং স্থানের নামের সঙ্গেবাম’ শব্দটি যুক্ত করে নামাকরণ করতে হবে। ইতিমধ্যে নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠানগুলির সাথেবাম’ শব্দ যুক্ত করে নামকরণ করা  হয়েছেবাম  নিত্যানন্দ বহুমুখী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়,রাজঘাট বাম ঈদগাহ, বাম বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়, বাম নবকুমার উচ্চ বিদ্যালয়,বাম  হাইস্কুল,রাজনগর ,বাম প্রেমানান্দ এম ই স্কুল ; বাম  ইদগাহ – বনগ্রাম ও বাম  ইদগাহ -জয়ধনপুর ।এছাড়াও বামের নাম বিলুপ্তির হাথ থেকে রক্ষা  করতে  বামবাসীরা বিয়ে, জন্মদিন, শ্রাদ্ধ ও বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদির আমন্ত্রণপত্রে গ্রামের নামের সাথেবামশব্দটি যোগ করতে পারেন। যেমন ‘বাম’ ভাগাবাজার , ‘বাম’রাজঘাট  ইতিমধ্যেই  কাছাড়ের মূল ভূখণ্ডের মানুষের  কাছে ধলাই বাজার  বাম’ ধলাই নামে পরিচিত হয়ে আছে।

 তৎসঙ্গে বামের অধিবাসীগণকেবাম উৎসববা এই ধরণের আরও অন্যান্য কর্ম্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই নামকে সমুন্নত রাখতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে অতি সম্প্ৰতি ২০৩৭ জনসংখ্যার ছোট জনপদ শেওড়ারতল যা ৭৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তারিত   তার অধিবাসীরা যেরকমভাবে উৎসাহ উদ্দিপনার সাথে গ্রামটির প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীর শুভেচ্ছা বাৰ্ত্তা সমন্বিতস্মৃতিগ্রন্থ (স্যুভিনির)” প্রকাশ করেছে তা থেকে দৃষ্টান্ত গ্রহণ করা যায়।

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে  বামের ঐতিহ্য ও পরিচয় তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  বামবাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গৌরবময় ‘বাম’ নামটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব ।    

    কিন্তু ভৌগোলিক অঞ্চল হিসাবে বাম নামটি তলিয়ে গেলেও একটি বিষয় নিশ্চিত যে  সংযোগবিহীন দূরবর্তী অনুন্নত অঞ্চল বুঝাতে    কাছাড়ের মূল ভূখণ্ডের মানুষের শব্দভাণ্ডারে ‘বাম-বাউরি’ বাগধারাটি  টিকে থাকবে।

 উপসংহারবামের আংশিক ইতিহাস রূপে লিখিত এই নিবন্ধটি লেখকের গবেষণা ও ব্যক্তিগত জ্ঞান অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ। বামের অনেক অধিবাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বই পুস্তকে বামের প্রাথমিক আলোচনার আলোকে লিখা হয়েছে ।আশা করা যায় যে নিবন্ধটি উত্তর পূর্ব ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (শিলচর) গবেষকদেরকে বামের সাথে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস, ভূগোল, বন্যপ্রাণী, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য আন্ত-বিষয়ক গবেষণার কাজে হাত দিতে উদ্দীপ্ত করবে। হয়তো বা কেউ কোনদিন বামের সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

 

 

গ্রন্থপঞ্জিঃ

১। কাছাড়ের ইতিবৃত্তউপেন্দ্ৰ চন্দ্ৰ গুহ

২। Indigenous Muslims of Assam with Focus on Barak Valley —Ali Haidar Laskar 

৩।Antiquities of Cachar-Raj Mohan Nath

৪।Cachar District Gazetteers -B.C.Allen

৫।Statistical Hand Book of Assam – Hunter

৬।বামের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব -সাবির আহমদ চেৌধুরী

৭।তথ্যভিত্তিক বামের মসজিদ সমুহ- সাবির আহমদ চেৌধুরী

        

লেখক পরিচিতিঃ

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী- কাছাড়ের বাম রাজঘাটের বাসিন্দা। বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল, বাম নিত্যানন্দ হাইস্কুল এবং সোনাই নিত্যগোপাল হাইস্কুলে তার স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন ।জিসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সহ স্নাতক, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং  গৌহাটী  ইউনিভার্সিটি  ল কলেজে এলএলবি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কোঅপারেটিভ ম্যানেজমেন্ট,পুনে থেকে কোঅপারেটিভ বিজনেস ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা নিয়ে, আসাম সরকারের সমবায় বিভাগে কর্মজীবন অতিবাহিত করে ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণ ।অবসর গ্রহণের পর সামাজিক কাজে নিয়োজিত