Friday, 26 June 2026

35.পরিবর্তনের পথে বামঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


 

১৯১২ সালে ঐতিহাসিক উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ তার কাছাড়ের ইতিবৃত্ত বইতে পূর্বাভাষ দিয়েছিলেন যে বাম অদূর ভবিষ্যতে বিকশিত হবে এবং অতীতের ঐতিহ্যকে পুণঃসংস্থাপিত করবে। তার ভবিষ্যৎ বাণীর পঞ্চাশ বছরের কম সময়ের মধ্যে বাম তার অতীতের চেয়েও বেশী পরিমাণ উন্নত হয়ে উঠছে। বাম আজ সঠিক ভাবে প্রাচুর্য্যে ভরপুর আধুনিকতার দিকে ধাবমান এক উন্নত জনপদ। বর্তমানের বামের অগ্রগতির যে মাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা দেখে প্রযুক্তিগত আগ্রগতি   এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে যদি কেউ উপেন্দ্র চন্দ্র গুহের মত ভবিষ্যদবাণী   করতে চায় যে আজ থেকে ১০০ বছর পরে ২১২৫ সনে বাম কি হবে তা 'লে তাকে নিঃসন্দেহে গভীর সমস্যায় পড়তে হবে। দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবেবামনামের পরিচিতি ভাগাবাজার, ধলাইবাজার ইত্যাদি উন্নয়নশীল কেন্দ্রগুলোর পরিচিতির আড়ালে  হারিয়ে যাচ্ছে। আজ মানুষ ভাগাবাজার বা ধলাইবাজারে যায়, বামে যায় না।বামনামটি টিকিয়ে রাখতে লে বামের জনগণকে  নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং স্থানের নামের সঙ্গেবাম’ শব্দটি যুক্ত করে নামাকরণ করতে হবে। ইতিমধ্যে নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠানগুলির সাথেবাম’ শব্দ যুক্ত করে নামকরণ করা  হয়েছেবাম  নিত্যানন্দ বহুমুখী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়,রাজঘাট বাম ঈদগাহ, বাম বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়, বাম নবকুমার উচ্চ বিদ্যালয়,বাম  হাইস্কুল,রাজনগর ,বাম প্রেমানান্দ এম ই স্কুল ; বাম  ইদগাহ – বনগ্রাম ও বাম  ইদগাহ -জয়ধনপুর ।এছাড়াও বামের নাম বিলুপ্তির হাথ থেকে রক্ষা  করতে  বামবাসীরা বিয়ে, জন্মদিন, শ্রাদ্ধ ও বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদির আমন্ত্রণপত্রে গ্রামের নামের সাথেবামশব্দটি যোগ করতে পারেন। যেমন ‘বাম’ ভাগাবাজার , ‘বাম’রাজঘাট  ইতিমধ্যেই  কাছাড়ের মূল ভূখণ্ডের মানুষের  কাছে ধলাই বাজার  বাম’ ধলাই নামে পরিচিত হয়ে আছে।

 তৎসঙ্গে বামের অধিবাসীগণকেবাম উৎসববা এই ধরণের আরও অন্যান্য কর্ম্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই নামকে সমুন্নত রাখতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে অতি সম্প্ৰতি ২০৩৭ জনসংখ্যার ছোট জনপদ শেওড়ারতল যা ৭৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তারিত   তার অধিবাসীরা যেরকমভাবে উৎসাহ উদ্দিপনার সাথে গ্রামটির প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীর শুভেচ্ছা বাৰ্ত্তা সমন্বিতস্মৃতিগ্রন্থ (স্যুভিনির)” প্রকাশ করেছে তা থেকে দৃষ্টান্ত গ্রহণ করা যায়।

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে  বামের ঐতিহ্য ও পরিচয় তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  বামবাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গৌরবময় ‘বাম’ নামটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব ।    

    কিন্তু ভৌগোলিক অঞ্চল হিসাবে বাম নামটি তলিয়ে গেলেও একটি বিষয় নিশ্চিত যে  সংযোগবিহীন দূরবর্তী অনুন্নত অঞ্চল বুঝাতে    কাছাড়ের মূল ভূখণ্ডের মানুষের শব্দভাণ্ডারে ‘বাম-বাউরি’ বাগধারাটি  টিকে থাকবে।

 উপসংহারবামের আংশিক ইতিহাস রূপে লিখিত এই নিবন্ধটি লেখকের গবেষণা ও ব্যক্তিগত জ্ঞান অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ। বামের অনেক অধিবাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বই পুস্তকে বামের প্রাথমিক আলোচনার আলোকে লিখা হয়েছে ।আশা করা যায় যে নিবন্ধটি উত্তর পূর্ব ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (শিলচর) গবেষকদেরকে বামের সাথে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস, ভূগোল, বন্যপ্রাণী, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য আন্ত-বিষয়ক গবেষণার কাজে হাত দিতে উদ্দীপ্ত করবে। হয়তো বা কেউ কোনদিন বামের সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

 

 

গ্রন্থপঞ্জিঃ

১। কাছাড়ের ইতিবৃত্তউপেন্দ্ৰ চন্দ্ৰ গুহ

২। Indigenous Muslims of Assam with Focus on Barak Valley —Ali Haidar Laskar 

৩।Antiquities of Cachar-Raj Mohan Nath

৪।Cachar District Gazetteers -B.C.Allen

৫।Statistical Hand Book of Assam – Hunter

৬।বামের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব -সাবির আহমদ চেৌধুরী

৭।তথ্যভিত্তিক বামের মসজিদ সমুহ- সাবির আহমদ চেৌধুরী

        

লেখক পরিচিতিঃ

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী- কাছাড়ের বাম রাজঘাটের বাসিন্দা। বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল, বাম নিত্যানন্দ হাইস্কুল এবং সোনাই নিত্যগোপাল হাইস্কুলে তার স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন ।জিসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সহ স্নাতক, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং  গৌহাটী  ইউনিভার্সিটি  ল কলেজে এলএলবি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কোঅপারেটিভ ম্যানেজমেন্ট,পুনে থেকে কোঅপারেটিভ বিজনেস ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা নিয়ে, আসাম সরকারের সমবায় বিভাগে কর্মজীবন অতিবাহিত করে ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণ ।অবসর গ্রহণের পর সামাজিক কাজে নিয়োজিত 

Thursday, 25 June 2026

34.বর্তমান বাম-এর অর্থনীতি -এক নতুন দিশাঃ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 কৃষিকাজ এখন আর বামবাসীর প্রধান জীবিকা নয় এটি একটি লাভজনক অর্থনৈতিক কার্যক্রম হিসাবেও আর বিবেচিত হয় না এর প্রধান কারণ কৃষিকর্মীর অভাব এবং বিকল্প আয়ের সুযোগের প্রসার বেশিরভাগ পরিবারই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত চাল পায় তাই মানুষ কৃষি কার্যক্রম ছেড়ে দিয়েছে । বেশীর ভাগ জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। নতুন প্রজন্ম কৃষিকাজের কষ্ট স্বীকার করতে আগ্রহী নয় এবং অধিকাংশই নতুন ব্যবসায়িক পেশাগত ক্ষেত্রগুলোর প্রতি আকৃষ্ট  এবং তারা কৃষিকাজ সম্পর্কে অজ্ঞ এটি একটি অশুভ সংকেত যদি কখনও সরকার বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত চাল দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে মানুষ আবার কৃষি শুরু করতে পারবে না

বামে পরিসেবা ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, কেনাকাটা-বেচাকেনা, শিক্ষকতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, কৃষিকাজের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে একইসাথে, বামবাসীরা  মিস্ত্রি,  বিদ্যুৎকর্মী,  নলকূপ পাইপ ফিটার,  রঙের কাজ,  আসবাবপত্র নির্মাণ,   কম্পুটার এবং  ডেস্কটপ পাবলিশিং,  ব্লগিং,  গাড়ি ধোয়া,  বৃক্ষ নার্সারি,  আগর গাছের চাষ, মৎস্যচাষ, মুরগি পালন,ডায়াগনস্টিক সেন্টার,সরকারি ও বেসরকারি খন্ডে চাকুরি, মোটর মেকানিক , পর্যটন শিল্প ,এবং হোটেল রেস্তোরাঁর মতো আধুনিক পেশার দিকে ঝুঁকছে 

বাম-এর ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে বাম কাছাড় এবং মিজোরামের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থলের  ভূমিকা পালন করে এর ফলে মিজোরাম এবং তার বাইরের বাজারগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হয়েছে 

.বাম হল মিজোরামের বনজ সম্পদ, উদ্যানফল এবং কৃষিজাত পণ্যের বিক্রয়ের প্রবেশদ্বার, যেমন রেমা, মরিচ, সুপারি, গন্ধী, কাঠ, বাঁশের বাঁশি, আদা, হলুদ এবং অন্যান্য পণ্য বামের ভাগবাজার এবং ধলাইবাজার মিজোরামের জন্য নির্মাণ সামগ্রী, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং অন্যান্য ভোক্তা সামগ্রীর বাজার হিসেবেও পরিচিত

ভারত সরকার প্রায় ২০/২৫ বছর  ধরেলুক ইস্টনীতি এবং ২০১৪ সালে এনডিএ সরকারেরঅ্যাক্ট ইস্টনীতি নিয়ে কাজ করছে কিন্তু বামবাসীরা অনেক আগেই মিজোরামের দক্ষিণের সীমানা সংলগ্ন দেশগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সুযোগের বিষয়ে সচেতন হয়েছিলেন সড়ক যোগাযোগের উন্নতি, যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং পরিবহন খাতের বিকাশ বামবাসীর সামনে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে 

ফলস্বরূপ, বাম-এর অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে পুরনো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এখন ইতিহাসের অংশ তবে ইট প্রস্তুত শিল্প ছাড়া উৎপাদন ক্ষেত্রের প্রসার তেমন লক্ষণীয় নয় যদিও মিজোরামের বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য এই শিল্প গড়ে উঠেছে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যবান কৃষিজমি ধ্বংস এবং পরিবেশ দূষণ এই শিল্পের প্রধান সমস্যা  বর্তমান প্রজন্মের নতুন পেশাগত উদ্যোগ এবং পরিসেবার মাধ্যমে বামবাসীরা শুধু তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছেন না, বরং অঞ্চলের অর্থনীতিতেও নতুন শক্তি গতিশীলতা যোগ করছেন তবে পরিবেশ সংরক্ষণ , দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা এখন বাম-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ   প্রত্যাহ্বান । .এই ক্ষেত্রে বামের  অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং এনজিও কাজ করছে।