কাহিনীই বলা যায়। এ স্কুলের জীবন কথা নানা কাহিনীতে ভরা। তবে সাত কাহন নয়। অনেকটা রূপকথার মতই সে কাহিনী সততই সূখকর।
অর্ধশতাব্দীরও আগের কথা। বিগত শতাব্দীর সাতান্ন সালের মাঝামাঝি । আসাম সরকারের সমবায় বিভাগের চাকরি।
বদলি হয়েএসেছি শিলচরে। দেখতে এসেছি ভাগাবাজারে, সমবায় বেংক আর গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা সমবায় সমিতি । বেশির ভাগই উপজাতি এলাকায়। কাজ ফেলেই ঘুরে বেড়াতাম পাহাড়ী জনপদের পায়ে হাঁটা পথে পথে । মন ভরে গেল। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে জনসেবার যুবকসুলভ যে আদর্শ মনে মনে লালন করতাম, বুঝলাম এই স্থানই তার সার্থক রূপায়নের উর্বর ভূমি। সহচর ইলিয়াস আলি মাষ্টারকে একদিন মনের কথা খোলেই বললাম। আকাংখিত ধন পাওয়ার খুশিতে তিনি আমায় নিয়ে গেলেন ভাগাবাজার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে। সেখানে এক চালাঘরে বসেছিলেন শিক্ষক হরভজন নমশূদ্র, চার-পাঁচ জন ছাত্র ও একজন ছাত্রী নিয়ে। ভাগাবাজার হাইস্কুল তথা বাম বিদ্যাপীঠ কাহিনীর সূচনা ওই দিনেই। সে ছিল নভেম্বরের প্রথম দিক, ১৯৫৮ ইংরেজি।ছেড়ে দিলাম চাকরি, লেগে গেলাম কাজে। চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুকভরা সাহস নিয়ে।
স্কুল খোলার অনুমতি চেয়ে দরখাস্থ গেল। প্রধান শিক্ষক আমি, সহকারি শিক্ষক হরভজন নমশূদ্র, ফার্সি শিক্ষক হাফেজ আব্দুস সালাম। সংস্কৃত ভাষাটা দেখবেন হরভজন বাবু নিজেই। তিনি ছিলেন Matric
Normal, সরল মনের আদর্শবান যুবক। দক্ষিন আসামের স্কুল পরিদর্শক তখন জনাব নুরুল ইসলাম সাহেব। কটন কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক। সৌভাগ্যবশত তিনি আমায় চিন্তে পারলেন, প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে। দিন কয়েক পরে আটান্ন সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এক পড়ন্ত বেলায় তিনি একদিন নিজেই আসলেন ভাগাবাজারে স্কুল কমিটির সম্পাদক হাজি মসাহিদ আলি চৌধুরী সাহেবের বর্হিবাড়িতে।বসে প্রয়োজনীয় জন সংযোগ করলেন এবং জনসমক্ষেই মৌখিক অনুমতি দিয়ে গেলেন। অনুমতি পত্র আসল পরের মাসে
Permission for opening of classes VII
& VIII w.e.f. 1st March 1958.
এখানে একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়। নূরুল ইসলাম সাহেব না হলে স্কুল খোলার সরকারি অনুমতি পাওয়া কঠিন হত। কারণ আমাদের আগেই নিকটবর্তী হাওয়াইথাং বাজারে একটা হাইস্কুল খোলাছিল।পরে যখন বিভাগীয় স্বীকৃতির
(Departmental Recognition) প্রশ্ন আসল তখন লাগল রশি টানাটানি। স্কুল পরিদর্শক তখন জনাব সাহাবুদ্দিন সাহেব।সহকারি পরিদর্শক রামকুমার দাস। রামকুমারবাবু একটা Educational
Servey report দেখিয়ে বললেন হাইস্কুল হাওয়াইথাং-এ হতে পারে, ভাগায় নহে। কারণ আসাম সরকারের ঐ রিপোর্টে
স্কুলের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা আছে হাওয়াইথাং। ভাগাবাজারের নাম নেই।স্কুল পরিদর্শক সাহাবুদ্দিন সাহেব তখন রিপোর্টখানা হাতে নিয়ে তাতে লিখে ছিলেন Under
Changed Circumstances High School should be located in between Bhagabazar &
Howaithang. মন্তব্যের তলায় নিজের সহি দিয়ে বড়বাবুকে বললেন- নেন, লিখে দিল সাহাবুদ্দিন । আর আমাকে বললেন, বাবা, তোমার স্কুল ঘরটা একটু হাওয়াইথাং-এর দিকে এগিয়ে নিয়ে স্থাপন কর।
স্থান নির্বাচন করা হলো
বনগ্রাম গোচরা ভূমি, বর্তমান অবস্থানে।আর তখনই প্রকাশ পেল স্কুল নিয়ে স্থানীয় মানুষের ঐকান্তিক আগ্রহ, অকৃত্রিম ভালবাসা আর উদ্যোগ। কোন আপত্তি না করে সকলেই দানপত্রে সহি করে দিল। নির্দিষ্ট পথ ধরে বছরের মাথায় এসে গেল স্বয়ং রাজ্যপালের অনুমতি - Six
bighas of land alloted to Bhagabazar High School from Bongram V.G.R. আর যায় কোথায়, বন কেটে বসত হলো
। টুনটুনি আর শিয়ালের আবাস ভূমি, যেখানে ভূতের ভয়ে দিনের বেলাতেই লোক যেত না সেখানে তৈরি হলো
স্কুল ঘর। একশ দশ ফুট লম্বা বাঁশ ও ছনের কাঁচা ঘর। সে ১৯৫৯ ইংরেজির শুরুতে। স্কুল পরিদর্শনে আসলেন, সহকারি পরিদর্শক গুপ্তবাবু। যোগ্যতার বলেই বিভাগীয় স্বীকৃতি অচিরেই এসে গেল। আর পেছন ফিরে তাকাতে হলো
না।৫৯ এ খোলা হলো
নবম ও ৬০ ইংরেজিতে দশম শ্রেণি । প্রথম একবছর প্রাইভেট হিসেবে পরীক্ষায় বসলো
ছাত্ররা। ১৯৬২ থেকে নিয়মিত অর্থাৎ Regular সরকারি সাহায্য পেতেও আমাদের বেশি অপেক্ষা করতে হয় নি। ১৯৬৪ ইংরেজি অর্থাৎ ১৬/১/৬৪ থেকে Deficit
grant আর সেই সুবাদে প্রথম সুযোগে
অর্থাৎ ১/১০/৭৭ ইংরেজিতে প্রাদেশিক মর্যাদা। শুনতে মনে হবে - নিজ হাতে ধরা অনায়াস লব্ধ মধুভাণ্ড থেকে অকাতরে শুধুই পান করা । কিন্তু না। এই প্রাপ্তিরপেছনে অবশ্যই ছিল নিরলস প্রচেষ্টা, আর এই প্রচেষ্টার পেছনে শক্তির উৎস ছিল জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং অকৃত্রিম ভালবাসা, আঞ্চলিক সম্মানের সঙ্গে জড়িত স্কুলটিকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় সংকল্প।
বিদ্যালয়ের কথা ও কাহিনী এখানেই শেষ নয়। আমাদের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল মানুষ ও বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সদ্ভাব গড়ে তোলা। কারণ স্বাধীনতার প্রথম দশকে দেশভাগ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাম অঞ্চলের জনমন ছিল বিধ্বস্থ । সে কাজ ছিল বড়ই কঠিন আর সংবেদনশীল। সৌভাগ্যবশত স্কুলের জন্মলগ্ন থেকেই যে শিক্ষক সম্প্রদায় আমরা পেয়েছিলাম তাদের নির্মল চরিত্র, ঐকান্তিক ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এই কঠিন কাজকেও সহজেই ফলপ্রসূ করেছিল।স্কুল প্রাঙ্গনে তারা সকলেই মিলেমিশে থাকতেন।অবসর সময়ে দল বেধে জনসংযোগ করতেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জনাব মুজাম্মিল আলি লস্কর, শ্রী নীরেশ দাস, গিরিন্দ্র কুমার মল্লিক, কুতুব আহমদ এবং আরও অনেক। তাঁদের প্রেরণায় যে দুর্লভ কস্মপলিটান ভাবধারা জন্ম নিয়েছিল তাহা আজও বিদ্যমান। শতাব্দীর মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে এই বিদ্যালয়ের প্রাপ্তির একটা মূল্যায়ন আমরা অবশ্যই করব। সেটা হবে স্থূলভাবে কতজন পাশ করল, কতজন দেশ ও সমাজে প্রতিষ্ঠা পেল। কিন্তু আজকের এই হিংসায় উন্নত
উন্মত্ত
পৃথিবীতে পারস্পরিক সহনশীলতায় যে আদর্শ ও শিক্ষা এই স্কুলে জন্ম নিয়েছিল এবং যাহা আজও ফল্গু
ধারার মত এই অঞ্চলের সমাজ দেহে সঞ্জিবিত হয়ে আছে তাহাই আসল শিক্ষা, আসল মহতী লাভ। এই ভাবধারা অক্ষয় থাকুক, আমরা এই কামনা করব।
তবে এত সার্থকতার মাঝে ও একটা না পাওয়ার বেদনা সকলের মনকেই ব্যথিত করে, যে বামবিদ্যাপীঠ কেন উচ্চতর বিদ্যালয়ে উন্নিত হল না। সে কাহিনী বড়ই লজ্জার।পরিপূর্ণ যেগ্যতা ও বিভাগীয় অনুমোদন থাকা সত্বেও কোনও কোনও সরকারি আমলা আর মন্ত্রীদের একপেসে ইচ্ছার ফলে আমরা বঞ্চিত হয়ে ছিলাম। কিন্তু বামবিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের শিক্ষা ও প্রেরণার বলে বলীয়ান ভাগাবাজারের জনসাধারণ এই বঞ্চনায় দমে থাকেনি। আপন অধিকার রক্ষা করেছে একটি কলেজও প্রতিষ্ঠা করে, যে কলেজের পরিচালকও অধ্যাপক বৃন্দ বাম বিদ্যাপীঠের সন্তান। তাইদেখছি বাম বিদ্যাপিঠের সার্থকতা শুধু শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেই আবদ্ধ থাকেনি এলাকায় উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞে ও আপনার স্থান করে নিয়েছে I
………………………………………………………………
লেখক পরিচিতিঃ-
মহীউদ্দিন
আহমদ বাম
বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন।এই
নিবন্ধটি বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী স্মরণিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল ।