Saturday, 6 June 2026

14.বামে জনবসতির ধারা-4:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


বামে যথেষ্ট  সংখ্যক বর্মন  ডিমাছা জনসংখ্যা রয়েছে ডিমাসা বর্মনরা মূলত দক্ষিণ বামের গভীর পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত গ্রামগুলিতে যেমন কালারহাওর, ধলাখাল, তুগ্রামে  বাস করেন। দক্ষিণ বামের বর্মন ডিমাসারা বামের অভ্যন্তরীণ অভিবাসী। শেওড়ারতলের বর্মন ডিমাসাদের প্রথম বসতি স্থাপনকারীরা ১৯১৬ সালে বামের ধলাইবাজারের কাছে দেবীপুর গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তারা একটি রাজস্ব গ্রাম থেকে এসে শেওড়ারতল ফরেস্ট ভিলেজে বসতি স্থাপন করেছিল। পরে  অনেকেই সদাগ্রাম এবং ধলাইবাজারের নিকটবর্তী অন্যান্য গ্রাম থেকে শেওড়ারতলে ও দক্ষিণ বামের অন্যান্য গ্রামে এসেছিল। পূর্বে বর্মণ ডিমাসারা বেশিরভাগই বড়খলা,ডলু,বিজয়পুর,গড়ের ভিতর খাসপুর,ঠালিগ্রাম ,বাগের কোণা থেকে দেবীপুর, সদাগ্রাম এবং ধলাইবাজারের নিকটবর্তী অন্যান্য গ্রামে আসতেন।

 

বামে যথেষ্ট হিন্দিভাষী জনসংখ্যা রয়েছেন যারা স্থানীয়ভাবে হিন্দুস্তানি জনগোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত। তারা প্রধানত ভাগাবাজারের কাছে টিলানগর, সরসপুর, রাজগোবিন্দপুর এবং বিষ্ণুপুরে বাস করে। প্রায় তিনশ পরিবার রয়েছে।ধলাই বাজার সংলগ্ন  ধলাই বস্তিতেও অনেক হিন্দুস্তানী পরিবার রয়েছে।বামের জন বসতির  প্রাথমিক পর্যায়ে তারা বামে এসেছিলেন। তারা কৃষিকাজ ও দুধ উৎপাদনের মতো পারিবারিক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তখনকার দিনে পরিবহন  ও মালামাল  বহনের জন্য কোনো রাস্তা বা যানবাহন ছিল না। হিন্দুস্তানি সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য গরু গাড়ি চালাতেন যা বামের প্রথম দিকে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল। যদিও তারা কৃষিকাজ এবং দুগ্ধ উৎপাদন পেশাকে  ধরে রেখেছে, তারা এখন অন্য ব্যবসায়ও নিয়োজিত আছেন। তারা শিক্ষাগতভাবে অনেক উন্নত। বর্তমান হিন্দুস্তানী সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষরা পূর্বে বিহার এবং  উত্তরপ্রদেশের  জেলাগুলি থেকে বামে চলে এসেছিলেন।মিজোরা এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা ।রিয়াংরা হয়ত চট্টগ্রাম থেকে মিজোরাম হয়ে কোন এক সময় এসেছিলেন ।. প্রায়শই কুকিদের আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য, ব্রিটিশরা মণিপুর থেকে মণিপুরীদের দক্ষিণ কাছাড়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু জনবসতির প্রাথমিক অবস্থায় এলাকাটি ছিল দুর্গম। পায়ে হাঁটা রাস্তায় এলাকায় যাওয়া আসা করতে হত। ক্রমে লোকেল বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় পায়ে হাঁটা ছোট সড়কপথ তৈরি করা হয়েছিল। এই সড়কপথে শিলচর সদর শহর থেকে ক্রমে গরুর গাড়ী, ঠেলাগাড়ী চলাচল শুরু হয়েছিল।

স্মরণ করা যেতে পারে যে ১৯০৫ ইংরেজী পর্যন্ত কাছাড়ে মাত্র দু'টি বড় সড়কপথ ছিল। এই দুই সড়কপথের একটি বদরপুর-শিলচর হয়ে বাঁশকান্দি-লক্ষীপুর-জিরিঘাট হয়ে মণিপুরের সঙ্গে যোগাযোগ পথ ।অপরটি ছিল শিলচর থেকে চাতলা হাওর-সমারিকোনা-হাইলাকান্দি রোড। বাকি রাস্তাগুলি লোকেল বোর্ডদ্বারা নির্মিত গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা ছিল।

 

Friday, 5 June 2026

13.বামে জনবসতির ধারা-3:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


 এলাকার উর্বর জমি আর বন সম্পদের  অর্থকরী  উৎপাদন গৃহস্থকুলকে আকৃষ্ট করতে থাকে। ফলে সরকারের আওতাধীন অজরিপীকৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চালেও   জনবসতি শুরু হয়ে যায়। এতে একের পর এক ফরেষ্ট ভিলেজ গড়ে উঠতে থাকে। স্থাপিত হয় ৩৫ টি গ্রাম -যাকে বলা হয় ফরেস্ট  ভিলেজ ৩৩.২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা  জুডে এই গ্রামগুলি রয়েছে। গড়ে একটি   ফরেস্ট  ভিলেজের আয়তন প্রায় এক বর্গ কিলমিটার।

এভাবে এক সময়ের রাজপাট সমৃদ্ধ গৌরবোজ্জ্বল বাম এলাকা রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে জনমানবহীন বনাঞ্চলে ঢেকে গিয়ে বিস্মৃতির আড়ালে তলিয়ে গেলেও ব্রিটিশ শাসনামলে নতুন জনবসতি প্রদান প্রকল্প চালু হওয়ার ফলে বাম অঞ্চল আবার নতুনভাবে জনমুখর হয়ে উঠেছিল।

 

বিভিন্ন জাতি, জনজাতি, উপজাতি মানুষের বসবাস নিয়ে বাম অঞ্চল সর্বজাতি, সর্ব সম্প্রদায় অধ্যুষিত বৈচিত্রে ভরা এক অঞ্চল হিসাবে আবির্ভূত হয়। অঞ্চলের জনবসতির সূত্র সম্পর্কে ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনায় এই ইংগিত পাওয়া গেছে যে বাম মূলত এক ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রাচীন জনপদ; নবীন জনবসতির নতুন ধারায় এক নতুন বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলেছে।

বৈশিষ্ট্য রচনার এই নতুন ধারায় যারা মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে  বাঙ্গালী মুসলমান  ও বাঙ্গালী হিন্দু জনবসতির ধারাটিই প্রধান বলে প্রতীয়মান হয়

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানেরা এক ধর্মীয় সম্প্রদায় হলেও ভাষা-সংস্কৃতির বিচারে এদের মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালী মুসলমান, মণিপুরী ভাষাভাষী পাঙ্গাল বা মণিপুরী মুসলমান, মাইমাল মুসলমান   ধরণের সাংস্কৃতিক ব্যবধান রয়েছেহাইলাকান্দি থেকে পূব দিকে ধোয়ারবন্দ হয়ে রেংটি পাহাড় পাড়ি দিয়ে পূব দিকে এগোলে হাঁটা পথে বামের দূরত্ব মাত্র ৩০-৩৫ কিঃমিঃ। এক সময়ে হাঁটাপথে ৩০-৩৫ কিঃমিঃ বিশেষ দূরত্বের মধ্যে গণ্য হত না। ছিল স্বাভাবিক প্রতিবেশী এলাকার সচরাচর দূরত্ব। দূরত্বে হাঁটাপথে মানুষ দিব্যি চলাফেরা করত, যোগাযোগ রেখে চলত।

বাঙালী মুসলমান ও বাঙ্গালী হিন্দুরা  প্রধানত বাম সংলগ্ন পশ্চিম দিকের হাইলাকান্দি মহকুমা (বর্তমান হাইলাকান্দি জেলা), কাছাড় করিমগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে।

পশ্চিম দিকের হাইলাকান্দির বিলপার-ধুমকর, ভিচিংচা, নারাইনপুর,মনাছড়া,বোয়ালিপার, আলগাপুর, বাহাদুরপুর, সৈদবন্দ, লালা,শাহবাদ ইত্যাদি গ্রামের উৎসাহী উদ্যমী-সাহসী কৃষক গৃহস্থরা জনমানবহীন বনাঞ্চলের বনজঙ্গল কেটে সাফ করে জনবসতিপূর্ণ গ্রাম স্থাপন করেছে।

এদেরই সূত্র ধরে উত্তরাঞ্চলের শিলচর শহর সংলগ্ন  ,ভাগাডর,বাগপুর, নিয়াইরগ্রাম, ধনেহরি, কৃষ্ণপুর, কনকপুর,উত্তর কৃষ্ণপুর ,শ্রীপুর,মেহেরপুর, বেরেঙ্গা, মধুরবন্দ, টিকরবস্তি, রামনগর, উধারবন্দ এবং বুড়িবাইল  আর করিমগঞ্জের ভাঙ্গা ,বুন্দাশীল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন গ্রামের অনেক দুঃসাহসী কৃষক পরিবার আন্যান্য বৃত্তিধারী মানুষ নতুন জায়গায় গিয়ে বনজঙ্গল সাফ করে ঘরবাড়ি তৈরি করে ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে নতুন নতুন গ্রাম গড়ে তুলেছিল। । কিছু বাঙালি হিন্দু, ব্যবসায়ী তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের সিলেট ব্রাহ্মণবাড়িয়া,বানিয়াচং এবং বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বামের পুনর্বসতির প্রথম পর্যায়ে বাম অঞ্চলে এসেছেন। ঠিক একইভাবে ঢাকা থেকে কিছু মুসলমান ব্যবসায়ী ভাগাবাজারে ব্যবসা স্থাপন করেছিলেন। কিন্থু ১৯৫০ দশকের প্রথম দিকে তাঁরা বাম ছেড়ে চলে যান ।

    অবশ্য এখানে একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে যে হাইলাকান্দি শহর এবং শিলচর শহর সংলগ্ন গ্রামগুলো থেকে গৃহস্থ পরিবারের লোকেরা ব্যাপক হারে বামের জনবসতি বিরল জংলি এলাকায় কেন বসতি বদল করেছিল। এর একাধিক কারণ ছিল।

প্রথমত ছিল উপত্যকায় ঘনঘন প্রলয়ংক রী বন্যার করাল গ্রাসে কৃষকের খেত-কৃষির বিপুল ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আশা ৷বাম অঞ্চলের উচু ভূমি বন্যার  প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্ত ছিল।এরপর ছিল নতুন ভূমি বন্দোবস্ত বিষয়ে সরকারের সহজ লভ্যনীতিযার দরুণ ক্ষুদ্র চাষি, প্রান্তিক চাষি পরিবারগুলো অধিক পরিমাণে ভূমি পাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে এলাকায় বসতি করেছে।

শহর, শহরতলি কিংবা শহরের পাশের জমির দামের তুলনায় বাম এলাকার জমির মূল্য তুলনামূলকভাবে কম থাকার জন্য পুরাতন বসতবাড়ি বিক্রি করে সে বিক্রয় মূল্যে বেশি জমি পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকে পরবর্তী সময়কালে বামে জমি খরিদ করে সে অঞ্চলের বাসিন্দা হয়েছে। দিন দিন জনসংখ্যা বেড়েছে।