স্কুল ছুটির পর পথের ধারে কাদা-জলে লুটো-পুটো হয়ে জাম্বুরা বা মাতুয়া (বাতাবি লেবু) দিয়ে ফুটবল খেলা, বাড়িতে এসে খাতা-বই রেখেই কাদামাখা শরীরে নদীর পাড়ের সবরী (পেয়ারা) গাছে ওঠে লাফ দিয়ে জলে পড়া, জলে ডুব দিয়ে শ্বাস বন্ধ করে চুপচাপ জলের নিচে বসে নদীর স্রোতে যতদূর সম্ভব ভেসে যাওয়া, আবার পূর্বস্থানে ফিরে এসে এর পুনরাবৃত্তি করা, - এই সহজ-সরল, কোন আর্থিক সংস্পর্শহীন খেলার আনন্দ টেনিস, ক্রিকেট বা বেডমিন্টনে পাওয়া কি সম্ভব?
ধান কেটে নেবার পর, বাম অঞ্চলের খোলা, প্রশস্ত মাঠে যে খেলাটি প্রায় সর্বত্র দেখা যেত, ছেলেদের মধ্যে সম্ভবত সর্বাধিক জনপ্রিয় সেই খেলাটি হলো 'গুলি-ডাণ্ডা' । বাম অঞ্চলের সবার নিকট 'টাঙ্গল-বেঙ্গী' নামেই খেলাটি অধিক পরিচিত। খোলা মাঠ ছাড়া এটি খেলা সম্ভব নয়। তবে মজার ব্যাপার, যতজন ইচ্ছে খেলোয়াড় এতে অংশ নিতে পারে, - কোন নির্দিষ্ট সংখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। গাছের ডালের ৪/৫ ইঞ্চি লম্বা গুলি (বেঙ্গী) আর বাঁশের গোড়ার দিকের মজবুত লাঠির মতো প্রায় দেড়ফুট লম্বা ডাণ্ডা (টাঙ্গল) হলেই খেলা শুরু করা যায়। এ যেন অনেকটা ক্রিকেট খেলার মতো, - দু'জন ব্যাট্সম্যানকে (এখানে একজন ডাণ্ডাধারী) ঘিরে বাকি সব ফিল্ডারদের গুলিকে 'ক্যাচ' করে বা রান আউটের মতো 'থ্রো টু স্টাম্প'-এর মাধ্যমে 'আউট' করার প্রচেষ্টা।
আরেকটি গ্রাম্য খেলা হয়তো বর্তমানে একেবারেই হারিয়ে গেছে, - সেটি হলো তাস খেলা। তবে এই তাসগুলো বানানো হতো ফেলে দেওয়া সিগারেটের বাক্সের চেপটা অংশের দু'দিক কেটে নিয়ে। বিভিন্ন ব্রাণ্ডের সিগারেটের বাক্স থেকে তৈরি সেই তাসগুলোর মানও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কোন একটি ব্রাণ্ডের তাসের মান হয়তো ১০, কোনটির ২০, কোনটির ১০০ আবার কোন একটির মান হয়তো ১০০০ । তাই ১০০ মানের দশটি তাসের বিনিময়ে যেমন ১০০০ মানের একটি মাত্র তাস পাওয়া যেত, তেমনি ২০ মানের ৫টি তাসের বিনিময় মান ছিল ১০০ মানের ১টি তাসের সমান। এভাবে এক এক ব্রাণ্ডের তাসের মূল্যমান এক এক রকম নির্ধারিত ছিল। মাটির ভাঙা বাসনের টুকরো দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়ের সে রকমই একটি চাকতির ওপর ছুড়ে সেটিকে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হতো সেই খেলায়।
কানামাছি, খো-খো, কুত কুত (লেং ধাপ্পা), দাইড় (মাটির আল দিয়ে বা কখনো দাগ দিয়ে চারটি চতুষ্কোণ ঘর বানিয়ে একটি থেকে অন্যটিতে যাওয়ার খেলা) ইত্যাদি মূলত মেয়েদের খেলা হলেও ছোট ছেলেদের অংশগ্রহণে কারো আপত্তি থাকতো না। কচু খেলায় শুধুমাত্র দু'জন প্রতিযোগীই অংশ নিতে পারতো। মাটিতে ছক কেটে ছোট কচুগাছের ডাঁটাকে ছোট ছোট টুকরো করে ছকে বসিয়ে মেয়েরা এই খেলাটি খেলতো। বর্তমানের অনেক শিশুর মধ্যে জনপ্রিয় 'চাইনিজ-চেকার' যেন সেই খেলারই আধুনিক সংস্করণ। ছেলেরা সাধারণত লাটম (লাটিম), হাডু-ডু-ডু (কবাডি), গুলি-ডাণ্ডা, মার্বেল, তাস ইত্যাদি খেলা নিয়েই মজে থাকতো।
……………………………………………………………………………..