Thursday, 4 June 2026

12. বামে জনবসতির ধারা-2:জিয়াউদ্দিন উধুরী

 


  উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের  দ্বারা প্রবর্তিত ইনার লাইন রেগুলেশনপদ্ধতি চালু করার দরুন বাম এলাকা ছিল সংরক্ষিত অঞ্চল। এই ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘইনার লাইনহাইলাকান্দির রণটিলা থেকে রামপ্রসাদপুরের মধ্য দিয়ে কাছাড় মণিপুর সীমান্তের বরাক তীরের ময়নাডর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল ।  ইনার লাইন’ এর দক্ষিন  অঞ্চলে প্রবেশ করতে হলে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হত। নতুন ভূমি বণ্টন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর এই অনুমতি গ্রহণ পদ্ধতি শিথিল করা হয়। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে আগ্রহী কৃষক গৃহস্থকুল বামে গিয়ে বসতি শুরু করে

বামে জমি বরাদ্দের জন্য ব্রিটিশ শাসন কিছু মৌলিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল, যার মূল নিয়ম ছিল যে একটি পরিবারকে যতটা জমি একটি হাল দিয়ে চাষ করা সম্ভব ততটা জমি দেওয়া হবে । হিসাব করা হয়েছিল যে একটি লাঙ্গল ও  ১ জোড়া গরুর  (যাকে "হাল" বলা হয়) সাহায্যে একজন কৃষক ১৪ বিঘা জমি চাষ করতে পারে, যা "এক হাল জমি" নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অভিবাসী কৃষকদের পরিবার প্রতি  এক হাল বা ১৪ বিঘা জমি বসতি স্থাপনের জন্য বরাদ্দ করা হতো।তারা  জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করতো ।

 

জমি পরিষ্কার করা, চাষ করা এবং সেখানে বসবাস করা বরাদ্দপ্রাপ্ত কৃষকের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এরপরে নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশ রাজস্ব কর্মকর্তারা পরিদর্শন করতেন । কৃষক জমিতে উপস্থিত থাকলে জমি বরাদ্দ নিশ্চিত করা হতো, আর অনুপস্থিত থাকলে বরাদ্দ বাতিল করা হতো।

 

অনুপস্থিতির কারণে অনেক কৃষক তাদের জমি হারিয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতি থেকেই বামে স্থানীয় প্রবাদ “আ্‌ঘিতে(হাঘিতে)  বাম যায়” এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো "বামে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে  গেলে জমি হারাতে হয়।"

 

এই প্রবাদটি একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে। এখানে এক কৃষক জমি পরিদর্শনের সময় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে জমি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রাজস্ব কর্মকর্তারা এসে তাকে জমিতে না পেয়ে তার বরাদ্দ বাতিল করে দেন। ফিরে এসে কৃষক বুঝতে পারেন যে তিনি তার জমি হারিয়েছেন এবং দুঃখ করে বলেন, "আ্‌ঘিতে বাম যায়।" সেই থেকে এই প্রবাদটি এমন পরিস্থিতির জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে আপনি সঠিক মুহূর্তে উপস্থিত না থাকলে মূল্যবান কিছু হারাতে পারেন।

জনবসতির এই পর্যায়ে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি রোগের আক্রমণ,বন্য-হিংস্র পশু আর বিষাক্ত পোকামাকড় সরীসৃপের প্রাণঘাতি আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নতুন বসতকারী জনমণ্ডলী বাম এলাকাকে আবার জনবসতিপূর্ণ এলাকারূপে গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। এর ফলে এলাকায় ৮০ টি নতুন গ্রাম গড়ে উঠে।  কলেরা এবং গুটিবসন্ত বামে বনফারার সময় মহামারী আকার ধারণ করত এবং বিশাল জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন করে দিত। মানুষ রোগের কারণ বা চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুই জানত না  তারা একে মড়কের অপভ্রংশ রূপমরকিবলে অভিহিত করতেন। এটি কখনও কখনও পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিত।  ১৯১৮ সালের শুরুর দিকে ধলাই আব্দুল মজিদ ডিস্পেন্সার‍ী  প্রতিষ্ঠিত হয়।  ডিস্পেন্সার‍ী থেকে  ম্যালেরিয়া ইনজেকশন এবং গুটিবসন্তের টিকা দেওয়া হত।  প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে মহামারী কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে ।জয়নগরের   আব্দুল মজিদ লস্করের ইস্টেইট থেকে  দানকৃত জমিতে ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সরকারী ডিসপেনসারিটি তার নামানুসারে নামকরণ করা হয় জয়নগরের এই আব্দুল মজিদ লস্কর ইস্টেইটের ধলাইবাজারে ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে এবং বর্তমানে ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি খাজনা সংগ্রহ করে থাকেন

Wednesday, 3 June 2026

11.বামে জনবসতির ধারা-1:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী


ত্রিপুরীদের রাজধানী বামের রাজঘাট থেকে কৈলাশহরে এবং সেখান থেকে আগরতলায় কবে সরে গিয়েছিল সে সঠিক সংবাদ আমাদের অজানা হলেও বাম থেকে ত্রিপুরীদের রাজধানী যে অন্যত্র সরে গিয়েছিল কথা সুধীমণ্ডলী স্বীকার করেছেন। রাজার রাজপাট সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর জনমুখর পরিবেশও নীরব হয়ে গিয়েছিল। রাজার  রাজন্য বর্গ, রক্ষী বাহিনী,  সজ্জনমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ অংশটি রাজার সঙ্গে নিশ্চয়ই চলে গিয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তার ভয়ে জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। জন্যই পরবর্তীকালে জনবসতির চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেছে।

জঙ্গল কেটে মানুষ বসতি শুরু করে। ফলে বনভূমিও লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। ঠিক উল্টোদিক থেকে দেখলে জনবসতি উঠে গেলে বসতি এলাকাও বনবাদাড়ে ঢেকে গিয়ে জনমানবহীন অরণ্য ভূমিতে পরিণত হতে পারে। বাম এর ব্যাপারে এই ঘটনাই ঘটেছিল। এক সময়ের জনমুখর এলাকা হয়ে গিয়েছিল জনমানবহীন গভীর বনাঞ্চল।  

ব্রিটিশেরা   কাছাড়ের শাসনভার হাতে নেওয়ার পর শুল্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নতুন জনবসতি স্থাপনের কাজে হাত দেয়। জনবসতি বিরল নতুন নতুন এলাকায় লোকবসতির বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কৃষক গৃহস্থদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া শুরু করে।

এতে এক সময়ের জনাকীর্ণ রাজ্যাংশ পরবর্তী সময়ে বনাঞ্চলে পরিণত হলেও ইংরেজ সরকারের নতুন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান শুরু করায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষিপাগল কৃষক গৃহস্থদের দল নতুন আবাদি উর্বর কৃষিযোগ্য ভূমির মালিকানা লাভের আশায় বিপুল সংখ্যক গ্রামবাসী বাম এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। তবে জনবসতি একই সঙ্গে এক দফায় নয় একভাবেও নয়

আনুমানিক ১৮৮৫ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার কৃষক গৃহস্থ পরিবারকে জমি বন্দোবস্ত দিতে শুরু করে। একর প্রতি ১৫ আনা খাজনা (রাজস্ব) নির্ধারিত করে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার এই প্রথায় ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০০০ একর জমি আগ্রহী গৃহস্থদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল। ১৯০৩ সালে ডেভিডসনাবাদ নামে এক নতুন পরগনার পত্তন করে জমি জরিপের কাজ নতুনভাবে আবার শুরু হয়েছিল। পরিবার প্রতি হাল  (১২ কেয়ার   বা   ১৪ বিঘা- ১ কেয়ার =১ বিঘা ৪কাটা ৪ ছটাক ) পতিত জমি পক্ষান্তরে বনভূমির খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়ে জনবসতি ব্যবস্থা শুরু করা হয়েছিল।

     এই সময়কালকে বলা হয় বনফারা - ইংরেজি শব্দ বনফায়ারের স্থানীয় উচ্চারণ যার অর্থ আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করা। বামের গভীর জঙ্গল ছিল গাছ গাছড়ায় ভরা ।জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য কোন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়নি।জমি বরাদ্দকৃতদেরকে কুঠার, দা এবং কোদাল এর মত সাধারণ হাতিয়ার ব্যবহার করে নিজেরাই জঙ্গল পরিষ্কার করতে হয়েছিল। এমনকি এই সাধারণ সরঞ্জামগুলি স্থানীয় কারিগরদের দ্বারা তৈরি করা হয়নি। এগুলো ঢাকা ও চাতক থেকে আগত কামাররা তৈরি করত। তাই আগুন জ্বালিয়ে বাকি থাকা গাছ-গাছালি কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করা সহজ ছিল।বনরাজ পরগনা,  লক্ষিপুর পরগনা এবং কাটলিছড়ার মতো অন্যান্য এলাকায় প্রায় বামের সঙ্গে নতুন বসতি গড়ে ওঠে। তারাও সেই সময়কে বনফারা কাল বলে থাকেন।

 

শ্রম বাঁচানোর পাশাপাশি বনফায়ারের বাড়তি সুবিধা ছিল। বামের গভীর জঙ্গল ছিল বাঘ, চিতাবাঘ, হায়েনা, চিতা, হাতির মতো হিংস্র বন্য প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। আগুন নিরস্ত্র নতুন বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হিংস্র প্রাণীদের দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এই বনফারা বা বনফায়ার বামের উদ্ভিদ প্রাণীজগতকেও  অনেকটা ধ্বংস করেছে।

………………………………………………………………………………………………………..