বামে
কীর্তন কেন্দ্রীক- সঙ্গীত চর্চাঃ
আজকের দিনে গ্রামাঞ্চলগুলো শহরাঞ্চলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, যাতায়াত ব্যবস্থা, শিল্প বানিজ্য, রাজনীতি কোনও কিছুতেই গ্রামগুলো আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। অবশ্য কিছু কিছু গ্রাম এখনও উন্নতির ছোঁয়া থেকে দূরে রয়েছে, তবে এগুলোর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন গ্রামগুলোর দিকে ফিরে তাকালে সমসাময়িক অন্যান্য গ্রামগুলোর তুলনায় বাম কাছাড়ের গ্রামগুলোর বৌদ্ধিক বিকাশ যে অনেকটাই উন্নত ছিল-তা গর্বের সঙ্গেই বলা যায়। এ অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্প চর্চার সঙ্গে সঙ্গীত চর্চাও ছিল খুবই উন্নত মানের। আর এই সঙ্গীত চর্চার প্রশস্ত ক্ষেত্র ছিল 'কীর্তন'।
বাম কাছাড়ে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস। তাই বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মতাদর্শকে কেন্দ্র করে, এমন কি বিভিন্ন পেশাকে অর্থাৎ জীবিকাকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে। তাই তো এখানে সুফীগান, গাজীর গানের সঙ্গে জারি-সারির চর্চাও অব্যাহত। এখানে মাঠে-ঘাটে, জলে-জঙ্গলে ঘটে প্রতিভার স্ফুরণ । মাঠে লাঙ্গল চালাতে চালাতে বা ভরা নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে এখানকার মানুষ উদাত্ত কণ্ঠে, অবলীলায় গাইতে পারেন বাউল-ভাটিয়ালি । সঙ্গীতের মাদকতায় মত্ত হয়ে যান তাঁরা । আবার কখনও নেশা আর পেশা একসাথে চলতে থাকে হাত ধরাধরি করে । তাই তো কীর্তনের আসরে শোনা যায়_
জগা বলে শোনরে মাধা ভাই ,
(আমরা) হরি নামের সারি গেয়ে, তরী বেয়ে যাই । রাধার নামে বাদাম দিয়ে, আনন্দ সাগরে ভেসে যাই ।
অপর দিকে 'তিন নাথের সেবা'র গান, চড়ক পূজার গান, মনসামঙ্গল, কৃষ্ণলীলা, বৈষ্ণব পদাবলির ব্যাপক চর্চা এখানে দৃষ্ট হয়। দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, দোল পূর্ণিমা, ঝুলনযাত্রা প্রভৃতি ছাড়াও কিছু সামাজিক অনুষ্ঠান, যেমন-- অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধাদিকে কেন্দ্র করেও এতদঞ্চলে সঙ্গীত চর্চা আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গ শিখরে পৌঁছে গেছে প্রেম-ভক্তির পথ অনুসারী বৈষ্ণব ভাবাদর্শের কীর্তন গুলো।
বাম কাছাড়ের সঙ্গীত চর্চা মূলতঃ কীর্তন কেন্দ্রীক। পাঁচ শতাধিক বৎসর পূর্বে যখন মানব সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতা, ব্যভিচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তখন মানব কল্যানের ধ্বজা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন পশ্চিম বঙ্গের নদিয়া জেলা নিবাসী এক জ্ঞান-তপস্বী , সমাজ-সংস্কারক "বিশ্বম্ভর মিশ্র"। অত্যুজ্বল ফর্সা গাত্রবর্ণের জন্য এই মানবতাবাদী মহাপুরুষ পরবর্তী কালে গৌরচন্দ্র বা গৌরাঙ্গ নামে সুপ্রসিদ্ধ হন। ধনী-দরিদ্র, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল, হিন্দু-মুসলমান প্রভৃতি ধর্ম-বর্ণ- নির্বিশেষে সবাইকে এক ছত্র ছায়ায় নিয়ে এসেছিলেন। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে, হিংসা-দ্বেষকে প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে বিতাড়িত করে, খোল-করতাল সহযোগে সমবেত গায়ন-বাদনের যে প্রচলন করেছিলেন- তা-ই সংকীর্তন (সম+কীর্তন)। আর এই সংকীর্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল আমাদের এই বাম কাছাড়ে। তাই তো এখানকার সঙ্গীত চর্চা হয়ে উঠে মূলত: কীর্তন কেন্দ্রীক।
গৌরচন্দ্র সমবেত কীর্তনের প্রবর্তন করেন,সেইজন্য তাঁকে 'কীর্তনের জনক' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নিদর্শন স্বরূপ সব কীর্তনের প্রারম্ভে গৌর চন্দ্রকে স্মরণ করে তাঁর আশীর্বাদ কামনা করার রীতিও প্রচলিত হয়ে গেছে। প্রসঙ্গতঃ বঙ্গসাহিত্যের বিকাশেও গৌরচন্দ্রের অপরিসীম প্রভাবকে স্বীকৃতি দিতে "ভূমিকা" শব্দটির বিকল্প হিসাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্থান দেওয়া হয়েছে "গৌরচন্দ্রিকা" শব্দটিকে, যার অর্থ সূচনা ।
গৌরভক্ত পদকর্তাদের ঐকান্তিক আগ্রহ আর প্রচেষ্টায় বাংলা কীর্তন এগিয়ে চলেছে গৌরচন্দ্রকে কেন্দ্র করে। গৌরচন্দ্রের উপস্থিতি, তাঁর কর্মধারা, তাঁর উদার মানসিকতা আর প্রেমময় ভাবমূর্তির বর্ণনা যেমন কীর্তনের অবয়বকে করেছে স্ফীত তেমনই কীর্তনকে করেছে আকর্ষনীয় এবং উপভোগ্য। কীর্তনীয়া তথা শ্রুতৃবর্গের স্মরণে, মননে, তথা অনুভবে গৌরচন্দ্রের ব্যাপক উপস্থিতির ফলে কীর্তনে সংযোজিত হয়েছে নানা তাল, ছন্দ, সুর। ক্রমে নিজস্ব ভৌগলিক গণ্ডী ছাড়িয়ে কীর্তন সর্বভারতীয় সঙ্গীতের অঙ্গনে পৌঁছে গেলেও বাম কাছাড়ের কীর্তন আজও হারায়নি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট। আজও এখানকার কীর্তন প্রবাহিত হয়ে চলেছে একই ধারায়, একই নিয়মে । এখানে কীর্তন গৌরময়।
কীর্তনারম্ভে এখানে যথারীতি গৌরচন্দ্রকে আসরে আহ্বান করা হয় তাঁর আশীর্বাদ প্রাপ্তি মানসে--
আইস গৌর নিত্যানন্দ আমার আসরে ।
তুমি আসিলে আনন্দ হবে; নিরানন্দ যাবে দূরে।
তোমার যন্ত্র তুমি ধরো তোমার কীর্তন তুমি করো
তুমি বিনে দেহ যন্ত্র বাজে কেমনে ।
………………………………………………………………………………………………………….