Tuesday, 16 June 2026

25.বামের বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় বৈশিষ্টঃ-৬ঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


বামে সুফীবাদের প্রভাব :দরবেশ , পীর ,ফকির ,অলি-আউলিয়া ,দরগা-মোকামঃ সুফিবাদ, বা তাসাওউফ, ইসলাম ধর্মের একটি আধ্যাত্মিক ও মরমী শাখা, যা আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত ও অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেয়। সুফিরা জিকির ও অন্যান্য ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন।

 

সুফীরা বিভিন্ন তরিকায় (সুফিবাদের শাখা) যেমন চিস্তিয়া, কাদিরিয়া, নকসবন্দী, সুরাওয়ার্দী ইত্যাদির অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, এবং তাদেরকে ফকির, দরবেশ বা পীর বলা হয়। দরবেশ এবং ফকিররা সাধারণত দারিদ্র্য ও আধ্যাত্মিকতার জীবনযাপন করেন এবং তারা জাগতিক সম্পদের প্রতি নিরাসক্ত থাকেন। জিকির এবং অন্যান্য ধ্যানের মাধ্যমে তারা আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন, প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ধর্মীয় রীতিনীতি অবলম্বন না করে হৃদয় ও আত্মাকে বেশি গুরুত্ব দেন। বাম অঞ্চলে দরবেশ ও ফকিরদের নামের সঙ্গে সচরাচর "বাবা" “শাহ “বা "মামু" শব্দ যুক্ত হয়।

 

বিপরীতে পীর হলেন সেই ব্যক্তি যিনি উচ্চ স্তরের আধ্যাত্মিক জ্ঞানে পৌঁছেছেন এবং তিনি সুফি পথে অন্যদের পথপ্রদর্শন করার জন্য যোগ্য। শরিয়াহের আওতায় থেকেই পীর তার শিষ্যদের ‘মারিফাত’ (আল্লাহর উপস্থিতির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা) অর্জনে সাহায্য করেন। বরাক উপত্যকায় তারা প্রায়ই ইসলামী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে থাকেন। "অলি-আউলিয়া" শব্দ যুগল পীরের সমান্তরাল হিসেবে এই অঞ্চলে পরিচিত।

বাম  অঞ্চলেও পীর সুফী দরবেশগণের আগমন ঘটেছিল। তাদের সমাধি স্থলগুলো পবিত্র দরগাহ-মোকাম রূপে পরিগণিত। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে যন্ত্রণাকাতর মানুষ এসব দরগাহ-মোকামে প্রতিদিন নানা মানত নিয়ে যায়, শিরনি দেয়, মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে নিজের সমস্যা নিরসনের জন্য প্রার্থনা করে।

এই শ্রেণীর সুফীসাধক সর্বজন শ্রদ্ধেয় আগুনখারা বাবার মাজার রাজঘাটে অবস্থিত। কথিত হয় গত শতাব্দীর প্রথম দিকে শিলচর বড়যাত্রাপুরের জনৈক রাখাল নাথ নিজের বাড়িঘর, আত্মীয়- স্বজন ত্যাগ করে সোনাবাড়িঘাটের পাশে সৈদপুরে চরকীশাহ বাবার মোকামে চলে আসেন এবং সুফীবাদের আধ্যাত্মিক সাধানায় বিভোর হয়ে এখানে অবস্থান করতে থাকেন।

পরে চরকীশাহ এর মোকাম থেকে বেরিয়ে এসে এই বিবাগী ফকীর বামের রাজঘাটে সুরুজ আলির বাড়িতে আস্তানা গেড়ে এখানেই অবস্থান করতে থাকেন। আগুনের জলন্ত আঙ্গার তিনি চিবিয়ে খেতেন বলে সবাইআগুনখারা বাবা' বলে ডাকত। ১৯২৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে রাজঘাটে সমাধিস্থ করা হয়। তার সমাধিস্থল এখনআগুন খারা বাবার মাজার মোকাম' রূপে সর্ব সম্প্রদায়ের পরম শ্রদ্ধার স্থান রূপে পরিগণিত এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলনভূমির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ভাবনার পীঠস্থল। আগুনখারা বাবার মোকামে  প্রতি  চৈত্র মাসের ২২ তারিখ বিরাট উৎসাহ ও উদ্দীপনার সহিত বিভিন্ন কর্ম কাণ্ডের মধ্য দিয়ে বার্ষিক ‘উরস ‘ উদযাপিত হয় ।সুফি মতবাদে ‘উরস’ বলতে একজন সুফির  মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণ অনুষ্ঠানকে বোঝায়। উরসের সময়, অনুসারীরা সুফির মোকাম বা দরগাহে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন ভক্তিমূলক কার্যকলাপ পরিচালনা করেন ।

ভাগাবাজারের পাশে রুকনি নদীর পশ্চিম তীরে বামে বসতি শুরু হওয়ার সময় থেকেআম্ আমির মোকামবলে পরিচিত এক অজ্ঞাত পরিচয় সুফী সাধকের মোকাম সাধারণ মানুষের ভক্তি নিবেদনের কেন্দ্ররূপে এলাকার ঐতিহ্য বহন করেছে। তিনদিকে রুকনি নদীর খরস্রোত ঘেরা উচু টিলার উপর অবস্থিত বহুশতাব্দী প্রাচীন এই মোকাম লক্ষীপুরের পাশে ফুলেরতলে বরাক নদীর খরস্রোত ঘেরা লঙ্গরশাহ বাবার মোকামের মত লৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সুফী সাধকের এবাদত স্থল বলে লোকবিশ্বাস মোকামের ঐতিহ্য বহন করছে। অবশ্য বর্তমান সময়ে মোকামটির অস্তিত্ব বিভিন্ন কারণে প্রায় বিলুপ্তির পথে।

 

 আর্জানপুর   গ্রামে অবস্থিত পানিসাগার মোকামের অন্যতম সুফি সাধাক ইয়াকুব শাহ আনুমানিক ১৬৬ বছর  পূর্বে সোনাই কাজিডর গ্রামে  জন্মগ্রহণ করেন। জনশ্রুতি মতে  বারো বছর  বয়সে উনি কাজিডর গ্রাম ত্যাগ করে পানিসাগরে  আসেন  এবং  বর্তমান মোকামস্থলে তার আধ্যাতিক আস্তানা স্থাপন করেন । কিংবদন্তী রয়েছে যে  তিনি বাঘের উপর চলাফেরা করতেন ।তদানিন্তন সময়ে  যার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক মানুষ ছিলেন। ৫৩ বছর বয়সে আনুমানিক ১৯১১ সনে তিনি পরলোক গমন করেন । পানিসাগার  মোকামে তাঁর মাজার  রয়েছে। কয়েক বছর  পূর্বে এখানে  একটি মসজিদও স্থাপন করা হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে  অনেক লোক এই জায়গায় জিয়ারত করতে আসেন।

 সোনাহর আলী ওরফে “গাইটআলা মামু “ বাম অঞ্চলের এক অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি যাঁকে সবাই “মজ্জুফ”  বলে বিশ্বাস করতেন ।শরীরের  সবদিকে গাট-গাঠালি ঝুলিয়ে চলাফেরা করতেন বলে  তাঁকে “গাইটআলা মামু “ নামেই অভিহিত করা হত ।প্রারম্ভিক জীবনে  তিনি হাতির মাহুত ছিলেন বলে  জানান তাঁর মূল বাড়ি বাঁশখালের এক বংশধর ।তাঁর জীবনের অনেক অলৌকিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে ।মৃত্যুর কিছুদিন  পূর্বে তাঁর জন্মস্থান বাঁশখাল থেকে  লোক এসে  তাঁকে নিয়ে যায় । বাঁশখালেই আনুমানিক ৮০ বছর  বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় এবং সেখানেই তাঁকে কবরস্ত করা হয় । তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে একটি মোকাম গড়ে উঠেছে সেখানে ।

বামের সপ্তগ্রামে  রয়েছে ‘নারায়ণ শাহ বাবার মোকাম’ নামে পরিচিত  একটি মোকাম । এ সম্পর্কে তথ্য প্রদান করতে গিয়ে  এলাকার প্রবীণ দু’জন ব্যক্তি এবং মোকামে  অবস্থানকারী খাদিম  প্রচলিত জনশ্রুতির উপর  ভিত্তি করে জানান এই নারায়ণ শাহ ছিলেন পানিভরার বাসিন্দা । পানিভরায় তিনি শিলচর -আইজল সড়কের  পাশের একটি গাছের নিচে বসে থাকতেন আলুথালু বেশে ।কিংবদন্তি মতে  একদিন সপ্তগ্রামের বাসিন্দা হাসন লস্কর ঘোড়ায় চড়ে এক খুনের মামলার আসামী রূপে শিলচর আদালতে  হাজিরা দিতে  গাছের নিচে অবস্থানরত নারায়ণ শাহের পাশ দিয়ে  যাওয়ার সময়  শুনেন যে  ঐ ব্যক্তি  মাটির মধ্যে আচড় কেটে কেটে বলছেন “ হাছন খালাস ,হাছন খালাস” । কথাগুলি শুনে শুনে তিনি  আদালতে চলে যান এবং সেখানে  বিচারক তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন ।সেদিন থেকে হাছন লস্কর কথিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন । এবং এই ব্যক্তি  সপ্তগ্রামে তাঁর বাড়িতে আসা যাওয়া  শুরু করেন এবং এখানেই প্রায় থাকতে  শুরু করেন ।পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর মৃত্যু পূর্ববর্তী শর্ত অনুসারে হাছন লস্কর  তাঁর মৃতদেহ সপ্তগ্রামে নিয়ে আসেন এবং  তাঁকে এখানেই সমাধিস্থ করা  হয় । বর্তমানে তাঁর কবর ঘিরে  একটি মোকাম গড়ে উঠেছে ।এখানে উল্লেখ্য যে  নারায়ণ শাহের কবরের পাশেই স্বাধীনতা সংগ্রামী মৌলানা ফরমুজ আলী লস্করের  সমাধি  

উপরোক্ত সাধকগণ কোন সুফি তরিকায় এবাদত বা ধ্যান ধরণা করেছিলেন জানা নাই ।