আমার প্রাথমিক জীবনে এই বাম যাত্রা আমাকে বাম ও
বামের মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় । বিশেষ
করে, আমি যে বিবাহ অনুষ্ঠানটি দেখেছিলাম তা বাম সমাজের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিসর সম্পর্কে
গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করেছিল।
বিবাহের দিনে, পুরো গ্রামে উচ্ছ্বাসের পরিবেশ ছিল
।গ্রামের সবাইকে ‘সিন্নি’ বা দুপুরের খাবারে অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত করা হয়েছিল। প্রস্তুতি ভোর থেকে শুরু হয়েছিল, এবং মহল্লাবাসীরা
একত্রিত হয়ে কাজ করতে লাগল। সেখানে কোনও পেশাদার রাঁধুনি ছিল
না; বরং, গ্রামের দক্ষ স্বেচ্ছাসেবকরা রাঁধুনির
কাজ করেছিল, যুবকরা তাদের সাহায্য করছিল। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা বামের ঐতিহ্য
এবং সহযোগিতার চেতনা প্রতিফলিত করেছিল।
অপরাহ্নে বরযাত্রী
যাওয়ার পালা। যাওয়ার আগে বর এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য "দামন্দখানি" নামে
পরিচিত একটি বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়। এই ভোজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বরটির সামনে রাখা
একটি বড় খাবার থালা, যা সুস্বাদু খাবারে পরিপূর্ণ—পোলাও, ভাজা ডিম,
খুরমা, মুরগির তরকারি, এবং উপরে সুন্দরভাবে সাজানো মুরগির রোস্ট। স্থানীয় রীতির অনুসরণ
করে খাওয়ার মধ্যে কোনো মাছের পদ ছিল না।
একটি আনন্দময় ঐতিহ্যবাহী
মুহূর্তে, বর তার সেরা বন্ধুর সহযোগিতায় মুরগির রোস্টটি এবং তার থালার আরও খাবার বন্ধুদের
সাথে ভাগ করে নেন। ভোজন পর্বটি হাসি এবং হালকা কথোপকথনে ভরপুর একটি উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি
করে। ভোজনটি মিষ্টান্ন দিয়ে শেষ হয়, যার মধ্যে ছিল প্রচলিত চালকুমড়া দিয়ে তৈরি
"মুরব্বা"।বরযাত্রীদের অন্যান্য সদস্যরা আলাদা করে ভোজন শেষ করেছিলেন।
ভোজের পরে, বর
"দামান্দ হাজানি" বা বর সাজানোর একটি সাজসজ্জার অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রবেশ
করেন। একটি মার্জিত সেলওয়ার কামিজ এবং অন্যান্য সাজের সাথে শোভিত হয়ে, তিনি পশ্চিম
দিকে মুখ করে বসেন। এরপর তার মাথায় একটি সাজানো পাগড়ি স্থাপন করা হয় এবং আতর বা সুগন্ধি
প্রয়োগ করা হয়। সাজানোর পর বর তার পিতার এবং অন্যান্য বৃদ্ধদের প্রতি সালাম জানান,
আর বিনিময়ে তারা বরকে আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।
পুরুষ সদস্যদের দ্বারা
গঠিত বরযাত্রীদের দল বাসে করে অপরাহ্নে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। বর, তার কিছু
ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমি—একজন তরুণ সদস্য—একটি পুরনো ১৯৫৭
সালের ল্যান্ড মাস্টার গাড়িতে (ASC 1703) যাত্রা করি। গাড়িটি কানকপুরের একটি পারিবারিক
আত্মীয়ের ছিল।
বিবাহের আসরে বরযাত্রীকে
উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। প্রবীণদের সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সালাম আদান-প্রদানের
মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানানো হয়, এবং মাটিতে পরিষ্কার কাপড়ে ঢাকা 'পাটি'-এর ওপর বসানো
হয়। সম্মানের চিহ্ন হিসেবে পান এবং সুপারি কয়েকটি 'পান্দানে' পরিবেশন করা হয়। বরপক্ষকে
স্বাগত জানিয়ে শরবত দেওয়া হয়। বয়স্কদের ধূমপানের জন্য কয়েকটি লম্বা নলযুক্ত হুক্কা
রাখা ছিল।
প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা
শেষে, বরের অভিভাবকরা আনুষ্ঠানিকভাবে কনের জন্য আনা অলংকার, শাড়ি এবং প্রসাধনী কনের
অভিভাবকদের হাতে তুলে দেন। বরকে ইতিমধ্যে প্রচলিত “গেইটধরা" নামে একটি আচারের"
মাধ্যমে প্রবেশ করতে হয়েছিল। কনের বন্ধুবান্ধব এবং তরুণ আত্মীয়রা বর ও তার বন্ধুদের
গেট অবরুদ্ধ করে প্রবেশের জন্য বিশাল আর্থিক পুরস্কারের দাবি করেছিল। দর কষাকষির পর এবং ন্যূনতম পরিমাণ অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে, বরকে
প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তাদের আলাদা বেষ্টনীতে বসানো হয়।
অভ্যর্থনার পর ইসলামিক রীতি অনুযায়ী নিকাহের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অতিথিদের একটি বিলাসবহুল ভোজে আপ্যায়িত করা হয়। তারা সবাই পাটির উপর পা ত্রিকোণ করে (রান মেলিয়া) বসেছিলেন এবং তাদের সামনে একটি "দস্তার" (দীর্ঘ লাল কাপড়ের টুকরো, যা খাওয়ার সময় থালা রাখার জন্য ব্যবহার করা হত) মেলে দেওয়া হয়েছিল। একজন ব্যক্তি অতিথিদের সামনে কাসার তৈরি একটি পাত্র "চিলিমচি" বা "পিকদান" ও একটি বদনায় জল নিয়ে নুয়ে নুয়ে যেতে থাকে, যাতে অতিথিরা বসেই হাত ধোতে পারেন। আহার শেষে, এই প্রথাটি পুনরাবৃত্তি করা হয় হাত ও মুখ ধোওয়ার জন্য। এটি অতিথিদের প্রতি আতিথেয়তার একটি প্রথা। অতিথিরা উঠে গিয়ে হাত-মুখ ধোয়া ‘বেয়াদবি’ (অসম্মানজনক) বলে গণ্য করতেন।
আহার শেষে 'পান্ দান' এ পান সুপারী পরিবেশন করা হয়। "হুক্কা" সেখানে বিরাজমান ছিলই, মাঝে মাঝে তামাক ভরে 'টিকি'তে ফুঁ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। বরযাত্রীরা সূর্যাস্তের আগে কনের সাথে ফিরে আসে।
………………………………………………………………………………………………………