Saturday, 31 October 2026

108.‘বামে’ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান-5:কানন নাথ মজুমদার

  ব্রজমণি সিংহ

বাম অঞ্চল যখন ছিল শিক্ষার আলোকে বষ্ণিত,তখন যে বিদ্যলয়টি জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে অঞ্চলটিকে আলোকিত করার ব্রত নিয়ে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল তা হল”১৫৭ নং রাম প্রসাদপুর মডেল থাম্বাল স্কুল।“ ১৮৯৫সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক রাধা চরণ রাহা।স্কুল টি আঞ্চলিক শিক্ষা   বোর্ডের

অধীনে পরিচালিত হতো। তখন এটা মডেল স্কুল ছিল না ।পরবর্তীকালে স্থাপিত ৩২৯ নং বালিকা বিদ্যলয়টি ১৯৫১ সালে এই স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং স্কুলটি ‘মডেল স্কুলে’ পরিণত হয়।সে সময় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ ব্রজমনি সিংহ । তখন স্কুলটি ছিল তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষা কেন্দ্র।

রাম প্রসাদপুর গ্রামের সুসন্তান  ব্রজ মনি সিংহ নিজের গ্রামের এই স্কুল থেকেই পাঠশালা পাস করেন । তাঁর পিতা ছিলেন বকুল সিংহ এবং মাতার নাম ছিল কাবোকলৈ দেবী। পাঠশালা পাস  করার পর শিলচর নর্মাল স্কুল থেকে  গুরু ট্রেইনিং সেরে কাজিডহর গ্রামের এক পাঠশালায় মাসিক ৮ টাকা বেতনে শিক্ষক রূপে  যোগদান করেন।১৯৩২ সালে নিজের গ্রামের, নিজের শিক্ষালাভ করা স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসাবে যোগদান করার পরই তাঁর কর্মময় জীবনের সূত্রপাত হয়।শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েন।এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।১৯৩৮সালে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী ব্রজমণি সিংহের শিক্ষাদান প্রণালীর মধ্যে ছিল অভিনবত্ব। প্রতি সোমবার ছাত্র ছাত্রীদের দাত,নখ,পোষাক পরিচ্ছদের পরিচ্ছন্নতা খতিয়ে দেখা হত। প্রতি শণিবার দ্বিতীয় মান ও তৃতীয় মানের ছাত্র ছাত্রীদের  ফুলের বাগানে কাজ করতে হতো। প্রতি তিন মাস অন্তর ছাত্র ছাত্রীদের  উচ্চতা মেপেদেখা হতো। কোনও শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে অভিবাবকদের  ডেকে এর প্রতিবিধানের চেষ্টা করা হতো। এসব কাজ  সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার শিক্ষা দিতে ছাত্র ছাত্রীদের  মধ্যে  “মন্ত্রী মণ্ডলী” গঠন করে দিতেন শিক্ষকরা।মন্ত্রী মণ্ডলীতে থাকতো বর্গ মন্ত্রী, সাফাই মন্ত্রী ,জল সরবরাহ মন্ত্রী প্রভৃতি ।পরিশ্রুত জল পানের ব্যবস্থা হিসাবে ছিল “ কলসী ফিল্টার”।একটির উপর আরেকটি ৪টি কলসী দ্বারা নির্মিত ফিল্টারটি শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। বিশুদ্ধ জলপানের সৌভাগ্য তো ছিলই।

সুদক্ষ  কীর্তনীয়া ব্রজমনি সিংহ  কীর্তনে অংশ নিতেন এবং কীর্তনের আসরে দেশের ও নিজের মঙ্গলের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনা করতেন।ফলস্বরূপ স্কুলের ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতি বছর একাধিক বৃত্তি আসতো এই স্কুলে।কোনও বছর ৪/৫ টা বৃত্তিও আসতো।বৃত্তি পরীক্ষার ৩/৪ মাস আগে থেকে,বৃত্তি পরীক্ষার  বাছাই করা ছাত্র ছাত্রীদের  প্রধান শিক্ষকের বাড়ীতে গিয়ে বিশেষ ভাবে পড়া শুনা করতে হতো।কিন্তু এ জন্য কোনোও পারিশ্রমিক দিতে হতোনা।নিঃস্বার্থ পরিশ্রমে স্কুলের সুনাম আর ছাত্র ছাত্রীদের  মঙ্গলই  ছিল  একমাত্র লক্ষ্য।

এই সময় ,যখন স্কুলটি উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করে,তখন স্কুলের সহকারী শিক্ষকগণ ও ছিলেন ছাত্র অন্ত প্রাণ ।ছাত্রদের উন্নতিই ছিল  তাঁদের মূল লক্ষ্য।এই মহানুভব শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীরা ছিলেন কুশেন্দ্র পাল,সতীশ চন্দ্র নাথ,ভুবনেশ্বর সিনহা, নির্মলা দেবী(নাথ),সুরবালা পাল এবং সরলা নমশূদ্র ।প্রধান শিক্ষকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারাও স্কুলের উন্নতি সাধন তথা এলাকার শিক্ষা প্রসারে মহান ভূমিকা পালন করে গেছেন।ব্রজমনি সিংহের সুযোগ্য ছাত্র তথা পরবর্তীতে সহকর্মী প্রয়াত সতীশ চন্দ্র নাথ ,তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করে স্কুলের প্রাত্যহিক প্রার্থনা সভায় সংস্কৃত শ্লোকের অন্তর্ভুক্তি ঘটান যা  এতদঞ্চলে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে বহুদিন  পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

প্রতিমাসে কেন্দ্রসভা বসতো এই স্কুলেই।কেন্দ্রাধীন পাঠশালা শিক্ষকবৃন্দ ছাড়াও বাম নিত্যানন্দ  এম ই ও হাই স্কুলের শিক্ষকগণ সহযোগে “ শিক্ষক সম্মিলনী” শীর্ষক শিক্ষক সংস্থা  গঠন  করা হয় ব্রজমনি সিংহের উদ্যোগে। সম্পাদক ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষাবিধ মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর মহাশয়।এই শিক্ষক সম্মিলনীর   প্রচেষ্টায় ১৯২৬ সালে “ আশার আলো” নামে হাথে লেখা ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের করা শুরু হয়।এই পত্রিকার হাতের লেখা অক্ষরগুলো ছাপা অক্ষরের চেয়ে কোনোও অংশে কম ছিল না।এই প্রয়াসকে শুধু শিক্ষক সম্মিলনীর নয়, সমগ্র বাম অঞ্চলের আশার আলো বলে অনেকেই আখ্যায়িত  করেছিলেন ।ব্রজমনি সিংহ বাম নিত্যানন্দ হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটিরও সদস্য ছিলেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে ব্রজমনি সিংহের অসামান্য অবদানের  স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগ তাঁকে “জাতীয়” শিক্ষক “ রূপে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করে। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ,ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের হাত থেকে  পুরষ্কার গ্রহণ করেন তিনি। তাঁর কার্যকাল ছয় বৎসর বাড়িয়ে দেওয়া হয় ।১৯৬৭ সালে রাজ্য সরকার  কর্তৃক প্রাদেশিক শিক্ষক পুরষ্কারেও ভূষিত হন।


ব্রজমণি সিংহ মহাশয়কে ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সনে রাষ্ট্রপতি ডঃ  সর্বপল্লী রাধাকৃঞ্চন রাষ্ট্রীয় শিক্ষক সম্মমাননার অভিজ্ঞান প্রদান করছেন।

 

রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্তির পর স্কুল পরিদর্শকের বদান্যতায় এবং এলাকার জনগনের উৎসাহে স্কুলে এক বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।স্কুল পরিদর্শকের উপস্থিতিতে,এলাকার প্রচুর উৎসাহী জনগণের সামনে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা নাচ-গান-আবৃত্তি-অঙ্কণ প্রভৃতির উপস্থাপন ছাড়াও বিজ্ঞান প্রদর্শনী করে অনুষ্ঠানটিকে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়।“কাঁচের গ্লাসে পরিস্কার চূণের জল রেখে,পাইপ দিয়ে  ফুঁ দিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড সংযোগের মাধ্যমে এই জলকে দুধের মত সাদা দেখানো যায়”- এ রকম ছোট ছোট বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড উপস্থাপিত করে,খুদে ছাত্র ছাত্রীরা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় ।আজ থেকে এত বছর আগে ,এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা এমন প্রদর্শন বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আর এটা সম্ভব হয়েছিল ব্রজমনি সিংহের মতো   বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব আর তার অনুগামী সহশিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে।তাঁদের সম্মিলিত প্রয়াসেই স্কুলটি এক বিশেষ মর্যাদা লাভে সমর্থ হয়েছিল।এই স্কুলের বহু ছাত্র-ছাত্রী পরবর্তী জীবনে নানাভাবে  নিজের ও দেশের  সুনাম বৃদ্ধি করেছেন আর বাম অঞ্চল হয়েছে গর্বিত ।কুলচন্দ্র সিংহ (নেভি কামাণ্‌ডার ,পরে ডেপুটি ডিরেক্টার ও এন জি সি) করুণাময় নাথ লস্কর( প্রিন্সিপাল,বি এন এম পি স্কুল) এর মত  বহু কৃতি ছাত্র  তাদের জীবদ্দশায় নিজের জীবনে  শ্রদ্ধেয় ব্রজমনি সিংহের অবদানের কথা  মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে গেছেন। তাঁর সুপুত্র উপেন্দ্র সিংহ ছিলেন একজন প্রখ্যাত  ফুটবলার এবং অরুণাচল প্রদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের  একজন দক্ষ কর্মী।ডাক্তার ইন্দ্রজিৎ পাল  এই স্কুলেরই ছাত্র।

 সুদীর্ঘ ৪৮ বৎসর সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করে ১৯৭১ সালের ১লা জানুয়ারী বাম অঞ্চলের একমাত্র রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্ত শিক্ষক ব্রজমনি সিংহ অবসর গ্রহণ করেন।অবসর গ্রহণের পরও আমৃত্যু সমাজ কল্যাণের  কাজে  নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। নিজের কর্মনিষ্ঠা,দক্ষতা,সততা আর সার্বিক কল্যণের মানসিকতার গুণে,নিজের নামের সঙ্গে ১৫৭ নং রাম প্রসাদপুর স্কুলের নামকেও গৌরবান্বিত করে গেছেন বাম অঞ্চলের  গর্ব, সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্রজমনি সিংহ।

 


তথ্যঃ

·      অশ্বিনী সিংহ-প্রয়াত ব্রজমনি সিংহের ভ্রাতুষ্পুত্র

·      শচীনদ্র সিনহা- প্রধান শিক্ষক, ১৫৭ নং রাম প্রসাদপুর থাম্বাল এল পি স্কুল

·      অমিত কুমার সিংহ -শিক্ষক,১৫৭ নং রাম প্রসাদপুর থাম্বাল এল পি স্কুল

·      সুলতা রায়-শিক্ষিকা -১৫৭ নং রাম প্রসাদপুর থাম্বাল এল পি স্কুল

·      আশার আলো-ম্যাগাজিন,১৯৯৭

এ ছাড়া  নিবন্ধ লেখিকা নিজে এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন।তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অকুন্ঠ শ্রদ্ধা উপস্থাপনাকে   সমৃদ্ধ করেছে।

--------------------------------------------------------------------------------

 

 

 

 

 

 


 

107.(4)-‘বামে’ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে  অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান-4:সাবির আহমদ চৌধুরী

 

 মহীউদ্দিন আহমদ                                      

প্রয়াত মহীউদ্দিন আহমদের নামের সাথে বামের প্রারম্ভিক শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যদিও তাঁর জন্মস্থান বাম নয়। মহীউদ্দিন আহমদের জন্ম  সোনাইর কাজিডহর গ্রামে। পিতার নাম ছিল আসাইদ আলী লস্কর এবং মাতার নাম ছিল জেবুন নেছা লস্কর। চার ভাইয়ের মধ্যে মহীউদ্দিন আহমদ ছিলেন সবার বড়। ১৯৪০  ইংরেজীতে শিবটিলা নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে তার লেখা পড়ার হাতেখড়ি হয়। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষে সোনাই নিত্য গোপাল হায়ার সেকেন্ডারীতে ভর্তি হন। সেই স্কুল থেকে ১৯৫৩ সালে মেট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হন।

সেই বছরই গুাহাটির কটন কলেজে আই এস সি তে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে কটন কলেজ থেকে আই এস সি পাস করেন। পরবর্তীতে আবার শিলচর ফিরে এসে গুরুচরণ কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৮ সালে ঐ কলেজ থেকে বি এ পাস করেন। সেই বছরেই তিনি সমবায় পরিদর্শকের চাকরি পান এবং প্রথম

পোস্টিং হয় রামকৃষ্ণ নগরে।


মহীউদ্দিন আহমদ

এরপরই মহীউদ্দিন আহমদের পথ পরিবর্তন ঘটে, যা ভাগাবাজার তথা বাম অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত। রামকৃষ্ণ নগর থেকে বদলি হয়ে কো-অপারেটিভ সোসাইটির পরিদর্শক হয়ে ১৯৫৮ সালে ভাগায় এসে এতদঞ্চলে শিক্ষার অভাব অনুভব করেন। শুধু অনুভবই নয়, সেই অভাব দূর করে শিক্ষার বিস্তারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। নিরাপদ সরকারি চাকরি ছাড়ার মন স্থির করেন এবং চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৫৮ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বামের ইতিহাসের শিক্ষা ক্ষেত্রে বছরটি একটি মাইলফলক হয়ে রইল। তার প্রতিষ্ঠিত বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল আজ বহু কৃতিত্বের অধিকারী বামের একটি সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বাম অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আবার এক নব সূচনার অধিকারী হিসেবে শিক্ষানুরাগী মানুষের স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে গেলেন ১৯৯৪ সালে ভাগা-রাজঘাটে এম এ লস্কর জুনিয়র কলেজ প্রতিষ্ঠার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জুনিয়র কলেজ (বর্তমানে সিনিয়র সেকেন্ডারী স্কুল) পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মহীউদ্দিন আহমদ এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল ছিলেন। ভূমিদাতা পরলোকগত তবারক আলী লস্কর ও মবারক আলীর দানকৃত ১৪  বিঘা জমির উপরে প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র সেকেন্ডারী স্কুলটি আজ প্রাদেশীকৃত রূপে অবস্থান করছে, যার প্রতিষ্ঠার লগ্নে রয়েছে মহীউদ্দিন আহমদের অপরিসীম প্রচেষ্টা।

একজন আদর্শ শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা এবং দক্ষ সংগঠক ছাড়াও মহীউদ্দিন আহমদ ছিলেন এক উচুমাপের সাহিত্যিক, গল্পকার। বরাকের সাহিত্যিক সমাজে তার একটি সুপরিচিতি ছিল। তবে দুঃখজনকভাবে, দু-একটি গল্প ছাড়া অন্যান্য অসংখ্য গল্প এখন আর পাওয়া যায় না। নির্মল সংস্কৃতি অনুরাগী মহীউদ্দিন আহমদ সাহেব সহকর্মী শ্রীযুক্ত নীরেশ চন্দ্র দাস, প্রাক্তন মন্ত্রী গিরীন্দ্র মল্লিক, সিরাজ উদ্দিন বড়ভুঁইয়া (সেকন্ড স্যার), সংস্কৃত শিক্ষক শর্মা স্যার, হরেন্দ্র স্যার শিক্ষকদের নিয়ে একটি স্বচ্ছ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছিলেন বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলে। নিয়মিতভাবে পালিত হত রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, শিক্ষক দিবস, শারদীয় উৎসবসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একজন সৃজনশীল, সংস্কৃতমনস্ক প্রধান শিক্ষকের সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯৯৩ সালে মহীউদ্দিন আহমদ সাহেব চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি ভাগাবাজারের দক্ষিণ প্রান্তে তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সন্নিকটস্থ এক খণ্ড জমি ক্রয় করে গৃহ নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সেই বাড়ীটি বিক্রি করে শিলচরে চলে যান। ২৬শে অক্টোবর, ২০১৯ ইংরেজীতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান শিক্ষাবিদ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। সোনাই থানাধীন কাজিডহরে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে কবর দেয়া হয়।

তাঁর অনেক প্রাক্তন ছাত্র ও অভিভাবক বাম থেকে কাজিডহরে গিয়ে তার জানাজার জন্য উপস্থিত হন। সেখানে তারা ঘোষণা করেন যে, মহীউদ্দিন আহমেদের সম্মানে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। বাম বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের কৃতজ্ঞ প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিভাবকরা ২০২১ সালে "আলোকের ঝর্ণাধারা" নামে একটি স্মরণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই স্মরণ গ্রন্থটি বাম বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মহীউদ্দিন আহমদ সাহেবের প্রতি নিবেদিত এবং হাফসা ফাউন্ডেশন দ্বারা প্রকাশিত হয়।

তার আগে ২০১৯ সালে, বরাক সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়ন পরিষদের আয়োজনে এম.এ. লস্কর জুনিয়র কলেজে অনুষ্ঠিত সভায় মহীউদ্দিন আহমদকে দক্ষিণ বামের শিক্ষা বিস্তারের জন্য সম্মানিত করা হয়। দেরিতে হলেও, তাঁর প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিভাবকরা তাঁর শিক্ষা বিস্তারের অবদানের জন্য তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। সম্মানিত হওয়ার কয়েক মাস পরেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।


------------------------------------------------------------------------