Monday, 8 June 2026

16.পরম্পরাগত সমাজ -2:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 

 


 

আর্থিক জীবনযাত্রাঃ 

 বাম অঞ্চলের জীবন ছিল অতিশয় সহজ সাদাসিধা। জমি উর্বর হওয়া সত্ত্বেও পরম্পরাগত পুরাতন জাতের ধানের  বীজ ব্যবহার করার জন্য উৎপাদন হত তুলনামূলক ভাবে কম । বামে পুরানো পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হতো। স্বাধীনতার পর বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বামে চাষের উন্নত পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য সরকারর প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে, সরকার উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ধরণের বীজ এবং সার প্রয়োগ প্রথা প্রবর্তন করতে শুরু করে। প্রগতিশীল কৃষকদের মধ্যে নতুন ধরণের ছোট খাটো কৃষি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বিতরণ করা  আরম্ভ হয়। ভাগাবাজারে একজন কৃষি  ডেমনস্ট্রেটার নিয়োগ করা হয়েছিল যিনি অধিক ফলনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিতেন এবং বীজ ও সার বিতরণ করতেন।একই সময়ে, ভাগাবাজারে একটি ভেটেরিনারি হেলথ সেন্টার খোলা হয়েছিল এবং একজন ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট   নিয়োগ করা হয়েছিল। সরকার থেকে  রেশম উৎপাদনের  প্রচেষ্টা চালু হয়েছিল যার জন্য একজন রেশম প্রদর্শক কৃষকদের রেশম চাষে যেতে কৃষককে উৎসাহিত করতেন। এগুলি ছিল বামে আধুনিকতার দিকে উত্তরণের পথে  স্বাধীন ভারত সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ ।

বামের অর্থনীতিতে টাকার ভূমিকা ছিল ন্যূনতম । যদিও  এটাকে ঠিক বিনিময় অর্থব্যবস্থা বলা যায় না । লোকেরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই উৎপাদন করত কিন্তু লবণ, দেশলাই-বাক্স,লবণ, কেরোসিন তেলের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তাদের কিছু অর্থের প্রয়োজন ছিল। শিক্ষা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ছিলনা বললেই চলে। তারা ন্যূনতম পোশাক ব্যবহার করেছে। তারা খালি পায়ে হেঁটেছে।

লোকেরা নগদ টাকা পেত  উদ্বৃত্ত ধান, সুপারি, কলা, ডিম, হাঁস-মুরগী, ফল পারিবারিক ব্যবহারের  জন্য ফলানো শাক-সব্জী বিক্রির মাধ্যমে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রধানত তফসিলি জাতি ,হাতে তৈরি বাঁশের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। এই বাঁশের      কারুকাজগুলি ছিল একজন কৃষকের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস যেমন ধান শুকানোর জন্য বাঁশের চাটাই যাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডাম’ বলা হয়, ধান সংরক্ষণের জন্য উঁচু বাঁশের পাত্র যাকে স্থানীয়ভাবে 'জুঙ্গি' বলা হয়, ধান রাখার ও বহন করার জন্য 'টুকরি' নামে বাঁশের পাত্র; বিভিন্ন ধরণের মাছ ধরার ফাঁদ বা সরঞ্জাম যা স্থানীয়ভাবে ‘ডরি, রুঙ্গা, ওছু, পারণ, পলো ,খলই,চেপা  নামে পরিচিত ও গ্রীষ্মে উপশমের জন্য বাঁশের হাতপাখা।

      গ্রামবাসীরা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য 'মুর্তা' থেকেও বিভিন্ন জিনিস তৈরি করত। এগুলি ছিল মাটিতে বসা ও ঘুমানোর জন্য বা নামাজের 'চাটি' ও ‘পাটি’।  ছোট আকারের 'চাটি' বা 'পাটি'র প্রচুর চাহিদা ছিল কারণ প্রতিটি মুসলমান পরিবারে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ার জন্য দুই বা তিনটি 'চাটি' বা 'পাটি'র প্রয়োজন ছিল।  কৃষক পরিবাররা  এসব পণ্য বিক্রি করে কিছু নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারত। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে এসব হস্তশিল্প জাত সামগ্রীর বাজার প্রায় হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন অনেক কারিগর আর অবশিষ্ট নেই।

    বামের মণিপুরি সম্প্রদায়ের আলাদা এক দক্ষতা ছিল। মণিপুরি মহিলারা 'মুড়ি' ও 'চিড়া' তৈরি করে সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করতেন। তারা ‘মণিপুরি গামছা’ নামে এক নিত্য ব্যবহারিক কাপড় বুনতেও জানতেন যার বাজারে চাহিদা ছিল। এটি সাপ্তাহিক কেনাকাটা করার জন্য পরিবারের কাছে অর্থ এনে দিত।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রথম পর্বে একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের মাসিক বেতন ছিল ৩০ টাকা এবং এক কাঠি ( কেজি) চালের দাম ছিল আট আনা তথা বর্তমান পঞ্চাশ পয়সা।

কিন্তু যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে টাকার ব্যবস্থা করা কঠিন ছিল। ব্যাংক ঋণের কোনো সুবিধা ছিল না। ঋণের জন্য মানুষকে নির্ভর করতে হতো গ্রামের মহাজনদের ওপর। কাবুলি ঋণদাতারাও ছিল। কোন কোন  গ্রামে  কৃষি ঋণের জন্য কৃষি সহায়ক সমবায় সমিতিও ছিল।জরুরি অবস্থার সময় ঋণ পাওয়ার একটি সাধারণ পদ্ধতি ছিল কৃষি জমি ইজারা দেওয়া।কিন্তু  একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল।অনেক সময় জমি বাড়ী খুঁয়াতে হত ।

 

15.পরম্পরাগত সমাজ -1:জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 


কৃষি নির্ভর সমাজ

বনফারার সময় বাম অঞ্চলটি মূলত কৃষি নির্ভর এলাকা ছিল। অঞ্চলের  বিস্তীর্ণ কৃষিযোগ্য ভূমির লোভনীয় পরিবেশ কৃষক গৃহস্থকে প্রলুব্ধ করেছে, আকর্ষণ করেছে। উর্বর মাঠে ধানের ফসল দেখে উপত্যকার নানা প্রান্ত থেকে কৃষক গৃহস্থরা বনবাদাড়ের অসহনীয় পরিবেশ গায়ে মেখে জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে বসতি স্থাপন করে জনবিহীন গহন নির্জন স্থানগুলোকে জনমুখর করে তুলেছে। এতদসঙ্গে  সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈশিষ্ট দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে

এখানকার জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ধান চাষ। চাষির আনন্দ তার ফসলের সজীব সুন্দর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে। ফলানো ফসলের অক্ষত সংগ্রহ থেকে। বামের কৃষকেরা প্রকৃতির প্রসন্ন মদত পেয়েছে। খেতের ফসল কৃষকের মনে প্রেরণা যুগিয়েছে। দ্বিগুণ উৎসাহে ফসল ফলিয়েছে।

ফসলের মধ্যে প্রধান ফসল ধান। দু'ধরণের ধানের চাষ ছিলআউশ বা আশু আর শাইল বা হৈমন্তিক ধান আউশ ধানের চাষ শুরু হত চৈত্র-বৈশাখ থেকে। ফসল উঠত শ্রাবণ-ভাদ্রমাসে। শাইল ধানের চাষ শুরু হত আষাড়-শ্রাবণ মাসে। ফসল উঠার সময় অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ।ভাদ্রমাস কৃষক গৃহস্থের সমস্ত কৃষি মরশুমের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়। শাইল ধান চাষের সর্বশেষ মরশুম ভাদ্র মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত আউশ ফসল   তোলার অন্তিম সময় ভাদ্র মাস

তাই কৃষক গৃহস্থের কৃষি কর্মকাণ্ডের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম সময় ভাদ্র মাস ভাদ্রমাসে কৃষকের চরম ব্যস্ততার আভাস দিতে গিয়ে প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছে

ভাদো মাসো মা মরে

কুলা আওড়দি খেত্ করে।

অর্থাৎ ভাদ্র মাসে মা মারা গেলেও তার সৎকার কর্ম স্থগিত রেখে খেতের কাজ শেষ করবার প্রয়াস চলে।

কৃষক গৃহস্থের বাৎসরিক অর্থ উপার্জনের অন্যপথ ছিল পশুপাখি পালন, পশুর মধ্যে প্রধান সম্পদ গরু। হাল চাষের জন্য গরু, দুধের জন্য গরু। বিক্রি করে অর্থ সঞ্চয় অথবা বিপদ উদ্ধারের জন্য গরু। গৃহস্থকুলের গরুর গুরুত্ব বুঝাতে প্রবাদ রচিত হয়েছিল—“যার নাই গরু হে (সে) দুনিয়ার হরু (অবহেলিত)গরু-মহিষ ছিল এলাকার কৃষক গৃহস্থকুলের সক্ষম-অক্ষম যাচাইয়ের মাপকাঠি। ছাগল পালন ছিল গৃহস্থকুলের বাড়তি উপার্জনের আর এক উপায়।

ফসল ফলানো, ফসল তোলাফসলের পরিচর্যা করা ইত্যাদি কাজের ফাঁকে সংস্কৃতি চর্চারও রেওয়াজ ছিল। শ্রম ক্লান্ত জীবনের অবসাদ কাটিয়ে মনকে চাঙ্গা করবার জন্য মনোরঞ্জনের উপাদন রূপে কোনও গৃহস্থ ঘরের আঙ্গিনায় জড়ো হয়ে পুত্তি (পুথি) পড়ার আসর বসত। ধর্মীয় আখ্যানের আধারে লেখ্য-আখ্যান কাব্য হাল্লতুন নবী, ইছুব জুলেখা, জঙ্গনামা, জঙ্গে খয়বর, জঙ্গে হাসর, নিজাম পাগলার কিচ্চা ইত্যাদি মধ্যযুগীয় সমাজ-সংস্কৃতি ভিত্তিক কথা সাহিত্য পাঠের আয়োজন ছিল চিত্ত বিনোদনের অবলম্বন। গ্রামোফোনে রেকর্ড করা গান বাজানো ছিল বিনোদনের একটি বড় উৎস।

 

     আশ্বিন-কার্তিক মাস ছিল কৃষকের কর্মবিরতির মরশুম। সময়ে রসিকজনেরা গাট্টার গান (তর্জাগান) এর আয়োজন করত। কোনও কোনও গৃহস্থবাড়িতে গাজির গানের মহড়া চলত; কোথাও বসত মারিফাতি গান, বাউল গানের আসর। রাতভর অনুষ্ঠানের আয়োজন শ্রোতৃমণ্ডলীকে মোহিত করে রাখত। কবিগান  গাওয়া ও প্রচলিত ছিল ।কবি গান ছিল গ্রামের কবিদের দ্বারা রচিত বাংলা কবিতার একটি জনপ্রিয় রূপ,   যা কাছাড়ের  সংবাদযোগ্য সংবেদনশীল ও খবরযোগ্য ঘটনা যেমন  বিধ্বংসী  অগ্নীকাণ্ড,দুঃসাহসিক ডাকাতি বা প্রেম ঘটিত  হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনাগুলি "কবি গানের" মাধ্যমে বর্ণনা করা হত। এই কবিরা তাদের "কবিগান" গেয়ে বিক্রি করতে ভাগাবাজার এবং ধলাইবাজারে  আসতেন।প্রথম দিকে, আলাউদ্দিন এবং অন্ধ সইফুল মিয়ার মতো কবি তাদের কবিগানের  জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত ছিলেন। তারা একটি একতারা  সহকারে কবি গান গাইতেন ।আর তাদের রচিত কবিগান বিক্রয় করতেন। গ্রামবাসীরা এই  চার বা পাঁচ  পৃষ্ঠার কবিগান দুই আনা দিয়ে ক্রয় করতঃ তাদের অবসর সময়ে উচ্চস্বরে গাইতেন ।

আউশ ফসল তোলার পর ভগিনী এবং কন্যার প্রতি অপত্য স্নেহে পিঠা-চিরা-ফল-ফসলের ঝুড়িভরা খাবার পাঠানো ছিল গ্রামীণ গৃহস্থ সমাজে প্রচলিত প্রথা

অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে শাইল মরশুমে চুঙ্গাপিঠার লোভনীয় ভোজনায়োজনের বিশেষ অংশরূপে বিবাহিত ভগিনী এবং কন্যাদের বাড়িতে অতি পরিপাটি মোড়কে পাঠিয়ে দিয়ে কৃষক গৃহস্থ তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিত। চুঙ্গা পিঠার লোভনীয় স্মৃতি কি ভুলা যায়!

সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আধ্যাত্মিক ভাবনায় ধর্ম চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত আলোচনার অঙ্গরূপে এলাকার বিভিন্ন স্থানেওয়াজমহফিল’-এর আয়োজন হত শীতের শুকনা মরশুমে বিশেষ করে মাঘ-ফাল্গুন মাসের অবসর সময়ে। অমুসলমান গ্রামগুলিতেও চলত ধরমীয় কীর্তন এবং সামাজিক নানা অনুষ্ঠান ইত্যাদি।    এও ছিল সংস্কৃতি চর্চার এক বিশেষ দিক।

      

………………………………………………………………………………………………………..