Sunday, 5 July 2026

44.কাছাড় জেলার ‘বাম’ অঞ্চলের বন্যপ্রাণী -2: ড.আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী

 

      বাম অঞ্চলে অন্ততপক্ষে ৩০০ টিরও বেশি প্রজাতি সমৃদ্ধ পাখি বৈচিত্র্য (বার্ড  ডাইভারসিটি)      রয়েছে। অনেক বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতি যেমন সাদা ডানাওয়ালা উড ডাক আগে দেখা যেত কিন্তু এখন নেই। লেসার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক (স্থানীয়ভাবে ছলাকাক বলা হয়) এখনও দেখা যায় তবে মাঝে মাঝে।পেইল কেপড কবুতর সম্ভবত এখনও দেখা যায়। সোয়াম্প ফ্রাঙ্কোলিন বা বিল তিতর ১৯৬০এর দশকের শেষের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সবুজ ময়ূরের  পরিসীমা এই এলাকায় আছে যদিও কোন নির্দিষ্ট রিপোর্ট নেই। বৃহত্তর অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক (স্থানীয়ভাবে ছলাকাকও বলা হয়) কয়েক দশক ধরে দেখা যায়নি। ১৯৯০ -এর দশকের গোড়ার দিকেও হোয়াইট-ব্যাকড এবং স্লেন্ডার-বিলড শকুন প্রচুর ছিল, তবে, তারা এখন বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। চার প্রজাতির হর্নবিল  বা  ধনেশ  একসময় প্রচুর ছিল কিন্তু এখন খুব বিরল, এগুলি হল গ্রেট পাইড হর্নবিল (স্থানীয়ভাবে রাজ ধনেশ নামে পরিচিত), ওরিয়েন্টাল পাইড হর্নবিল (স্থানীয়ভাবে কাউওয়া ধনেশ নামে পরিচিত),   রীদড  হর্নবিল এবং এশিয়ান ব্রাউন হর্নবিল। সর্বশেষ নামটি সর্বদা তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল এবং আমি ১৯৮৭সালে শেওড়ারতল তিন-ঘরিতে একটি দেখেছিলাম।

 

 

      সরীসৃপদের মধ্যে, বার্মিজ রক পাইথন বা অজগর, কিং কোবরা এবং মনিটর বা গোসাপ (সাধারণ বা বেঙ্গল মনিটর এবং ওয়াটার মনিটর) সহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ আর টিকটিকি রয়েছে। মনিটর টিকটিকিকে স্থানীয়ভাবে আইরং বলা হয়।

 

গুরুত্বপূর্ণ পাখি এলাকাঃ

বাম অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখি এবং জীববৈচিত্র্যের এলাকা রয়েছে, যেমন ইনারলাইন (পূর্ব অংশ) বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল, কেমব্রিজ (ইউ. কে) এর নির্দেশিকা ও মাপদণ্ড অনুসরণ করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশীলনের পরে এই ধরনের সাইটগুলি চিহ্নিত করা হয়েছিল।

  ভবিষ্যৎঃ

      তাদের আবাসস্থলে ঘূর্ণিঝড়, গাছ কাটা এবং অবৈধ শিকারের কারণে বাম অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর ভবিষ্যত  অন্ধকার। অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবংঅনেকগুলি আবার বিলুপ্তির  দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। বিলুপ্তির প্রান্তে উপনীত  বামের বনজঙ্গল রক্ষা করার জন্য ব্যাপক সচেতনতামূলক অভিযানের প্রয়োজন। বেশিরভাগ বনাঞ্চল এখন আংশিকভাবে সমস্ত  বছর জুড়ে মোটর যোগে যাওয়া আসার জন্য উপযুক্ত। স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এই এলাকায় ঘন ঘন পরিদর্শন করা উচিত যাতে তারা তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বুঝতে পারে এবং এটি সংরক্ষণের জন্য কাজ করে। চোরা শিকারিদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বাম অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ এবং সমর্থন জরুরিভাবে প্রয়োজন। বামের কিছুটা অংশ বরাক -ভূবন  বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

"বিঃদ্রঃ -  মূল ইংরেজি নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন জিয়া উদ্দিন চৌধুরী ………………………………………………………………………………………………………

ডাঃ আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী আই.এ.এস (অবসরপ্রাপ্ত) বামের জামালপুর থেকে। তিনি গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. এবং ডি.এস.সি করেছেন। ডাঃ আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী  আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন পক্ষীবিদ এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ । তাঁর প্রশংসকদের  কাছে উত্তর পূর্বের সেলিম আলী নামে পরিচিত। তার প্রোফাইল জানতে গুগল সার্চ করুন।

43.কাছাড় জেলার ‘বাম’ অঞ্চলের বন্যপ্রাণী-1: ড. আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী

 

দক্ষিণ আসামের কাছাড় জেলার বাম অঞ্চলটি মোটামুটিভাবে ধলাই, সোনাই নদী, লায়লাপুর, রেংটি পাহাড় এবং আসাম-মিজোরাম সীমান্ত বরাবর পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত একটি অঞ্চল । বিশ্বের জীববৈচিত্র্য মানচিত্রে, বাম অঞ্চলটি পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর ইন্দো-বার্মা হটস্পটের এক অংশ- যেখানে পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর উচ্চ বৈচিত্রতা বিরাজমান। রুকনি নদী যা বামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেটি সোনাই নদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপনদী ।রুকনি নদী তার ছোট ছোট উপনদী যেমন শিঙ্গরখাল, পানছড়া, ধলাখাল, নতছড়া এবং তিয়ামা (সোনাই নদীর একটি উপনদী) নিয়ে বামের জল নিষ্কাশন করে। সোনাই নদী আবার বরাক নদীর একটি প্রধান উপনদী।

     সমতল ভূমির মাঝে মাঝে   নিম্ন পাহাড় এবং টিলা দ্বারা বেষ্টিত হয়ে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিরাজমান।  বাম অঞ্চলের আবাসস্থলও বৈচিত্র্যময়। এখানে গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ 'বৃষ্টিবন'( রেইন  ফরেস্ট)সহ  সাভানা তৃণভূমি (বেশিরভাগই  দখলকৃত) রয়েছে । এই অঞ্চল  জলাভূমি এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বনে আবৃত ।বামের সমগ্র দক্ষিণ অংশটি ইনার লাইন সংরক্ষিত বন দ্বারা প্রভাবিত, যা আসামের বৃহত্তম সংরক্ষিত বনের এক বৃহৎ অংশ। মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল অনেকাংশে সংকোচিত ও খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। অনেক প্রজাতি হয় হারিয়ে গেছে বা বিলুপ্তির পথে।

     আমি ১৯৮৭ এবং ১৯৮৮ সালে বাম এবং এর আশেপাশের বনগুলিতে গবেষণা (ফিল্ড রিসার্চ) করার সুযোগ পেয়েছিলাম । পরবর্তী বছরগুলিতেও বিক্ষিপ্তভাবে মাঠগবেষণা করেছি। প্রকৃতপক্ষে, হুলক গিবনের ডাকের সাথে আমার প্রথম পরিচিতি হয়েছিল বামে, এবং আমি ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি জামালপুর গ্রামে আমাদের বাড়ি থেকে ডাকটি শুনেছিলাম ।

 

বন্যপ্রাণীঃ

 

      বাম অঞ্চলে 'বিপন্ন' হুলক গিবন সহ আট প্রজাতির প্রাইমেট বা বাঁদরজাতীয়  প্রাণী রয়েছে। ম্যাকাকের চারটি প্রজাতি আছে - অসমীয়া, রিসাস, স্টাম্প-টেইল্ড এবং পিগ-টেইলড। তারপরে রয়েছে আদিম স্লো লরিস (স্থানীয়ভাবে সরমিয়া বিলাই বলা হয়) ক্যাপড লঙ্গুর বা হনুমান এবং ফায়ারের  লিফ বানর বা চশমা বানর ও পাওয়া যায়। ঢোলে বা এশিয়ান বন্য কুকুর খুব বিরল হয়ে উঠেছে যখন হিমালয় বা এশিয়াটিক কালো ভাল্লুক এবং মালয় সূর্য ভাল্লুকও (সান বিয়ার )খুব বিরল। উভয় ভাল্লুক তাদের পিত্ত এবং পিত্তথলির  বাণিজ্যিক বাজারে চাহিদা  থাকার জন্য শিকারের গুরুতর হুমকির মধ্যে রয়েছে।

      বাম অঞ্চল থেকে বাঘ উধাও হয়ে গেছে। শেষ বড় বিড়াল সম্ভবত ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। চিতাবাঘ এবং ক্লাউডেড চিতা (১৯৮০ -এর দশকে খুলিছড়ার কাছে একটি নিহত হয়েছিল) এখনও পাওয়া যায় তবে খুব কম সংখ্যায়, বেশিরভাগ ইনার লাইন সংরক্ষিত বনে। ছোট বিড়ালদের মধ্যে রয়েছে ফিশিং, এশিয়ান গোল্ডেন, মার্বেলড, লেপার্ড এবং পাত বিড়াল। শেষটি সচরাচর মানুষের বাসস্থানের কাছে বসবাস করে।

      এশীয় হাতির পাল যা প্রায়  ১৯৪০এর দশক পর্যন্ত দেখা যেত, পরবর্তী বছরগুলিতে,সংখ্যায়  হ্রাস পেয়েছে এবং ১৯৬০  এর দশকের শেষের দিকে, কোন স্থায়ী জনসংখ্যা বেঁচে নেই। এমনকি কোন বিক্ষিপ্ত ঘটনা  ১৯৭০এর দশকের পরে রিপোর্ট করা হয়নি। জাভান এবং সুমাত্রান গন্ডার উভয়ই সম্ভবত অতীতে বামে বিদ্যমান ছিল।  ১৯৬৭ সালে, পুনিখাল এলাকা থেকে  সুমাত্রান প্রজাতির একটি গন্ডার,  রিপোর্ট করা হয়েছিল। সোয়াম্প ডিয়ার এবং বন্য  মহিষ এখন বিলুপ্ত কিন্তু  ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বেঁচে  থাকা অল্প সংখ্যক ভারতীয় 'বাইসন' (স্থানীয়ভাবে মেটনা বলা হয়)১৯৮০ -এর দশকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বার্কিং ডিয়ার বা মুন্টজাক এবং কিছু সাম্বার এখনও বেঁচে আছে যদিও হগ হরিণ সম্ভবত নিঃশেষ হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে "রাম ছাগল" নামে পরিচিত সেরো এখনও মাঝে মাঝে দক্ষিণের পাহাড়ে দেখা যায়। গাঙ্গেয় ডলফিন 'বিপন্ন' এবং অতীতে সোনাই রুকনি নদীর সঙ্গমস্থল থেকে বর্ষাকালে রিপোর্ট করা হত। মাছ ধরার জালে শ্বাসরোধে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ঘটলে এটি তেলের জন্য শিকার করা হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে  রয়েছে এশিয়াটিক বা গোল্ডেন জ্যাকল (স্থানীয়ভাবে বলা হয় হিয়াল), ক্রেস্টলেস হিমালয়ান সজারু (স্থানীয়ভাবে ছেদা বলা হয়), চাইনিজ প্যাঙ্গোলিন (স্থানীয়ভাবে বনরৌ  বলা হয়), তিনটি প্রজাতির উদ, বড় ভারতীয় সিভেট (স্থানীয়ভাবে বাগদাশ বলা হয়), ছোট ভারতীয় সিভেট, (স্থানীয়ভাবে  খাঢাশ বলা হয়), মুখোশযুক্ত পাম সিভেট, সাধারণ পাম সিভেট (স্থানীয়ভাবে মেখম, বোজরো-বাটুল বা শুর্মা কটা বলা হয়), হগ ব্যাজার (স্থানীয়ভাবে বলা হয় বালিয়া ছউর) এবং হলুদ-গলাযুক্ত মার্টেন।