Wednesday, 23 September 2026

77.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -7: কানন নাথ মজুমদার

 বাম কাছাড়ের কিছু প্রবাদ  ও প্রবচনঃ

যখন খুব ছোট ছিলাম,তখন বাড়িতে ধর্মগ্রন্থ পাঠের আসর  বা অন্য কোনও কারনে বসা আসরে  মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম  “গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন”-------- “।  তখন ধারণা হয়ে গিয়েছিলো যে  গীতা লিখেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।

তারপর যখন পাঠশালায় ভর্তি হয়ে শিখলাম

“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি ।

সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি ।

তখনও এই একই ধারনা কাজ করেছিলো । ভেবেছিলাম  ঈশ্বরই  আমাদের জন্য এগুলো  লিখে রেখেছেন ।

পরে এম  ই স্কুলে ভর্তি হয়ে শিখলাম –

“বসেছে আজ রথের তলায়

স্নান যাত্রার মেলা ।

সকাল থেকে বাদল হলো

ফুরিয়ে এলো বেলা।। “

           বা

ফুলের দলে প্রজাপতি ,হাসির পরে হাসি ।

এমন শোভা দেখতে আমি বড়ই ভালবাসি ।

উড়ে উড়ে  কেমন তারা বেড়ায় নেচে নেচে ।

ইন্দ্র ধনু  দিয়ে পাখা  -জান,কে এঁকেছে ?

যাঁর দয়াতে  গোলাপ ফুটে লোহিত বরন মাখা ।

যাঁর দয়াতে হাসিরছটায় শিশুর আনন ঢাকা ।।

রবিশশী ফুটিয়ে জগৎ আলো করেন যিনি ।

প্রজাপতির পাখায় হেন সাজ দিয়েছেন তিনি ।।

বুঝলাম -এ কবিতাগুলো ঈশ্বরের লেখা নয় । তাছাড়া  মাষ্টার মশাইদের  মুখে কবিদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম যে  – এ কবিতাগুলো ঈশ্বরের লেখা নয়।তবে ধারনা  হলো -কবিরা অসাধারণ কিছু মানুষ,তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নন ।

তবে ভুল ভাংলো ক্লাস   VII এ উঠার পর ।ধলাই বি এন এম পি  স্কুলে ভর্তি হলাম ।হাতে এলো ১৯৬১ সালে  প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিন “বামশ্রী” । দেখলাম বামশ্রীর অনেক লেখকই আমদের স্কুলের শিক্ষক ।তাছাড়া কবিতা আর অন্য  কিছু লেখায় স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রদের নাম আছে ।প্রাক্তন শিক্ষকও আছেন ।এর মধ্যে দুই একজন  আবার আমার পরিচিত । বুঝলাম যে কেউ লিখতে পারে । তবে নির্দিষ্ট বিষয় এবং ভাষার উপর  দখল থাকতে হবে ।

 বামশ্রীতেই পড়লাম –

“নে ফুল তুলে নে

যত খুশি সাজি ভরে।

সার্থক হোক তোর পুষ্প চয়ন

শরতের এ শান্ত প্রভাতে ।“

অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম । এখন বুঝতে পারি এ সব তো বাম কাছাড়েরই কাব্যপ্রতিভা  । দুর্গাপূজার আগমনি গান গুলোতে ও এতদঞ্চলের প্রচুর রচনা আছে ।বিজয়ায় দেখা যায় এঅঞ্চলের কবি বলছেন-

যাবেই যদি যা মা ,শুধু কথা দিয়ে যা,

বছর গেলে আসবে ফিরে ধরার বুকে মা

মা তোর আসার পথটি চেয়ে

রইবো সারা বছর ধরে…।

 এসব তো বাম কাছাড়েরই প্রতিভার প্রকাশ ।

………………………………………………………………………………………………………

Monday, 21 September 2026

76.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -6 :কানন নাথ মজুমদার

 প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে ধামাইলে প্রবর্তন করেন শ্রীকৃষ্ণের “ পুষ্প দোল” পালা ।তাঁর এই মহান প্রয়াসকে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন “রাধিকা ঠাকরুণ “,যিনি ছিলেন এই অঞ্চলের ধামাইল শিল্পের এক প্রোথিতযশা শিল্পী । তিনি তাঁর সুযোগ্যা শিষ্যা স্নেহলতা দেবী ,ঊষারাণী নাথ  প্রমূখ শিল্পীদেরে নিয়ে ,বিশেষ অনুশীলনের  মাধ্যমে “  পুষ্প দোল “ পালাকে জনপ্রিয় করে তুলেন  । “পুষ্প দোলের “ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বরাক উপত্যকায় ।নরসিংপুর,দুধপাতিল,লালা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে  ধামাইল শিল্পীরা ছুটে আসেন  পুষ্প দোলের তালিম নিতে ।পুষ্প দোল পালা সমগ্র বরাক উপত্যকায় ধামাইল শিল্পের আসরে  নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় অত্যন্ত সম্মানের আসনে ।আজও পুষ্প দোল বিরাজ করছে   স্বমহিমায় ।বৈশাখি পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের পুষ্প দোল পার্বণে সাদরে পালিত হয় পুষ্প দোল পালা ধামাইলের মাধ্যমে ।অত্যন্ত জনপ্রিয়তার  জন্য একদিনে পরিবেশিত এই  পালা জনগনের চাহিদা মিটাতে পারে না ।তাই পক্ষকাল  ব্যাপী চলে এই পালার ধামাইল কীর্তন ।ভনিতা অংশে রচয়িতার নাম উল্লেখ  থাকার রীতি অনুযায়ী পুষ্প দোল পালার কোনও গানে শোনা যায় “ভাবনেত্রে হেরে তাহা বৃন্দাবন দাস “

 

 

,আবার কোনও গানের শেষে আছে “ আশায় বসিয়া রইলো গোপাল ভিখারী “ ।

     পুষ্প দোলের ব্যাপক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এবং রাধিকা ঠাকরুনের ঐকান্তিক আগ্রহে  গোপাল দাস বাবাজী আরো আরো পালা কীর্তনের সন্ধান করতে থাকেন  ।শ্রী হরিলাল   চট্টোপাধ্যায়   সংকলিত এবং কানাইলাল চট্টোপাধ্যায়   প্রকাশিত “পদ্ রত্নমালা” শীর্ষক গ্রন্থে যদুনাথ দাস ,বাসু ঘোষ,দীনবন্ধু দাস,পূর্ণানন্দ দাস,রঘুনাথ দাস,রায়শেখর প্রভৃতি  পদকর্তাদের  রচিত “সুবল মিলন”এবং” রাই রাখাল” পালা দুটি তাঁর দৃষ্টি   আকর্ষণ করে ।শুরু হয় বিভিন্ন ছন্দে রচিত লেখাগুলোকে বিভিন্ন সুর  তাল লয়ের  বিন্যাসে  ধামাইলে  রূপায়িত করার অনুশীলন ।আশ্চর্যজনক ভাবে  আখরযুক্ত কীর্তনের নমুনাও  এখানে  সন্নিবেশিত হয় । সার্থক হয় প্রচেষ্টা ।এ দুটি পালাও ধামাইলে সুন্দর ভাবে আত্মপ্রকাশ করে ।

তাছাড়াও “ মুক্তালতাবলী”নামক গ্রন্থ,জয়নারায়ন  মুখোপাধ্যায় রচিত “ রাধাকৃষ্ণ  বিলাস” প্রভৃতি অসংখ্য গ্রন্থ থেকে  কৃষ্ণ লীলা বিষয়ক প্রচুর গান ধামাইলের জন্য নির্বাচিত হয় ।গোপাল দাস বাবাজীর স্বরচিত  কিছু গানও এতে স্থান পায় ।রাধা রমন দত্ত ,চৈতন্য চরণ পাল ,দ্বিজ বংশীদাস ,বাউল জীবন  প্রভৃতি  অসংখ্য রচয়িতাদের রচনা সম্ভারে  ধামাইল সমৃদ্ধ ।সূর্য ব্রত ,কালাঠাকুরের কীর্তন, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, অন্নপ্রাশন,বিয়ে,নানা দেব দেবীর  পুজোর মন্ডপে  ধামাইল তার  নিজস্ব  বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বিষয় ভিত্তিক  গানের সঙ্গে  ধামাইল পরিবেশন সামাজিক জীবনে  এক অপরিহার্য সংস্কৃতি ।

এদিকে পালা কীর্তন হিসাবে পুষ্প দোল আজও  স্বমহিমায় বিরাজমান থাকলেও গোপাল দাস আর রাধিকা ঠাকরুনের  দেহত্যাগের পর “সুবল মিলন” আর “রাই রাখাল“ পালাদ্বয় বিস্মৃতির  দিকে এগিয়ে  যেতে  থাকে । অনুশীলনের অভাবে  এগুলির প্রচার স্তব্ধ হয়ে গেলেও এ  অঞ্চলের প্রবীণ মানুষদের স্মৃতির দরজায় আজ ও কড়া নাড়ে এ দুটি পালা কীর্তন ।আজও রাধিকা ঠাকরুনের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যা,সুদক্ষ ধামাইল  শিল্পী প্রয়াতা স্নেহলতা  দেবীর সংগ্রহে,হাতে লেখা পালা কীর্তন দুটি সযত্নে রক্ষিত আছে ।(আর সৌভাগ্যক্রমে এই লেখিকা স্বর্গীয়া স্নেহলতা দেবীরই আত্মজা)

  বাম কাছাড়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে চর্যাপদের সময় থেকেই এখানে কাব্য চর্চা হয়ে আসছে । এটা আমাদের গর্ব । এই ধারাবাহিকতা  কিন্তু  হারিয়ে যায়নি । তাইতো দেখি আজ থেকে দেড়শত বছর আগেও   এতদঞ্চলে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ,সংস্কৃতি চর্চা ,ধামাইলের মতো  লোকনৃত্যের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধনের জন্য ব্যাপক অনুশীলন -আশ্চর্যজনক ভাবে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছিল ।  এখানকার শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক প্রতিভার আলোকে সমগ্র বরাক উপত্যকার সঙ্গীত চর্চার মানোন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে ।

পুঁথিগত শিক্ষা ছাডাও  বা শিক্ষিত হওয়া  সত্ত্বেও আঞ্চলিক ভাষাকে ভালোবেসে এই ভাষাতেই যে নিজের কাব্যপ্রতিভার   স্ফুরণ     ঘটানো যায় ,নিজের চিন্তাধারাকে সার্থক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়- তাও প্রমাণ করে দিয়েছে বামের ধামাইলের আসর । যেমন-

দিদি রোহিণী , গোপাল আমার বাড়িত নাই

(খেলতে) খেড়িত গেছেগিয়া

ওউত্তো তার এক বিরতি (বৃত্তি) অইছে

রাইত  পোয়াইতে খেড়িত গেছে

(তারে ) খাইবার কালো আনো ডাক দিয়া ।।

কেলেঙ্কারিয়া নারায়নে

বারোর দরবার ঘরো আনে

(আমি) তারে লইয়া মরতাম কোনবায় গিয়া ।

ঐতিহ্যবাহী বাম কাছাড়ের এই ইতিহাসকে জনসমক্ষে  তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের আলোকে বর্তমানকে আলোকিত  করতে না পারলে উত্তরসূরী হিসেবে  আমরা ব্যর্থ প্রতিপন্ন  হবো । তাই বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আবেদন রইলো – তারা যেন বিশেষ আনুধাবন আর অনুশীলনের মাধ্যমে ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্পকে আরো উচ্চমার্গে পৌঁছে দিতে যত্নবান হয় । আর তবেই  আমরা  হতে পারবো ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্প তথা বাম কাছাড়ের  সঙ্গীত চর্চার সার্থক উত্তরসূরী ।

……………………………………………………………………………………………….

75.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন-5 কানন নাথ মজুমদার

 বামের  লোকনৃত্য “ধামাইল”

বিপুলা পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বিচিত্রা পৃথিবীর কতো বৈচিত্র্য সম্ভার ।আদিম যুগ থেকেই  প্রকৃতির সঙ্গে  তাল মিলিয়ে  স্রষ্টার  শ্রেষ্ঠ  সৃষ্টি মানুষ নিজের সুখ দুঃখের অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে  নানাভাবে ,নানা ভঙ্গিমায় ।ব্যক্তির অভিব্যক্তি ক্রমে সামাজিক ভাবে রূপায়িত হয়েছে । সৃষ্টি হয়েছে  কতো শিল্পের, কতো সংস্কৃতির । এ ভাবেই বিভিন্ন লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ।যেমন পাঞ্জাবের ভাংরা ,  রাজস্থানের ডান্ডিয়া,গুজরাটের গরবা ,কেরলের ভেলাকালি,বাংলার  ছৌ,রায়বেশে প্রভৃতি ।

 কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ অর্থাৎ সমগ্র বরাক উপত্যকা এবং অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত সিলেট অঞ্চলের লোকনৃত্যই” ধামাইল “ নামে সুপরিচিত ।ছয়মাত্রা তালযুক্ত গানের সঙ্গে হাত তালি  সহযোগে বৃত্তাকারে সমবেত নৃত্যই এর  বৈশিষ্ট্য । বিভিন্ন পূজা পার্বণ,বিবাহ,অন্নপ্রাশনাদি উৎসবকে কেন্দ্র করে বিষয় ভিত্তিক  গানের সঙ্গে  এ নৃত্য পরিবেশিত হয় ।এ নৃত্যের একচ্ছত্র  অধিকার  মহিলাদের । শিল্পী বৃন্দ নিজেরাই গান গেয়ে গেয়ে  নৃত্য পরিবেশন করেন । রাধারমন দত্ত নামের জনৈক বিদগ্ধ শিল্পী তথা গীতিকারকে ধামাইলের জনক বলে আখ্যায়িত করা হয় ।

আজ থেকে প্রায় পয়ত্রিশ বছর আগে শিলচর শহরের  এক লোকসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এক  আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলাম ।সেখানে ধামাইল সম্বন্ধে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জনৈক লোক সংস্কৃতি গবেষক নিজের  বাঁ হাতের চেটোয় ডান হাত দিয়ে সজোরে আঘাত করে একটা পা প্রায় দেড় ফুট উপরে তুলে সজোরে তা মাটিতে ফেলে বললেন -ধা দিতে হাতের মইল  যদি না যায়, তবে আর ধামাইল কিসের?

বিস্মিত হলাম ।সেই মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠলো মাত্র কয়েক দিন আগে দূরদর্শনে দেখা  পশ্চিম বঙ্গের  পুরুলিয়া অঞ্চলের এক ছৌ   নৃত্যগুরুর বক্তব্য –“ লাফিয়ে যদি মাটি ফাটানো না গেলো  তবে আর ছৌ হলো কী করে ? ভাবলাম – এটা কি  একটা বক্তব্যের  উপর আরেকটা বক্তব্যের   প্রভাব ? অর্থাৎ বক্তব্যের  অন্ধ অনুকরণ  ,নাকি ধামাইলের উপর ছৌ এর অপ্রত্যাশিত হামলা ।

মেনে নিতে পারলাম না । আমি নিজে গ্রাম কাছাড়ের মেয়ে ,গ্রামেই জন্মেছি ,গ্রামেই বড় হয়েছি । গ্রামে প্রচলিত ধামাইল সম্বন্ধেও   যথেষ্ট ওয়াকিবহাল  বলে মনে করি ।শহুরে গবেষকের বক্তব্য  শুনে  বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম ।ধামাইল সম্বন্ধে  আরও জানার আগ্রহ  বেড়ে গেলো । নিজের এলাকা বাম কাছাড় ছাড়াও  সমগ্র বরাক উপত্যকায় প্রচলিত  ধামাইল সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম । সিলেট থেকে  আসা মানুষদের থেকে  ওখানকার  ধামাইল সম্বন্ধে  জানার চেষ্টা করলাম । এই অনুসন্ধানের  ফলে  জানতে পারলাম ধামাইল  সম্বন্ধে আমার ধারনাটাই ঠিক । বাম কাছাড়ের ধামাইলের সঙ্গে অন্যান্য  স্থানের  ধামাইলের  বিশেষ কোন ও পার্থক্য নেই ।

তবে এই  অনুসন্ধিৎসা আমাকে এমন একটা ঐতিহ্যের সন্ধান দিলো যা শুধুমাত্র বাম কাছাড়েরই নিজস্ব সম্পদ । প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে বিকশিত ,এখানকার নানা সমৃদ্ধ  ধামাইল সম্বন্ধে জানতে পেরে গর্বিত  বোধ করলাম । জানতে পারলাম- সিলেটে যেমন কিছু   উদ্যমী ধামাইল প্রেমিক নানা  তাল ও পায়ের কাজের মাধ্যমে ধামাইল কে জনপ্রিয় করে তুলেছেন , আমাদের বাম কাছাড়েও  সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল ,তবে তুলনায় অনেক বেশী ।সে প্রচেষ্টায় ছিল অভিনবত্ব,ছিল  চমৎকারীত্ব ।কাছাড়ের  কিছু শিল্প স্রষ্টা  নিজের নৈপুন্যকে ধামাইলের  উন্নতি সাধনে  নিয়োগ করে আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও তাদের কীর্তি শুধু  বাম অঞ্চলে নয় সমগ্র বরাক উপত্যকায় আজও বেঁচে আছে ।

সাধারণভাবে বিভিন্ন পার্বণ বা অনুষ্ঠান কেন্দ্রীক  কিছু  গান মোটামোটি   সর্বত্রই সমান ভাবে  ধামাইলে অনুশীলিত হলেও বাম কাছাড়ের বিশেষত্ব   অন্য জায়গায় ।এক্ষেত্রে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশী,তিনি হলেন পানিভরা গ্রামের গোপাল দাস  নামক জনৈক বৈষ্ণব কবি , সংসার জীবনে অর্থাৎ গার্হস্থ আশ্রমে যাঁর নাম ছিল গোপী চরণ নাথ । তীর্থ ভ্রমণ উদ্দেশ্যে তিনি বৃন্দাবন যাত্রা করে সেখানে বহু দিন বসবাস করেন এবং বহু বৈষ্ণব কবির সান্নিধ্য লাভ করেন ।সেইসব মহান বৈষ্ণব কবিদের  রচিত অমূল্য কয়েকটা  কাব্য গ্রন্থ নিয়ে  যখন গ্রামে ফিরে আসেন তখন সেই গুলিকেই এখান কার কীর্তনে এবং ধামাইলে  প্রয়োগ করতে থাকেন ।তাঁর নিজের কাব্য প্রতিভাও এখানে সংযোজিত  হয়।

………………………………………………………………………………………………………..

Friday, 18 September 2026

74.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন-4 কানন নাথ মজুমদার

          সম্প্রীতির পরিবেশে,  একাত্মতা বজায় রেখে,  সমবেত প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠিত এই পুতুল বিয়ের অনুষ্ঠান স্মৃতির সরণি বেয়ে হৃদয়তন্ত্রীতে অনুরণিত হয় আজও । আর এই সুন্দর সংস্কৃতিটিকে টিকিয়ে রাখার অভিপ্রায়ে,  আজকের প্রজন্মের কাছে এর অনুভূতিটুকুকে আরো আকর্ষণীয় করে পৌঁছে দেওয়ার মানসেই "পুতুল বিয়ে"র সামগ্রিক চিত্রের উপস্থাপন ছন্দে ছন্দেঃ

বর্ষশেষের সংক্রান্তিতে

পুতুল বিয়ের লগ্ন ।

পুতুল যাদের পুত্রকন্যা 

চিন্তায় তারা মগ্ন  ।।

রিতার চোখে ঘুম নেই

মেয়ে রিঙ্কুর জন্য  ।

মাসেক কাল বয়েস হলো

জামাইতো নগণ্য  ।।

চলছে রীতা জামাইর খোঁজে 

সীতার সনে দেখা ।

ভাবনা শুনে বললে সীতা

"এইতো বিধির লেখা ।।

পিন্টুর মোর বয়স হলো

বউ আনতে চাই ।

তোমার রিঙ্কু আসলে ঘরে

আমার চিন্তা নাই ।।"

রইলো কথা পাকাপাকি 

চললো দোহে ঘর ।

মায়ের কাছে বললে রীতা

বড়ই সুখবর ।।

সাজো সাজো রব পড়েছে 

কনের বাড়ির কাজ ।

একটু যদি ত্রুটি থাকে

পাবো বড় লাজ ।।

রসগোল্লা, জিলিপি আর

পায়েস মিষ্টি দই ।

সফরীকলা নারিকেল

পান সুপারি খই ।।

আয়োজনের সমাপনে

প্রতীক্ষার পালা ।

ঘন ঘন পথ চাওয়া 

কনের মার জ্বালা ।।

আসবে কবে বরের পক্ষ 

এতো দেরী কেন ?

আয়োজন আর বিয়ের লগ্ন 

মাটি হয় না যেন ।।

ঘরে বাইরে আনাগোনা 

ধৈর্য নাহি রয় ।

টেলিফোনে বরের মায়ে

ডেকে রীতা কয় ।।

"বরকে নিয়ে আসছিস না যে

কেমন বেয়ান তুই ।

আয়োজন সব নষ্ট হবে

পঁচে যাবে দই ।।"

"এইতো আমি এলেম বলে

দেরী হলো কই ?

বরযাত্রী গীতা, মায়া

আসতে বাকী সই ।।"

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _

 

 

জামাই এলো বিয়ে হলো

উলু দিলো সবে ।

হৈ হুল্লোড় কানে তালা

বিয়ে বাড়ির রবে ।।

মাতা এসে হেসে হেসে

বলেন "বসো খেতে ।

বরের পক্ষ কনের মা

সবাই আসন পেতে ।।"

খাওয়া হলো যথারীতি 

বাজলো বিদায় সুর ।

প্রাণ উড়ে যায় কনের মায়ের

কি হবে রিঙ্কুর ।।

কেমন করে ওকে ছেড়ে 

একলা ঘরে রই ।

আরতো আমার পুতুল নেই

এক রিঙ্কু বই ।।

সীতা এসে বুঝায় তারে

কেঁদোনা বেয়ান ।

বিয়ে হলে যেতে হবে

এইতো হলো আইন ।।

শোভাযাত্রায় যেতে দাও

প্রতিনিধির সাজে ।

বিশ্ব নবদম্পতির

কল্যাণ-সভা মাঝে ।।

 সবাই মিলে জাহাজ সাজায়

ফুল-মালা দিয়ে ।

হুইসেল দিয়ে ছাড়লো জাহাজ

বর-বধূ নিয়ে ।

 

…………………………………………………………………………………….