প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে ধামাইলে প্রবর্তন করেন শ্রীকৃষ্ণের “ পুষ্প দোল” পালা ।তাঁর এই মহান প্রয়াসকে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন “রাধিকা ঠাকরুণ “,যিনি ছিলেন এই অঞ্চলের ধামাইল শিল্পের এক প্রোথিতযশা শিল্পী । তিনি তাঁর সুযোগ্যা শিষ্যা স্নেহলতা দেবী ,ঊষারাণী নাথ প্রমূখ শিল্পীদেরে নিয়ে ,বিশেষ অনুশীলনের মাধ্যমে “ পুষ্প দোল “ পালাকে জনপ্রিয় করে তুলেন । “পুষ্প দোলের “ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বরাক উপত্যকায় ।নরসিংপুর,দুধপাতিল,লালা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ধামাইল শিল্পীরা ছুটে আসেন পুষ্প দোলের তালিম নিতে ।পুষ্প দোল পালা সমগ্র বরাক উপত্যকায় ধামাইল শিল্পের আসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় অত্যন্ত সম্মানের আসনে ।আজও পুষ্প দোল বিরাজ করছে স্বমহিমায় ।বৈশাখি পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের পুষ্প দোল পার্বণে সাদরে পালিত হয় পুষ্প দোল পালা ধামাইলের মাধ্যমে ।অত্যন্ত জনপ্রিয়তার জন্য একদিনে পরিবেশিত এই পালা জনগনের চাহিদা মিটাতে পারে না ।তাই পক্ষকাল ব্যাপী চলে এই পালার ধামাইল কীর্তন ।ভনিতা অংশে রচয়িতার নাম উল্লেখ থাকার রীতি অনুযায়ী পুষ্প দোল পালার কোনও গানে শোনা যায় “ভাবনেত্রে হেরে তাহা বৃন্দাবন দাস “
,আবার কোনও গানের শেষে আছে
“ আশায় বসিয়া রইলো গোপাল ভিখারী “ ।
পুষ্প দোলের ব্যাপক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এবং
রাধিকা ঠাকরুনের ঐকান্তিক আগ্রহে গোপাল দাস
বাবাজী আরো আরো পালা কীর্তনের সন্ধান করতে থাকেন
।শ্রী হরিলাল চট্টোপাধ্যায় সংকলিত
এবং কানাইলাল চট্টোপাধ্যায় প্রকাশিত “পদ্
রত্নমালা” শীর্ষক গ্রন্থে যদুনাথ দাস ,বাসু ঘোষ,দীনবন্ধু দাস,পূর্ণানন্দ দাস,রঘুনাথ
দাস,রায়শেখর প্রভৃতি পদকর্তাদের রচিত “সুবল মিলন”এবং” রাই রাখাল” পালা দুটি তাঁর
দৃষ্টি আকর্ষণ করে ।শুরু হয় বিভিন্ন ছন্দে
রচিত লেখাগুলোকে বিভিন্ন সুর তাল লয়ের বিন্যাসে
ধামাইলে রূপায়িত করার অনুশীলন ।আশ্চর্যজনক
ভাবে আখরযুক্ত কীর্তনের নমুনাও এখানে সন্নিবেশিত
হয় । সার্থক হয় প্রচেষ্টা ।এ দুটি পালাও ধামাইলে সুন্দর ভাবে আত্মপ্রকাশ করে ।
তাছাড়াও “ মুক্তালতাবলী”নামক
গ্রন্থ,জয়নারায়ন মুখোপাধ্যায় রচিত “ রাধাকৃষ্ণ বিলাস” প্রভৃতি অসংখ্য গ্রন্থ থেকে কৃষ্ণ লীলা বিষয়ক প্রচুর গান ধামাইলের জন্য নির্বাচিত
হয় ।গোপাল দাস বাবাজীর স্বরচিত কিছু গানও এতে
স্থান পায় ।রাধা রমন দত্ত ,চৈতন্য চরণ পাল ,দ্বিজ বংশীদাস ,বাউল জীবন প্রভৃতি
অসংখ্য রচয়িতাদের রচনা সম্ভারে ধামাইল
সমৃদ্ধ ।সূর্য ব্রত ,কালাঠাকুরের কীর্তন, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, অন্নপ্রাশন,বিয়ে,নানা
দেব দেবীর পুজোর মন্ডপে ধামাইল তার
নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বিষয় ভিত্তিক গানের সঙ্গে
ধামাইল পরিবেশন সামাজিক জীবনে এক অপরিহার্য
সংস্কৃতি ।
এদিকে পালা কীর্তন হিসাবে পুষ্প
দোল আজও স্বমহিমায় বিরাজমান থাকলেও গোপাল দাস
আর রাধিকা ঠাকরুনের দেহত্যাগের পর “সুবল মিলন”
আর “রাই রাখাল“ পালাদ্বয় বিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে
। অনুশীলনের অভাবে এগুলির প্রচার স্তব্ধ হয়ে
গেলেও এ অঞ্চলের প্রবীণ মানুষদের স্মৃতির দরজায়
আজ ও কড়া নাড়ে এ দুটি পালা কীর্তন ।আজও রাধিকা ঠাকরুনের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যা,সুদক্ষ
ধামাইল শিল্পী প্রয়াতা স্নেহলতা দেবীর সংগ্রহে,হাতে লেখা পালা কীর্তন দুটি সযত্নে
রক্ষিত আছে ।(আর সৌভাগ্যক্রমে এই লেখিকা স্বর্গীয়া স্নেহলতা দেবীরই আত্মজা)
বাম কাছাড়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে
চর্যাপদের সময় থেকেই এখানে কাব্য চর্চা হয়ে আসছে । এটা আমাদের গর্ব । এই ধারাবাহিকতা কিন্তু
হারিয়ে যায়নি । তাইতো দেখি আজ থেকে দেড়শত বছর আগেও এতদঞ্চলে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ,সংস্কৃতি চর্চা
,ধামাইলের মতো লোকনৃত্যের সর্বাঙ্গীন উন্নতি
সাধনের জন্য ব্যাপক অনুশীলন -আশ্চর্যজনক ভাবে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছিল । এখানকার শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক প্রতিভার আলোকে সমগ্র
বরাক উপত্যকার সঙ্গীত চর্চার মানোন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে ।
পুঁথিগত শিক্ষা ছাডাও বা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও আঞ্চলিক ভাষাকে ভালোবেসে এই ভাষাতেই যে
নিজের কাব্যপ্রতিভার স্ফুরণ
ঘটানো যায় ,নিজের চিন্তাধারাকে সার্থক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়- তাও প্রমাণ করে
দিয়েছে বামের ধামাইলের আসর । যেমন-
দিদি
রোহিণী , গোপাল আমার বাড়িত নাই
(খেলতে)
খেড়িত গেছেগিয়া
ওউত্তো
তার এক বিরতি (বৃত্তি) অইছে
রাইত পোয়াইতে খেড়িত গেছে
(তারে
) খাইবার কালো আনো ডাক দিয়া ।।
কেলেঙ্কারিয়া
নারায়নে
বারোর
দরবার ঘরো আনে
(আমি)
তারে লইয়া মরতাম কোনবায় গিয়া ।
ঐতিহ্যবাহী বাম কাছাড়ের এই
ইতিহাসকে জনসমক্ষে তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের
আলোকে বর্তমানকে আলোকিত করতে না পারলে উত্তরসূরী
হিসেবে আমরা ব্যর্থ প্রতিপন্ন হবো । তাই বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আবেদন রইলো
– তারা যেন বিশেষ আনুধাবন আর অনুশীলনের মাধ্যমে ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্পকে আরো উচ্চমার্গে পৌঁছে দিতে যত্নবান হয় । আর
তবেই আমরা হতে পারবো ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্প তথা বাম কাছাড়ের সঙ্গীত চর্চার সার্থক উত্তরসূরী ।
……………………………………………………………………………………………….