Tuesday, 29 September 2026

82.বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ -4 :সাবির আহমদ চৌধুরী

 মৈতৈ মণিপুরী বাম অঞ্চলে বসবাসকারী এক অন্যতম বৃহৎ সম্প্রদায়। ভাগাবাজার গাঁও পঞ্চায়েত সংলগ্ন ইসলামাবাদ (তেলিচিবা) এবং ধলাই গাঁও পঞ্চায়েতের রামপ্রসাদপুর গ্রামে বেশির ভাগ মণিপুরি দের বাস। রুকনি নদীর পূর্ব তীরের কিছু গ্রামেও এককালে মণিপুরিদের বসতি ছিল। বর্তমানে অবশ্য তারা অন্যত্র চলে গিয়েছেন।

মণিপুরিদের ভাষা মেইটেলন (Meiteilon)। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী। তাছাড়া তারা Sanamahism (Apokpa) নামীয় মতবাদেরও অনুসারী। বর্তমানে কিছু সংখ্যক খৃষ্ট ধৰ্ম মতাবলম্বী মণিপুরিও আছেন। তাদের স্বকীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবাদির নাম হল সাজিবু (Sajibu), চাইরাওবা (Chairaoba), লাই হারাওবা (Laai Haraoba), ইয়াওসাং (Yaoshang)। মূলতঃ মণিপুরি সম্প্রদায় বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী হলেও হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি তারা যথারীতি পালন করেন। হিন্দু ধর্মের পূজা পার্বন গুলো পালনেও তাদের নিজস্ব ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য মেনে চলেন। চৈত্র মাসের শেষ দিনে চৈত পূজাকে তারা পাহোউবী এবং তার পাঁচ দিন পর লক্ষ্মী পূজাকে ইমোইনুকৌই অনুষ্ঠান রূপে পালন করেন। আশ্বিন মাসে আবার দূর্গাপূজাকে পাহৌইবী পূজা রূপে পালন করেন।

 

 

য়ুমলই-এর স্থান মণিপুরিদের গৃহে নির্দিষ্ট থাকে। আদিকাল থেকে তাদের গুরু সিদবা (পরমপুরুষের) পূজা চলে আসছে। এ ছাড়া কার্তিক মাসে রথযাত্রা, কালী পূজার দুদিন পরে নিঙোল চাকৌবা (ভগিনী ভোজন) ইত্যাদি মণিপুরিদের অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। ভগিনী ভোজন উৎসব তাদের মতে চূড়াচাঁন্দ মহারাজের প্রবর্তিত উৎসব। ভাগ্য চন্দ্র মহারাজ প্রবর্তিত হৌদোক্লম্বনী উৎসবও জনপ্রিয়। পরবর্তীতে নিত্যরাস, বসন্ত রাস, ষণ শেনক বা রাখাল রাস, উদখোল, জলকেলী ইত্যাদি রাস তাদের মধ্যে প্রচলিত হয়।

 ভাগাবাজার গাঁও পঞ্চায়েতের পার্শ্ববর্তী ইসলামাবাদ (তেলিচিবা) গ্রামে মৈতৈ মণিপুরিদের পাশাপাশি মৈতৈ মুসলিম মণিপুরিদের বাস। এখানে ৭৬টি মৈতৈ মুসলিম পরিবার রয়েছে। তাদের ভাষা পুরোপুরি মৈতৈ মণিপুরি। মহিলারাও মৈতৈ মণিপুরিদের মতই ঘরে বোনা মেখলা পরিধান করেন। ভাষা, বেশভূষা ও শারীরিক গড়নে তাদেরকে মৈতৈ (হিন্দু) মণিপুরি থেকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক হতে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে।

 বামের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের কিছু ফরেস্ট ভিলেজে ব্রু বা রিয়াং উপজাতির মানুষদের বসবাস রয়েছে। তাদের ভাষা হল কাউব্রু (Kaw Bru)। ধর্ম বিশ্বাসে তারা খৃষ্টান ও হিন্দু - এই দুই ধর্ম মতের অনুসারী। দুই ভিন্ন ধর্মমতের অনুসারিরা স্বাভাবিক ভাবেই নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী যথাক্রমে বড়দিন এবং দূর্গাপূজা ও বিষ্ণুপূজা উদযাপন করে। গ্রামের মধ্যে (পুঞ্জিতে) একজন গাঁওবুড়া বা রাই (Rai) থাকে যার নির্দেশ মতে গ্রামের  সবাইকে চলতে হয়। বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানেও 'রাই' য়ের অনুমতি লাগে। জুম চাষ, জংলী পশু পাখী শিকার, মাছ শিকার ইত্যাদির মাধ্যমে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।

 

বামে যথেষ্ট সংখ্যক হিন্দী ও ভোজপুরিভাষী লোক রয়েছেন। হিন্দু ধর্মের অন্যান্য পূজা পার্বনের সাথে তারা অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে ছট পূজা পালন করেন। সে সময় রুকনি নদীর ঘাটগুলো পূজা অর্চনার ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠে। হিন্দীভাষীদের সাথে অল্প সংখ্যক উড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। পৌষমাসে তারা টুসু পূজা উদযাপন করেন। এছাড়াও রয়েছেন বিষ্ণুপ্ৰিয়া মণিপুরি। মৈতৈ মণিপুরিদের সাথে তাদের শুধুমাত্র ভাষাগত বৈসাদৃশ্য রয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠান তারা মণিপুরিদের মতই পালন করেন।

বামের সামাজিক ,ভাষিক ,সাংস্কৃতিক ও  ধর্মীয় বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য সাধনের এক মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে এখানকার মানুষের খেলাধূলা বিশেষ করে ফুটবল খেলার প্রতি অদম্য আগ্রহ । এক কালে বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল স্কুল সংলগ্ন রুকনি নদী  ঘেঁষা সবুজ  বিশাল খেলার মাঠ ছিল এতদঞ্চলের খেলাধূলার মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু । প্রতি বছর এখানে  ফুটবল  টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হত । বিকাল হলে তখন চারি  দিক থেকে  মাঠের দিকে জনস্রোত দেখা যেত। সেই জনস্রোত ছিল ক্রীড়া প্রেমী হিন্দু,মুসলিম  বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী ,মনিপুরী এমনকি  পার্শ্ববর্তী রাজ্যের  বাসিন্দা মিজো লোক ও । এই ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এখানে কয়েকটি সক্রিয় ক্লাব  গড়ে উটেছিল জেগুলো থেকে জিলা স্থরের  খেলার খেলোয়াড় বের হতেন । কালক্রমে মাঠটি ধীরে ধীরে নদীর ভাঙ্গনে  বিলীন হয়ে যায় এবং  মাঠের বিলুপ্তির সাথে সাথে যেন এ অঞ্চলের খেলাধূলা বিশেষ করে ফুটবল খেলা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় । অবশ্য ক্রিকেট খেলায়  ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও ফুটবলের  প্রতি  মানুষের আকর্ষণ কমার এক অন্যতম কারণ বলেও মনে করা হয়।

বিগত কয়েকটি দশকে  বাম খেলাধূলায়  অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল । কিন্তু কয়েক বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বাম  ধলাইয়ের মাতৃভূমি নামক সামাজিক ও  সাংস্কৃতিক সংস্থা  মুখ্যত ফুটবল সহ  অনান্য   সাংস্কৃতিক চর্চার আয়োজনের সাথে সাথে ফুটবল খেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার নতুন ভাবে  উদীপ্ত করে তুলে । ধলাই বি এন এম পি  স্কুল মাঠে প্রতিবছর নিয়মিত ভাবে  ফুটবল টুর্নামেন্ট করা হয় যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ভাষার  হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি  এক সময়ে প্রায় ফুটবল উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছে যায় ।এখানে উল্লেখ করতেই হয় এ খেলাকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক সম্প্রীতির বাতাবরণ লক্ষ্য করা যায় , তাকে বামের চিরাচরিত  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুন্দর ,অপরিবর্তনীয় ধারাবাহিক ঐতিহ্য রূপে আখ্যায়িত করলে অত্যুক্তি হবেনা মোটেই।

 ‘মাতৃভূমি’ ছাড়াও বিগত বছর গুলোতে  রাজনগর ব্রাইট স্টার ক্লাব ও লায়লাপুরের  মইনুল হক  চৌধুরী মেমোরিয়াল ক্লাব  ও প্রতি বছর ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে যার মাধ্যমে বামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের প্রতিফলন ঘটে ।

  উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাম নামক প্রত্যন্ত ও অখ্যাত অঞ্চলটি এক বিস্ময়কর ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির মিশ্রণস্থল( melting pot), যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও  এক   অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের সুর ধ্বনিত হয়। সে সুর অখন্ড মানবতার, সে সুর প্রকৃত ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির। তাই তো এতো বিভেদের মধ্যেও আজ পর্যন্ত এতদঞ্চলে ভাষা, ধর্ম নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে নি। দিকে দিকে যখন ধর্মীয় বিভেদের উন্মত্ত বাতাস, মানুষে মানুষে যখন পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ তখনও এই অঞ্চলের মানুষ এ সমস্ত কলুষতা থেকে নিজেদের সমাজকে মুক্ত রেখেছেন। যদিও আজ থেকে প্রায় ৭৪ বছর আগে এ' অঞ্চলে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনোও এক ভুল বোঝাবুঝির দরুণ এবং কিছুটা গুজবের উপর ভিত্তি করে এক অনাকাংক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল তা কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের তৎপরতায় অঙ্কুরেই নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। আজ অবধি সে ধরণের কোনো ঘটনার কোথাও কোনো পুনরাবৃত্তি হয় নি। "বিভেদের মধ্যে ঐক্য" - বহু ভাষা, বহু ধর্মের, বহু সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বামবাসীর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট - একথাটি অকুন্ঠচিত্তে বলা যায়।

 …………………………………………………………………………………………………………………………

লেখক পরিচিতিঃ-

বাম ভাগাবাজারের বাসিন্দা সাবির আহমদ চৌধুরী সোনাইর এম.সি. দাস কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং নব প্রতিষ্ঠিত সাউথ কাছাড়  কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ । বর্তমানে তিনি সাহিত্য চর্চা ছাড়াও বিভিন্ন সমাজ কল্যানমূলক কাজে নিজেকে নিবেদিত করে রেখেছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Monday, 28 September 2026

81.‘বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ -3:সাবির আহমদ চৌধুরী

 আসাম-মিজোরাম সীমান্তবর্তী ফাইলেং, খুলিছড়া কুকীপুঞ্জিতে রয়েছে মিজো , কুকি ও মার সম্প্রদায়ের লোকের বাস। মূলতঃ খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী মিজোরা রোমান ক্যাথলিক ও প্রেসবিটেরিয়ান - এই দুই প্রধান শাখায় বিভক্ত। প্রেসবিটেরিয়ান বা প্রটেস্টান্টরা আবার U.P.C. (United Pentecostal Church), E.F.C., I.C.I.(Independent Church of India), B.C.I. (Baptist Church of India), Seven Day Adventist ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত।

   'সেভেন ডে' মতাবলম্বীরা শনিবারে গির্জায় উপাসনা করে। মদ ও শূকরের মাংস তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ খাদ্যদ্রব্য রূপে গণ্য করা হয়। খ্রীষ্টমাস বা বড়দিন মিজোদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও তাদের নিজস্ব সামাজিক সাংস্কৃতিক উৎসব, অনুষ্ঠান রয়েছে। চাপচারকুট (Chapcharkut) হল সে রকম একটি উৎসব যা মিজোরা বৎসরে একবার খুব আড়ম্বরের সাথে পালন করে। জুন মাসের ৫ তারিখে অন্য একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয় যার মাধ্যমে Holy Spirit কে আবাহন করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি Penticost Day নামে অভিহিত। Bamboo Dance মিজোদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন নৃত্যানুষ্ঠান সর্বভারতীয় স্থরে যার পরিচিতি রয়েছে।

 

  রুকনি নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত শেওড়ারতল, খকড়াপুঞ্জি, হাডামাপুঞ্জি, বালুখাল, ধলাই বাজারের পার্শ্ববর্তী গ্রামে প্রচুর সংখ্যক ডিমাসা বা বর্মণ সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাদের ভাষা ডিমাসা। ধর্মীয় দিক দিয়ে তারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী এবং কিছু সংখ্যক খৃষ্টানও রয়েছেন। বাঙ্গালী হিন্দুদের দূর্গাপূজা এবং খৃষ্টানদের বড়দিন এ'দুটি তাদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শেওড়ারতল গ্রামে ১৯৩৭ সাল থেকে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। দুর্গাপূজার পাশাপাশি, গ্রামবাসীরা ‘সংগ্রাইন’ (মাঘ বিহু)ও উদযাপন করেন। ।

  বুশু হল বর্মন ডিমাসা সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত প্রধান উৎসব। এটি অত্যন্ত আড়ম্বর এবং জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। ফসল কাটার পরে এটি উদযাপিত হয়। বুশু মানে ব্রাই-শিবরাই ডিমাসা সমাজে একজন সর্বোচ্চ দেবতা। শান্তির জন্য ব্রাই-শিবরাইকে ধানের নতুন ফসল দেওয়া হয়। তিন ধরনের বুশু রয়েছে -সুরেম বুশু যা তিন বা পাঁচ দিন স্থায়ী হয়, হ্যাংসিও মানাওবা বুশু সাত দিন এবং জিদাব বুশু শুধুমাত্র এক দিনের জন্য পালন করা হয়। প্রতিদিন একটি সাম্প্রদায়িক ভোজে নিহত পশু ও পাখির মাংস খাওয়া হয়। প্রথম দুই থেকে তিন দিন খারাম(ঢোল) মুরী  (শিঙ্গা) বাজনার সাথে বুশু গান গেয়ে থাকে। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়েরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে উৎসবে সারা রাত নাচতে থাকে।

 

  আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে বাম অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। চাকমা, খাসিয়া, মার, রিয়াং, টিপরা, ও নাগা তাদের অন্তর্ভুক্ত। বামের অনেকগুলো ফরেস্ট ভিলেজে রয়েছে তাদের অবস্থান। উপজাতিদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক খাসিয়া রয়েছেন বামের বিভিন্ন ফরেস্ট ভিলেজে। তাদের মধ্যে খাসি, প্নার (Pnar) ও ওয়ার (War) - এই তিনটি ভাষার প্রচলন রয়েছে। খকড়া, মালপুঞ্জি, হাডামাপুঞ্জি, বালুখালপূঞ্জি, পূর্ব ও পশ্চিম ধলাখাল খাসিয়াপুঞ্জি এবং বাঘখাল নামে পরিচিত পাহাড়ী অঞ্চলসমূহে মূলতঃ তাদের বাস। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা খৃষ্টান, সেং খাসি। সেংখাসি (Seng Khasi) তাদের প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসব। তাছাড়া বাদেইয়েং খ্লাম (Bahdiengklam) নামক ধর্মীয় উৎসব তারা প্রধান উৎসব রূপে পালন করে থাকে। খৃষ্টানদের বড়দিন উৎসব তো হয়ই। বামের মিজোরাম সীমান্তে মিজোদের সাথে মার (Hmar) উপজাতির বসবাস রয়েছে। তাদের মাতৃভাষাও মার (Hmar)। মিজোদের মতো তারাও খৃষ্ট ধৰ্মে বিশ্বাসী, মূল বিভেদ ভাষাগত। মারদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎসব হল শিকপুই রুওই (Sikpui Ruoi)। জুমচাষ তাদের প্রধান জীবিকা হলেও আজকাল তাদের মধ্যে কিছুটা ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁকও পরিলক্ষিত হয়।

 

বামের জনসংখ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছেন বাঙ্গালী হিন্দুরা। হিন্দুদের মধ্যে পাল, দাস, রায়, নমশূদ্র, পাটনি,পুরকায়াস্থ ,শুক্লবৈদ্য ইত্যাদি উপাধির মানুষ রয়েছেন। বাঙ্গালী হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা মহা আড়ম্বরে পালিত হয়। বৃহৎ সংখ্যক সার্বজনীন মন্ডপে দূর্গাপূজার আরতির আয়োজন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা নিজ নিজ মন্ডপে দূর্গাপূজার আয়োজন করেন। দূর্গাপূজার পরেই রয়েছে কালিপূজা, লক্ষ্মী পূজা যেগুলো সার্বজনীন ভাবে পালন করা হয়। এছাড়াও রয়েছে দোল পূর্ণিমা। বামের অধিবাসীদের মধ্যে হিন্দুস্থানী সম্প্রদায়ের লোকও রয়েছেন বিশাল সংখ্যায়। দূর্গাপূজা ছাড়াও তারা ছট পূজা মহা সমারোহ উদযাপন করেন। সংখ্যায় কম হলেও নাগা সম্প্রদায়ের কিছু অধিবাসী রয়েছেন বাম অঞ্চলের ধলাই ও ভাগাবাজার এলাকায়। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা খৃষ্টান ও টি.আর.সি. (Tingka Raguang Clapriak) - এই দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত। রংমাই ও নাগা, এই দুই ভাষায় তারা কথা বলে। টি.আর.সি. সম্প্রদায় দূর্গাপূজা ও কালিপূজা পালন করে না কিন্তু পূজো দুটোকে তারা মানে এবং এ উপলক্ষে হাস ও মুরগি বলি দেয়। টি.আর.সি. সম্প্রদায়ভুক্ত নাগারা বছরে দুটি উৎসব পালন করে। জানুয়ারি মাসে উদযাপিত Gaangaa সবচেয়ে বড় উৎসব। Dikap নামে আরও একটি উৎসব আছে যা শুধু যুবতী মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। খৃষ্টধর্মে বিশ্বাসী নাগাদের মূল ধর্মীয় উৎসব বড়দিন।

 নাগাদের দুটি সম্প্রদায়ই মৃতদেহ কবর দেয়। সাত ফূট গভীর গর্ত করে কফিন বন্দী মৃতদেহ রেখে তার উপর বাঁশ বিছিয়ে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। মৃতদেহ সাদা কাপড়ে আবৃত করা হয়।

মদ ও শূকরের মাংস নাগাদের কাছে দুটি অপরিহার্য ভোগ্যবস্তু। জন্ম এবং মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই এ' দুটির ব্যবহার অনিবার্য। মৃত্যুর পর পাঁচ দিনের মাথায় Kainit Suakmai  এবং বছরে একবার Ngaitom mei নামে দুটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান মৃতের সদ্গতির উদ্দেশ্য করা হয়। নাগাদের একটি গ্রুপের কাছে বাইবেল হল পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। TRC সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ হল Ralarik। Lugailen Rongmai নামে ভাগাবাজার নিবাসী এক নাগা নাগরিকের কাছ থেকে এ সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। শূকর পালন করে বিক্রি করাই এতদ অঞ্চলের নাগাদের প্রধান পেশা। অবশ্য দেশী মদ বিক্রির ব্যবসাও তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।

…………………………………………………………………………………………………………………………………..

Sunday, 27 September 2026

80.‘বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ -2 :সাবির আহমদ চৌধুরী

    বামের মুসলমান মাইমাল সম্প্রদায়ের মধ্যে গাজির গানের প্রচলন আছে । গাজিরগান নৃত্য সহকারে করা হয় । গাজিরগানের  খলিফা  বা দল প্রধান গান  করেন ও অন্যরা  তার সঙ্গে দোহার দেন

  ঈদুল ফিতর এবং ঈদ উল আদহা, যা রোজার ঈদ এবং বকরি ঈদ হিসেবেও পরিচিত, বাম মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদের চাঁদ দেখা একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি যা রমজানের শেষে পালিত হয়। আধুনিক সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে, গ্রামবাসীরা গ্রামের রাস্তায় জড়ো হয়ে পশ্চিম দিগন্তের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ঈদের চাঁদ খুঁজতেন।

 এই চাঁদ দেখা ছিল উত্তেজনা এবং প্রত্যাশায় ভরা। আবহাওয়া মেঘলা থাকলে চাঁদ দেখা কঠিন হয়ে উঠত। চাঁদ না দেখা গেলে তারা ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরত, পরের দিনের রোজার প্রস্তুতি নিত। কিন্তু চাঁদ দেখা গেলে, গ্রামবাসীরা মহিষের শিং দিয়ে তৈরি শিঙা ফুঁকিয়ে ঈদের আগমন ঘোষণা করত, যা পুরো গ্রামকে উৎসবের আবহে ভরিয়ে দিত।

  সাথে সাথেই, গ্রামের মহিলারা 'ছিয়া' দিয়ে 'ঘাইল’এ কুটে চালের গুঁড়া তৈরি করতে শুরু করতেন , যাতে ঈদের উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করা যায়। ‘ঘাইল’এ চাল কুটার  আওয়াজ সারা গ্রামে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটি প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করত।

   মহিলারা  সারা রাত জেগে ঈদের বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করতেন। এর মধ্যে ছিল’ হান্দেশ’ যা একটি শুকনো চালের কেক  এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা ও সম্পদের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা অনেক উপাদেয়। যেসব পরিবারে সেওয়াই তৈরির মেশিন ছিল, তারা সেওয়াই তৈরি করত, যা তখন বিলাসিতা হিসেবে বিবেচিত হত।

  ঈদের দিন সূর্যোদয়ের আগে, শিশু এবং পুরুষ সদস্যরা রুকনি নদী বা পরিবারের পুকুরে গোসল করতেন। গোসলের পর, শিশুরা নতুন রঙিন ঈদের পোশাক পরিধান করতো এবং সালাম করে বড়দের সম্মান জানাতো, বিনিময়ে এক পয়সা বা এক আনার মতো ঈদী  পেত। পরিবার তারপর রাতের প্রস্তুত মিষ্টি উপভোগ করতে জড়ো হতো, এবং খাবার পর প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা দলবদ্ধভাবে ঈদের নামাজের জন্য মসজিদ বা ইদগাহের দিকে অগ্রসর হতো। নামাজের পর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও সামাজিক সফর হত। শিশুরাও উৎসবের আমেজ বজায় রেখে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের  বাড়ীতে বেড়াতে যেতো।

  আধুনিকতার সাথে ঈদ উদযাপনের অনেক দিক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আর চাঁদ দেখা হয় না, ‘ঘাইল’এ চাল কুটা হয়না এবং রাতজেগে খাবার প্রস্তুতির প্রথাও দুর্লভ হয়ে গেছে। এখন মানুষ মোবাইল ফোনে চাঁদ দেখার তথ্য পায় এবং ঈদের বাজারের জিনিসপত্র অনলাইনে বা দোকান থেকে কেনে। মহিলারা  প্রেশার কুকারে সল্পসময়ে রান্না করেন, এবং সামাজিক সফরের সংখ্যা কমে গেছে, যা এখন ভার্চুয়াল সফরে রূপান্তরিত হয়েছে। সরাসরি ঈদের শুভেচ্ছার বদলে অনেকেই বন্ধু এবং আত্মীয়দের নিকট সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলফি, ছবি ও ভিডিও পাঠান। মোবাইলে ঈদ মোবারক জানান ।

  ঈদ উল আজ হা বা বকরি ঈদে, চাঁদ দেখার উত্তেজনা নেই, কারণ তারিখটি দশ দিন আগে জানা যায়।  উৎসবের অঙ্গগুলি ঈদুল ফিতরের মতো হলেও, বকরি ঈদের মূল গুরুত্ব হল  কুরবানি। বামের মুসল মান সম্প্রদায়ের মধ্যে বকরি ঈদ উদযাপনে একটি নতুন প্রবণতা হল মিজোরামের মিজো জনগণের অংশগ্রহণ। অনেক মিজো লোক মিজোরাম থেকে এসে তাদের ব্যবসায়িক বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বকরি ঈদ উদযাপন করেন।

 বাম মুসলমান সমাজে  অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হল ওয়াজ মেহফিল। এই মেহফিলগুলি সাধারণত শীতকালে খোলা মাঠে বা মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়, এবং এতে প্রায় হাজার হাজার লোক উপস্থিত হয়। মাওলানারা রাতজুড়ে ধর্মীয় বক্তৃতা দেন, এবং যদিও মহিলারা মূল অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত নাও থাকতে পারেন, তারা নিকটবর্তী বাড়ি থেকে  অংশগ্রহণ করেন। ও ওয়াজ শুনেন।

 আরেকটি প্রিয় প্রথা হল রমজানে ইফতার। রমজান মাসে পরিবারগুলি তাদের কন্যা ও বোনের বাড়িতে বিভিন্ন মিষ্টি ও খাবার পাঠায়, যা পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুত করে এবং এই পবিত্র মাসের শেয়ারিং ও উদারতার মনোভাব প্রকাশ করে।

  এছাড়াও, জুন এবং জুলাইয়ের ফলের মৌসুমে ‘আছা’ দেওয়ার একটি প্রথা রয়েছে। এই সময়, পরিবারগুলি তাদের কন্যা ও বোনের বাড়িতে তাজা ফল পাঠায়। এই প্রথাটি বিবাহিত কন্যা ও বোনের প্রতি যত্ন ও সুসম্পর্কের প্রতীক। এ সম্পর্ক পুনর্নবীকরণ করে এবং মহিলাদের পিতৃবাড়ির ফলের একটি অংশ দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।এতে শ্বশুর বাড়ীতে মেয়ে বা বোনের সম্মান বাড়ায়।

বাম মুসলিমরা তাদের কন্যা ও বোনের বাড়িতে অন্যান্য  সুস্বাদু খাবারের  সাথে চুংগা পিঠাও পাঠায়, এই প্রথাটি পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুত করতে সাহায্য করে এবং সম্প্রদায়ের খাদ্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।

 মোটকথা, বাম মুসলমানদের প্রথাগুলি ঐতিহ্য, পরিবার এবং বিশ্বাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক, যা বছরের বিভিন্ন সময়ে পালন করা হয় এবং একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলে।

……………………………………………………………………………

Saturday, 26 September 2026

79.‘বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ - 1:সাবির আহমদ চৌধুরী

  আসামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে মিজোরাম সীমান্ত ঘেষা মোটামুটি ২৮১.৮৭ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ভূখন্ডটি বাম নামে অভিহিত। । সর্বমোট ৪৫টি ছোট রাজস্ব গ্রাম ৩৫টি বসতিপূৰ্ণ ফরেস্ট ভিলেজ নিয়ে বিশাল বাম অঞ্চল। বাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত গ্রাম পঞ্চায়েত গুলো হল ধলাই ,ভাগা বাজার , সপ্তগ্রাম ,চান্নিঘাট ,রাজনগর ,জলালপুর , শেওড়ারতল ও  জীবনগ্রাম। এ' গ্রাম পঞ্চায়েত গুলো নরসিংপুর উন্নয়ন খণ্ডের অধীন। ।এগুলো ছাড়া পালংঘাট উন্নয়ন খণ্ডের অধীনে আরও তিনটি গাঁও পঞ্চায়েত-রুকনি,ভূবনডর ও মনিয়ারখাল গাঁও পঞ্চায়েতের ছয়টি‘ গ্রাম ও বাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

   বর্তমান নিবন্ধটি বামের ধর্মীয়, ভাষিক, ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের প্রতি সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে লিখিত। বাম আক্ষরিক অর্থেই নৃতত্ববিদদের স্বর্গ স্বরূপ। এখানে রয়েছেন মৈতৈ, মণিপুরি, মৈতৈ মুসলিম, বাঙ্গালী মুসলিম, মৎস্যজীবি বাঙ্গালী মুসলিম, বিষ্ণুপ্ৰিয়া মণিপুরি, মিজো, মার, উড়িয়া, রিয়াং, খাসিয়া, নাগা, কুকি, বর্মণ, টিপরা এবং সর্বোপরি বিশাল সংখ্যক বাঙ্গালী হিন্দু যাদের মধ্যে আছেন উচ্চ বর্ণের বাঙ্গালী বর্ণ হিন্দু, অনুসূচীত জাতি, নাথ সম্প্রদায় এবং উত্তর ভারত থেকে আগত প্রচুর সংখ্যক হিন্দি ভাষী। চমকপ্ৰদ বিষয় হল বাম তথা দক্ষিণ কাছাড়ের বৃহত্তম বাজার ভাগাবাজারে বর্ণিত এত ধর্মীয় ও ভাষিক সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য বা পারিবারিক অন্যান্য প্রয়োজনে নিত্য নৈমিত্তিক আনাগোনা এহেন  বৈচিত্রময় ভারতবর্ষের এক দুর্লভ খন্ডচিত্র। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বতন্ত্ৰতার সাথে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রয়েছে। এখানে সেসব বৈচিত্র স্বল্প পরিসরে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হল।

২০১১ ইংরেজীর আদমসুমারী মতে বামের মোট  ৯৪৩৭৯ জন অধিবাসীর মধ্যে   বহু মুসলমান অধিবাসী রয়েছেন যার সিংহভাগই বাংলা ভাষী। তাছাড়া রয়েছেন মৎস্যজীবি বা শেখ সম্প্রদায়ের মুসলমান লোক,পাঙ্গাল মুসলমান । মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা কোনো বর্ণ, গোত্র, জাতের ভিন্নতা নেই কিন্তু বরাক উপত্যকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত এ সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে প্রচলিত কাছাড়ের কথ্য ভাষার ব্যবহারে কিছুটা শব্দগত ও ভাষিক তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।

 বামের মুসলমানদের সংস্কৃতি মূলত ভাষা, ধর্ম এবং সামাজিক রীতিনীতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

বামের মুসলমানদের সবাই হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জের ভাঙ্গা, এবং শিলচরের পার্শ্ববর্তী বেরেঙ্গা, ভাগাডর এবং শহরতলীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত। তাদের কাছাড়ের কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত বাগধারার প্রতি লক্ষ্য করলে এ কথা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে তাদের মধ্যে আদি বাসস্থানের বাগধারার সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।

    হাইলাকান্দি মূলের লোকদের মধ্যে প্রচলিত কিছু শব্দ তাদের আদি আবাসস্থলের পরিচয় বহন করে। যেমন তাদের মধ্যে রান্না করা 'বিরইন' কে পিঠা, পুষ্করিনীকে পুকইর বা পুরকি, দূরকে পাল্লা, অনেকটা বুঝাতে ফাই (যেমন ফাই পাল্লা অর্থাৎ অনেক দূর), আমি কে মুই, রান্নার পাত্র বিশেষকে টউ, ফুফুকে পিওন, চাচাকে বাছাই ইত্যাদি শব্দের প্রচলন ছিল। 'ছিল' এই অর্থে বলা হচ্ছে যে এ সমস্ত শব্দের প্রচলন অধুনা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

 শিলচরের শহরতলী থেকে আগত লোকজনদের মধ্যে 'দাদি' কে 'বুদি' বা 'বুদিজী', জল বা খাদ্য দ্ৰব্য রাখার প্রশস্ত পাত্রকে 'তাগারা', জেষ্ঠ সম্পর্কীয়দের' ঠাকুর' বা 'ঠাকুরজী', চাদরকে' রেফা, সব ধরণের পুষ্করিনীকে 'দিঘী' ইত্যাদি বলার প্রচলন রয়েছে বা ছিল। শিলচরের শহরতলী হতে আগত অভিবাসীরা বামে উজানি নামে পরিচিত।

  শুধু ভাষাতেই নয়, বামে উজানী মুসলিম ও হাইলাকান্দি মূলের মুসলিম মহিলাদের পোশাকেও পার্থক্য ছিল। হাইলাকান্দি মূলের মহিলারা বোরকা পরতেন এবং বাঁশের তৈরি সজ্জিত 'ছাত্তা' মাথায় দিতেন । অন্যদিকে, উজানী মহিলারা চাদর পরতেন। উভয় গোষ্ঠীর সামাজিক রীতিনীতিতে এতটাই পার্থক্য ছিল যে, বামের প্রথম দিকে উজানী মুসলিম ও হাইলাকান্দি মূলের মুসলিমদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হতো না। উল্লেখযোগ্য যে, সিলেটের একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত অনুরূপ এক ‘ছাত্তা’কে ‘জৈন্তাপুরি ছাত্তা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে

করিমগঞ্জের ভাঙ্গা অঞ্চল হতে আগত বিরাট সংখ্যক মানুষের বসবাস রয়েছে বিশেষ করে বামের ভাগাবাজার ও পার্শ্ববর্তী জায়গা গুলোয়। ভাষার ব্যবহারে তাদেরও স্বকীয়তা বিদ্যমান রয়েছে। তাদের কথাবার্তায় স্নানকে নাওয়া, ওগোকে 'রেবো', দিদিমা বা দাদিকে বিবি, ভ্রাতৃবধূকে 'মিয়ার বউ', এখন বুঝাতে 'এবলা' বলার প্রচলন রয়েছে।

ঠিক তদ্ৰুপ ভাবে মৎস্যজীবি শেখ সম্প্রদায়েরও বাগধারায় ভিন্নতা রয়েছে। দিয়ে দাও কে 'দেলা', অপেক্ষা করাকে 'দম লাগো', আমাকে 'মুই', আমার বুঝাতে 'মোর' ইত্যাদি শাব্দিক বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়।

  বামের  মুসলমানদের  মধ্যে জারি  নাচ বা জারি গানের প্রচলন ছিল ।মহরম উৎসব উপলক্ষে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের শহিদ হওয়ার মরমান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত জারি গান করুণ  সুরে গেয়ে একদল লুঙ্গি পরিহিত পুরুষ বৃত্তাকারে  ঘুরে ঘুরে বুক চাপড়ে জারি নাচ করত। বর্তমানে এই লোক নৃত্য লোপ পেয়েছে। বর্তমানে, বামে  রোজা রাখা, প্রার্থনা, ধর্মীয় কার্যকলাপ এবং দান-খয়রাতের মাধ্যমে মহররম পালিত হয় ।

…………………………………………………………………………………………………………………………..

78.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -8: কানন নাথ মজুমদার

 অবশ্য এগুলো হলো অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের,লেখা পড়া জানা মানুষের রচনা । তবে অনেক আগে, যখন এতদঞ্চলে লেখা পড়ার তেমন প্রচলন ছিলনা , তখন  ও তো এ অঞ্চলের কাব্য প্রতিভা  ছিলো চোখে পড়ার মতো । মানুষের কাব্য প্রতিভার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিলো তাঁদের বিচক্ষনতা,দূরদরশিতা আর অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান । স্বল্প কথায়ও যে অনেক কিছু বলা যায়,মনের  ভাব ব্যক্ত করা যায়,তার প্রমাণ রেখে গেছেন এখানকার প্রবাদ আর প্রবচন  রচয়িতারা ।নিজের কথ্য ভাষাতেই নিজের উপলব্ধি তথা  কাব্যপ্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন  তাঁরা । আজ  তাঁরা হারিয়ে গেছেন কালের স্রোতে ,কিন্তু  তাঁদের অমূল্য রচনা আজও বেঁচে আছে  বাম কাছাড়ের ঘরে ঘরে ,মানুষের মুখে মুখে ।সুদূর অতীতে রচিত  এরকমই কিছু প্রবাদ ও প্রবচন এখানে তুলে ধরা হলো –

১।ইজ্জত যায়না ধৈলে আর খাসলত যায়না মৈলে।

২।কুকুরর লেঞ্জ ঘি দিয়া  মাঞ্জিলে ও সিধা অয় না ।

দুটো প্রবাদের অর্থ একই ।অর্থাৎ হাজার চেষ্টা করলেও যার যে স্বভাব (খারাপ অর্থে ) তা বদলানো যায় না ।

৩।আওরর মাঝে হিয়াল রাজা-যেখানে যোগ্য ব্যক্তির অভাব সেখানে অযোগ্যরাই  সদম্ভে মুন্সিয়ানা দেখায় ।

৪।আগুইনে হিজেনা আর পানিয়ে  বুড়ে  না- অসংলগ্ন ও অনুপযুক্ত কিছু কথা বা ব্যবহার  যেটার কোনও মূল্য নাই ।

৫।আ-জানডার আটু পানিত হাতার- কোনও বিষয়ের ব্যাপারে জ্ঞান নাথাকলে সহজ কাজও কঠিন মনে হয় ।

৬।আট আনার বন কাম বারো আনার আফিম    -

৭।খাজনা তনে বাজনা ডাঁট -দুটোর অর্থ এক । সামান্য লাভের আশায় বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ।

৮।আত্তি যাইতে দেখেনা ,ছুই যাইতে দেখে-বিরাট অংকের খরচ করতে পিচ-পা হয় না,কিন্তু সময় বিশেষে অতি সামান্য খরচ করতে  রাজী নয় ।বা বড় বড় বিষয়কে উপেক্ষা করলেও  ছোট ছোট ঘটনাকে নিয়ে  তুল কালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে ।

৯।ঘরো নাই চাউল ভাজা,রোজ করইন লক্ষিপুজা- আড়ম্বর করে লোক দেখিয়ে নিজেকে  মস্ত ধনী প্রমাণ করতে  চাইলেও আসলে অতি দরিদ্র ।

১০।আত্তি ঘুড়া তল অইলা ,তাইন দেখি নয়া আইলা- কোনও কাজ অনেকের চেষ্টাতে ও সফল না হলে মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে । তাই  সক্ষম কেউ এলেও তাকে  বিশ্বাস করতে চায় না ।

১১।আ-তে মারা নায় ,ভাতে মারা-কৌশলে কাউকে জব্দ করা ।

১২।আম ও নাই,বাড়ল ও নাই-কোনও কাজ হাসিল করার জন্য  নানা কৌশল অবলম্বন  করেও ব্যর্থ হওয়া । অর্থাৎ মূল কাজটিতো হয়নি,অধিকন্তু কৌশল আবলম্বনের খাটনিটাও বৃথা যায় ।

১৩।এক মাঘে শীত যায় না -সুযোগ শুধু একজনের  নয় ,অন্য জনের জন্য ও আসে ।

১৪।কমিন্দে লাথ খায় , চাইরবায় কইয়া যায় , ভাল মানসে লাথ খায় ,চাইর বায় চাইয়া  যায়- যারা আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে  তারা  নিজেদের অপমানের কথাটা গোপন  রাখে,কিন্তু  যাদের আত্মসম্মানবোধ নেই তারা  নিজের অসম্মানের প্রচার করতে  কুন্ঠাবোধ করে না ।

১৫। কাবু পাইলে বেঙেও ঠ্যাং দেখায়-নীচু মানসিকতার মানুষেরা  সময়বিশেষে সম্মানিত ব্যক্তিকেও অসম্মান করতে ছাড়েনা ।

১৬।গাতো হামায়না উন্দুর, লেঙ্গুড়ো বানছে কোলা- অসংখ্য  সমস্যার  মধ্যে  আরও সমস্যা বাড়িয়ে তোলা ।

১৭।গাছো তুলিয়া তলে তনে মই হরানি- উস্কানি দিয়ে  কোনও কাজে  লাগিয়ে ,ফাঁসিয়ে দিয়ে পরে  দূরে সরে যাওয়া ।

১৮।ঘাট পারইলে খেওয়ানি কার হালা- বিপদে  হাতেপায়ে ধরে সাহায্য নেয় ,কিন্তু পরে তা মনে রাখেনা ।

১৯।চুরে চুরে আলি,এক চুরে বিয়া  করে আরেক চুরর হালি-অসৎ ব্যক্তিরা  এক জোট হয়ে একে অপরকে সাহায্য করে ।

২০।জামাইর কামাই খায় বেটিয়ে হাসিয়া খুসিয়া,পুয়ার কামাই খায় বেটিয়ে কান্দিয়া কুটিয়া-স্বামীর উপার্জনে যতটা অধিকার থাকে  ,পুত্রের উপার্জনে অনেকের সেই অধিকার থাকে না ।

২১।মুই আইলু আতকা,মোরে কয় ভাত খা- কিছু বুঝে উঠার আগেই  কাউকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া ।

২২। কানা গরু তাকি খালি  গোয়াল ভালা-উটকো ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া ভাল।

২৩।চুল নাই বেটিয়ে  চুলর লাগি কান্দে ,কচুপাতা দিয়া  বেটিয়ে  উচ্চা খুপা বান্ধে – সাধ থাকলেও সাধ্য না থাকায়  কৃ্ত্রিমতার আশ্রয় লওয়া ।

২৪।রাজার লাগি রাণী  পেচার লাগি পেচী-উপযুক্ত কাজ বা সঙ্গী স্বস্তিদায়ক ।

২৫।মশারীর ভিত্রর কিল-প্রকাশ্যে ভালোমানুষী  দেখানো হলেও লোকচক্ষুর অন্তরালে অত্যাচার।

 ………………………………………………………………………………………………….

লেখক পরিচিতিঃ-

কানন নাথ মজুমদারঃবরাক উপত্যকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ,নানা সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার প্রকাশিত  স্মরনিকা,”শারদীয়া শ্রীহট্ট জ্যোতি”  “বার্ষিক কাত্যায়নী” প্রভৃতিতে লেখা ছাড়াও  কলকাতা থেকে প্রকাশিত  “নব যুগান্তর” এবং নদীয়া থেকে প্রকাশিত “বঙ্গদেশ” নামক লিটল ম্যগাজিনের  বিভিন্ন সংখ্যার নিয়মিত লেখিকা ।এ ছাড়াও “ বৈজয়ন্তি “  শীর্ষক শারদীয় ম্যগাজিনের সম্পাদনা করে  যথেষ্ট সুনাম  অর্জন করেন ।তাঁর লেখা উপন্যাস “ মানুষ মানুষের জন্য” বিদগ্ধ সমাজে উচ্চ প্রশংসিত ।

 

 

Wednesday, 23 September 2026

77.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -7: কানন নাথ মজুমদার

 বাম কাছাড়ের কিছু প্রবাদ  ও প্রবচনঃ

যখন খুব ছোট ছিলাম,তখন বাড়িতে ধর্মগ্রন্থ পাঠের আসর  বা অন্য কোনও কারনে বসা আসরে  মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম  “গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন”-------- “।  তখন ধারণা হয়ে গিয়েছিলো যে  গীতা লিখেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।

তারপর যখন পাঠশালায় ভর্তি হয়ে শিখলাম

“সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি ।

সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি ।

তখনও এই একই ধারনা কাজ করেছিলো । ভেবেছিলাম  ঈশ্বরই  আমাদের জন্য এগুলো  লিখে রেখেছেন ।

পরে এম  ই স্কুলে ভর্তি হয়ে শিখলাম –

“বসেছে আজ রথের তলায়

স্নান যাত্রার মেলা ।

সকাল থেকে বাদল হলো

ফুরিয়ে এলো বেলা।। “

           বা

ফুলের দলে প্রজাপতি ,হাসির পরে হাসি ।

এমন শোভা দেখতে আমি বড়ই ভালবাসি ।

উড়ে উড়ে  কেমন তারা বেড়ায় নেচে নেচে ।

ইন্দ্র ধনু  দিয়ে পাখা  -জান,কে এঁকেছে ?

যাঁর দয়াতে  গোলাপ ফুটে লোহিত বরন মাখা ।

যাঁর দয়াতে হাসিরছটায় শিশুর আনন ঢাকা ।।

রবিশশী ফুটিয়ে জগৎ আলো করেন যিনি ।

প্রজাপতির পাখায় হেন সাজ দিয়েছেন তিনি ।।

বুঝলাম -এ কবিতাগুলো ঈশ্বরের লেখা নয় । তাছাড়া  মাষ্টার মশাইদের  মুখে কবিদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম যে  – এ কবিতাগুলো ঈশ্বরের লেখা নয়।তবে ধারনা  হলো -কবিরা অসাধারণ কিছু মানুষ,তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নন ।

তবে ভুল ভাংলো ক্লাস   VII এ উঠার পর ।ধলাই বি এন এম পি  স্কুলে ভর্তি হলাম ।হাতে এলো ১৯৬১ সালে  প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিন “বামশ্রী” । দেখলাম বামশ্রীর অনেক লেখকই আমদের স্কুলের শিক্ষক ।তাছাড়া কবিতা আর অন্য  কিছু লেখায় স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রদের নাম আছে ।প্রাক্তন শিক্ষকও আছেন ।এর মধ্যে দুই একজন  আবার আমার পরিচিত । বুঝলাম যে কেউ লিখতে পারে । তবে নির্দিষ্ট বিষয় এবং ভাষার উপর  দখল থাকতে হবে ।

 বামশ্রীতেই পড়লাম –

“নে ফুল তুলে নে

যত খুশি সাজি ভরে।

সার্থক হোক তোর পুষ্প চয়ন

শরতের এ শান্ত প্রভাতে ।“

অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম । এখন বুঝতে পারি এ সব তো বাম কাছাড়েরই কাব্যপ্রতিভা  । দুর্গাপূজার আগমনি গান গুলোতে ও এতদঞ্চলের প্রচুর রচনা আছে ।বিজয়ায় দেখা যায় এঅঞ্চলের কবি বলছেন-

যাবেই যদি যা মা ,শুধু কথা দিয়ে যা,

বছর গেলে আসবে ফিরে ধরার বুকে মা

মা তোর আসার পথটি চেয়ে

রইবো সারা বছর ধরে…।

 এসব তো বাম কাছাড়েরই প্রতিভার প্রকাশ ।

………………………………………………………………………………………………………

Monday, 21 September 2026

76.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -6 :কানন নাথ মজুমদার

 প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে ধামাইলে প্রবর্তন করেন শ্রীকৃষ্ণের “ পুষ্প দোল” পালা ।তাঁর এই মহান প্রয়াসকে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন “রাধিকা ঠাকরুণ “,যিনি ছিলেন এই অঞ্চলের ধামাইল শিল্পের এক প্রোথিতযশা শিল্পী । তিনি তাঁর সুযোগ্যা শিষ্যা স্নেহলতা দেবী ,ঊষারাণী নাথ  প্রমূখ শিল্পীদেরে নিয়ে ,বিশেষ অনুশীলনের  মাধ্যমে “  পুষ্প দোল “ পালাকে জনপ্রিয় করে তুলেন  । “পুষ্প দোলের “ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বরাক উপত্যকায় ।নরসিংপুর,দুধপাতিল,লালা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে  ধামাইল শিল্পীরা ছুটে আসেন  পুষ্প দোলের তালিম নিতে ।পুষ্প দোল পালা সমগ্র বরাক উপত্যকায় ধামাইল শিল্পের আসরে  নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় অত্যন্ত সম্মানের আসনে ।আজও পুষ্প দোল বিরাজ করছে   স্বমহিমায় ।বৈশাখি পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের পুষ্প দোল পার্বণে সাদরে পালিত হয় পুষ্প দোল পালা ধামাইলের মাধ্যমে ।অত্যন্ত জনপ্রিয়তার  জন্য একদিনে পরিবেশিত এই  পালা জনগনের চাহিদা মিটাতে পারে না ।তাই পক্ষকাল  ব্যাপী চলে এই পালার ধামাইল কীর্তন ।ভনিতা অংশে রচয়িতার নাম উল্লেখ  থাকার রীতি অনুযায়ী পুষ্প দোল পালার কোনও গানে শোনা যায় “ভাবনেত্রে হেরে তাহা বৃন্দাবন দাস “

 

 

,আবার কোনও গানের শেষে আছে “ আশায় বসিয়া রইলো গোপাল ভিখারী “ ।

     পুষ্প দোলের ব্যাপক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এবং রাধিকা ঠাকরুনের ঐকান্তিক আগ্রহে  গোপাল দাস বাবাজী আরো আরো পালা কীর্তনের সন্ধান করতে থাকেন  ।শ্রী হরিলাল   চট্টোপাধ্যায়   সংকলিত এবং কানাইলাল চট্টোপাধ্যায়   প্রকাশিত “পদ্ রত্নমালা” শীর্ষক গ্রন্থে যদুনাথ দাস ,বাসু ঘোষ,দীনবন্ধু দাস,পূর্ণানন্দ দাস,রঘুনাথ দাস,রায়শেখর প্রভৃতি  পদকর্তাদের  রচিত “সুবল মিলন”এবং” রাই রাখাল” পালা দুটি তাঁর দৃষ্টি   আকর্ষণ করে ।শুরু হয় বিভিন্ন ছন্দে রচিত লেখাগুলোকে বিভিন্ন সুর  তাল লয়ের  বিন্যাসে  ধামাইলে  রূপায়িত করার অনুশীলন ।আশ্চর্যজনক ভাবে  আখরযুক্ত কীর্তনের নমুনাও  এখানে  সন্নিবেশিত হয় । সার্থক হয় প্রচেষ্টা ।এ দুটি পালাও ধামাইলে সুন্দর ভাবে আত্মপ্রকাশ করে ।

তাছাড়াও “ মুক্তালতাবলী”নামক গ্রন্থ,জয়নারায়ন  মুখোপাধ্যায় রচিত “ রাধাকৃষ্ণ  বিলাস” প্রভৃতি অসংখ্য গ্রন্থ থেকে  কৃষ্ণ লীলা বিষয়ক প্রচুর গান ধামাইলের জন্য নির্বাচিত হয় ।গোপাল দাস বাবাজীর স্বরচিত  কিছু গানও এতে স্থান পায় ।রাধা রমন দত্ত ,চৈতন্য চরণ পাল ,দ্বিজ বংশীদাস ,বাউল জীবন  প্রভৃতি  অসংখ্য রচয়িতাদের রচনা সম্ভারে  ধামাইল সমৃদ্ধ ।সূর্য ব্রত ,কালাঠাকুরের কীর্তন, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, অন্নপ্রাশন,বিয়ে,নানা দেব দেবীর  পুজোর মন্ডপে  ধামাইল তার  নিজস্ব  বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বিষয় ভিত্তিক  গানের সঙ্গে  ধামাইল পরিবেশন সামাজিক জীবনে  এক অপরিহার্য সংস্কৃতি ।

এদিকে পালা কীর্তন হিসাবে পুষ্প দোল আজও  স্বমহিমায় বিরাজমান থাকলেও গোপাল দাস আর রাধিকা ঠাকরুনের  দেহত্যাগের পর “সুবল মিলন” আর “রাই রাখাল“ পালাদ্বয় বিস্মৃতির  দিকে এগিয়ে  যেতে  থাকে । অনুশীলনের অভাবে  এগুলির প্রচার স্তব্ধ হয়ে গেলেও এ  অঞ্চলের প্রবীণ মানুষদের স্মৃতির দরজায় আজ ও কড়া নাড়ে এ দুটি পালা কীর্তন ।আজও রাধিকা ঠাকরুনের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যা,সুদক্ষ ধামাইল  শিল্পী প্রয়াতা স্নেহলতা  দেবীর সংগ্রহে,হাতে লেখা পালা কীর্তন দুটি সযত্নে রক্ষিত আছে ।(আর সৌভাগ্যক্রমে এই লেখিকা স্বর্গীয়া স্নেহলতা দেবীরই আত্মজা)

  বাম কাছাড়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে চর্যাপদের সময় থেকেই এখানে কাব্য চর্চা হয়ে আসছে । এটা আমাদের গর্ব । এই ধারাবাহিকতা  কিন্তু  হারিয়ে যায়নি । তাইতো দেখি আজ থেকে দেড়শত বছর আগেও   এতদঞ্চলে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ,সংস্কৃতি চর্চা ,ধামাইলের মতো  লোকনৃত্যের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধনের জন্য ব্যাপক অনুশীলন -আশ্চর্যজনক ভাবে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছিল ।  এখানকার শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক প্রতিভার আলোকে সমগ্র বরাক উপত্যকার সঙ্গীত চর্চার মানোন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে ।

পুঁথিগত শিক্ষা ছাডাও  বা শিক্ষিত হওয়া  সত্ত্বেও আঞ্চলিক ভাষাকে ভালোবেসে এই ভাষাতেই যে নিজের কাব্যপ্রতিভার   স্ফুরণ     ঘটানো যায় ,নিজের চিন্তাধারাকে সার্থক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়- তাও প্রমাণ করে দিয়েছে বামের ধামাইলের আসর । যেমন-

দিদি রোহিণী , গোপাল আমার বাড়িত নাই

(খেলতে) খেড়িত গেছেগিয়া

ওউত্তো তার এক বিরতি (বৃত্তি) অইছে

রাইত  পোয়াইতে খেড়িত গেছে

(তারে ) খাইবার কালো আনো ডাক দিয়া ।।

কেলেঙ্কারিয়া নারায়নে

বারোর দরবার ঘরো আনে

(আমি) তারে লইয়া মরতাম কোনবায় গিয়া ।

ঐতিহ্যবাহী বাম কাছাড়ের এই ইতিহাসকে জনসমক্ষে  তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের আলোকে বর্তমানকে আলোকিত  করতে না পারলে উত্তরসূরী হিসেবে  আমরা ব্যর্থ প্রতিপন্ন  হবো । তাই বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আবেদন রইলো – তারা যেন বিশেষ আনুধাবন আর অনুশীলনের মাধ্যমে ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্পকে আরো উচ্চমার্গে পৌঁছে দিতে যত্নবান হয় । আর তবেই  আমরা  হতে পারবো ধামাইলের মতো সমৃদ্ধ শিল্প তথা বাম কাছাড়ের  সঙ্গীত চর্চার সার্থক উত্তরসূরী ।

……………………………………………………………………………………………….