অবশ্য এগুলো হলো অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের,লেখা পড়া জানা মানুষের রচনা । তবে অনেক আগে, যখন এতদঞ্চলে লেখা পড়ার তেমন প্রচলন ছিলনা , তখন ও তো এ অঞ্চলের কাব্য প্রতিভা ছিলো চোখে পড়ার মতো । মানুষের কাব্য প্রতিভার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিলো তাঁদের বিচক্ষনতা,দূরদরশিতা আর অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান । স্বল্প কথায়ও যে অনেক কিছু বলা যায়,মনের ভাব ব্যক্ত করা যায়,তার প্রমাণ রেখে গেছেন এখানকার প্রবাদ আর প্রবচন রচয়িতারা ।নিজের কথ্য ভাষাতেই নিজের উপলব্ধি তথা কাব্যপ্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন তাঁরা । আজ তাঁরা হারিয়ে গেছেন কালের স্রোতে ,কিন্তু তাঁদের অমূল্য রচনা আজও বেঁচে আছে বাম কাছাড়ের ঘরে ঘরে ,মানুষের মুখে মুখে ।সুদূর অতীতে রচিত এরকমই কিছু প্রবাদ ও প্রবচন এখানে তুলে ধরা হলো –
১।ইজ্জত যায়না ধৈলে আর খাসলত
যায়না মৈলে।
২।কুকুরর লেঞ্জ ঘি দিয়া মাঞ্জিলে ও সিধা অয় না ।
দুটো প্রবাদের অর্থ একই ।অর্থাৎ
হাজার চেষ্টা করলেও যার যে স্বভাব (খারাপ অর্থে ) তা বদলানো যায় না ।
৩।আওরর মাঝে হিয়াল রাজা-যেখানে
যোগ্য ব্যক্তির অভাব সেখানে অযোগ্যরাই সদম্ভে
মুন্সিয়ানা দেখায় ।
৪।আগুইনে হিজেনা আর পানিয়ে বুড়ে না-
অসংলগ্ন ও অনুপযুক্ত কিছু কথা বা ব্যবহার যেটার
কোনও মূল্য নাই ।
৫।আ-জানডার আটু পানিত হাতার-
কোনও বিষয়ের ব্যাপারে জ্ঞান নাথাকলে সহজ কাজও কঠিন মনে হয় ।
৬।আট আনার বন কাম বারো আনার
আফিম -
৭।খাজনা তনে বাজনা ডাঁট -দুটোর
অর্থ এক । সামান্য লাভের আশায় বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ।
৮।আত্তি যাইতে দেখেনা ,ছুই
যাইতে দেখে-বিরাট অংকের খরচ করতে পিচ-পা হয় না,কিন্তু সময় বিশেষে অতি সামান্য খরচ করতে রাজী নয় ।বা বড় বড় বিষয়কে উপেক্ষা করলেও ছোট ছোট ঘটনাকে নিয়ে তুল কালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে ।
৯।ঘরো নাই চাউল ভাজা,রোজ করইন
লক্ষিপুজা- আড়ম্বর করে লোক দেখিয়ে নিজেকে মস্ত
ধনী প্রমাণ করতে চাইলেও আসলে অতি দরিদ্র ।
১০।আত্তি ঘুড়া তল অইলা ,তাইন
দেখি নয়া আইলা- কোনও কাজ অনেকের চেষ্টাতে ও সফল না হলে মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে ।
তাই সক্ষম কেউ এলেও তাকে বিশ্বাস করতে চায় না ।
১১।আ-তে মারা নায় ,ভাতে মারা-কৌশলে
কাউকে জব্দ করা ।
১২।আম ও নাই,বাড়ল ও নাই-কোনও
কাজ হাসিল করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেও ব্যর্থ হওয়া । অর্থাৎ মূল কাজটিতো হয়নি,অধিকন্তু
কৌশল আবলম্বনের খাটনিটাও বৃথা যায় ।
১৩।এক মাঘে শীত যায় না -সুযোগ
শুধু একজনের নয় ,অন্য জনের জন্য ও আসে ।
১৪।কমিন্দে লাথ খায় , চাইরবায়
কইয়া যায় , ভাল মানসে লাথ খায় ,চাইর বায় চাইয়া
যায়- যারা আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে
তারা নিজেদের অপমানের কথাটা গোপন রাখে,কিন্তু
যাদের আত্মসম্মানবোধ নেই তারা নিজের
অসম্মানের প্রচার করতে কুন্ঠাবোধ করে না ।
১৫। কাবু পাইলে বেঙেও ঠ্যাং
দেখায়-নীচু মানসিকতার মানুষেরা সময়বিশেষে সম্মানিত
ব্যক্তিকেও অসম্মান করতে ছাড়েনা ।
১৬।গাতো হামায়না উন্দুর, লেঙ্গুড়ো
বানছে কোলা- অসংখ্য সমস্যার মধ্যে আরও
সমস্যা বাড়িয়ে তোলা ।
১৭।গাছো তুলিয়া তলে তনে মই
হরানি- উস্কানি দিয়ে কোনও কাজে লাগিয়ে ,ফাঁসিয়ে দিয়ে পরে দূরে সরে যাওয়া ।
১৮।ঘাট পারইলে খেওয়ানি কার
হালা- বিপদে হাতেপায়ে ধরে সাহায্য নেয় ,কিন্তু
পরে তা মনে রাখেনা ।
১৯।চুরে চুরে আলি,এক চুরে বিয়া করে আরেক চুরর হালি-অসৎ ব্যক্তিরা এক জোট হয়ে একে অপরকে সাহায্য করে ।
২০।জামাইর কামাই খায় বেটিয়ে
হাসিয়া খুসিয়া,পুয়ার কামাই খায় বেটিয়ে কান্দিয়া কুটিয়া-স্বামীর উপার্জনে যতটা অধিকার
থাকে ,পুত্রের উপার্জনে অনেকের সেই অধিকার
থাকে না ।
২১।মুই আইলু আতকা,মোরে কয় ভাত
খা- কিছু বুঝে উঠার আগেই কাউকে কাজে লাগিয়ে
দেওয়া ।
২২। কানা গরু তাকি খালি গোয়াল ভালা-উটকো ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া ভাল।
২৩।চুল নাই বেটিয়ে চুলর লাগি কান্দে ,কচুপাতা দিয়া বেটিয়ে
উচ্চা খুপা বান্ধে – সাধ থাকলেও সাধ্য না থাকায় কৃ্ত্রিমতার আশ্রয় লওয়া ।
২৪।রাজার লাগি রাণী পেচার লাগি পেচী-উপযুক্ত কাজ বা সঙ্গী স্বস্তিদায়ক
।
২৫।মশারীর ভিত্রর কিল-প্রকাশ্যে
ভালোমানুষী দেখানো হলেও লোকচক্ষুর অন্তরালে
অত্যাচার।
লেখক পরিচিতিঃ-
কানন নাথ মজুমদারঃবরাক
উপত্যকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ,নানা সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার প্রকাশিত স্মরনিকা,”শারদীয়া শ্রীহট্ট জ্যোতি” “বার্ষিক কাত্যায়নী” প্রভৃতিতে লেখা ছাড়াও কলকাতা থেকে প্রকাশিত “নব যুগান্তর” এবং নদীয়া থেকে প্রকাশিত “বঙ্গদেশ”
নামক লিটল ম্যগাজিনের বিভিন্ন সংখ্যার নিয়মিত লেখিকা ।এ ছাড়াও “ বৈজয়ন্তি
“ শীর্ষক শারদীয় ম্যগাজিনের সম্পাদনা করে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন ।তাঁর লেখা উপন্যাস “ মানুষ মানুষের জন্য”
বিদগ্ধ সমাজে উচ্চ প্রশংসিত ।