মৈতৈ মণিপুরী বাম অঞ্চলে বসবাসকারী এক অন্যতম বৃহৎ সম্প্রদায়। ভাগাবাজার গাঁও পঞ্চায়েত সংলগ্ন ইসলামাবাদ (তেলিচিবা) এবং ধলাই গাঁও পঞ্চায়েতের রামপ্রসাদপুর গ্রামে বেশির ভাগ মণিপুরি দের বাস। রুকনি নদীর পূর্ব তীরের কিছু গ্রামেও এককালে মণিপুরিদের বসতি ছিল। বর্তমানে অবশ্য তারা অন্যত্র চলে গিয়েছেন।
মণিপুরিদের ভাষা মেইটেলন (Meiteilon)। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা হিন্দু ধর্মের
অনুসারী। তাছাড়া তারা Sanamahism (Apokpa) নামীয় মতবাদেরও অনুসারী। বর্তমানে কিছু
সংখ্যক খৃষ্ট ধৰ্ম মতাবলম্বী মণিপুরিও আছেন। তাদের স্বকীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক
উৎসবাদির নাম হল সাজিবু (Sajibu), চাইরাওবা (Chairaoba), লাই হারাওবা (Laai
Haraoba), ইয়াওসাং (Yaoshang)। মূলতঃ মণিপুরি সম্প্রদায় বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী
হলেও হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি তারা যথারীতি পালন করেন। হিন্দু ধর্মের পূজা পার্বন
গুলো পালনেও তাদের নিজস্ব ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য মেনে চলেন। চৈত্র মাসের
শেষ দিনে চৈত পূজাকে তারা পাহোউবী এবং তার পাঁচ দিন পর লক্ষ্মী পূজাকে ইমোইনুকৌই
অনুষ্ঠান রূপে পালন করেন। আশ্বিন মাসে আবার দূর্গাপূজাকে পাহৌইবী পূজা রূপে পালন
করেন।
য়ুমলই-এর স্থান মণিপুরিদের গৃহে নির্দিষ্ট থাকে। আদিকাল থেকে তাদের গুরু
সিদবা (পরমপুরুষের) পূজা চলে আসছে। এ ছাড়া কার্তিক মাসে রথযাত্রা, কালী পূজার
দুদিন পরে নিঙোল চাকৌবা (ভগিনী ভোজন) ইত্যাদি মণিপুরিদের অন্যান্য ধর্মীয় ও
সাংস্কৃতিক উৎসব। ভগিনী ভোজন উৎসব তাদের মতে চূড়াচাঁন্দ মহারাজের প্রবর্তিত উৎসব।
ভাগ্য চন্দ্র মহারাজ প্রবর্তিত হৌদোক্লম্বনী উৎসবও জনপ্রিয়। পরবর্তীতে নিত্যরাস,
বসন্ত রাস, ষণ শেনক বা রাখাল রাস, উদখোল, জলকেলী ইত্যাদি রাস তাদের মধ্যে প্রচলিত
হয়।
বামে যথেষ্ট সংখ্যক হিন্দী ও ভোজপুরিভাষী লোক রয়েছেন। হিন্দু ধর্মের
অন্যান্য পূজা পার্বনের সাথে তারা অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে ছট পূজা পালন করেন। সে
সময় রুকনি নদীর ঘাটগুলো পূজা অর্চনার ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠে। হিন্দীভাষীদের
সাথে অল্প সংখ্যক উড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। পৌষমাসে তারা টুসু পূজা
উদযাপন করেন। এছাড়াও রয়েছেন বিষ্ণুপ্ৰিয়া মণিপুরি। মৈতৈ মণিপুরিদের সাথে তাদের
শুধুমাত্র ভাষাগত বৈসাদৃশ্য রয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠান তারা
মণিপুরিদের মতই পালন করেন।
বামের সামাজিক ,ভাষিক ,সাংস্কৃতিক ও
ধর্মীয় বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য সাধনের এক মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে
এখানকার মানুষের খেলাধূলা বিশেষ করে ফুটবল খেলার প্রতি অদম্য আগ্রহ । এক কালে বাম
বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল স্কুল সংলগ্ন রুকনি নদী
ঘেঁষা সবুজ বিশাল খেলার মাঠ ছিল
এতদঞ্চলের খেলাধূলার মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু । প্রতি বছর এখানে ফুটবল
টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হত । বিকাল হলে তখন চারি দিক থেকে
মাঠের দিকে জনস্রোত দেখা যেত। সেই জনস্রোত ছিল ক্রীড়া প্রেমী হিন্দু,মুসলিম বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী ,মনিপুরী এমনকি পার্শ্ববর্তী রাজ্যের বাসিন্দা মিজো লোক ও । এই ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র
করে এখানে কয়েকটি সক্রিয় ক্লাব গড়ে উটেছিল
জেগুলো থেকে জিলা স্থরের খেলার খেলোয়াড়
বের হতেন । কালক্রমে মাঠটি ধীরে ধীরে নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায় এবং মাঠের বিলুপ্তির সাথে সাথে যেন এ অঞ্চলের
খেলাধূলা বিশেষ করে ফুটবল খেলা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় । অবশ্য ক্রিকেট খেলায় ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও ফুটবলের প্রতি
মানুষের আকর্ষণ কমার এক অন্যতম কারণ বলেও মনে করা হয়।
বিগত কয়েকটি দশকে বাম খেলাধূলায় অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল । কিন্তু কয়েক বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বাম ধলাইয়ের মাতৃভূমি নামক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা মুখ্যত ফুটবল সহ অনান্য সাংস্কৃতিক চর্চার আয়োজনের সাথে সাথে ফুটবল খেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার নতুন ভাবে উদীপ্ত করে তুলে । ধলাই বি এন এম পি স্কুল মাঠে প্রতিবছর নিয়মিত ভাবে ফুটবল টুর্নামেন্ট করা হয় যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ভাষার হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি এক সময়ে প্রায় ফুটবল উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছে যায় ।এখানে উল্লেখ করতেই হয় এ খেলাকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক সম্প্রীতির বাতাবরণ লক্ষ্য করা যায় , তাকে বামের চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুন্দর ,অপরিবর্তনীয় ধারাবাহিক ঐতিহ্য রূপে আখ্যায়িত করলে অত্যুক্তি হবেনা মোটেই।
লেখক পরিচিতিঃ-
বাম ভাগাবাজারের বাসিন্দা সাবির আহমদ চৌধুরী সোনাইর এম.সি. দাস কলেজের
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং নব প্রতিষ্ঠিত সাউথ কাছাড় কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ । বর্তমানে তিনি
সাহিত্য চর্চা ছাড়াও বিভিন্ন সমাজ কল্যানমূলক কাজে নিজেকে নিবেদিত করে রেখেছেন।
No comments:
Post a Comment