Monday, 2 November 2026

109.বি এন এম পি স্কুলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস - মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর

 

বাম নিত্যানন্দ হাইস্কুলের আজীবন সহযোগী,  মহাদেবপুরের শ্রী কৃষ্ণজীবন পুরকায়স্থের  পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২২ ইংরেজীতে তাঁহার বাড়ীতে একটি  এম ই স্কুল স্থাপিত হয়েছিল। দুলালগ্রামের শ্রী মহেন্দ্র শর্মা ছিলেন স্কুলের  প্রধান শিক্ষক।। পরবর্তীকালে তিনি শিলচরে একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হিসাবে কাজ করেন। প্রধান পন্ডিত হিসাবে কাব্যরত্ন  মানিক  সিনহা নিযুক্তি লাভ করেন।  নতুনভাবে  স্থাপিত এই স্কুলে সকল শ্রেণীর ছেলেদের এমনকি বাংলা প্রাথমিক শ্রেণীর ছাত্রদের  ভর্তি করা হত।

 এই সময়ে জীবনগ্রামের প্রয়াত কৃষ্ণধন বর্মণ এবং লান্টুগ্রামের কৃষ্ণচরণ  বর্মণ  তাঁর সঙ্গে হাত মিলান  এবং তাঁরা প্রয়াত নিত্যানন্দ বর্মনের কাছে  আর্থিক  সাহায্যের প্রস্তাব দেন।   সদাগ্রামের প্রয়াত নিত্যানন্দ বর্মন একজন নিরক্ষর এবং নিঃসন্তান কিন্তু বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন ।তিনি জনহিতকর  কাজ করার এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি   পুকুর খননের  ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেনএবং লোকাল বোর্ডের সদস্য শ্রী কৃষ্ণ জীবন পুরকায়স্থের সাহায্য চেয়েছিলেন ৷ তাঁরা এই সুযোগটি গ্রহণ করেন এবং তাকে একটি জলের পুকুর খনন করার পরিবর্তে 1000/ টাকা দিয়ে একটি এম.ই. স্কুল চালু করার পরামর্শ দেন যা তার উদ্দেশ্যকে আরও ভালভাবে পূরণ করবে। প্রয়াত নিত্যানন্দ বর্মন  এই  প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন। তখন প্রয়াত কৃষ্ণচরণ বর্মন স্কুলের জন্য পাঁচ বিঘা জমি দান করেন।

এইভাবে একটি নিয়মিত  এম ই স্কুল খোলার জন্য সবকিছু ব্যবস্থা করা হয়েছিল কিন্তু একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষকের জন্য  সমস্যা দেখা দেয়। তখন স্থানীয় লোকেরা একটি সভাতে মিলিত হয় এবং  সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাম নিত্যানন্দ এমই স্কুলের  প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে  শ্রী মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর, বিএ-কে অনুরোধ করা হয়।মাণিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর ছিলেন একজন বিশিষ্ট  স্নাতক এবং শিলচর মহকুমার হিন্দুদের মধ্যে দ্বিতীয় স্নাতক। কিন্তু জেলার এই অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি তার সেবা প্রদান করার মানসে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মতি প্রকাশ করেন । তদনুসারে, তিনি ২রা জানুয়ারি,  ১৯২৩ তারিখে তাঁর পদে যোগদান করেন

 কোনো ফান্ড, আসবাবপত্র বা কোনো প্রকৃত ভবন ছাড়াই লোকাল বোর্ড রোডের পশ্চিম পাশে পুকুরের উত্তর তীরে একটি বাঁশের কাঠামো এবং সি.আই.শিট ছাদের নিচে এই স্কুলটি শুরু হয়েছিল ।ছেলেরা মাচার ওপর বসত।  ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে একটি  প্রচন্ড ঝড়ে যখন এই  চালাঘরটি উড়িয়ে নিয়ে যায়  স্কুলের জন্য এটি সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল।আমরা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম এবং ক্লাসগুলি স্কুল পরিচালনা কমিটির বর্তমান সদস্য এবং স্কুলের জন্য জমি দাতা নরেশ্বর বর্মনের পিতা প্রয়াত কৃষ্ণচরণ বর্মনের বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ১৯২৩ ইংরেজীতে  চতুর্থ শ্রেণীতে  ৯জন এবং তৃতীয় শ্রেণীতে্  ১৬ জন ছাত্র ছিল। পরের বছর স্কুলের বর্তমান জায়গায় কাঠের কাঠামো এবং সি.আই.শীট ছাদ সহ একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯২৪সালে বিদ্যালয়টি বিভাগীয় স্বীকৃতি পায় এবং বিভাগটি  ৫০০ টাকার  একটি তহবিল খোলার জন্য স্কুলকে নির্দেশ দেয়। এই টাকা  প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নিত্যানন্দ বর্মনের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছিল।

 ১৯৩০ ইংরেজীতে   স্কুলটি ২৭৫০ টাকা ভবন অনুদান এবং প্রতি মাসে ১৫ টাকা করে  বিভাগীয় অনুদান লাভ করে । এই ভবনের অনুদানে একটি অর্ধ-স্থায়ী ‘এল ’ আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়। এটি ছিল বিদ্যালয়ের মূল ভবন এবং যা এই বছর (১৯৬০ ) মেরামত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে কর্মীদের মধ্যেও পরিবর্তন হয়।   ১৯২৪ ইংরেজীতে  প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র দাস ,একজন ম্যাট্রিকুলেট, দ্বিতীয় মাস্টার পদে  নিযুক্ত হন ।তিনি পরে  ১৯২৯ ইংরেজীতে সহকারী পুলিশ S/I-এর চাকরি পেয়ে স্কুল ত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় বর্তমান শিক্ষক শ্রী রাজকিশোর লস্করকে আপ্যায়ন করা হয়। ১৯২৫ ইংরেজীতে   রাজমোহন বারভূইয়া দ্বিতীয় স্থানীয় ভাষা শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। এই কর্মী ১৯৩৮ ইংরেজী  পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যখন এটি একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। তারপর ১৯৩৯  ইংরেজীতে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন সংকট দেখা দেয়। স্নাতক শিক্ষকরা সরকারের অধীনে লাভজনক চাকরি পাওয়ার আশায় স্কুল ছেড়ে যেতে শুরু করেন।

শ্রী গোলাপ সিনহা বি.এ. ১৯৪০ ইংরেজীতে  স্কুলে যোগদান করেন। শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষক এবং স্কুলের তৎকালীন সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রী গোলাপ সিনহার আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণেই এটি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। স্কুলটি ১৯৪২ ইংরেজীতে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা অধিভুক্ত হয়।

বিদ্যালয়টি সরকার থেকে অনেক অনুদান এবং বিদ্যালয়ের জন্য এতগুলি ভবন তৈরির প্রকল্প পেয়েছে। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টিকে  ১৯৬০ ইংরেজীতে  একটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তর করার জন্য ভবনটির জন্য ৬৭০০০/ টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। 8ই ফেব্রুয়ারি  ১৯৬১  তারিখে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।

পরিশেষে, আমি মানিক সিনহা, কাব্যরত্নকে আমার উষ্ণ শ্রদ্ধা নিবেদন না করলে আমি আমার দায়িত্বে ব্যর্থ হব ।তিনি স্কুলের জন্য মূল্যবান পরিষেবা প্রদান করেছিলেন। ক্রমাগত অসুস্থতার কারণে তিনি ১৯৪৪ ইংরেজীতে তার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সোনালি অক্ষরে তার নাম লেখা থাকবে স্কুলের ইতিহাসে এবং স্থানীয় লোকেরা তাকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদের সাথে স্মরণ করবে।

 টিকাঃ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন জিয়াউদ্দি চোধুর‍ী ।

………………………………………………………………………………………………………।।

মানিক্য চন্দ্র নাথ লস্কর ছিলেন বাম নিত্যানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। এই প্রবন্ধটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিন ‘বামশ্রী’-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।