Monday, 28 September 2026

81.‘বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ -3:সাবির আহমদ চৌধুরী

 


 আসাম-মিজোরাম সীমান্তবর্তী ফাইলেং, খুলিছড়া কুকীপুঞ্জিতে রয়েছে মিজো , কুকি ও মার সম্প্রদায়ের লোকের বাস। মূলতঃ খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী মিজোরা রোমান ক্যাথলিক ও প্রেসবিটেরিয়ান - এই দুই প্রধান শাখায় বিভক্ত। প্রেসবিটেরিয়ান বা প্রটেস্টান্টরা আবার U.P.C. (United Pentecostal Church), E.F.C., I.C.I.(Independent Church of India), B.C.I. (Baptist Church of India), Seven Day Adventist ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত।

   'সেভেন ডে' মতাবলম্বীরা শনিবারে গির্জায় উপাসনা করে। মদ ও শূকরের মাংস তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ খাদ্যদ্রব্য রূপে গণ্য করা হয়। খ্রীষ্টমাস বা বড়দিন মিজোদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও তাদের নিজস্ব সামাজিক সাংস্কৃতিক উৎসব, অনুষ্ঠান রয়েছে। চাপচারকুট (Chapcharkut) হল সে রকম একটি উৎসব যা মিজোরা বৎসরে একবার খুব আড়ম্বরের সাথে পালন করে। জুন মাসের ৫ তারিখে অন্য একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয় যার মাধ্যমে Holy Spirit কে আবাহন করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি Penticost Day নামে অভিহিত। Bamboo Dance মিজোদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন নৃত্যানুষ্ঠান সর্বভারতীয় স্থরে যার পরিচিতি রয়েছে।

 

  রুকনি নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত শেওড়ারতল, খকড়াপুঞ্জি, হাডামাপুঞ্জি, বালুখাল, ধলাই বাজারের পার্শ্ববর্তী গ্রামে প্রচুর সংখ্যক ডিমাসা বা বর্মণ সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাদের ভাষা ডিমাসা। ধর্মীয় দিক দিয়ে তারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী এবং কিছু সংখ্যক খৃষ্টানও রয়েছেন। বাঙ্গালী হিন্দুদের দূর্গাপূজা এবং খৃষ্টানদের বড়দিন এ'দুটি তাদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শেওড়ারতল গ্রামে ১৯৩৭ সাল থেকে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। দুর্গাপূজার পাশাপাশি, গ্রামবাসীরা ‘সংগ্রাইন’ (মাঘ বিহু)ও উদযাপন করেন। ।

  বুশু হল বর্মন ডিমাসা সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত প্রধান উৎসব। এটি অত্যন্ত আড়ম্বর এবং জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। ফসল কাটার পরে এটি উদযাপিত হয়। বুশু মানে ব্রাই-শিবরাই ডিমাসা সমাজে একজন সর্বোচ্চ দেবতা। শান্তির জন্য ব্রাই-শিবরাইকে ধানের নতুন ফসল দেওয়া হয়। তিন ধরনের বুশু রয়েছে -সুরেম বুশু যা তিন বা পাঁচ দিন স্থায়ী হয়, হ্যাংসিও মানাওবা বুশু সাত দিন এবং জিদাব বুশু শুধুমাত্র এক দিনের জন্য পালন করা হয়। প্রতিদিন একটি সাম্প্রদায়িক ভোজে নিহত পশু ও পাখির মাংস খাওয়া হয়। প্রথম দুই থেকে তিন দিন খারাম(ঢোল) মুরী  (শিঙ্গা) বাজনার সাথে বুশু গান গেয়ে থাকে। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়েরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে উৎসবে সারা রাত নাচতে থাকে।

 

  আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে বাম অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। চাকমা, খাসিয়া, মার, রিয়াং, টিপরা, ও নাগা তাদের অন্তর্ভুক্ত। বামের অনেকগুলো ফরেস্ট ভিলেজে রয়েছে তাদের অবস্থান। উপজাতিদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক খাসিয়া রয়েছেন বামের বিভিন্ন ফরেস্ট ভিলেজে। তাদের মধ্যে খাসি, প্নার (Pnar) ও ওয়ার (War) - এই তিনটি ভাষার প্রচলন রয়েছে। খকড়া, মালপুঞ্জি, হাডামাপুঞ্জি, বালুখালপূঞ্জি, পূর্ব ও পশ্চিম ধলাখাল খাসিয়াপুঞ্জি এবং বাঘখাল নামে পরিচিত পাহাড়ী অঞ্চলসমূহে মূলতঃ তাদের বাস। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা খৃষ্টান, সেং খাসি। সেংখাসি (Seng Khasi) তাদের প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসব। তাছাড়া বাদেইয়েং খ্লাম (Bahdiengklam) নামক ধর্মীয় উৎসব তারা প্রধান উৎসব রূপে পালন করে থাকে। খৃষ্টানদের বড়দিন উৎসব তো হয়ই। বামের মিজোরাম সীমান্তে মিজোদের সাথে মার (Hmar) উপজাতির বসবাস রয়েছে। তাদের মাতৃভাষাও মার (Hmar)। মিজোদের মতো তারাও খৃষ্ট ধৰ্মে বিশ্বাসী, মূল বিভেদ ভাষাগত। মারদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎসব হল শিকপুই রুওই (Sikpui Ruoi)। জুমচাষ তাদের প্রধান জীবিকা হলেও আজকাল তাদের মধ্যে কিছুটা ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁকও পরিলক্ষিত হয়।

 

বামের জনসংখ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছেন বাঙ্গালী হিন্দুরা। হিন্দুদের মধ্যে পাল, দাস, রায়, নমশূদ্র, পাটনি,পুরকায়াস্থ ,শুক্লবৈদ্য ইত্যাদি উপাধির মানুষ রয়েছেন। বাঙ্গালী হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা মহা আড়ম্বরে পালিত হয়। বৃহৎ সংখ্যক সার্বজনীন মন্ডপে দূর্গাপূজার আরতির আয়োজন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা নিজ নিজ মন্ডপে দূর্গাপূজার আয়োজন করেন। দূর্গাপূজার পরেই রয়েছে কালিপূজা, লক্ষ্মী পূজা যেগুলো সার্বজনীন ভাবে পালন করা হয়। এছাড়াও রয়েছে দোল পূর্ণিমা। বামের অধিবাসীদের মধ্যে হিন্দুস্থানী সম্প্রদায়ের লোকও রয়েছেন বিশাল সংখ্যায়। দূর্গাপূজা ছাড়াও তারা ছট পূজা মহা সমারোহ উদযাপন করেন। সংখ্যায় কম হলেও নাগা সম্প্রদায়ের কিছু অধিবাসী রয়েছেন বাম অঞ্চলের ধলাই ও ভাগাবাজার এলাকায়। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা খৃষ্টান ও টি.আর.সি. (Tingka Raguang Clapriak) - এই দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত। রংমাই ও নাগা, এই দুই ভাষায় তারা কথা বলে। টি.আর.সি. সম্প্রদায় দূর্গাপূজা ও কালিপূজা পালন করে না কিন্তু পূজো দুটোকে তারা মানে এবং এ উপলক্ষে হাস ও মুরগি বলি দেয়। টি.আর.সি. সম্প্রদায়ভুক্ত নাগারা বছরে দুটি উৎসব পালন করে। জানুয়ারি মাসে উদযাপিত Gaangaa সবচেয়ে বড় উৎসব। Dikap নামে আরও একটি উৎসব আছে যা শুধু যুবতী মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। খৃষ্টধর্মে বিশ্বাসী নাগাদের মূল ধর্মীয় উৎসব বড়দিন।

 নাগাদের দুটি সম্প্রদায়ই মৃতদেহ কবর দেয়। সাত ফূট গভীর গর্ত করে কফিন বন্দী মৃতদেহ রেখে তার উপর বাঁশ বিছিয়ে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। মৃতদেহ সাদা কাপড়ে আবৃত করা হয়।

মদ ও শূকরের মাংস নাগাদের কাছে দুটি অপরিহার্য ভোগ্যবস্তু। জন্ম এবং মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই এ' দুটির ব্যবহার অনিবার্য। মৃত্যুর পর পাঁচ দিনের মাথায় Kainit Suakmai  এবং বছরে একবার Ngaitom mei নামে দুটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান মৃতের সদ্গতির উদ্দেশ্য করা হয়। নাগাদের একটি গ্রুপের কাছে বাইবেল হল পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। TRC সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ হল Ralarik। Lugailen Rongmai নামে ভাগাবাজার নিবাসী এক নাগা নাগরিকের কাছ থেকে এ সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। শূকর পালন করে বিক্রি করাই এতদ অঞ্চলের নাগাদের প্রধান পেশা। অবশ্য দেশী মদ বিক্রির ব্যবসাও তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।

…………………………………………………………………………………………………………………………………..

No comments:

Post a Comment