Saturday, 26 September 2026

79.‘বাম’ - ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্ৰময় এক জনপদ - 1:সাবির আহমদ চৌধুরী

  আসামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে মিজোরাম সীমান্ত ঘেষা মোটামুটি ২৮১.৮৭ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ভূখন্ডটি বাম নামে অভিহিত। । সর্বমোট ৪৫টি ছোট রাজস্ব গ্রাম ৩৫টি বসতিপূৰ্ণ ফরেস্ট ভিলেজ নিয়ে বিশাল বাম অঞ্চল। বাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত গ্রাম পঞ্চায়েত গুলো হল ধলাই ,ভাগা বাজার , সপ্তগ্রাম ,চান্নিঘাট ,রাজনগর ,জলালপুর , শেওড়ারতল ও  জীবনগ্রাম। এ' গ্রাম পঞ্চায়েত গুলো নরসিংপুর উন্নয়ন খণ্ডের অধীন। ।এগুলো ছাড়া পালংঘাট উন্নয়ন খণ্ডের অধীনে আরও তিনটি গাঁও পঞ্চায়েত-রুকনি,ভূবনডর ও মনিয়ারখাল গাঁও পঞ্চায়েতের ছয়টি‘ গ্রাম ও বাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

   বর্তমান নিবন্ধটি বামের ধর্মীয়, ভাষিক, ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের প্রতি সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে লিখিত। বাম আক্ষরিক অর্থেই নৃতত্ববিদদের স্বর্গ স্বরূপ। এখানে রয়েছেন মৈতৈ, মণিপুরি, মৈতৈ মুসলিম, বাঙ্গালী মুসলিম, মৎস্যজীবি বাঙ্গালী মুসলিম, বিষ্ণুপ্ৰিয়া মণিপুরি, মিজো, মার, উড়িয়া, রিয়াং, খাসিয়া, নাগা, কুকি, বর্মণ, টিপরা এবং সর্বোপরি বিশাল সংখ্যক বাঙ্গালী হিন্দু যাদের মধ্যে আছেন উচ্চ বর্ণের বাঙ্গালী বর্ণ হিন্দু, অনুসূচীত জাতি, নাথ সম্প্রদায় এবং উত্তর ভারত থেকে আগত প্রচুর সংখ্যক হিন্দি ভাষী। চমকপ্ৰদ বিষয় হল বাম তথা দক্ষিণ কাছাড়ের বৃহত্তম বাজার ভাগাবাজারে বর্ণিত এত ধর্মীয় ও ভাষিক সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য বা পারিবারিক অন্যান্য প্রয়োজনে নিত্য নৈমিত্তিক আনাগোনা এহেন  বৈচিত্রময় ভারতবর্ষের এক দুর্লভ খন্ডচিত্র। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বতন্ত্ৰতার সাথে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রয়েছে। এখানে সেসব বৈচিত্র স্বল্প পরিসরে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হল।

২০১১ ইংরেজীর আদমসুমারী মতে বামের মোট  ৯৪৩৭৯ জন অধিবাসীর মধ্যে   বহু মুসলমান অধিবাসী রয়েছেন যার সিংহভাগই বাংলা ভাষী। তাছাড়া রয়েছেন মৎস্যজীবি বা শেখ সম্প্রদায়ের মুসলমান লোক,পাঙ্গাল মুসলমান । মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা কোনো বর্ণ, গোত্র, জাতের ভিন্নতা নেই কিন্তু বরাক উপত্যকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত এ সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে প্রচলিত কাছাড়ের কথ্য ভাষার ব্যবহারে কিছুটা শব্দগত ও ভাষিক তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।

 বামের মুসলমানদের সংস্কৃতি মূলত ভাষা, ধর্ম এবং সামাজিক রীতিনীতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

বামের মুসলমানদের সবাই হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জের ভাঙ্গা, এবং শিলচরের পার্শ্ববর্তী বেরেঙ্গা, ভাগাডর এবং শহরতলীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত। তাদের কাছাড়ের কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত বাগধারার প্রতি লক্ষ্য করলে এ কথা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে তাদের মধ্যে আদি বাসস্থানের বাগধারার সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।

    হাইলাকান্দি মূলের লোকদের মধ্যে প্রচলিত কিছু শব্দ তাদের আদি আবাসস্থলের পরিচয় বহন করে। যেমন তাদের মধ্যে রান্না করা 'বিরইন' কে পিঠা, পুষ্করিনীকে পুকইর বা পুরকি, দূরকে পাল্লা, অনেকটা বুঝাতে ফাই (যেমন ফাই পাল্লা অর্থাৎ অনেক দূর), আমি কে মুই, রান্নার পাত্র বিশেষকে টউ, ফুফুকে পিওন, চাচাকে বাছাই ইত্যাদি শব্দের প্রচলন ছিল। 'ছিল' এই অর্থে বলা হচ্ছে যে এ সমস্ত শব্দের প্রচলন অধুনা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

 শিলচরের শহরতলী থেকে আগত লোকজনদের মধ্যে 'দাদি' কে 'বুদি' বা 'বুদিজী', জল বা খাদ্য দ্ৰব্য রাখার প্রশস্ত পাত্রকে 'তাগারা', জেষ্ঠ সম্পর্কীয়দের' ঠাকুর' বা 'ঠাকুরজী', চাদরকে' রেফা, সব ধরণের পুষ্করিনীকে 'দিঘী' ইত্যাদি বলার প্রচলন রয়েছে বা ছিল। শিলচরের শহরতলী হতে আগত অভিবাসীরা বামে উজানি নামে পরিচিত।

  শুধু ভাষাতেই নয়, বামে উজানী মুসলিম ও হাইলাকান্দি মূলের মুসলিম মহিলাদের পোশাকেও পার্থক্য ছিল। হাইলাকান্দি মূলের মহিলারা বোরকা পরতেন এবং বাঁশের তৈরি সজ্জিত 'ছাত্তা' মাথায় দিতেন । অন্যদিকে, উজানী মহিলারা চাদর পরতেন। উভয় গোষ্ঠীর সামাজিক রীতিনীতিতে এতটাই পার্থক্য ছিল যে, বামের প্রথম দিকে উজানী মুসলিম ও হাইলাকান্দি মূলের মুসলিমদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হতো না। উল্লেখযোগ্য যে, সিলেটের একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত অনুরূপ এক ‘ছাত্তা’কে ‘জৈন্তাপুরি ছাত্তা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে

করিমগঞ্জের ভাঙ্গা অঞ্চল হতে আগত বিরাট সংখ্যক মানুষের বসবাস রয়েছে বিশেষ করে বামের ভাগাবাজার ও পার্শ্ববর্তী জায়গা গুলোয়। ভাষার ব্যবহারে তাদেরও স্বকীয়তা বিদ্যমান রয়েছে। তাদের কথাবার্তায় স্নানকে নাওয়া, ওগোকে 'রেবো', দিদিমা বা দাদিকে বিবি, ভ্রাতৃবধূকে 'মিয়ার বউ', এখন বুঝাতে 'এবলা' বলার প্রচলন রয়েছে।

ঠিক তদ্ৰুপ ভাবে মৎস্যজীবি শেখ সম্প্রদায়েরও বাগধারায় ভিন্নতা রয়েছে। দিয়ে দাও কে 'দেলা', অপেক্ষা করাকে 'দম লাগো', আমাকে 'মুই', আমার বুঝাতে 'মোর' ইত্যাদি শাব্দিক বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়।

  বামের  মুসলমানদের  মধ্যে জারি  নাচ বা জারি গানের প্রচলন ছিল ।মহরম উৎসব উপলক্ষে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের শহিদ হওয়ার মরমান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত জারি গান করুণ  সুরে গেয়ে একদল লুঙ্গি পরিহিত পুরুষ বৃত্তাকারে  ঘুরে ঘুরে বুক চাপড়ে জারি নাচ করত। বর্তমানে এই লোক নৃত্য লোপ পেয়েছে। বর্তমানে, বামে  রোজা রাখা, প্রার্থনা, ধর্মীয় কার্যকলাপ এবং দান-খয়রাতের মাধ্যমে মহররম পালিত হয় ।

…………………………………………………………………………………………………………………………..

No comments:

Post a Comment