Thursday, 1 October 2026

84.বামাঞ্চলের অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক ও কৃষ্টিগত জীবনধারা-2: শ্ৰীমতি সুনন্দা পুরকায়স্থ

  

আমাদের এই বামাঞ্চলে কয়েকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে। এই প্রতিষ্ঠান দ্বারা অনেক লোক নানা ভাবে উপকৃত হইতেছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রহিয়াছে বিশেষ ভাবেঃ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, থানা, ব্যঙ্ক, ডাকঘর, জলসরবরাহ ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় শুল্ক বিভাগ, রাজ্যিক শুল্ক বিভাগ, টেলিফোন কেন্দ্র, সামাজিক বনানীকরণ বিভাগ, বনবিভাগ, কেন্দ্রীয় জল নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, সমবায় সমিতি ইত্যাদি। এই বামাঞ্চলের সর্বপ্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইল বাম নিত্যানন্দ উচ্চমাধ্যমিক বহুমুখী বিদ্যালয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই বিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় ৺ নিত্যানন্দ বর্মণ মহাশয় কিছু  টাকা দান করিয়াছিলেন। তাঁহার নামানুসারে এই বিদ্যালয়টির নামকরণ হয়। এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকজন লোকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে পরম শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিতে হয়। ক্রমে স্কুলটির দ্রুত পরিবতন  পরিবর্তন ও কলেবর বৃদ্ধি হইতে থাকে বৰ্তমানে ইহা দ্বাদশ শ্রেণী যুক্ত বিরাট স্কুলে পরিণত হইয়াছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এই অঞ্চলে ছাত্র ছাত্রীরা দ্রুত উচ্চ শিক্ষিত হইয়া উঠে এবং কর্ম জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উচ্চ পদে নিযুক্ত আছে।

বামাঞ্চলে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের বৃত্তিগত ও শিল্পগত বৈশিষ্ট্য আছে। এই সকল বৈশিষ্ঠ্য হঠাৎ করিয়া সৃষ্টি হয় নাই। প্রাচীন কাল হইতে জনগণের চিন্তাধারা জ্ঞান এবং কলাকৌশল ধীরে ধীরে বিকশিত হইয়া জীবিকা, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদির মধ্যে দিয়া বামাঞ্চল একটি সাংস্কৃতিক জীবন গড়িয়া উঠিয়াছে। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোক নিজ নিজ বৃত্তি অবলম্বন করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেছে, পাটনী সম্প্রদায়ের লোকেরা কৃষিকাজ, ব্যবসা-বানিজ্য এবং উচ্চপদে চাকুরী করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেছে, নমশূঃত্র সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ ছাড়াও বাঁশ-বেতের কাজের জন্য বিশেষভাবে সু-প্রসিদ্ধ। এই বাঁশ-বেতের কাজের মধ্যে সুক্ষ্ম কারু কার্য্যের কলা নৈপুণ্যের নিদর্শন দেখা যায়। তাহাদের স্ত্রীলোকেরাও এই সমস্ত কাজে পুরুষদের সাহায্য করিয়া থাকে। মণিপুরী ও বৰ্মণ সম্প্রদায়ের লোকেরা বাড়ীতে সাংসারিক কাজ কৰ্ম ছাড়াও নিজের প্রয়োজনীয় বস্ত্র তৈরী এবং উদ্বৃত্ত কাপড় বিক্রি করিয়া আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করিতেছে। মণিপুরী সম্প্রদায়ের স্ত্রীলোকেরা বাজার হাট হইতে আরম্ভ করিয়া অন্যান্য সকল ধরণের শ্রমকাৰ্য করিয়া থাকে। তাহাদের মধ্যে পুরুষেরা একটু সৌখিন প্রিয়। হিন্দুস্থানী সম্প্রদায়ের লোকেরা কৃষি কাজ এবং অন্যান্য কঠোর শ্রমের কাজ করিয়া থাকে । তাহাদের স্ত্রী লোকেরা ও শ্রমকাৰ্যে পুরুষদের সাহায্য করিয়া থাকে । পাহাড়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা মাটি অসমতল থাকায় লাঙল বা গরুদ্বারা হালচাষ করিতে পারে না। তাই তাহারা জঙ্গলে ‘জুম’ পদ্ধতিতে চাষ করিয়া থাকে। জমিতে সার কমিয়া গেলে বা জমি অনুর্বর হইয়া গেলে অন্য স্থানে গিয়া ‘জুম’ পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন করিয়া থাকে। এইভাবে বামাঞ্চলের প্রত্যেক সম্প্রদায় জীবন ধারণের জন্য বিভিন্ন রকম উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করিতেছে।

একটি সমাজের সংস্কৃতি হইল সেই সমাজের দর্পন। ব্যক্তিগত আচার আচরণ, ভাষা, কলা, দর্শন, ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়া সংস্কৃতি প্রকাশিত হয়। এক কথায় বলা হয় মানুষের সামগ্রিক জীবনধারাই সংস্কৃতি। এই বামাঞ্চলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক ক্রিয়াকলাপ ও সংস্কৃতি ভিন্ন ধরণের। বামাঞ্চল একটি কৃষি প্রধান অঞ্চল। এখানে শতকরা ৯০ ভাগ লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল। বামাঞ্চলে নানা ধৰ্মাবলম্বী লোক বাস করে। আমাদের এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরণের সংস্কৃতি, আচার—ব্যবস্থার ও রীতি নীতি ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়। এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পাৰ্থক্য দেখা যায়। বামাঞ্চলে অনগ্রসর ও পার্বত্য জাতির লোক বাস করে। তপশীল শ্রেণীভুক্ত অনেক লোকে এই অঞ্চলে আছে। তাহাদের সমস্যাও নানা রকমের, তাই সামাজিক দিক দিয়া  বামাঞ্চল একটি সমস্যাবহুল অঞ্চল। আমাদের এই অঞ্চলে কৃষিজীবি ও হস্তশিল্পী সম্প্রদায়ের লোক ছাড়াও কিছু ব্যবসায়ী এবং সরকারী কর্মচারীও এই অঞ্চলে আছে। বামাঞ্চলে কোন শিল্প উদ্যোগিক প্রতিষ্ঠান নাই। বেশীর ভাগ মানুষই কৃষির উপর জীবিকা নির্ভর করে। এখানে জমিৰ উৎপাদন ক্ষমতাও কম। চাষীরা পুরাতন পদ্ধতিতে কৃষিক্ষেত করিয়া থাকে। ফলে অর্থনৈতিক দিক দিয়া এই অঞ্চলটি অতি দুর্বল।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক আসিয়া এই বামাঞ্চলে বসতি স্থাপন করিয়াছে। বামাঞ্চলবাসী সবাইকে গ্ৰহণ করিয়াছে, কাহাকেও ঘৃণার চোখে দেখে নাই। পরিবেশ অনুযায়ী এই অঞ্চলের কৃষ্টি ও সভ্যতা পৃথক পৃথক। এই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের লোকের দ্বারা গড়িয়া উঠিয়াছে। এই সাংস্কৃতিক ঐক্যবোধ বামাঞ্চলবাসীর একতা সৃষ্টির সহায়ক হইয়াছে। বামাঞ্চল এক বৈচিত্রপূর্ণ অঞ্চল। জাতির গঠন, ভাষা, ধর্ম, রীতি নীতি, সাজপোষাক, জীবিকা ইত্যাদি সকল দিকেই বামাঞ্চলের বিচিত্রতার শেষ নাই। প্রকৃতির লীলাভূমি এই বামাঞ্চল কাহাকেও পর বলিয়া অবহেলা করে নাই। এই সংমিশ্রনও সমন্বয় বামাঞ্চলবাসীর ঐক্যের মূলতত্ত্ব। তাই কবির ভাষায় :

“নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান

       বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।।”

………………………………………………………………………………….


লেখক প্রিচিতিঃ-

 মহাদেবপুরের  শ্ৰীমতি সুনন্দা পুরকায়স্থ  বি এন এম স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী। এই নিবন্ধটি  বি এন এম পি স্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী সুভেনিরে ১৯৯৪ সনে প্রকাশিত হয়েছিল ।ত্রিশ বছর পর এখানে পুনর্মুদ্রণ হল।

……………………………………………