বামে " পুতুল বিয়ের " পরম্পরা
পঞ্চাশ বছর আগের গ্রামাঞ্চল আর আজকের গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হয় ।
পাশ্চাত্য সভ্যতার হাওয়ায় আর উগ্র আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রাচীন ঐতিহ্য গুলো আজ মুছে যাওয়ার পথে । বিজ্ঞানের অতি 'বেগ' , সাধারণ মানুষের সহজ সরল 'আবেগ' কে তাড়িয়ে দিতে চাইলেও অন্তরের মণিকোঠায় সঞ্চিত স্মৃতিগুলো আজও উঁকি দেয় ফেলে আসা দিনগুলোর আবেগঘন, আন্তরিকতাপূর্ণ গ্রাম্য সংস্কৃতির একটুখানি ছোঁয়া পাবার আকাঙ্ক্ষায় ।
বাম কাছাড়ের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি "পুতুল বিয়ে " হয়তো আজ কিংবদন্তি হতে চলেছে । কিন্তু এটাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস যে এতদঞ্চলের মানবিক মেল বন্ধন আর ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতিকে শক্ত পোক্ত আর অটুট রাখার একটা প্রচেষ্টা রূপে সার্থকতা লাভ করতে পারে তা বলাই বাহুল্য ।
তখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিলো না । তবে কোনও কোনও সম্ভ্রান্ত পরিবারে ল্যান্ড ফোন ছিলো । গ্রামের ধনী-গরিব সব পরিবারের শিশু দেরে পুতুল বানিয়ে দিতেন মা-মাসিরা, দিদিমা-ঠাকুমারা , কাকিমা-জেঠিমারা । অবশ্য আজকের দিনে বাজারে পাওয়া ফ্যাশনেবল পুতুল নয়, প্রাচীন পদ্ধতিতে কাপড়ের তৈরী পুতুল । স্ত্রী-পুরুষ উভয় প্রকারের পুতুল ই বানানো হতো, তবে স্ত্রী পুতুলের সংখ্যাই বেশি থাকতো । এদেরকে বলা হতো "তেনার কইন্যা" । কন্যা শিশুরা এই পুতুল গুলোকে নিজের সন্তানের স্বীকৃতি দিতো । ওদের যত্ন করতো, স্নান করাতো, সাজাতো, খাওয়াতো, পোষাক পাল্টে দিতো , ঘুম পাড়াতো । এক কথায় সন্তানের প্রতি মায়ের সব কর্তব্যই পালন করতো । হয়তো এভাবেই পরবর্তী কালের একজন সুগৃহিনী, একজন আদর্শ জননী হয়ে উঠার প্রশিক্ষণ পেয়ে যেতো ।
এভাবে সন্তান পালনের খেলা খেলতে খেলতে শুরু হয়ে যেতো সন্তানদের বিয়ে দেবার ভাবনা । গ্রামের সব খুদে মায়েরা নিজেদের পুতুল সন্তানদেরে নিয়ে এক বাড়িতে জড়ো হতো । সঙ্গে অবশ্য অভিভাবক মহিলারাও থাকতেন । সব বাড়ি থেকেই আসতো কোনও না কোনও ঘরে প্রস্তুত করা খাদ্য সামগ্রী । অবশ্য আজকের দিনের মতো মাংস-পোলাও, বিরিয়ানি কিংবা চাইনিজ খাবার নয়, ঘরে তৈরী পুলি পিঠা, চিতল পিঠা, ঘুরাইল পিঠা , মালপোয়া, পাটিসাপটা, চালের গুড়ি দিয়ে তৈরী বিশেষ ধরনের রুটি আর পায়েস । সব বাড়ি থেকে আনা খাদ্যদ্রব্য একত্রিত করে হতো ভুরি ভোজের আয়োজন ।
সত্যিকারের বিয়ের মতো নানা অনুষ্ঠান পালন করা হতো এই পুতুল বিয়েতে । আনুষ্ঠানিকভাবে জল ভরা, বর-কনে কে স্নান করানো, সাতপাকে বাঁধা__ সবই হতো উলু দিয়ে । মহিলারা বিয়ের গীত গাইতেন, ধামাইল নৃত্যে সরগরম হয়ে উঠতো বিয়ে বাড়ি ।
বিয়ের তারিখ বা লগ্ন কিন্তু চিরস্থির থাকতো । চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিতেই হতো পুতুল বিয়ে । দিনটি সবারই জানা, তাই বিয়ের প্রস্তুতি চলতো আগে থেকেই । প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা ও হর্ষ উল্লাসের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর সবাই বসতো পংক্তি ভোজনে । আহার পর্ব শেষ হলে সবাই নিজ নিজ পুতুল নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতো ।
পুরো একমাস পর অর্থাৎ বৈশাখ মাসের সংক্রান্তির দিন ছিলো বিদায়ের জন্য ধার্য । মজার ব্যাপার হলো এটা কিন্তু শুধু কন্যা বিদায়ের অনুষ্ঠান ছিলো না, ছিলো দম্পতি বিদায়ের অনুষ্ঠান । পুতুল বর-কনেকে নিয়ে আবার সবাই এক বাড়িতে মিলিত হতো । বাসি বিয়ে সেরে, খাওয়া দাওয়া সেরে, "গীত জোকাড় " (গান ও উলুধ্বনি) দিয়ে 'জাহাজে' করে বর-কনেকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো অর্থাৎ সংসার ধর্ম পালনের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হতো । এই জাহাজ তৈরী হতো কলাগাছের ভেলা , বাঁকানো বাঁশের ছাউনি আর তার উপর কাপড়ের ঢাকনা দিয়ে । রঙিন কাগজ, ফুলের মালা ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো জাহাজ সাজানোর কাজে ।
সন্তানদেরে পাঠিয়ে দিয়ে কনের মা, বরের মা সবাই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতো । কোমলমতি অনেক শিশুকে উচ্চস্বরে বিলাপ করতেও দেখা যেতো । অভিভাবকেরা নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে রাখতেন ক্রন্দনরত শিশুদেরে ।
পুতুল গুলোকে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য ছিলো শিশুরা । কারন কর্তব্য কর্ম তো করতেই হবে , তা সে যতো কঠিনই হোক । হৃদয়ের আবেগের থেকে কর্তব্যকে বেশী গুরুত্ব দিতেই হবে । এটাই যে সংসার ধর্ম । সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে প্রয়োজনে হৃদয়ের আবেগকে চেপে রাখতে হয়, অনেক সময় অনেক ত্যাগও স্বীকার করতে হয় । এই বিষয় গুলোই হয়তো বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কচিকাঁচা শিশুদেরে শিক্ষা দেওয়ার মহড়া চলতো ।
তারপর আবার নতুন পুতুলের আশায় বুক বাঁধতো শিশুরা । শুরু হতো প্রতীক্ষার পালা । আবার কবে আসবে পুতুল নিয়ে খেলার সুযোগ ? কবে আসবে পুতুল বিয়ের লগ্ন ? দিন যায়, মাস যায়, অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটে । এসে যায় চৈত্র মাস । বর্ষচক্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে জীবন চক্র । মা-মাসিরা হাতে তুলে নেন পুতুল তৈরীর সরঞ্জাম আর ক্ষুদে মায়েদের মন জুড়ে চলতে থাকে আসন্ন সন্তানদের লালন-পালন করার পরিকল্পনা । ওদের বিয়ের দায়িত্ব পালনের জল্পনার সঙ্গে জন্ম নেয় গ্রামের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপনের তাগিদ । অনুভব করে পরস্পরের প্রতি অন্তরঙ্গতার আকর্ষণ । তারা ভাবতে শিখে__ তাদের সমবয়সী বন্ধুরা, বন্ধুদের অভিভাবকেরা "সবাই তো আপনজন" ।
………………………………………………