বামের লোকনৃত্য “ধামাইল”
বিপুলা পৃথিবীর আনাচে কানাচে
ছড়িয়ে আছে বিচিত্রা পৃথিবীর কতো বৈচিত্র্য সম্ভার ।আদিম যুগ থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ নিজের সুখ দুঃখের অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত
অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে নানাভাবে ,নানা ভঙ্গিমায়
।ব্যক্তির অভিব্যক্তি ক্রমে সামাজিক ভাবে রূপায়িত হয়েছে । সৃষ্টি হয়েছে কতো শিল্পের, কতো সংস্কৃতির । এ ভাবেই বিভিন্ন লোকসংগীত
ও লোকনৃত্যের হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ।যেমন পাঞ্জাবের ভাংরা , রাজস্থানের ডান্ডিয়া,গুজরাটের গরবা ,কেরলের ভেলাকালি,বাংলার ছৌ,রায়বেশে প্রভৃতি ।
কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ অর্থাৎ সমগ্র বরাক উপত্যকা এবং অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত সিলেট অঞ্চলের লোকনৃত্যই” ধামাইল “ নামে সুপরিচিত ।ছয়মাত্রা তালযুক্ত গানের সঙ্গে হাত তালি সহযোগে বৃত্তাকারে সমবেত নৃত্যই এর বৈশিষ্ট্য । বিভিন্ন পূজা পার্বণ,বিবাহ,অন্নপ্রাশনাদি উৎসবকে কেন্দ্র করে বিষয় ভিত্তিক গানের সঙ্গে এ নৃত্য পরিবেশিত হয় ।এ নৃত্যের একচ্ছত্র অধিকার মহিলাদের । শিল্পী বৃন্দ নিজেরাই গান গেয়ে গেয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন । রাধারমন দত্ত নামের জনৈক বিদগ্ধ শিল্পী তথা গীতিকারকে ধামাইলের জনক বলে আখ্যায়িত করা হয় ।
আজ থেকে প্রায় পয়ত্রিশ বছর
আগে শিলচর শহরের এক লোকসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রে
অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলাম ।সেখানে
ধামাইল সম্বন্ধে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জনৈক লোক সংস্কৃতি গবেষক নিজের বাঁ হাতের চেটোয় ডান হাত দিয়ে সজোরে আঘাত করে একটা
পা প্রায় দেড় ফুট উপরে তুলে সজোরে তা মাটিতে ফেলে বললেন -ধা দিতে হাতের মইল যদি না যায়, তবে আর ধামাইল কিসের?
বিস্মিত হলাম ।সেই মুহূর্তে
চোখের সামনে ভেসে উঠলো মাত্র কয়েক দিন আগে দূরদর্শনে দেখা পশ্চিম বঙ্গের
পুরুলিয়া অঞ্চলের এক ছৌ নৃত্যগুরুর
বক্তব্য –“ লাফিয়ে যদি মাটি ফাটানো না গেলো
তবে আর ছৌ হলো কী করে ? ভাবলাম – এটা কি
একটা বক্তব্যের উপর আরেকটা বক্তব্যের প্রভাব ? অর্থাৎ বক্তব্যের অন্ধ অনুকরণ
,নাকি ধামাইলের উপর ছৌ এর অপ্রত্যাশিত হামলা ।
মেনে
নিতে পারলাম না । আমি নিজে গ্রাম কাছাড়ের মেয়ে ,গ্রামেই জন্মেছি ,গ্রামেই বড় হয়েছি
। গ্রামে প্রচলিত ধামাইল সম্বন্ধেও যথেষ্ট
ওয়াকিবহাল বলে মনে করি ।শহুরে গবেষকের বক্তব্য শুনে বিভ্রান্তিতে
পড়ে গেলাম ।ধামাইল সম্বন্ধে আরও জানার আগ্রহ বেড়ে গেলো । নিজের এলাকা বাম কাছাড় ছাড়াও সমগ্র বরাক উপত্যকায় প্রচলিত ধামাইল সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম । সিলেট
থেকে আসা মানুষদের থেকে ওখানকার
ধামাইল সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করলাম
। এই অনুসন্ধানের ফলে জানতে পারলাম ধামাইল সম্বন্ধে আমার ধারনাটাই ঠিক । বাম কাছাড়ের ধামাইলের
সঙ্গে অন্যান্য স্থানের ধামাইলের
বিশেষ কোন ও পার্থক্য নেই ।
তবে এই অনুসন্ধিৎসা আমাকে এমন একটা ঐতিহ্যের সন্ধান দিলো
যা শুধুমাত্র বাম কাছাড়েরই নিজস্ব সম্পদ । প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে বিকশিত ,এখানকার
নানা সমৃদ্ধ ধামাইল সম্বন্ধে জানতে পেরে গর্বিত বোধ করলাম । জানতে পারলাম- সিলেটে যেমন কিছু উদ্যমী
ধামাইল প্রেমিক নানা তাল ও পায়ের কাজের মাধ্যমে
ধামাইল কে জনপ্রিয় করে তুলেছেন , আমাদের বাম কাছাড়েও সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল ,তবে তুলনায় অনেক বেশী
।সে প্রচেষ্টায় ছিল অভিনবত্ব,ছিল চমৎকারীত্ব
।কাছাড়ের কিছু শিল্প স্রষ্টা নিজের নৈপুন্যকে ধামাইলের উন্নতি সাধনে
নিয়োগ করে আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও তাদের কীর্তি শুধু বাম অঞ্চলে নয় সমগ্র বরাক উপত্যকায় আজও বেঁচে আছে
।
সাধারণভাবে বিভিন্ন পার্বণ
বা অনুষ্ঠান কেন্দ্রীক কিছু গান মোটামোটি
সর্বত্রই সমান ভাবে ধামাইলে অনুশীলিত হলেও বাম কাছাড়ের বিশেষত্ব অন্য জায়গায় ।এক্ষেত্রে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশী,তিনি
হলেন পানিভরা গ্রামের গোপাল দাস নামক জনৈক
বৈষ্ণব কবি , সংসার জীবনে অর্থাৎ গার্হস্থ আশ্রমে যাঁর নাম ছিল গোপী চরণ নাথ । তীর্থ
ভ্রমণ উদ্দেশ্যে তিনি বৃন্দাবন যাত্রা করে সেখানে বহু দিন বসবাস করেন এবং বহু বৈষ্ণব
কবির সান্নিধ্য লাভ করেন ।সেইসব মহান বৈষ্ণব কবিদের রচিত অমূল্য কয়েকটা কাব্য গ্রন্থ নিয়ে যখন গ্রামে ফিরে আসেন তখন সেই গুলিকেই এখান কার
কীর্তনে এবং ধামাইলে প্রয়োগ করতে থাকেন ।তাঁর
নিজের কাব্য প্রতিভাও এখানে সংযোজিত হয়।
No comments:
Post a Comment