Tuesday, 30 June 2026

39.বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থান-4 :পঞ্চমী নাথ মাজুমদার

 দীপাবলিঃ

দীপাবলি যা অন্ধকারের ওপর আলোর জয়, মন্দের ওপর ভালোর, এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের । এই উৎসব বামে  ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয়৷ ।কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে দীপাবলি পালিত হয়  ৷ দীপাবলি হল "আলোর উৎসব" - ঘর, মন্দির এবং পাবলিক স্পেসে তেলের প্রদীপ , মোমবাতি এবং আলংকারিক আলো জ্বালানোর ঐতিহ্য। আলোকসজ্জা অন্ধকারের উপর আলোর বিজয় এবং জ্ঞান দ্বারা অজ্ঞতা দূরীকরণের প্রতীক।

এই আলোর উৎসবের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য  কিন্তু বিশেসভাবে প্রনিধানযোগ্য । এই সময় মাঠ থাকে সবুজ ধানগাছে ভরা । আসন্ন শীতের হিমেল  হাওয়া সবুজ মাঠে যখন মৃদুমন্দ দোলা দিয়ে যায় তখন মনে হয়  সবুজ সাগরে ঢেউ উঠে তটভুমিতে আছড়ে  পড়ার অপেক্ষায় শুধুই ধেয়ে চলেছে  সামনের দিকে ।বড়ো নয়নাভিরাম এই দৃশ্য । এ সময় ধানগাছে  ফুল আসে,ফল  ধরে । কিন্তু ফল গুলো (ধান ) তখনও থাকে অপুষ্ট, ,কোমল ,দুধের মত তরল । আর এই সময়ই প্রাদুর্ভাব ঘটে পঙ্গপালের  মত নানা কীট  পতঙ্গের ,যারা তরল শস্য শুষে নিয়ে  ফসল নষ্ট করে দেয় । এই ক্ষতিকারক কীট পতঙ্গ থেকে ফসল রক্ষা করার প্রয়োজনেই আলোর উৎসবের   প্রচলন ।চোখ ধাধানো  আলোর হাতছানিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে । ফলে বহুলাংশে ফসল রক্ষা পায় ।

দীপাবলিতে রুকনি নদী   বা  অন্য কোনও জলাশয়ে আলোর ভেলা ভাসানোর রীতি ও বাম অঞ্চলে প্রচলিত ।   পূর্ব পুরুষদের  শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার সুন্দর পদ্ধতি হলো আলো জ্বালিয়ে তাঁদের চলার পথকে আলোকিত করা । বাঙালী হিন্দুদের বিশ্বাস এতে তাঁদের চলার পথ  যেমন সুগম হয় তেমন-ই  খুশী হয়ে তারা  উত্তর পুরুষদের প্রতি প্রসন্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন অর্থাৎ আশীর্বাদ করেন । আর গুরুজন দের  আশীর্বাদ তো  চির কাম্য। তাই দীপাবলির শুভ মুহূর্তে বামের জলাশয় গুলিতে ,বিশেষ করে  রুকনি  নদীতে সারি সারি  প্রদীপের  ভেলা ভাসতে  দেখা যায় । এ দৃশ্য  যেমন দৃষ্টিনন্দন ঠিক তেমনই প্রকৃতিকে দূষণ মুক্ত করতেও বিশেষ সহায়ক ।

কাল বা সময় বড় বলবান  এবং সর্বদ্রষ্টা । সময়ের কাছে কোনও কিছুই অস্পষ্ট , অদৃশ্য কিংবা অজ্ঞাত থাকে না । সময়ই পারে  অজ্ঞতার  অন্ধকার ভেদ করে  সত্যের  উদ্ঘাটন করতে । তাই দীপাবলিতে ,অমানিশার অন্ধকারেই সচছতার দেবী কালি (‘কাল’ এর  স্ত্রী লিঙ্গ) পূজা হিন্দু আধ্যাত্ম চিন্তার এক নিগূঢ় সত্যের পরিচায়ক । শুভ দীপাবলিতে মানুষ পরস্পর উপহার ,মিষ্টি এবং শুকনো ফল বিনিময় করে । এবং শুভেচ্ছা  ও আশির্বাদ  জানাতে  আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের সংগে দেখা করে ।

বাসন্তী দুর্গাপূজাঃ

একই দেবী কখনও বাসন্তী আবার কখনও শারদীয়া । তিনি হলেন দেবী দুর্গা  । দুর্গতি নাশিনী দুর্গা বছরে  দুইবার পূজিতা । বসন্তকালে বাসন্তী আর শরৎ কালে শারদীয়া নামে পরিচিতা এই দেবীর পূজা পদ্ধতি,রীতি নীতি সবই এক এবং অভিন্ন ।

পুরাণ মতে ,পুরাকালে  মহারাজ সুরথ সর্বপ্রথম  পৃথিবীতে দেবী  দুর্গার পূজার প্রচলন করেন । তখন ছিল বসন্তকাল ।  তাই বাসন্তী   দুর্গা পূজাকেই  আদি পূজা বলে গণ্য করা হয় । আবার রামচন্দ্র ,রাবণ বধ মানসে দেবীর  কৃপা লাভের আশায় দুর্গা পূজা করেন । তখন ছিল শরৎকাল । তখন থেকে শারদীয়া দুর্গা পূজার প্রচলন ।  তবে অকালে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে শরৎকালের পূজাকে  “অকাল বোধনও “ বলা হয় ।

 সাত্বিক     ভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে নিরুপদ্রবে পূজা করার জন্য ,বিশেষ করে গৃহস্থ বাড়ীতে নিজস্ব ব্যক্তিগত  পূজার জন্য  সাধারণতঃ বাসন্তী দুর্গা পূজাকে বেছে নেওয়া হয় ।  সর্বজনীন বা বড় বাজেটের  পুজায় শারদীয়াই মানুষের পছন্দ ।  তবে ব্যতিক্রমও আছে ।স্থান বিশেষে ও অবস্থা বিশেষে বাসন্তী পূজায়ও জাঁকজমক , নিষ্ঠা  তথা সাত্বিকতা  দৃষ্ট হয় । যেমন মিজোরামের সীমান্তবর্তী  খুলিছড়া গ্রামে অনুষ্ঠিত সর্ব জনীন  বাসন্তী পূজা । গত ৯৭ বছর ধরে অত্যন্ত উৎসাহের সহিত এই  পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ।  দেবী বাসন্তীর  আশীর্বাদ লাভের  জন্য বিস্তৃত  আচার অনুষ্ঠান ছাড়াও  পাঁচ দিন ব্যাপী মেলা  অনুষ্ঠিত হয় । প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার  মানুষ মেলায় অংশ গ্রহন করেন

 

…………………………………………………………………

 

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment