Wednesday, 24 June 2026

33. বামের রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যৱস্থা-৩ঃজিয়াউদ্দিন চৌধুরী

  বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে বাম থেকে মিজোরামে যাওয়ার জন্য কোন মোটরযানযোগ্য রাস্তা ছিল না। শিলচর আইজল সড়কের লাইলাপুর-ভাইরেংটে অংশটি  ১৯৫৪ সালের দিকে নির্মিত  এবং যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এই রাস্তাটি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মিজোরামের সাথে বামের সংযোগ স্থাপন করেছে।

     আমরা উপরে দেখেছি যে বামে বসতি স্থাপনের প্রাথমিক বছরগুলিতে পরিবহনের জন্য কোনও রাস্তা ছিল না। একইভাবে, তথ্য প্রেরণ এবং গ্রহণের জন্য যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না এবং একটি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে  এটি  উল্লেখযোগ্য প্রত্যাহবান  ছিল। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে বামের মানুষকে   বার্তাবাহকের ( স্থানীয়ভাবে খবরিয়া নামে পরিচিত )   উপর নির্ভর করতে হতো। তারা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ  সরবরাহের জন্য পায়ে হেঁটে স্বল্প দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতেন। অনেকটা আগের দিনের ডাক রানারদের মত ।অসুস্থতা, মৃত্যু বা পরিবারের মধ্যে বিবাহের মত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বার্তাবাহকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

স্বল্প দূরত্বের জন্য, যোগাযোগ ছিল মূলত উচ্চ কণ্ঠ স্বরে ঘোষণার মাধ্যমে ।   হাটবাজারে ও গুরুত্বপূর্ণ  জায়গায়   ঢোল বাজিয়েও  গুরুত্বপূর্ণ খবর জনসমক্ষে ঘোষণা করা হত । বামের কুকিরা যারা কুঙ্গা পুঞ্জি, ককাই পুঞ্জি মতো পুঞ্জি নামে এক একটি  পাহাড়ী গ্রামে  বাস করত তাদের যোগাযোগের এক অনন্য পদ্ধতি ছিল। রাতে ঢোলের তালে বার্তা পাঠাতো তারা। এটি মোর্স কোড ব্যবহার করে ডট এবং ড্যাশ সহ টেলিগ্রাফিক বার্তা পাঠানোর সাথে সমান্তরাল  ছিল ৷ পরিবেশ দূষণমুক্ত, এবং পুঞ্জিগুলি পাহাড়ে অবস্থান করায়,  ঢোলের শব্দ রাতের বেলা বেশ দূরে চলে যেত। বার্তা আদান-প্রদান হত দুই  ঢোল বাদকের মধ্যে।   বিনিময় বেশ কিছুক্ষণ চলত। ঢোল বাদকদের   মধ্যে বার্তার আদান-প্রদান একটি সংলাপের মতো ছিল, যেখানে  একজন  বার্তা প্রেরণ করে এবং অন্য পক্ষ প্রতিক্রিয়া জানায় ।এই প্রক্রিয়াটি  যথেষ্ট সময়কাল ধরে প্রসারিত হতে পারত।

  ধলাই বাজারস্থিত ডাকঘরের আওতাধীন ছিল পুরো বাম অঞ্চল। ধলাই ডাকঘরটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯১৪ সনে-বামের পুনর্বসতির প্রায় প্রথম পর্যায়।১৯৫০ এর দশকে   শণি মঙ্গল এই দুই বাজার বারে ডাকপিয়ন ভাগাবাজারে আসতো। একটি কাপড়ের চাদর মেলে সেখানে চিঠি পত্র গুলো রেখে দিত এবং তা থেকে পোষ্টকার্ডের চিঠিগুলো বিলি করতো। চিঠির প্রাপক অথবা তার পরিচিতজনেরা চিঠি সংগ্রহ করতে পারতো।যে কেউ অন্যের চিঠি পড়ে রেখে  যেতে পারত। কোন গোপনীয়তা ছিল না।

চিঠি আসলেও চিঠি পড়ার লোক ছিল কম।চিঠি পাড়ানোর জন্য চিঠির প্রাপককে -বিশেষত মুসলমান প্রধান অঞ্চলে -এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হত।এখন ভাগাবাজারে স্বয়ংসম্পূর্ণ পোষ্ট অফিস রয়েছে। ভাগাবাজার পোষ্ট অফিসের অধীন ৮টি এবং ধলাই পোষ্ট অফিসের অধীন ৮টি শাখা কার্যালয় নিয়ে মোঠ ১৮ টি ডাক পরিসেবা রয়েছে পুরো বামে। ১৯৯০ ইংরেজীতে ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড কর্তৃক লেণ্ড লাইন টেলিফোন সেবা চালু করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সে ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রায় সবাই এখন মোঠো ফোন ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন।

 

No comments:

Post a Comment