Wednesday, 10 June 2026

19.পরম্পরাগত সমাজ -5 :জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

 

 মুসলমান সমাজে বিয়েঃ

 বামের মুসলমান বিবাহগুলি আঞ্চলিক ঐতিহ্য এবং ইসলামী নীতিগুলির একটি অনন্য সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ উপস্থাপন করে এখানে বামের প্রারম্ভিক সময়ের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

আচার এবং নীতি:

হিন্দু বিবাহের তুলনায়, বামের মুসলিম বিবাহে কিছুটা কম আচার-অনুষ্ঠান থাকে যদিও বাম- বাঙালি  হিন্দু  ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বিবাহের  কিছু মিল রয়েছে, যেমন বাল্যবিবাহ, অভিভাবকদের দ্বারা করা ব্যবস্থা, সম্প্রদায়ের ভোজ, এবং বরযাত্রীর মিছিল মূল পার্থক্য হল বিয়ের পদ্ধতিতে হিন্দু বিবাহকে ধর্মীয় সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে মুসলিম বিবাহকে একটি চুক্তি হিসেবে দেখা হয় এই চুক্তি-ভিত্তিক পদ্ধতি বামের মুসলিম বিবাহের বিভিন্ন প্রথাকে প্রভাবিত করে

সাল্লিশি - বিবাহের ব্যবস্থা প্রক্রিয়া:

বামের মুসলিম বিবাহের ব্যবস্থাপনায় একটি "রুথি" নামক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থাকত, যিনি বর কনের পরিবারের মধ্যে যোগাযোগের সুবিধা প্রদান করতেন একবার উভয় পক্ষই বিয়ের প্রস্তাবে সম্মত হলে, কনের বাড়িতে একটি "সাল্লিশি" নামক আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এই বৈঠকে অভিভাবকরা বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি, যেমন "মোহর" (কনের আর্থিক নিরাপত্তার টাকা), বিয়ের তারিখ, এবং অন্যান্য বিবরণ আলোচনা করেনমোহর’ হল আলোচনার একটি প্রধান উপাদান, যা কনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সম্মান দায়িত্বের ভরসা নিশ্চিত করে।

আমন্ত্রণ - পানবাটা ঐতিহ্য:

বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হলে, আমন্ত্রণগুলি সাধারণত "পানবাটা" নামে পরিচিত একটি প্রথার মাধ্যমে বিতরণ করা হত এতে কাটা সুপারি এবং পান  পাতা সুন্দরভাবে কাগজে মুড়িয়ে তৈরি করা হত পানবাটায়  পানের পাতার সংখ্যা আমন্ত্রিত ব্যক্তির মর্যাদা গুরুত্ব নির্দেশ করত - যত বেশি পান থাকবে, অতিথি তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতেন( ৬ পাতা /৮পাতা/১২ পাতা/১৬ পাতা) ।

শুক্রবারের নামাজের সময় মসজিদে একটি পানবাটা দিয়ে পুরো গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করা যেতগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে লিখিত আমন্ত্রণপত্র প্রচলিত হতে শুরু করেতবে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ করা তখনও অপমানজনক বলে বিবেচিত হতউপরে চন্দ্র তারকা খচিত গোলাপি রঙের, ডাকঘরের চিঠির  আকারের একটি নির্দিষ্ট আমন্ত্রণপত্র ছিল, যার বিষয়বস্তু সবসময় একই রকম থাকতঅভিভাবকরা কেবল কনের বরের নাম এবং বিয়ের তারিখ দিয়ে দিতেন, আর ছাপাখানা বাকি অংশটি একই ধরনে মুদ্রণ করতআমন্ত্রণ পত্র মোটামুটি এই রকম ছিলঃ

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,

আম্মাবাদ ,নাহমদুল্লাহি ওয়ানু ছাল্লি আলা  রছুলিহিল করিম,

আচ্ছালামু আলাইকু্‌ম,

খোদাতালার মর্জি মতে আমার ছেলে/মেয়ে----- এর  বিবাহ আগামী মাসের (আরবী চান্দ্র মাসের নাম ও তারিখ ) মোতাবেক  (বাংলা মাসের নাম ও তারিখ ) অমুক গ্রামের অমুকের পুত্র/কন্যা …………… এর সঙ্গে ঠিক হইয়াছে।

অতএব দাওয়াতক্রমে বাসনা এই যে উক্ত দিনে সপরিবারে তশরিফ আনয়ন পূর্বক  যৎকিঞ্চিত সিন্নি ভক্ষন করতঃ দুলহা ও দুলহনীকে দুয়াদানে সরফরাজ করিবেন।

পত্রদ্বারা নিমন্ত্রণজনিত  ত্রুটি নিজগুণে মার্জনা করিবেন।

ইতি-

আরজগোজার

পিতার নাম-----------

তারিখ……”

লক্ষণীয় যে নিমন্ত্রণ পত্রে তারিখ থাকত  ।সময়ের কোন উল্লেখ থাকত না । বিয়ের সিন্নি সধারনত মধ্যাণ্যের ভোজ বুঝাত ।সিন্নি হল আল্লাহর রহমত ও বরকত প্রার্থনা করে  মানুষদের খাওয়ানো।

নিকাহ অনুষ্ঠান:

বর কনের বাড়িতে পৌঁছানোর পর, নিকাহ বা বিবাহের অনুষ্ঠান পরিচালিত হত এতে বিয়ের প্রস্তাব (ইজাব) ও অনুমোদনের (কবুল) মধ্য দিয়ে বিবাহ (নিকাহ) সুম্পন্ন হত অনুষ্ঠানটি তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় এবং পবিত্র কুরআনের আয়াত পাঠের পর দম্পতির জন্য প্রার্থনা করা হয় নিকাহের পরে, অনুষ্ঠানটি ভোজ "কইনা বিদায়" (কনের প্রস্থান) দ্বারা সম্পন্ন হয়, যা হিন্দু "কণ্যাদান" থেকে আলাদা সাধারণত নববধূ ডুলিতে (পালকি) হেঁটে গিয়ে উঠতেন না , বরং নববধূকে বহন করে ডুলিতে তুলে দেওয়া হতপ্রায়শই নববধূ প্রচুর কেঁদে কেদেঁ পিতৃগৃহ ত্যাগ করত বরের বাড়িতে পৌঁছানোর পর,আবার তাকে ডুলি থেকে  বয়ে ঘরে  নিয়ে যাওয়া হত

কাবিন নামা: বিবাহের চুক্তি:

বিবাহের শর্তাবলী "কাবিন নামা" নামে পরিচিত একটি চুক্তিতে নথিভুক্ত করা হত এই দস্তাবেজটি বিবাহ চুক্তির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রদান করে এবং জড়িত পরিবারের মধ্যে স্পষ্টতা পারস্পরিক বোঝাপড়া নিশ্চিত করেকাবিন নামা কাজীর দ্বারা নিবন্ধিত হত ।

গেটধরা: বরপক্ষের সংবর্ধনা:

অভ্যর্থনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল  কনের ছোট আত্মীয় এবং বন্ধুদের দ্বারা "গেটধরা" বরপক্ষের বড়দেরকে  সৌজন্য ছালামের সাথে স্বাগত জানানোর পর , ছোটরা বর তার বন্ধুদের প্রবেশেগেটে  বাধা দিত এবং মোটা অঙ্কের বখশিশ দাবি করত এটি প্রায়ই তীব্র দর কষাকষি এবং মাঝে মাঝে ছোট ঝগড়ার আকার ধারণ করত এটি স্নায়ু  যুদ্ধ এবং বুদ্ধির একটি পরীক্ষা, যেখানে বর অবশেষে আলোচনার মাধ্যমে প্রবেশ লাভের জন্য অর্থ প্রদান করত মাঝে মাঝে, বর তার বন্ধুরা কনের পক্ষকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে

ফিরা যাত্রাঃফিরা খাওয়া

ফিরা খাওয়াঃফিরা খাওয়া (ফিরা যাত্রা বা দ্বিরাগমন) বামের মুসলিম বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রথা ছিল। বিবাহের ২-৩ দিন পর কনে তার বাবার বাড়িতে “নাইওর” এ ফিরে আসত। দু দিন পর , বর তার বন্ধু ও কনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে কনের বাড়িতে ভোজের জন্য আসত। বর সঙ্গে কতজন অতিথি আনবে তা আমন্ত্রণ ‘পানবাটায়’দেওয়া ‘পান খিল্লির’ উপর নির্ভর করত।পানবাটায় যতটা পান খিল্লি থাকত বর ততজন অতিথি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারত। কনের পরিবার বরের ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আত্মীয়দের লুঙ্গি উপহার দেওয়া প্রচলিত ছিল । ভোজের পর বর কনেকে নিয়ে ফিরে যেত, এবং তারা নতুন জীবনের সূচনা করত।

সংক্ষেপে, বামের মুসলিম বিবাহগুলি ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিকে ইসলামী নির্দেশিকাগুলির সাথে মিশ্রিত করে, সাংস্কৃতিক রীতিনীতিকে সম্মান করার পাশাপাশি মিলনের চুক্তিগত প্রকৃতির ওপর গুরুত্ব দেয় যদিও ইসলামী আইন একজন মুসলিম পুরুষকে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয়, বামের মুসলমানদের মধ্যে এই প্রথা বিরল



No comments:

Post a Comment