চিরাচরিত স্বাস্থ্য সেবাঃ
যদিও বামের প্রথম পর্যায়ে ন্যূনতম সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা উপস্থিত ছিল, তবুও রোগ চিকিৎসার জন্য লোকেরা চিরাচরিত চিকিৎসা পদ্ধতির উপর নির্ভর করত। এটি আয়ুর্বেদিক প্রতিকার, আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং লোক বিশ্বাসের একটি সমৃদ্ধ সংমিশ্রণ ছিল।এই সময়ে বামের
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। লোকেরা বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসক এবং
চিকিৎসা পদ্ধতির উপর নির্ভর করত, যা দেশীয় জ্ঞান, ধর্মীয় প্রভাব এবং লোক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ মিশ্রণকে প্রতিফলিত করত।
প্রারম্ভিক বাম অঞ্চলের মধ্যে নিম্নলিখিত ঐতিহ্যগত চিরাচরিত
চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন ছিলঃ
.কবিরাজ: বামে, কবিরাজ ঐতিহ্যবাহী ঔষধি গাছপালা এবং ভেষজ দিয়ে লোকেদের চিকিৎসা করতেন। তারা বিভিন্ন রোগের প্রতিকার করতে
স্থানীয়
গাছপালা এবং ভেষজ ব্যবহার করতেন। সাধারণ মানুষও সাধারণ অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য স্থানীয় উদ্ভিদ ও ভেষজ ব্যবহারে পারদর্শী ছিলেন। .
মোল্লা: যদিও মোল্লারা সাধারণত ইসলামী ধর্মীয় অনুশীলনের সাথে যুক্ত থাকেন , বামের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশে , তারা জাতি এবং ধর্ম নির্বিশেষে তাদের অনুসারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবদান রাখতেন । মোল্লারা ‘তাবিজ ‘দিতেন ‘ এবং সুরক্ষা ও নিরাময়ের জন্য ধর্মগ্রন্থ থেকে আয়াত পাঠ করে ’ ফু’ (ফুৎকার)
এবং’ পানিপড়া ‘ দিতেন। সাধারণত, মহিলারা পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে এবং
দাম্পত্য কলহ থেকে স্বস্তি পেতে মোল্লাদের
কাছে যেতেন।
হাতুড়ে
ডাক্তার : বামের মতো গ্রামীণ এলাকায়, হাতুড়ে ডাক্তাররা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিভিন্ন রোগের নিরাময় করার দাবি করে লোকের চিকিৎসা করতেন। তাদের চিকিৎসা এবং সমাজে তাদের ভূমিকা স্থানীয় বিশ্বাস দ্বারা নির্ধারিত হত।
ভূত- প্রেতাত্মা দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাঃ
লোকেদের মধ্যে ভূত-
প্রেতাত্মা এবং অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল ।যখন অসুস্থতার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নির্ণয় করা কঠিন হত, তখন ধারাণা করা হত -রোগীকে ভূত এবং অশুভ আত্মায় পেয়েছে । বলা হত রোগীকে “ভূতে পাইছে
“ । ভূত আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক চিকিৎসকরা (এক্সরসিস্ট
) ভুতুড়ে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। এই ভৌতিক
চিকিৎসকরা
ভূত-প্রেতাত্মাকে তাড়ানোর জন্য আচার, আবৃত্তি এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া সম্পাদন করতেন।
জ্যোতিষী
ও গণক: জ্যোতিষশাস্ত্র বামের ঐতিহ্যগত চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। জ্যোতিষীরা জ্যোতিষী চিহ্ন এবং গ্রহের অবস্থান ব্যাখ্যা করে স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সমাধান প্রদান করতেন। তারা নভস্থিত প্রভাব
সম্পর্কে তাদের বোঝার ভিত্তিতে চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের পরামর্শ দিতেন। অনেকে হস্তরেখা বিচার
করে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন । কবিরাজ ও গণকরূপে পরিচিত তেলিচিবার মাইবী এতই
পরিচিত ছিলেন যে তার বাড়ীর সামনে শিলচর আইজল রোডে এক জায়গা ‘মাইবী স্টেশন’ নামে পরিচিত ছিল।বরাক উপত্যকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষ বাস চালককে
মাইবী স্টেশনে
নামিয়ে দেওয়ার জন্য বলে রাখত।
ওঝা
:বামের প্রথম দিকে ওঝরা সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতেন। তারা স্থানীয় কাব্য এবং লোককাহিনী যেমন বেহুলা-লখিন্দর
আখ্যান
থেকে আবৃত্তি করে বিষ ঝাড়তেন। এই প্রথার মূল বিশ্বাস ছিল ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করলে বিষের প্রভাব প্রতিরোধ করা যায় এবং সুরক্ষা প্রদান করা যায়। এমনকি মুসলমান ওঝাও ছিলেন । গত শতাব্দীর চল্লিশের
দশকে রাজঘাটের ওহাব আলী লস্কর নামে একজন জনপ্রিয় ওঝা ছিলেন ।তিনি সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতেন। বেহুলা-লখিন্দর
আখ্যান
থেকে গানের সুরে আবৃত্তি করতঃ উঠানে খোলা আকাশের নীচে একটি ঘাইলের উপর বসে থাকা সাপের কামড়গ্রস্ত ব্যক্তির চারপাশে প্রদক্ষিণ করতেন এবং মাঝে মাঝে কাঁধের গামছা দিয়ে সাপের কামড় গ্রস্থ ব্যক্তির গায়ে
আঘাত করে “হায়রে বিষ দৌড়ে লাম“(হে বিশ-তুমি তাড়াতাড়ি নেমে যাও) বলে আদেশ দিতেন।গ্রামের
লোক চারপাশে বসে দেখত।
ঐতিহ্যগত চিকিৎসার পাশাপাশি, বামের কিছু স্ব-শিক্ষিত হোমিওপ্যাথ কম খরচে চিকিৎসার বিকল্প প্রদান করতেন। এই হোমিওপ্যাথরা শিলচর থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ আনতেন। কিছু ক্ষেত্রে এটি বিনামূল্যে প্রদান করা হত।
গ্রামীণ ধাত্রীগণ: বামের
প্রাথমিক অবস্থায় হাসপাতালে শিশুর জন্মের বিষয়টি অকল্পনীয় ছিল। সন্তানের জন্ম একটি ব্যক্তিগত
ওপারিবারিক ব্যাপার ছিল।গোপনীয়তা বজায় রাখা হত ।এই জন্য বামের চিরাচরিত প্রসব প্রক্রিয়ার জন্য গ্রামীণ ধাত্রীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞ মহিলারা প্রসবের ক্ষেত্রে
এবং মাতৃত্বের সহায়তা প্রদানে যত্নবান ছিলেন। তাঁরা সন্তান জন্মদানে শ্রম ও সহায়তা সহজ করার জন্য ভেষজ প্রতিকারের ব্যবহার সম্পর্কে গভীরভাবে জ্ঞানী ছিলেন।
গ্রামের ধাত্রীগণ নতুন মাকে প্রসবোত্তর নিরাময়ে সাহায্য করার জন্য দায়ী ছিলেন। তাঁরা পুষ্টিকর খাদ্য, বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন ও নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করতেন , যাতে মা এবং শিশু উভয়ই সুস্থ থাকে।এটা ছিল কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সম্মানজনক সেবা।
No comments:
Post a Comment