আর্থিক জীবনযাত্রাঃ
বাম
অঞ্চলের জীবন ছিল অতিশয় সহজ ও সাদাসিধা। জমি উর্বর হওয়া সত্ত্বেও পরম্পরাগত পুরাতন জাতের ধানের বীজ ব্যবহার করার জন্য উৎপাদন হত তুলনামূলক ভাবে কম । বামে পুরানো পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হতো। স্বাধীনতার
পর বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বামে চাষের উন্নত পদ্ধতি প্রবর্তনের
জন্য সরকারর প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে, সরকার উচ্চ ফলনশীল
বিভিন্ন ধরণের বীজ এবং সার প্রয়োগ প্রথা প্রবর্তন করতে শুরু করে। প্রগতিশীল কৃষকদের
মধ্যে নতুন ধরণের ছোট খাটো কৃষি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বিতরণ করা আরম্ভ হয়। ভাগাবাজারে একজন কৃষি ডেমনস্ট্রেটার নিয়োগ করা হয়েছিল যিনি অধিক
ফলনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিতেন এবং বীজ ও সার বিতরণ করতেন।একই সময়ে, ভাগাবাজারে
একটি ভেটেরিনারি হেলথ সেন্টার খোলা হয়েছিল এবং একজন ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। সরকার থেকে রেশম উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালু হয়েছিল যার জন্য একজন রেশম প্রদর্শক
কৃষকদের রেশম চাষে যেতে কৃষককে উৎসাহিত করতেন। এগুলি ছিল বামে আধুনিকতার দিকে উত্তরণের
পথে স্বাধীন ভারত সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার
প্রথম পদক্ষেপ ।
বামের অর্থনীতিতে টাকার ভূমিকা ছিল
ন্যূনতম । যদিও এটাকে ঠিক বিনিময় অর্থব্যবস্থা বলা যায় না
। লোকেরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই উৎপাদন করত কিন্তু লবণ, দেশলাই-বাক্স,লবণ, কেরোসিন তেলের
মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তাদের কিছু অর্থের প্রয়োজন ছিল। শিক্ষা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবার
জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ছিলনা বললেই চলে। তারা ন্যূনতম পোশাক ব্যবহার করেছে।
তারা খালি পায়ে হেঁটেছে।
লোকেরা নগদ টাকা পেত উদ্বৃত্ত ধান, সুপারি, কলা, ডিম, হাঁস-মুরগী, ফল ও পারিবারিক ব্যবহারের জন্য ফলানো শাক-সব্জী বিক্রির মাধ্যমে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রধানত
তফসিলি জাতি ,হাতে তৈরি বাঁশের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারতেন।
এই বাঁশের কারুকাজগুলি ছিল একজন কৃষকের
পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস যেমন ধান শুকানোর জন্য বাঁশের চাটাই যাকে স্থানীয়ভাবে
‘ডাম’ বলা হয়, ধান সংরক্ষণের জন্য উঁচু বাঁশের পাত্র যাকে স্থানীয়ভাবে 'জুঙ্গি' বলা
হয়, ধান রাখার ও বহন করার জন্য 'টুকরি' নামে বাঁশের পাত্র; বিভিন্ন ধরণের মাছ ধরার
ফাঁদ বা সরঞ্জাম যা স্থানীয়ভাবে ‘ডরি, রুঙ্গা, ওছু, পারণ, পলো ,খলই,চেপা নামে পরিচিত ও গ্রীষ্মে উপশমের জন্য বাঁশের হাতপাখা।
গ্রামবাসীরা
দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য 'মুর্তা' থেকেও বিভিন্ন জিনিস তৈরি করত। এগুলি ছিল মাটিতে
বসা ও ঘুমানোর জন্য বা নামাজের 'চাটি' ও ‘পাটি’। ছোট আকারের 'চাটি' বা 'পাটি'র প্রচুর চাহিদা ছিল
কারণ প্রতিটি মুসলমান পরিবারে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ার জন্য দুই বা তিনটি 'চাটি' বা
'পাটি'র প্রয়োজন ছিল। কৃষক পরিবাররা এসব পণ্য বিক্রি করে কিছু নগদ অর্থ উপার্জন করতে
পারত। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে এসব হস্তশিল্প জাত সামগ্রীর বাজার
প্রায় হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন অনেক কারিগর আর অবশিষ্ট নেই।
বামের
মণিপুরি সম্প্রদায়ের আলাদা এক দক্ষতা ছিল। মণিপুরি মহিলারা 'মুড়ি' ও 'চিড়া' তৈরি
করে সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করতেন। তারা ‘মণিপুরি গামছা’ নামে এক নিত্য ব্যবহারিক
কাপড় বুনতেও জানতেন যার বাজারে চাহিদা ছিল। এটি সাপ্তাহিক কেনাকাটা করার জন্য পরিবারের
কাছে অর্থ এনে দিত।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রথম পর্বে একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের মাসিক বেতন ছিল ৩০ টাকা এবং এক কাঠি (২ কেজি) চালের দাম ছিল আট আনা তথা বর্তমান পঞ্চাশ পয়সা।
কিন্তু যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে টাকার ব্যবস্থা করা কঠিন ছিল। ব্যাংক ঋণের কোনো সুবিধা ছিল না। ঋণের জন্য মানুষকে নির্ভর করতে হতো গ্রামের মহাজনদের ওপর। কাবুলি ঋণদাতারাও ছিল। কোন কোন গ্রামে কৃষি ঋণের জন্য কৃষি সহায়ক সমবায় সমিতিও ছিল।জরুরি অবস্থার সময় ঋণ পাওয়ার একটি সাধারণ পদ্ধতি ছিল কৃষি জমি ইজারা দেওয়া।কিন্তু একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল।অনেক
সময় জমি বাড়ী খুঁয়াতে হত ।
No comments:
Post a Comment