Monday, 15 June 2026

24.বামের বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় বৈশিষ্ট -৫ঃ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

ভাগা বাজার জামে মসজিদ ওবামেরঈদগাহ :

বামে গড়ে ৭০০ পরিবারের জন্য রয়েছে একটি মসজিদ। ভাগা বাজার জামে মসজিদে সর্বাধিক সংখ্যক পরিবার রয়েছে -১১০২ পরিবার এবং বাঘেওয়ালা (পশ্চিম বাগখাল) জামে মসজিদের মহল্লায় মাত্র ২১ টি পরিবার নিয়ে সবচেয়ে কম পরিবার রয়েছে

 

      তাছাড়া বছরে দু'দিন সমবেতভাবে ঈদের নমাজ পাঠ করবার জন্য খোলা মাঠের বিশেষ এক একটি জায়গা চিহ্নিত করে আলাদাভাবে সাজিয়ে রাখা থাকে গুলোকে বলা হয়ঈদগাহ বাম এলাকায় এই ঈদগাহ-এর সংখ্যা ১৩টি। এলাকার ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য ভাবনার এক উদাহরণ সন্দেহ নেই।

 

সমগ্র আসামে বিশালায়তন যে 'টি মসজিদ আছে ভাগাবাজার জামে মসজিদ সে মসজিদগুলোর অন্যতম। বামের মুসলমানদের ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্ররূপে এই মসজিদ সমস্ত বাম অঞ্চলকে উদ্ভাসিত করে রেখেছে।

শিলচর আর ই চি এর প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ ° বুরহান উদ্দিন বড়ভূইয়া সাহেবের রুচিসম্পন্ন দক্ষ কৌশল সম্বলিত নকশার ভিত্তিতে নির্মিত দ্বিতলবিশিষ্ট মসজিদখানার অভ্যন্তরীণ কারুকলার শিল্প কুশলতা দর্শনার্থীদেরকে মোহিত করে। রুচিদক্ষ শিল্প কুশলতায় তৈরি বিশালায়তন এই মসজিদ নির্মাণের সাকুল্য ব্যয়ভার বহন করেছেন বাম এলাকার মানুষেরা তাদের এক গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াসই বলা যায়।বামের মানুষ অর্থ সাহায্য ছাড়াও শ্রমদান করেছেন। পাঁচ ওয়াক্তের সমবেত নমাজ আদায় ছাড়াও মসজিদ চত্বরটি এলাকার মুসলমানদের সমাবেশ স্থল রূপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯১৬ সালে জেহাদের নামে সন্ত্রাস চালানোর প্রতিবাদে ভাগা জামে মসজিদের উদ্যোগে বামের ১৩টি ঈদগাহের প্রায় ১৫০০০ মুসলমান ঈদের নমাজের পর মিছিল করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল।

    ভাগাবাজার জামে মসজিদের আর এক বৈশিষ্ট কয়েক লক্ষ  টাকা মূল্যের ৩০০০ খানারও অধিক মূল্যবান দুষ্প্রাপ্য বই-এর সংগ্রহে সমৃদ্ধ আধুনিক রুচির লাইব্রেরী। পুস্তক সংগ্রহে মসজিদ পরিচালন কমিটির উদার দৃষ্টিভংঙ্গী এবং ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য পরম্পরার প্রতি সাগ্রহ অনুরাগ ফুটে উঠেছে। ।ইসলামি ঐতিহ্যের অত্যাবশ্যকীয় গ্রন্থরাজি ছাড়াও রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ রচনাবলী, সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদের বই, এপিজে আব্দুল কালামের বই- সমৃদ্ধ এই গ্রন্থাগারে বেদ, গীতা এবং স্বামী বিবেকান্দসহ অনেক স্মরণীয় হিন্দু মহাপুরুষের রচনাবলী জীবনী গ্রন্থে মসজিদ লাইব্রেরীকে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাতি-ধর্ম- নির্বিশেষে সকলের জন্য গ্রন্থাগারখানা উন্মুক্ত।মসজিদের  প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগারটি  রাজ্যিক তথা রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে স্থান লাভ করছে।

    বামের মসজিদগুলি কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্র। মসজিদ আধ্যাত্মিক এবং সাম্প্রদায়িক উভয় অস্তিত্বের ভিত্তি। মসজিদ মহল্লাবাসিকে একটি শক্তিশালী সামাজিক গোষ্ঠীতে আবদ্ধ করে রাখে ।এগুলি এমন জায়গা যেখানে মহল্লার সদস্যরা মিলিত হয়, খবর,  সংবাদ আদান প্রদান  করে এবং মহল্লায় পরিবারের একজন সদস্যের জন্ম ,মৃত্যু, এবং বিবাহের সময় একে অপরকে সাহায্য করে। বামের মসজিদগুলি প্রায়ই দাতব্য কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, যার মধ্যে যাকাত এবং সাদাকাহ(স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য) বিতরণও রয়েছে। দাতব্যের এই কাজগুলি দরিদ্র এবং অভাবীদের সহায়তা করে, সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক সংহতি এবং সহানুভূতিকে শক্তিশালী করে ৷ প্রতিটি মসজিদ রমজানে প্রতিদিন সম্প্রদায়ের ইফতারের ব্যবস্থা করে এবং সবে বরাত, সবে-কদর, ঈদে মিলাদুন নবী, আশুরা, সবে মেহরাজ ইত্যাদির মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে।

মসজিদগুলি প্রায়ই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে মহল্লাবাসীদের বিবাদে আপোষ মিমাংসা  এবং  নিষ্পত্তির মতো বিভিন্ন  পরিষেবা প্রদান করে। মসজিদগুলোও অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কাজ করে। মহল্লার নৈতিক কল্যাণে মসজিদগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মসজিদের মাধ্যমে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত  হয়।

বামের মসজিদগুলির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বামের সমস্ত ৬৫টি মসজিদ একত্রিত হয়ে ” বাম মসজিদ  সমন্বয় সমিতি”  গঠন করেছে যার প্রধান কার্যালয় ভাগাবাজার জামে মসজিদ। সমিতির উদ্দেশ্য হল সদস্য মসজিদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং মত বিনিময় করা।

……………………………………………………………………………………………..

No comments:

Post a Comment