১৯৫০ ইংরেজী অবধী কাছাড়ের মূল ভূখণ্ডের সাথে রাস্তাঘাট যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক দিয়ে বাম অঞ্চল প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। শুধুমাত্র পায়ে হাটা ও গরুর গাড়ি চলাচলের জন্য একটি সরু মাটির রাস্তা ছিল। এ রাস্থাটি রামপ্রসাদপুর রনফাড়ী শিব বাড়ি থেকে হাওয়াইথাং বাজার পর্যন্ত বিস্তারিত ছিল। এটি লান্টুগ্রাম, সদাগ্রাম, সপ্তগ্রাম, ইসলামাবাদ, বনগ্রাম, রাজঘাট, চান্নিঘাট হয়ে রুকনি নদীর পাশ দিয়ে হওায়াইথাং পর্যন্ত চলেছিল। সড়কটি তখন পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের উপযোগী ছিল না। রাস্তাটি স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসিত “লোকেল বোর্ডের” তত্ত্বাবধানেই চলতো। পরবর্তীতে রামপ্রসাদপুর থেকে সপ্তগ্রাম পর্যন্ত এই রাস্তার অবস্থান পশ্চিম দিকে স্থানান্তরিত করা হয় যা এখন ৩০৬ জাতীয় মহাসড়কনামে পরিচিত ।
কৃষিজাত উৎপাদিত দ্রব্যাদি বহন করার জন্য লোকজন নৌকা, গরুগাড়ী ও ঘোড়া ব্যবহার করতো। উত্তর প্রান্তের বরাক নদীর পরিবহন ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত রুকনি নদী ব্যবসা বাণিজ্যের যোগাযোগের মাধ্যম রূপে কাজ করতো।১৯৫০ সাল নাগাদ সিলেট থেকে
ব্যবসায়ীরা গুন টানা বজরা বা ‘গুমটী নাও’ দিয়ে খরস্রোতা রুকনি নদীর উজান বেয়ে প্রয়োজনীয়
পণ্য বাজারজাত করত।বিশেষ করে ঈদ বা পুজার সময় আসত। ১৯৫০ সনের পর থেকে তাদের আসা যাওয়া প্রায়
বন্ধ হয়ে যায়।বর্ষাকালে মাঝে মাঝে স্টীম বোট নিয়ে সরকারী কর্মকর্তারা রুকনি দিয়ে
আসা যাওয়া করতেন।
১৯৫৩ -৫৪ ইংরেজী পর্য্যন্ত ভাগাবাজার হতে ১৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত কাবুগঞ্জই ছিল শিলচরের সাথে মোটর গাড়ীর মাধ্যমে বামের সাথে সংযোগ স্থাপন কারী নিকটবর্ত্তী স্থান। বাস ধরতে কাবুগঞ্জ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে হতো লোকজনকে। প্রথম চার চাকার যান ভিন্টেজ ফরড গাড়ী ১৯৫২ সালে ভাগাবাজার অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে
যায় যা দেখে ভীত সন্ত্রস্ত গরু ও উৎসুক মানুষ গাড়ীর পিছনে দৌড়তে থাকে।এটাই ছিল বামের ধক্ষিনাঞ্চলে আসা
প্রথম চার চাকার যানবাহন ।
আনুমানিক ১৯৫৪ বা ৫৫ ইংরেজীতে ভাগাবাজার থেকে শিলচর পর্যন্ত বাস সেবা চালু হয় । সেগুলো ছিল ধাতব হাতলের (স্থানীয় নাম হ্যান্ডল ও যে হ্যান্ডল চালাত তাকে
বলা হত হান্ডিমেন)সাহায্যে চালুকরা ইঞ্জিনযুক্ত ম্যাড় ম্যাড় বাস।
হারুণ রসিদ লস্কর, যিনি টিকিট মাষ্টার রূপেই বেশী পরিচিত, ভাগাবাজারে বাসের টিকিট প্রদান করতেন। ভাগাবাজারের প্রবীণ নাগরিক রিয়াজ উদ্দিন লস্করের স্মরণ মতে ভাগাবাজার হতে শিলচরের বাস যাত্ৰার উচ্চ শ্রেণীর ভাড়া ছিল এক টাকা সাত আনা এবং নিম্ন শ্রেণীর ভাড়া ছিল এক টাকা। ৩৫ কিঃমিঃ কাঁচা ধূলোময় রাস্তা যেতে প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগতো। যাত্রাপথের প্রায় মধ্যস্থান কাবুগঞ্জ পৌছার পর ২০/২৫ মিনিটের যাত্রাবিরতি দেয়া হতো। যাত্রীদের অনেকেই তখন গাড়ী থেকে নেমে চা-পান করে নিতেন। প্রথমদিকে একটি মাত্র বাস সকাল ৭টায় ভাগাবাজার ছাড়তো এবং বিকাল ৩টায় শিলচর থেকে ঘুরে আসতো। শিলচরের প্রেমতলা যেখানে বর্তমানে গোলদিঘী শপিং মল রয়েছে সেখানেই ছিল বাস ষ্টেণ্ড। ১৯৫৮ ইং নাগাদ বামে প্রথম রিক্সার প্রচলন হয়।
১৯৫০ ইংরেজী হতে বামে অল্প অল্প
পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ক্রমে এই পরিবর্তন অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে যায় ও
বামের সার্বিক উন্নতির পথ প্রশস্থ করে দেয়।এ যেন ওয়াশিংটন ইরভিং এর রিপ ভ্যান উইংকেল গল্পের ক্যাটস্কিল
পর্বতমালার এক গ্রামের বাস্তব রূপ ।গল্পে অলস রিপ ভ্যান উইঙ্কল কাটস্কিল পর্বতে গিয়ে বিশ বছর ঘুমিয়েছিলেন। বিশ বছর পর ঘুম থেকে জেগে গ্রামে ফিরে এসে তিনি কিছুই চিনতে পারেননি। সবকিছু বদলে গিয়েছিল।
অতীতের পরিচিত বামকে এখন চেনা যেন এক দূরহ ব্যাপার হয়ে পড়ে। সমগ্র বাম এখন বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তাঘাট তথা জাতীয় সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত। পরিবর্তিত ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছে প্রশস্থ ৩০৬ নং শিলচর আইজল জাতীয় সড়ক। শিলচর হতে ২৩ কিঃমিঃ দূরে ধলাই বাজারের দক্ষিণে অবস্থিত রাম প্রসাদপুর দিয়ে বামে প্রবেশ করে রাস্তাটি রুকনি নদীর তীর বরাবর বামের পশ্চিমাঞ্চলের লান্টুগ্রাম, সদাগ্রাম, সপ্তগ্রাম, ইসলামাবাদ, বনগ্রাম, রাজঘাটের, মধ্য দিয়ে গিয়ে চান্নিঘাটের প্রায় উত্তর প্রান্তে পৌঁছে বাঁক নেয় এবং লায়লাপুর পর্যন্ত পৌঁছে এক অর্ধবৃত্তাকারের রূপ নিয়ে মিজোরামে প্রবেশ করে।
পুর্ত বিভাগের (PWD) অন্য একটি রাস্তা মিজোরাম রোড
ধলাই শ্মশানঘাটের
নিকটে এন এইচ ৩০৬ থেকে শুরু করে রেংটি পাহাড়ের পাদদেশে বামের পশ্চিম সীমানা ঘেষা
আর্জানপুর, লোকনাথপুর ,
জয়ধনপুর ,হাওয়াইথাং গ্রামগুলোর মধ্য দিয়ে চলে গিয়ে ৯ কিলোমিটার
অতিক্রম করে লায়লাপুর পৌঁছে ৩০৬ নং জাতীয় সড়কের সাথে সংযুক্ত হয়।
জয়ধনপুরে এই রাস্তা থেকে একটি নতুন রাস্তা বেরিয়ে
রেংটি পাহাড় পার হয়ে পাহাড়ের পশ্চিম উপত্যকায় বামের
ধলাইবস্তিতে চলে গেছে। এটি রেংটি পাহাড়ের জধনপুর তবতকুড় জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে চলে
গেছে। তবতকুড় জলপ্রপাতের কাছে রেংটি পাহাড়ের চূড়ার ভিউ পয়েন্ট থেকে পূর্বে পুরো
বামের ও পশ্চিমে হাইলাকান্দি জিলার মনোরম দৃশ্য পাওয়া যায়।এই রাস্তাটি রেংটি
পাহাড়ের পশ্চিমে বামের যোগাযোগ বিহীন উপত্যকা ভুমিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।অদূর
ভবিষ্যতে হয়ত এই রাস্তা হাইলাকান্দির সাথে বামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করবে।
জাতীয় মহাসড়ক ৩০৬ রামপ্রসাদপুর শিব মন্দিরের কাছে রনফাড়ির বিপরীতে বামে প্রবেশ করে।এখন এখানকার NH 306 সড়কটি ভারতমালা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং শিব মন্দিরটি স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
অনেকগুলো যোগাযোগকারী রাস্তা ৩০৬ নং জাতীয় সড়ক ও ধলাই লোকনাথপুর লায়লাপুর মিজোরাম পূর্ত সড়ককে যুক্ত করেছে। অন্য একটি রাস্তা ৩০৬ নং জাতীয় সড়কে চান্নিঘাট এলাকা থেকে বের হয়ে হাওয়াইথাং বাজার পার হয়ে রুকনি নদীর পশ্চিম তীর অবলম্বন করে খুলিছড়া ফরেস্ট ভিলেজ, নাপিতখাল পানজুম ফরেস্ট ভিলেজ হয়ে মিজোরাম সীমান্তের কাছে সাইহাপুই এ মিজোরাম
বর্ডার পুলিশ চেক গেটে পৌঁছায়। মোট দৈর্ঘ্য
আট কিলো মিটার ।
রুকনি নদীর পশ্চিম তীরে বামের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার এটাই হল এক চিত্র।
No comments:
Post a Comment