১৮৮৫ থেকে ১৯৪৭ সময় সীমায় জনসংখ্যার স্বল্পতা সত্ত্বেও বামবাসী স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জিলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়। এদের কয়েকজনের বিষয়ে নীচে আলোকপাত করা হচ্ছে।
১) সাজিদ রাজা মজুমদারঃ
ইসলামাবাদের সাজিদ রাজা মজুমদার কাছাড় জিলার প্রথম সারির একজন স্বাধীনতা যুদ্ধা ছিলেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ১৯২২ সালে জেলে যান। তার সাথে তখন শিলচর কারাগারে অন্য কারাবন্দীরা হলেন তরুণরাম ফুকন, বিষ্ণুরাম মেধী, সতীন্দ্র মোহন দেব, অশোক কুমার চন্দ ও অন্য কয়েকজন। সাজিদ রাজা মজুমদার ১৯৩৬ সনে শিলচর মহকুমা কংগ্রেস কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং কাছাড় জিলা কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৪০ সনে তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন। প্রকৃত গান্ধীবাদী হিসেবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কোন পদ প্রাপ্তির জন্য আগ্রহী ছিলেন না কিন্তু নিজেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রাখেন এবং ১৯৭১ সনে প্রাণত্যাগ করেন। তার ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধার পেনশন দেয়া হলেও তিনি তার উপযুক্ত স্বীকৃতি পাননি ।
2) মওলানা মশদ আলী বড়ভূইয়াঃ
উত্তর প্রদেশের রামপুর মাদ্রাসার প্রাক্তনী মওলানা মশদ আলী বড়ভূইয়া অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং সাজিদ রাজা মজুমাদারের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে কাজ করেন এবং উভয়ে একসঙ্গে জেলে যান। স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন প্রাপক এ মওলানা ১৯৬৪ সালে মারা যান। তার নব্বই বছরের অধিক বয়সী সহধর্মিনী জমিলা খাতুন ২০২২
ইংরেজীতে মৃত্যু পর্যন্ত মাসিক ১০৫০০.০০ টাকা ফ্যামিলি পেনশন পেয়ে গেছেন। মওলানা সাহেব স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহন করার কারণে ১৯২১, ১৯২২ ও ১৯২৩ সনে সর্বমোট নয় মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৯৭ সনে সরকার তাঁকে মরনোত্তর ‘তাম্রপত্র প্রদান করে'।
৩) মহব্বত আলী বড়ভূইয়াঃ
ইনি সপ্তগ্রামের বাসিন্দা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন প্রাপক ছিলেন।তিনি ১৯৭৭ সালে বার্ধক্যজনিত
রোগে মৃত্যুবরণ করেন ।
৪) মহব্বত আলী লস্করঃ
লোকানাথপুর নিবাসী মহব্বত আলী লস্কর একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। তিনি ১৯০১ সনে জন্ম গ্রহণ করেন ।বিশ বছর বয়সে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯২২ সনে তাঁকে গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং তদানীন্তন জিলা উপায়ুক্ত জি.ডি. ওয়াকার কর্তৃক তাঁর বিচার হয় আর বিচারের রায়ে শিলচর কারাগারে তিনি ছয় মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৭৫ সনের ১৬ নভেম্বর এই স্বাধীনতা সংগ্রামী মৃত্যু বরণ করেন ।তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন প্রাপক ছিলেন
৫) আবদুস সামাদ লস্করঃ
‘সামাদ মোল্লা’ নামে জন সাধারণে পরিচিত আব্দুস সামাদ লস্কর স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে যথেষ্ট কষ্টভোগ করেন এবং এর স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন পান । ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৯৭ সনে তাঁকে মরনোত্তর ‘তাম্ৰপত্ৰ’ প্রদান করা হয় ।
৬) আহমদ আলী লস্করঃ
আহমদ আলী মিয়াসাব নামে সুপরিচিত বনগ্রামের আহমদ আলী লস্কর তাঁর যুবা বয়সের প্রথম পর্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করে লীগ পরিচালিত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন এবং সিলেট গণভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা লাভের পর তিনি কোন রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন নি।
৭।মস্কন্দর
আলী মজুমদারঃহাওয়াইথাং নিবাসী
মস্কন্দর আলী মজুমদার বাশকান্দির হাতিরহাড় গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন । তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ(INA) এর একজন গুপ্তচর ছিলেন এবং বার্মায়
যাওয়া আসা করেছেন। ব্রিটিশ সরকার গুপ্তচর
বৃত্তির খবর জানতে পেরে পুলিশ দিয়ে তার হাতির হাড়ের বাসভবনে
তল্লাশি চালায় । ব্রিটিশের গ্রেফতার এড়াতে
তিনি হাতিরহাড় থেকে পালিয়ে ছদ্মনামে হাওয়াইথাং চলে আসেন এবং ইন্তাজ আলী মজুমদার এই ছদ্মনামে এখানে বসবাস
শুরু করেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত তিনি এই ছদ্মনামেই জীবন অতিবাহিত
করেছিলেন। ১৯৫৯ ইংরেজিতে তাঁর অকাল মৃত্যু হয় । তিনি ২১শে অক্টোবর দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস
রূপে পালন করতেন যে তারিখে নেতাজি সুভাষ
চন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরে(১৯৪৩ ইং সনে) স্বাধীন
ভারতের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিলেন ।
৮।আব্দুস
ছুবহান বড়ভূইয়াঃ বেলু খাদিম নামে পরিচিত আব্দুস ছুবহান
বড়ভূইয়া ১৯২২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করে তিনি কারাবরণ করেন।১৯৮৯ সালে তাঁকে
স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন দেওয়া হয় । ১৯৯৩ সনের জানুয়ারি মাসে তিনি মৃত্যু বরণ
করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সহধর্মিণী
লায়লী বেগম বড়ভূইয়া একই পেনশন লাভ করেন । মরহুম
আব্দুস ছুবহান বড়ভূইয়া ভাগাবাজার জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন এবং সুদীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মসজিদের
মুয়াজ্জিন রূপে মসজিদের সেবা করে যান।
৯। মৌলানা ফরমুজ আলী বড়ভূইয়াঃসপ্তগ্রামের
বাসিন্দা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী পেন্সন
প্রাপক ।তাঁর ছেলে আব্দুল নূর বড়ভুইয়া এক
সময় সপ্তগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের সভাপতি
নির্বাচিত হয়েছিলেন । ১৯৪৯ সালে মাত্র ৫০
বছর বয়েসে তাঁর মৃত্যু হয় ।
কংগ্রেস দলের ছত্রছায়ায় বামের আরও কয়েকজন পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা হলেন: কৃষ্ণজীবন পুরকায়স্থ, বিনোদ বিহারী দাস, গৌরমণি নাথ, অনন্ত কৃষ্ণ দাস, তুতিরাজা বারভূইয়া,মৌলভী আম্বর আলী, মুনশী হাবিব আলী, আনফর আলী চৌধুরী, আলাউদ্দিন, আসাদ্দার আলী, দেশান্ত বর্মন ,রাজমোহণ বড়ভুইয়া প্রমুখ।
কিন্তু তাদের বিস্তারিত বিবরণ জানা যায় নাই ।
এছাড়াও, রাজঘাট গ্রামের এক বলিষ্ঠ যুবক লাতু মিয়া
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজে (আইএনএ) যোগ দেন। আইএনএ থেকে মুক্তি
পাওয়ার পর, তিনি রাজঘাটে ফিরে আসেন। তিনি তার আইএনএ সৈনিকের পোশাক রেখে দিয়েছিলেন,
এবং ১৯৫০ সালে তাকে তার আইএনএ শার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যেত।
No comments:
Post a Comment