.বাম প্রধানত হিন্দু ,মুসলমান, এবং সীমিত সংখ্যক খ্রিস্টান দ্বারা অধ্যুষিত।প্রতিটি
সম্প্রদায়ই তাদের নিজনিজ ধর্মীয় রীতিনীতি, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
নিয়ে বিরাজমান রয়েছে।বাম বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ঐতিহ্যের একটি অঞ্চল। বামের ধর্মীয় আচার ও উপাসনার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সবুজ ও নির্মল পরিবেশে, মন্দির, মসজিদ, গীর্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়গুলি বামের মানুষকে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য সম্পর্কে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়। হিন্দু স্তোত্রের সুরেলা মন্ত্র, মিনার থেকে নামাজের আহ্বান এবং গীর্জার স্তোত্র গুলি বামে ধর্মীয় প্রেরণার উৎস। বামে অসংখ্য মন্দির, মসজিদ, গীর্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের
উপস্থিতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নির্দশন।
বামের মুসলমান সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্টঃ
বরাক উপত্যকার বিভিন্ন স্থান থেকে বামে আগমনের পর প্রথম পর্যায়ের মুসলমান বসতকারীরা নামাজ সম্পাদনের জন্য মসজিদ ও নামাজ পরিচালনার জন্য ইমামের প্রয়োজন অনুভব করে।এছাড়াও, সাবাহী মক্তবে শিশুদের ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি শেখানোর জন্য ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু প্রথমপর্বের বসতকারীদের মধ্যে ইমাম বা ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না।
১৯১৫ সনে সিলেটের পীর খুরশেদ আলী সাহেব এসে পুরো ধর্মীয় উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। তিনি ১৯১৫ সনে বামের সপ্তগ্রামে ‘দারুল ফয়েজ' নামে প্রথম মাদ্রাসা স্থাপন করেন। পরে ১৯১৭ সনে রাজঘাটের মুফতি গোষ্ঠীর মওলানা আরজদ আলী চৌধুরী ও তার চাচাতো ভাই মওলানা আব্দুল হামিদ চৌধুরী উত্তর প্রদেশের রামপুর থেকে ইসলামী শিক্ষার উচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ফিরে এসে নতুন বসতকারীদের পথ নির্দেশনায় নিজেদের একান্তভাবে নিয়োজিত করেন ও ইসলামী তরিকায় জীবন পরিচালনায় সাহায্য করেন। সে সময় বামে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল কম এবং উপযুক্ত শিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে সপ্তগ্রামে ‘দারুল ফয়েজ' মাদ্রাসা চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় । তাই মাদ্রাসাটি ১৯১৮ সনে স্থানান্তরিত হয় রাজঘাটে মৌলানা আরজদ আলী চৌধুরী সাহেবের বসতবাড়ির এলাকাভূক্ত স্থলে। মৌলানা সাহেব সেখানেই মাদ্রাসা শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন। অতি শীঘ্র মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ফলস্বরূপে পরবর্তীতে মাদ্রাসাটি ভাগাবাজারে স্থানান্তর করা হয় এবং সর্বশেষে তিরিশের দশকের মাঝামাঝিতে রাজঘাটের বা রাঙাউটির স্থায়ী স্থলে স্থানান্তরিত হয়। মৌলানা সাহেব এজন্য মাদ্রাসার জন্য এক বিঘা জমিও ওয়াকফ করে দেন ।পীর খুরশেদ আলী সাহেব ১৯১৫ সালে ধলাই বাজার মসজিদ স্থাপন করেন। শেষ বয়েসে তিনি মক্কায় গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন ৷ তাঁর বাম ত্যাগের সঠিক তারিখ নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এভাবে বাম এলাকায় ইসলামি শিক্ষার প্রয়াস সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে দেখা যায় ‘দারুল ফয়েজ' মাদ্রাসাই এলাকায় ইসলামি শিক্ষার প্রথম প্রদীপটি জ্বালিয়েছিল।
বাম অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষা প্রসারে ‘দারুল ফয়েজ’ মাদ্রাসার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এ মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা লাভ করে বহু ইসলামি পণ্ডিত উত্তর প্রদেশের রামপুর, দেওবন্দ এবং কাছাড়ের বাঁশকান্দি মাদ্রাসায় উচ্চতম ডিগ্রী নিয়ে মৌলানা হয়ে বাম এলাকায় এবং বামের বাইরে সুনাম অর্জন করে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
এ ছিল বামে নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক প্রয়াস। জনবসতির প্রথমপর্ব থেকে ক্রম প্রচেষ্টার ফলে যে আদর্শ গড়ে উঠেছিল সে আদর্শের সূচনা অনুসন্ধান করতে গেলে জনবসতির প্রথম পর্বের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়।
জনবসতির প্রথম পর্বে বিক্ষিপ্ত ভাবে লোকজনের বসবাস ছিল। ফলে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের দায়বদ্ধতা ছিল নিতান্ত দুর্বল । ইসলামি শিক্ষার আলোকে সেই উদাসীনতার অভিশপ্ত অধ্যায় উঠে গিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধ জাগরিত হয়ে উঠতে শুরু করে। মাদ্রাসা দারুল ফয়েজ মানুষের মধ্যে নৈতিক চেতনাবোধ জাগিয়ে তোলে— শৃঙ্খলাবদ্ধ বলিষ্ঠ সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠার ভাবনা নিয়ে এলাকায় আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে।
বাম অঞ্চলজুড়ে বসবাস করা মুসলমান জনবসতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ১২খানা ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের মুসলমান সমাজকে নৈতিক মূল্যবোধের পাঠ দিয়ে চলেছে সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতারও শিক্ষাদান করছে।
এলাকার এ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহু বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত বাম এলাকায় এবং এলাকার বাইরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান দিয়ে সার্থক নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন ।
No comments:
Post a Comment