বিবাহ ব্যবস্থাঃহিন্দু সমাজের বিয়ে:
বিবাহ ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার এক অপরিহার্য অঙ্গ
।বাম অঞ্চলেও এর ব্যতিক্রম ছিলনা । সাধারণতঃ শীত
ও বসন্ত কালেই এ অঞ্চলে বিবাহ অনুষ্ঠিত হতো । এ সময় ফসল কাটা শেষ আর
গৃহস্থের ঘরে গোলাভরা ধান আর ঝড়বৃষ্টির ও সম্ভাবনা কম থাকায়,এ সময়টাকেই বিবাহের
উপযুক্ত সময় বলে বেছে নেওয়া হতো ।
তখন বাল্যকালকেই বিবাহের উপযুক্ত সময় বলে গণ্য
করা হতো ।মেয়েরা ঋতুমতী হওয়ার আগেই বিয়ে
দেওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল ।উপয়ুক্ত সময়ে
কন্যাদান কে “গৌরীদান” বলা হতো ।তবে জাঁক জমক নয় , নিয়মাবলী আর আচার অনুষ্ঠানকেই বেশী গুরুত্ব দেওয়া হতো
।পুরোহিতের দ্বারা মন্ত্র উচ্চারণের
মাধ্যমে “আভ্যুদিক “ বা পূর্বপুরুষের
অনুমতি বা আশীর্বাদ করা ছিল বাধ্যতামূলক ।
বাম
অঞ্চলে অভিভাবক ও আত্মীয় স্বজনরাই দেখে শুনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন । কুষ্টি বিচার করা ,বংশ পরিচয় সম্বন্ধে
অবহিত হওয়া প্রভৃতি অতি আবশ্যক বলে
বিবেচিত হতো । সাধারণতঃ বিয়ের বর কনে কেউ
কাউকে জানতো না বা দেখতোনা ।বিয়ের আসরে
“শুভদৃষ্টির” সময়েই একে অপরকে দেখতে পেতো ।
তখনকার দিনে অন্যান্য বিভিন্ন স্থানে যৌতুক
প্রথার প্রচলন থাকা সত্ত্বেও বাম
অঞ্চলে এই কুপ্রথা ছিলনা ।বরপক্ষ থেকে
কিছু ধনরাশি বিয়ের খরচ বাবত কন্যাপক্ষকে দেওয়া হতো ,এটাই ‘কন্যাপণ’।কন্যাদানের সময়
কন্যাদাতা স্বেচ্ছায় কিছু প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ও দান করতেন ।এতে কোনোও দাবি বা
বাধ্যবাধকতা ছিল না ।
যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় গাড়ীঘোড়ার
প্রচলন ছিলনা ।যাত্রী,বরযাত্রী সবাইকে নিয়ে
বরকর্তা পায়ে হেটেই রওয়ানা হতেন ।সঙ্গে থাকত বাজনা পার্টি ।বাজনার শব্দ
শুনে টোপর মাথায় বর দেখতে রাস্থার দুপাশে
ভিড় জমে যেতো ।পরের দিন কনের বাড়ীতে ‘ বাসি বিয়ে ‘সেরে একই পথে নববধূকে নিয়ে বর
বাড়ী ফিরতো ,পায়ে হেটেই ।পথের পাশে থাকা বাড়িগুলোর মহিলারা তখন উলু দিয়ে ধান দূর্বা ছিটিয়ে দিতেন বর কনের
উপর ।আত্মীয় অনাত্মীয়,পরিচিত অপরিচিতের কোনও প্রশ্ন ছিলনা ।নববিবাহিত দম্পতির
মঙ্গল কামনা ও তাদের প্রতি শুভেচ্ছাই ছিল এর অন্তর্নিহিত উদেশ্য । আন্তরিক এই
আচারটি সামান্য হলেও উদারতা ও সার্বজনীন মহানুভবতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত ছিল যা আজকের দিনে কল্পনাতীত ।
বিয়ে চূড়ান্ত হওয়ার পর মঙ্গলাচণ থেকে শুরু করে
দ্বিরাগমন (ফিরা যাত্রা) পৰ্যন্ত দীর্ঘ কর্মসূচী থাকতো । মাইকের উৎপাত ছিলনা ।
কিন্তু মহিলারা উলুধ্বনি আর গীতের বন্যা দিয়ে
বিয়েবাড়ী মাতিয়ে রাখতেন ।জুড়নি থেকে মঙ্গলাচরণ,পানে খিলি ,আধিবাস,জলভরা ,বর
কনেকে স্নান করানো,সাজানো,বর যাত্রা ,জামাই বরণ ,সাতপাক ,কন্যাদান ,বধুবরণ প্রভৃতি
প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের জন্য,এমন কি ঘাটস্নান,
বৌভাতের জন্য ও নির্দিষ্ট গীতগুলো আজও বামের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে ।আর এই প্রত্যেক টি অনুষ্ঠানে গ্রামবাসী মহিলাদের
যোগদানের ফলে একটা বিয়ে একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হতো । আজকাল মাইকের অত্যধিক
ব্যবহার,বিভিন্ন রুচির গান বাজানোর প্রবণতা
আর শব্দ দানবের আত্যাচার সেই ঐতিহ্যপূর্ণ
মহিলা কন্ঠগুলোকে স্তব্ধ করে দিতে চলেছে ,
যা মোটেই সুখকর নয় ।
বিয়ের মূল আকর্ষণ ছিল কনের বাড়ীতে আটটি কলাগাছ (অষ্ট সখি ) দিয়ে সাজানো
“কুঞ্জ” । বিদ্যুতের ব্যবহার ছিলনা ,তাই বিজলী বাতির ঝা চকচকে আলোক সজ্জা ও ছিল অনুপস্থিত
। কিন্তু প্রাণের আবেগে গ্রামের ছেলেরা (কোনও ভাড়া করা ডেকরেটর নয় ) কুঞ্জটিকে
সাজাতো রঙ্গিন কাগজ ,রঙিন আবীর ,বিভিন্ন
রঙের ফুল ,ফুলের মালা আর কাগজের মালা দিয়ে ।ফুলগাছের ডাল আর বিভিন্ন মনোহারী
পাতাবাহারের ডাল ও স্থান পেত এই কুঞ্জে ।পেট্রোমাক্সের আলোয় ঝলমল করতো ফুল পাতা আর রঙিন কাগজগুলো । স্বভাবতঃই শিশুরা
খুশিতে উদ্বেল হয়ে প্রজাপতির মতো নেচে
বেড়াত ,ঘুরঘুর করতো কুঞ্জের আশেপাশে । সাতপাক, মালাবদল, শুভদৃষ্টির মতো অনুষ্ঠান
প্রত্যক্ষ করতে বড়রাও ভিড় জমাতেন । আর মুহুর্মুহু হর্ষ ধ্বনিতে বিয়ে বাড়ি মুখরিত
হয়ে উঠতো ।
বিয়েবাড়ির ভোজন প্রক্রিয়া ছিল প্রায়
সার্বজনীন এবং চিত্তাকর্ষক ।গ্রামের সবাই
থাকতেন আমন্ত্রিত । জ্ঞাতিবর্গ , আত্মীয়স্বজন সবাই বসতেন পংক্তি ভোজনে । কোথাও
কোথাও শাল পাতার প্রচলন থাকলেও বামে কলাপাতাই ব্যবহৃত হতো । রসিকজনদের পরিবেশিত
বিভিন্ন হাস্য কৌতুক আর ছড়ার গুনে পংক্তি ভোজন
আরও তৃপ্তিকর হয়ে উঠতো ।
নানা মাঙ্গলিক
অনুষ্ঠান আর পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে যে বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ
হতেন বর কনে,তাকে সাত সাত জন্মের বন্ধন বলে বিশ্বাস করতো সবাই ।
সকলের শুভেচ্ছা ,আশীর্বাদ আর স্নেহ উপহারে সমৃদ্ধ
দম্পতির নবজীবনের এগিয়ে চলার এই বিবাহ
প্রথা ছিল বাম অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রতীক । এটা ছিল এই অঞ্চলের মানুষের পরস্পরের
প্রতি বিশ্বাস ,শ্রদ্ধা ,একাত্মতা ,ভালোবাসা এবং
সমাজবব্ধ বসবাস করার অদম্য
ইচ্ছা ও মুল্যবোধকে টিকিয়ে রাখার মানসিকতার এক অসামান্য দলিল ।
No comments:
Post a Comment