Sunday, 28 June 2026

37.বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থানঃ-2পঞ্চমী নাথ মজুমদার


 বাম অঞ্চলের হিন্দুদের স্থায়ী মন্দির ও অস্থায়ী  মণ্ডপে পালিত  বিভিন্ন উৎসব ও পূজার বিবরণ দেওয়া হল-

দুর্গাপূজাঃ

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল একটি প্রধান বাঙালি হিন্দু উৎসব যা চান্দ্র আশ্বিন মাসে বামে জাঁকজমক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে  উদযাপিত হয়। দুর্গাপূজা মহিষাসুরের উপর দেবী দুর্গার বিজয়ের জন্য উদযাপন করা হয়। এটি মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রতীক।মহালয়া থেকেই শুরু হয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি।।দুর্গাপূজার কেন্দ্রবিন্দু হল পূজার জন্য সুসজ্জিত প্যান্ডেলগুলিতে স্থাপন করা  অন্যান্য দেব-দেবীর সাথে দেবী দুর্গার মূর্তি। দুর্গা পূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক  ও সামাজিক অনুষ্ঠানও। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক এবং শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। নতুন জামাকাপড়, খেলনা, উপহার সামগ্রী  কেনাকাটা দুর্গোৎসবের একটি অপরিহার্য অংশ। জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই পুজোর কেনাকাটায় মেতে উঠে। দুর্গা পূজার  একটি জনপ্রিয় কার্যকলাপ হল "প্যান্ডেল হপিং", যেখানে লোকেরা তাদের সেরা পোশাক পরে, প্রতিমার সাজসজ্জা, থিম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে সারা রাত বিভিন্ন পূজা প্যান্ডেল ঘুরে বেড়ায়। দূর্গাপুজার পর বামের গ্রামবাসীরা সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ হিসেবে যাত্রাপালার আয়োজন করে যেখানে স্থানীয় শিল্পীরা অংশ নেয়।সর্বজনীন দুর্গাপূজা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়।দুর্গাপূজার সময় ঢাক, শঙ্খ  ও মন্ত্র উচ্চারণের শব্দে বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে এবং একটি উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।

চান্দ্র আশ্বিন মাসের শুক্লা সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী তিথিত্রয়ে মহা ধূমধামে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় ।কিন্তু নবমীর নিশি শেষে দশমীর আগমনেই বেজে উঠে  বিষাদের সুর । শোনা যায়  বিজয়ার করুণ রাগিনী । দেবীর বিসর্জনে ভগ্নহৃদয় ভক্তগণ  সান্ত্বনা  খুঁজে বেড়ায় আত্মীয়- স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ।গুরুজন দের প্রণাম  আর বন্ধুদের আলিঙ্গনে  আবদ্ধ করা বিজয়ার বিশেষ রীতি । এই সময় শত্রুকেও মিত্র করার রেওয়াজ আছে । জাতি-ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে  আপন করে নেওয়াই বিজয়ার  বিশেষত্ব ।  এই সৌভ্রাতৃত্ব বোধটাকেই দুর্গাপূজার ফল বা দেবী দুর্গার  আশীর্বাদ বলে মনে করা হয় ।

লক্ষ্মী পূজাঃ

দেবীপক্ষের শেষ হয় শারদ পূর্ণিমায় আর এই পূর্ণিমা তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয় লক্ষ্মী পূজা ।লক্ষ্মী মানে শ্রী,লক্ষ্মী মানে সুরুচি।লক্ষ্মী সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী ।লক্ষ্মী পূজার দিনে   বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে,বামের প্রায় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে  চালের পিটুলি দিয়ে  আলপনা দেওয়া হয়।সে আল্পনায় থাকে ধানের ছড়া,লক্ষ্মীর চরণ চিহ্ন ,ক্ষেতের সরঞ্জাম,লতাপাতা প্রভৃতি ।হৈমন্তিক ধান ঘরে তোলার প্রাক মুহূর্তে  লক্ষ্মীর আরাধনা কৃষিভিত্তিক সমাজের মানস কল্পনাকে প্রতিফলিত করে। প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ প্রাপ্তির জন্যই লক্ষ্মী পূজার আয়োজন।

কার্তিক  পূজাঃ

কার্ত্তিক সংক্রান্তি অর্থাৎ কার্ত্তিক মাসের শেষ দিনে কার্ত্তিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । এখানে কোনও তিথি নক্ষত্র বারের বিধি নিষেধ নেই ।দেবসেনাপতি কার্ত্তিক বীরত্ব আর শৌর্য বীর্যের প্রতীক । তাঁর আশীর্বাদে সন্তান লাভ হয় -এই বিশ্বাসে বিশেষতঃ নববিবাহিতা বধূরাই কার্তিকের পূজা করে থাকেন । কার্তিকের মতো বীর যোদ্ধা সুদর্শন সন্তান লাভের আশায়,ময়ুরাসনে বিরাজিত কার্তিকের সঙ্গে তীর ধনুকের ও পূজা করা হয় । সাধারনতঃ কয়েকজন ব্রতী  একত্রিত হয়ে ,সমবেত ভাবে ,একই স্থানে কার্ত্তিক পূজা করে থাকেন ।

সারাদিন উপবাস করে ,  সারা রাত জেগে থেকে প্রহরে প্রহরে পূজা হয় । সেই সঙ্গে ধান ,মাস কলাই,মুগ  ইত্যাদি শস্যের  নবাঙ্কুর অর্থাৎ নব অঙ্কুরিত শস্যে জলাভিষেক করা হয় । সম্ভবতঃ এই আচার অনুষ্ঠানটি নবপ্রজন্মকে স্বাগত জানাবার ইঙ্গিত বাহী । কার্তিক পূজার পরে আসে ফসল কাটার মৌসুম । কৃষকরা প্রচুর  ফলনের জন্য  আশা প্রকাশ করে  এবং আসন্ন কৃষি চক্রে অনুকূল আবহাওয়া  ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা জানায় ।

মকর  সংক্রান্তিঃ

বাম অঞ্চলের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে   মকর সংক্রান্তি এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে । কৃষি প্রধান এই অঞ্চলে  কৃষির সঙ্গে  সম্পর্কিত এই অনুষ্ঠানটি বিশেষ  অর্থবহ ।পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে অর্থাৎ বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে  এই উৎসব পালিত হয় ।

   ইংরেজী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী  জানুয়ারী মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখে পড়ে এই সংক্রান্তি  । এ সময় শীতকালীন  ফসলের মৌসুমের   সমাপ্তি ঘটে অর্থাৎ এতদঞ্চলের ‘শাইল‘ (শালি) ধান  কাটা শেষ হয় । হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর  সোনালী ধানে গোলা যখন  ভরে যায় তখন কৃষকের মনও ভরে উঠে আনন্দে । সদ্য ঘরে তোলা  নতুন ধানের চাল দিয়ে  তৈরী হয়  নানা রকম পিঠে পুলি । বামের ঐতিহ্যবাহী উপাদেয় সব স্থানীয় খাবারের সাথে ‘ চুঙ্গাপিঠা’র উপস্থিতি গৃহস্থের রসুইকে পরিপূর্ণ করে তুলে । প্রত্যেকের বাড়ীতে প্রত্যেকের আমন্ত্রণ থাকায় উৎসবের মেজাজটা সর্বজনীন রূপ ধারণ করে ।

এছাড়াও  মকর সংক্রান্তির আর একটি  তাৎপর্য  আছেমহাভারত খ্যাত  পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় শায়িত ছিলেন তিনি ছিলেন  ইচ্ছামৃত্যুর বরপ্রাপ্ত । এই  সংক্রান্তির দিনেই তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করেন । এ জন্য হিন্দুরা ব্রাহ্ম মুহূর্তে স্নান সেরে ‘তিল’ গ্রহণ করেন সর্বপ্রথম । তাই ঘরে ঘরে তিলের নাড়ু তৈরী হয় । এই সংক্রান্তিকে এই জন্য তিল সংক্রান্তি  ও বলা হয় ।

………………………………………………………………..

প্রিয় পাঠকমণ্ডলী,

বাম হিস্ট্রি ব্লগ আপনাদের আন্তরিক সাড়া ও উৎসাহে ক্রমশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ পর্যন্ত ১১,৮৫০ বার পাঠকরা ব্লগটি পরিদর্শন করেছেন।

যারা বামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছে অনুগ্রহ করে ব্লগটির লিংকটি শেয়ার করুন:

bam-history.blogspot.com

এছাড়াও, ব্লগের Comment বিভাগে আপনাদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া জানালে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত হব।

আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাই আমাদের অনুপ্রেরণা।


ধন্যবাদান্তে,
বাম হিস্ট্রি ব্লগ


No comments:

Post a Comment