ব্রিটিশরা কাছাড়ের শাসনভার হাতে নেওয়ার পর কাছাড়ে নতুনভাবে জনবসতি প্রদানের ব্যবস্থা করে। এই নতুন জনবসতির ধারায় ১৮৮৫ সাল থেকে বাম অঞ্চলে নতুন ভাবে ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া চালু হওয়ার ফলে কাছাড়ের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভাগ্যান্বেষী গৃহস্থরা বাম অঞ্চলে ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে বসতি শুরু করে। বাম এলাকায় নতুনভাবে জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করে।নতুন ভাবে যারা জনবসতি গড়ে তুলেছিল তাদের আধুনিক শিক্ষাচর্চার একটা ঝোঁক ছিল। ফলে ১৮৯৫ সাল নাগাদ বাম এলাকায় ৩ খানা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। এগুলির মধ্যে ১৫৭ নং রামপ্রসাদপুর থাম্বাল এল. পি. স্কুল ,প্রথম শিক্ষক ছিলেন, রাধাচরণ রাহা।১৬৮ নং মহাদেবপুর এল. পি. স্কুল যার প্রথম শিক্ষক ছিলেন, গিরিশ চন্দ্ৰ দাস ৷১৬৯ নং দেবিপুর এল. পি. স্কুল যার প্রথম শিক্ষক ছিলেন সূর্যমোহন দাস।
অতঃপর ১৯২০ সালে হাওয়াইথাং এ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তখনকার সার্কেল সরপঞ্চ মশরফ আলী লস্কর। প্রথম শিক্ষক ছিলেন কালারাজা চৌধুরী।
এরপর ভাগবাজারে শুরু হয়েছিল ইলিয়াছ আলী এল.পি.স্কুল। প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ছিলেন, আনফর আলী লস্কর। তারপর শুরু হয়েছিল বিদ্যারতনপুর এল.পি.স্কুল ।
এভাবে এলাকায় ক্রমেই স্কুলের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০২৫ সাল নাগাদ বাম এলাকায় ৮৫টি এল.পি.স্কুল স্থাপিত হয়ে সমস্ত অঞ্চলকে শিক্ষালোকিত করার দায়িত্ব পালন করছে।
এলাকায় আছে ৪(চার)টি এম.ভি.স্কুল। এগুলোর মধ্যে পুরাতন চান্নিঘাট এম.ভি.স্কুল- ১৯৩০ সালে স্থাপিত। প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহেন্দ্র চন্দ্র সিকদার। এরপর ১৯৩৯ সালে শুরু হয় ধলাই উমাতারা এম.ভি.স্কুল। ১৯৪২ সালে স্থাপিত হয়েছিল জামালপুর এম.ভি.স্কুল। প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিপিন বিহারী দাস।এলাকায় এম.ই.স্কুল রয়েছে ১৩টি। উপরে উল্লেখিত প্রাদেশিকীকৃত স্কুল সমূহ ছাড়াও বামে রয়েছে ব্যক্তিগত
খণ্ডে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ।
এভাবে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার পরবর্তী পর্যায়ে হাইস্কুল পর্যায়ে শিক্ষার জন্য বাম-এ গড়ে উঠেছিল ‘বাম নিত্যানন্দ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়।১৯৩৮ সালে এই স্কুলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯২২ সাল থেকে‘বাম নিত্যানন্দ এম.ই.স্কুল রূপে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু হয়েছিল। ১৯২২
সালে মাননীয় শ্রী কৃষ্ণজীবন পুরকায়স্থ, কৃষ্ণচরণ বর্মণ, এবং কৃষ্ণধন বর্মণের উদ্যোগ,
পৃষ্ঠপোষকতা ও ভূমি দানের পাশাপাশি অন্যান্য মহৎ ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে
এবং নিত্যানন্দ বর্মণের অর্থদান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাম নিত্যানন্দ এম.ই. স্কুল।ফলে ১৯২২ সাল থেকে এম.ই.স্কুলটি ‘বাম নিত্যানন্দ এম ই স্কুল' রূপে এলাকার প্রথম এম ই স্কুল শুরু হয়েছিল লান্টুগ্রাম-সাদাগ্রামে ।বর্তমানে তা ‘বাম নিত্যানন্দ বহুমুখী সিনিওর সেকেণ্ডারী স্কুল' হয়েছে। মোট ২২ বিঘা জমির প্রশস্থ পরিসরে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপত্যকার স্বনামধন্য বিদ্যানিকেতন গুলির মধ্যে অন্যতম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকায় অনেক কৃতী সন্তান উপহার দিয়েছে। এই স্কুলে পড়া ছাত্রদের মধ্যে অনেক ছাত্র জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রাজ্য সরকার, জাতীয় সরকার এবং আন্তর্জাতিক স্তরে দায়িত্বপূর্ণ কাজে কৃতিত্বের সঙ্গে কর্তব্য পালন করে সফল ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। স্কুলটি বাম অঞ্চলের গর্বের বিষয়। উল্লেখ্য যে স্কুলে প্রধান শিক্ষক শ্রী মাণিক্য চন্দ্ৰ নাথ দীর্ঘ ৩৭ বছর এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে থেকে স্কুলটিকে স্বনামধন্য আদর্শ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন কাছাড়ের স্নাতক উত্তীর্ণদের মধ্যে দ্বিতীয়। এই কৃতী শিক্ষকের অবদানে বাম অঞ্চল কৃতজ্ঞ।
স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে বামে আর এক হাইস্কুল এলাকায় শিক্ষার পরিবেশকে সমুজ্জ্বল করে রেখেছে। এই স্কুলের নাম ‘বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল'। ১৯৫২ সালে স্কুলটি প্রথমে এম.ই.স্কুল রূপে শুরু হয়েছিল। অতঃপর ১৯৫৮ সালে তা হাইস্কুল স্তরে উন্নীত করা হয়। বাম অঞ্চলে শিক্ষার জগতে এ আর এক আদর্শ প্রতিষ্ঠান।আসাম
সরকারের সমবায় বিভাগে সহকারী কোপারেটিভ অফিসারের কাজে পদত্যাগ করে মহিউদ্দিন আহমদ সদ্য প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেডমাষ্টার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বামের দক্ষিন অঞ্চলে
শিক্ষাবিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন।
এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বাম এলাকায় এখন ১৮ টি হাইস্কুল ও সিনিয়র সেকেণ্ডারি স্কুল আছে । বলা যায় বামে মুটামুটি ভাবে প্রতি
১০০০ পরিবারের জন্য রয়েছে একটি করে হাইস্কুল বা সিনিয়র সেকেণ্ডারি স্কুল। তাছাড়াও পাশেই অদূরে মিজোরাম সীমানার নিকটে রয়েছে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় এবং সৈনিক স্কুল। ২০২৩ সালে বামের শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও এক সাফল্যের
কাহিনী সংযোজিত হয়। রিড ফাউন্ডেশন নামক এক বেসরকারি ট্রাস্টের উদ্যোগে ভাগাবাজারে (ইসলামাবাদ) প্রতিষ্টিত হয় সাউথ কাছাড় কলেজ নামে একটি বেসরকারি ডিগ্রী কলেজ। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এফিলিয়েটেড কলেজটি এ অঞ্চলে
উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে বিশেষত মেয়েদের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এলাকায় আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে সচেতন নাগরিক গড়ে তুলছে। এলাকাবাসীর সমবেত প্রচেষ্টায়
এই ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
No comments:
Post a Comment