107.(4)-‘বামে’
আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে অগ্রণী শিক্ষকদের অবদান-4:
প্রয়াত মহীউদ্দিন আহমদের নামের সাথে বামের প্রারম্ভিক শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যদিও তাঁর জন্মস্থান বাম নয়। মহীউদ্দিন আহমদের জন্ম সোনাইর কাজিডহর গ্রামে। পিতার নাম ছিল আসাইদ আলী লস্কর এবং মাতার নাম ছিল জেবুন নেছা লস্কর। চার ভাইয়ের মধ্যে মহীউদ্দিন আহমদ ছিলেন সবার বড়। ১৯৪০ ইংরেজীতে শিবটিলা নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে তার লেখা পড়ার হাতেখড়ি হয়। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষে সোনাই নিত্য গোপাল হায়ার সেকেন্ডারীতে ভর্তি হন। সেই স্কুল থেকে ১৯৫৩ সালে মেট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হন।
সেই বছরই গুাহাটির কটন কলেজে আই এস সি তে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে কটন কলেজ থেকে আই এস সি পাস করেন। পরবর্তীতে আবার শিলচর ফিরে এসে গুরুচরণ কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৮ সালে ঐ কলেজ থেকে বি এ পাস করেন। সেই বছরেই তিনি সমবায় পরিদর্শকের চাকরি পান এবং প্রথম
পোস্টিং হয় রামকৃষ্ণ নগরে।
মহীউদ্দিন আহমদ
এরপরই মহীউদ্দিন আহমদের পথ পরিবর্তন ঘটে, যা ভাগাবাজার তথা বাম অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত। রামকৃষ্ণ নগর থেকে বদলি হয়ে কো-অপারেটিভ সোসাইটির পরিদর্শক হয়ে ১৯৫৮ সালে ভাগায় এসে এতদঞ্চলে শিক্ষার অভাব অনুভব করেন। শুধু অনুভবই নয়, সেই অভাব দূর করে শিক্ষার বিস্তারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। নিরাপদ সরকারি চাকরি ছাড়ার মন স্থির করেন এবং চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৫৮ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বামের ইতিহাসের শিক্ষা ক্ষেত্রে বছরটি একটি মাইলফলক হয়ে রইল। তার প্রতিষ্ঠিত বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল আজ বহু কৃতিত্বের অধিকারী বামের একটি সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বাম অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আবার এক নব সূচনার অধিকারী হিসেবে শিক্ষানুরাগী মানুষের স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে গেলেন ১৯৯৪ সালে ভাগা-রাজঘাটে এম এ লস্কর জুনিয়র কলেজ প্রতিষ্ঠার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জুনিয়র কলেজ (বর্তমানে সিনিয়র সেকেন্ডারী স্কুল) পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মহীউদ্দিন আহমদ এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল ছিলেন। ভূমিদাতা পরলোকগত তবারক আলী লস্কর ও মবারক আলীর দানকৃত ১৪ বিঘা জমির উপরে প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র সেকেন্ডারী স্কুলটি আজ প্রাদেশীকৃত রূপে অবস্থান করছে, যার প্রতিষ্ঠার লগ্নে রয়েছে মহীউদ্দিন আহমদের অপরিসীম প্রচেষ্টা।
একজন আদর্শ শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা এবং দক্ষ সংগঠক ছাড়াও মহীউদ্দিন আহমদ ছিলেন এক উচুমাপের সাহিত্যিক, গল্পকার। বরাকের সাহিত্যিক সমাজে তার একটি সুপরিচিতি ছিল। তবে দুঃখজনকভাবে, দু-একটি গল্প ছাড়া অন্যান্য অসংখ্য গল্প এখন আর পাওয়া যায় না। নির্মল সংস্কৃতি অনুরাগী মহীউদ্দিন আহমদ সাহেব সহকর্মী শ্রীযুক্ত নীরেশ চন্দ্র দাস, প্রাক্তন মন্ত্রী গিরীন্দ্র মল্লিক, সিরাজ উদ্দিন বড়ভুঁইয়া (সেকন্ড স্যার), সংস্কৃত শিক্ষক শর্মা স্যার, হরেন্দ্র স্যার শিক্ষকদের নিয়ে একটি স্বচ্ছ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছিলেন বাম বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলে। নিয়মিতভাবে পালিত হত রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, শিক্ষক দিবস, শারদীয় উৎসবসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একজন সৃজনশীল, সংস্কৃতমনস্ক প্রধান শিক্ষকের সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
১৯৯৩ সালে মহীউদ্দিন আহমদ সাহেব চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি ভাগাবাজারের দক্ষিণ প্রান্তে তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সন্নিকটস্থ এক খণ্ড জমি ক্রয় করে গৃহ নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সেই বাড়ীটি বিক্রি করে শিলচরে চলে যান। ২৬শে অক্টোবর, ২০১৯ ইংরেজীতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান শিক্ষাবিদ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। সোনাই থানাধীন কাজিডহরে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে কবর দেয়া হয়।
তাঁর অনেক প্রাক্তন ছাত্র ও অভিভাবক বাম থেকে কাজিডহরে গিয়ে তার জানাজার জন্য উপস্থিত হন। সেখানে তারা ঘোষণা করেন যে, মহীউদ্দিন আহমেদের সম্মানে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। বাম বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের কৃতজ্ঞ প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিভাবকরা ২০২১ সালে "আলোকের
ঝর্ণাধারা" নামে
একটি স্মরণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই স্মরণ গ্রন্থটি বাম বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মহীউদ্দিন আহমদ সাহেবের প্রতি নিবেদিত এবং হাফসা ফাউন্ডেশন দ্বারা প্রকাশিত হয়।
তার আগে ২০১৯ সালে, বরাক সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়ন পরিষদের আয়োজনে এম.এ. লস্কর জুনিয়র কলেজে অনুষ্ঠিত সভায় মহীউদ্দিন আহমদকে দক্ষিণ বামের শিক্ষা বিস্তারের জন্য সম্মানিত করা হয়। দেরিতে হলেও, তাঁর প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিভাবকরা তাঁর শিক্ষা বিস্তারের অবদানের জন্য তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। সম্মানিত হওয়ার কয়েক মাস পরেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
------------------------------------------------------------------------

No comments:
Post a Comment