আসামের বাঙালি সংস্কৃতির পীঠস্থান বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার দক্ষিণ-পূর্বের 'বাম' অঞ্চল, -যা এককালে ছিল গভীর অরণ্যাবৃত। 'বনফারা' নামেই তখন তার ছিল পরিচিতি। ক্রমে জঙ্গল আবাদ হয়ে জন বসতি গড়ে ওঠা শুরু হলো, - এই উর্বর ভূমির কল্যাণে মানুষের শুধুমাত্র জীবন ধারনের প্রাথমিক চাহিদাই মিটলো না, একই সাথে মনের আবেগগুলোকে বিকশিত করার মতো প্রচুর প্রাকৃতিক উপকরণও পেয়ে গেল। প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা উপাদানকে কাজে লাগিয়ে অবসর বিনোদন বা আনন্দ উপভোগের জন্য মানুষ আবিষ্কার করতে থাকলো নানা সহজ-সরল খেলা - যেগুলোর মধ্যে থাকলো না কোন প্রকার আর্থিক সংলিপ্ততা।
আসলে আনন্দ লাভের জন্য বিশেষ কোন আয়োজন বা বিশেষ কোন সাধনের প্রয়োজন পড়ে না। সামান্য বা ক্ষুদ্র আয়োজনই যে অসীম আনন্দ এনে দিতে পারে, গ্রামীণ জীবনের সাথে যারা কোনভাবে যুক্ত আছেন বা ছিলেন, তারা তা বিশেষ ভাবে অনুভব করতে পারবেন। তবে দুঃখের বিষয়, অবসর বিনোদন বা আনন্দ উপভোগের জন্য আবিষ্কৃত গ্রামীণ অনেক খেলাই আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ফুলঘুঁটি, গুলি-ডাণ্ডা ইত্যাদির মতো বাম অঞ্চলে এক সময়ের বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় খেলাগুলো আজ দেখাই যায় না। খেলা-ধুলোর আধুনিক উপকরণগুলো সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার ফলে আর মনকাড়া বিজ্ঞাপন দেখে আনন্দ লাভের সহজ-সরল উপকরণগুলোকে আজ আমরা দূরে ঠেলে দিয়ে কৃত্রিম আনন্দেই মেতে ওঠছি। মনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ-আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে বিদায় জানিয়ে বাজারলব্ধ আনন্দকেই আমরা নিজেদের জ্ঞাতে অথবা অজ্ঞাতে আনন্দ ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছি।
রুকনি নদীর বাঁকে বাঁকে বালুর চরে কিছুক্ষণ সটান হয়ে শুয়ে থাকাও তেমনি এক আনন্দদায়ক খেলা। বাম অঞ্চলের খুব কম ছেলে-মেয়েকে পাওয়া যাবে, যারা এই খেলাটি উপভোগ করে নি। কখনো কখনো বালু সরিয়ে নালার মতো বানিয়ে তার মধ্যে শুয়ে পড়ে শুধু মুখ-চোখ-নাক ছাড়া সমস্ত দেহই বালু দিয়ে ঢেকে দিয়ে কী আনন্দই না পাওয়া যেত, - আজ সেটা ভাবলেও মনের মধ্যে শিহরণ জাগে। কখনো বা বালুতে ছোট গর্ত খুঁড়ে তার ওপর ভিজে বালু দিয়ে নানা আকারের বাড়ি তৈরি করা হতো। কখনো এমনও হতো, নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই বাড়ি ভেঙে পড়ে সমস্ত শ্রম, উত্তেজনা, ধৈর্য নিমেষে মাটি করে দিত। কিন্তু এতে দমে না গিয়ে আবার শুরু থেকে নতুন উদ্যমে বাড়ি বানানোর কাজ শুরু হয়ে যেত। বালিয়াড়ির পাশের নদীর দিকে ঝুঁকে পড়া পেয়ারা গাছের পেয়ারা খাওয়ার চেয়ে ডাল থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার রোমাঞ্চকর খেলাটাই ছিল বেশি আনন্দের। আবার নদীর পাড় থেকে সুপারিগাছের খোলে (শুকনো ডাঁটা ও পাতা সমেত নিচের চেপটা অংশটি) বসে পিচ্ছিল পথ বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসার মধ্যে ছিল কত আনন্দ আর রোমাঞ্চ। আজ তা ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়। কারণ, তীব্রগতিতে নেমে আসার সময় দু'হাতে ধরে থাকা খোলের ডাঁটাকে নৌকোর গলই-এর মতো সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যে কোন মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা থাকে । ফলে গড়িয়ে নিচে পড়ার সময় হাত-পায়ের হাঁড়-গুড় ভাঙার যে যথেষ্ট সম্ভাবনা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার মধ্যে আবার ওপর থেকে নামাকে আরো দ্রুততর করতে জল ঢেলে এই পথকে আরো পিচ্ছিল করে তোলা হতো।
নদী বা পুকুরের জলে ভাঙা মাটির বাসনের টুকরো বা চেপটা আকারের ছোট পাথর ইত্যাদি এমনভাবে ছুঁড়া হতো, যাতে সেটি জলের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে বেশ কয়েকটা ঢ্যাং খেয়ে ক্রমে মিলিয়ে যেত। কে কত বেশি ঢ্যাং খাওয়াতে পারবে, তা নিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও হতো ।
গৃহকর্মে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি ডালার ভেতরের অংশ নষ্ট হয়ে গেলে সাধারণত তা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। সেই অকেজো ডালাটিকে কুড়িয়ে তার বাইরের চাক খুলে নিয়ে সেটি দিয়ে চাকা বানিয়ে অন্য একটা বাঁশের টুকরো অথবা কোন ভাঙা ছাতার লোহার শিক-এর একদিকে U আকৃতি বানিয়ে অপর দিক হাতে ধরে চাকাটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সাইকেল মনে করে তার পেছনে পেছনে ছুটে যাওয়ার মধ্যেও যে কী অপার আনন্দ। আবার কোন বড়ো বাঁশের আঁখের (গাট-এর) দু'দিক কেটে চাকার মতো বানিয়ে চার /পাঁচ ফুট লম্বা একটি বাঁশের একদিকে লাগিয়ে তার অন্য দিকটি কাঁধে চাপিয়ে গাড়ির মতো চালিয়ে নিয়ে যাওয়াতে যে ছিল কত আনন্দ আর রোমাঞ্চ। লম্বা বাঁশের টুকরোটির মাঝখানে আবার ছোট একটি হাতল, - অর্থাত ছোট একটি গাছের ডাল বা বাঁশের শলা লাগিয়ে সেটিকে গাড়ির স্টিয়ারিং-এর মতো ব্যবহার করে নিজেকে গাড়ির চালক ভেবে কত-ই না গর্ব অনুভূত হতো। কারণ, তখন অনেক শিশুর চোখে ট্রাক ড্রাইভাররা কোন অংশেই চলচ্চিত্রের নায়কের চেয়ে কম ছিলেন না। বিশেষ করে মিজোরামের দিকে ছুটে যাওয়া পাঞ্জাব-হরিয়ানা ইত্যাদি স্থান থেকে আসা চোখে কালো চশমাপরা ট্রাক চালকদের দেখে অনেকের মনেই স্বপ্ন জাগতো, - কখন বড়ো হয়ে এদের মতো ড্রাইভার হওয়া যায় ।
…………………………………………………………………………………
No comments:
Post a Comment