Thursday, 17 September 2026

72.বামের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন -2 কানন নাথ মজুমদার

  

গৌরচন্দ্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাসে তাঁর উপস্থিতিকেও উপলব্ধি করতে পারেন ভক্তগন। তাঁরা ভাবনেত্রে অবলোকন করেন--শ্রীগৌরাঙ্গ যেমন সপার্ষদ আবির্ভূত হয়ে ধরাধামকে কলুষমুক্ত করেছিলেন ঠিক সে ভাবেই এই আসরেও উপস্থিত  হয়েছেন ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে

উদয় হইল রে নবীন সোনার গৌরাঙ্গ 

উদয় হইল গৌর চান্দ লইয়া সাঙ্গপাঙ্গ

 মানস চক্ষে শ্রীগৌরাঙ্গের অপরূপ দেহকান্তি সন্দর্শনে বিমোহিত ভক্তমণ্ডলি পঞ্চমুখে তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব বর্ণনায় রত হন তাঁদের কল্পনায় ফুটে উঠে - ভগীরথীর তীরে তীরে গৌরা চাঁদের সেই মনোলোভা দৃষ্টিনন্দন নৃত্যরূপ--

 সুরধুনির কিনারায় সোনার নূপুর দিয়ে পায়

নাচে নাগরি গো, সুন্দর গৌরাঙ্গ রায়

 সুন্দর কপালে সুন্দর তিলক

 সুন্দর নামাবলি গায়  

 অপূর্ব শ্রীমণ্ডিত মুখমণ্ডল, তিলক লাঞ্ছিত ললাট, নামাবলি বেষ্টিত শ্রীতনু, দণ্ড-কমণ্ডলু ধারী, পতিত পাবন জনার্দনের অপরূপ কীর্তন পরিক্রমা দর্শনের মধ্যেই মনের কালিমা মুক্তির উপায় খুঁজে পান তাঁরা--

গৌরাঙ্গে, কী রঙ্গে, হরি বলছে নদীয়ায়।

খোল করতাল আনন্দে বাজাইয়ে

প্রেম তরঙ্গে নাচে গায়।

গৌরাঙ্গের প্রেমের বাতাসে 

জীবের তম অহং সব বিনাশে 

অষ্ট পাশে জগতে বান্ধা

জীব তরাইতে দেয় উপায়

 ভক্তদের অনুভবে  কীর্তনের আসরটাই হয়ে উঠে নইদা (নদীয়া) অসার সংসারের ভোগ বাসনায় পরম পদ অবহেলা করার জন্য  আত্মসমালোচনা আর ভগবৎ চরণে আত্মনিবেদনের  প্রয়াসে খেদোক্তি শোনা যায়--

গৌর গৌর গৌর বলে ডাকরে রসনা

তারে ডাকলে অঙ্গ শীতল হবে

যাবে রে ভব যন্ত্রণা

রবির সুতে বাঁধবে রে যখন 

কোথায় রবে ঘর দরজা

কোথায় রবে ধন। 

তোমার বন্ধু সবে বিদায় দিবে 

সঙ্গের সঙ্গী কেউ হবে না।

 

ভক্ত পদকর্তাগণ গৌরাচাঁদের মধ্যেই শ্রীকৃষ্ণকে প্রত্যক্ষ করেছেন আর ব্রজের গোপালকে নবদ্বীপে নবরূপে অবতীর্ণ হতে দেখে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেছেন--

কানাই, কি অভাবে কার ভাবে ভাই 

ব্রজ ছেড়ে এলে।

মধুর বৃন্দাবন ত্যাজ্য করে

দেশান্তরী হলে

তোর হাতে বাঁশী  নাই  মাথে চূড়া নাই 

গলে নাইরে বনমালা।

তোর অঙ্গে নামাবলি কান্ধে ভিক্ষার ঝুলি

দুই নয়নে বহে ধারা

 

এ প্রশ্নের উত্তর আবার তাঁরা নিজেরাই খুঁজে বের করেছেন তারা গৌরসুন্দরের মধ্যে রাধাকৃষ্ণের মিলিত রূপ উপলব্ধি করে হৃদয়ঙ্গম করেছেন--

রাধা-ভাব-কান্তি-দ্যুতি' শ্রীঅঙ্গে ধারণ করে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, প্রেমাবতার শ্রীগৌরাঙ্গ রূপে অবতীর্ণ হয়ে শ্রীহরির প্রতি রাধারাণীর প্রেমভাব আস্বাদন করেছেন --

শ্রীবাসের আঙ্গিনার মাঝে

শ্রীশচী নন্দন গৌরা।

হরি হরি হরি বলে 

রাধা ভাবে মাতোয়ারা

এভাবেই রাধা, কৃষ্ণ আর শ্রীগৌরাঙ্গ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছেন। নদীয়ার নবদ্বীপ, হয়ে গেছে শ্রীবৃন্দাবন। আর ভক্ত হৃদয়ের  অপার বিশ্বাসে কীর্তনের আসরই বৃন্দাবন আর নবদ্বীপের  মূর্ত প্রতীক। তাই তো বলা হয়--

যেথা হয় নাম সংকীর্তন

সেই তো বৃন্দাবন। 

অবশ্য শাস্ত্রের বানীও কথাটার সমর্থনে এগিয়ে আসে--

নাহং তিষ্ঠামি বৈকুন্ঠে

যোগীনাং হৃদয়েন চ।

মদভক্তা যত্র গায়ন্তী

তত্র তিষ্ঠামি নারদঃ

 কথাগুলোর সপক্ষে বিপক্ষে যত যুক্তিই থাকুক না কেন বাম কাছাড়ের  জনগণ যে এভাবে কীর্তনানন্দে মেতে সঙ্গীত সাধনা  করেছেন এবং আজ তা করে চলেছেন--  তার মূল প্রেরণা কিন্তু যুগপুরুষ গৌরচন্দ্রের অসাধারণ জীবন দর্শন আর অস্পৃশ্যতা  দূরীকরণের মতো সমাজ-সংস্কার মূলক কর্মধারা এই অঞ্চলের মানুষ তাঁর এই উদার নীতিকে সমর্থন বিশ্বাস করেছিলেন বলেই তাঁর অনুগামী হয়ে আজও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একসঙ্গে "হরি বলে বাহু তুলে" সংকীর্তনে মেতে উঠতে পারেন। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন বহন করে আজও সংকীর্তন মানব কল্যানের বার্তা ছড়িয়ে চলেছে দিকে দিকে।

বৈদ্যুতিক প্রচার মাধ্যমের দৌলতে  মানুষ আজ পৃথিবীর  সব প্রান্তের সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হলেও, ভিন্ন শৈলী ভিন্ন আঙ্গিকের সঙ্গীত চর্চা হলেও, অঞ্চলে আজও  সংকীর্তন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, আজও সংকীর্তন এক এবং অদ্বিতীয়।