ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়—‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত' নামক গ্রন্থে উপেন্দ্ৰ চন্দ্ৰ গুহ বাম সম্পর্কে বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন— বামে রুকনি নদীর তীরে রাজঘাটে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী ছিল। এতদসঙ্গে উপেন্দ্র
চন্দ্র গুহ উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানের ইসলামাবাদে (ইসলামপুরে) “ পুরাতন রাজপথ ,পুষ্করিণী, ইষ্টক নির্মিত
সোপানাবলী প্রভৃতি ঐ স্থানে ও তন্নিকটস্থ ভূ-ভাগে অদ্যাপি বর্তমান রহিয়াছে
“।বাম বাসীর মধ্যে রাজদিগি নামে পরিচিত এই দিঘিটি এখনও অক্ষত অবস্থায় আছে। ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত' নামক গ্রন্থ ১৯১০ সনে প্রকাশিত হয়। তথ্যমতে উপেন্দ্ৰ চন্দ্ৰ গুহ নিজে বামে এই রাজদিঘি পরিদর্শন করেছিলেন
।বাম থেকে পরবর্তীকালে রাজধানী কৈলাশ শহরের জয়পুরে স্থানান্তরিত হয়েছিল। জয়পুর থেকে রাজধানী বদল হয় মানিক ভাণ্ডার নামক স্থানে। এরপর রাজধানী স্থানান্তরিত হয় আগরতলায়। আগরতলায় ত্রিপুরার রাজধানী এখনও বর্তমান । বাম সম্পর্কে ত্রিপুরিদের মধ্যে অনেক
জনশ্রুতি প্রচলিত আছে ।উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ কাছাড়ের ইতিবৃত্ত বইয়ে এরকম কয়েকটি
জনশ্রুতি উল্লেখ করেছেন।এ সব জনশ্রুতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে এক কালে বামে
ত্রিপুরিদের রাজধানি বা রাজত্ব ছিল।
প্রাচীনকালে রাজা-রাজড়ারা নিজেদের কীর্তির পরিচয় রাখবার জন্য রাজ্যের স্থানে স্থানে বড় বড় দিঘি খনন করে অক্ষয় কীর্তি রেখে যেতেন। এর উদাহরণ রয়েছে। কাছাড়ি রাজা লক্ষীচন্দ্রের উধারবন্দের রাণীর দিঘি, পানগ্রামের রাজদিঘি কিংবা হাইলাকান্দির শক-আলার দিঘি ,শিবসাগরের জয়সাগর দিঘি ইত্যাদি। বামের ইসলামাবাদের রাজদিঘিও এমনি এক বিশাল দিঘি যা এলাকায় এক সময়ের গৌরবোজ্জ্বল রাজশক্তির স্মৃতি প্রচার করছে।
প্রায়
১০-১২ বিঘা জমিজুড়ে বিশাল এই দিঘি। ১৯৫৭ সালে আসাম সরকার এই দিঘিটিকে মৎস্য পালন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। দিঘির প্রশস্থ পারে মীন বিভাগের নিজস্ব কার্যালয় এবং কর্মচারীদের আবাসিক ভবনগুলি তৈরি করা হয়েছে।
তবে বাম থেকে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় কেন স্থানান্তরিত করা হয়েছিল এর কারণ এখনও জানা যায়নি । অনুসন্ধানী গবেষকরা এর কারণ অনুসন্ধান করবেন নিশ্চয়ই। ত্রিপুরি রাজারা বাম থেকে সরে যাওয়ার একটি কারণ সম্ভবত বহিশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া। এ সম্পর্কে ব্রিটিশ রাজ কর্মচারীদের রিপোর্ট ইতিহাসের উপাদানরূপে নির্ভরযোগ্য দলিল সন্দেহ নেই
উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ তার "কাছাড়ের ইতিবৃত্ত" গ্রন্থে যখন বামের রাজঘাটে টিপ্রা রাজার রাজধানী ছিল বলে মত পোষণ করেন, রাজমোহন নাথ তার "এন্টিকুইটিজ অফ কাছাড়" গ্রন্থে বামের তেলিচিবা (যা ইসলামাবাদ গ্রামের একটি অংশ) নামক স্থানে অনেক গুলো পুরাতন পুকুর,মাটির উচু কেল্লা, ইট ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। এবং তার মতে এগুলো ত্রিপুরার উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের বা আধিকারিকদের সদর দফতরের সাথে যোগসুত্র
রয়েছে।রাজমোহন নাথ আরও উল্লেখ করেছেন যে "ত্রিপুরা রাজমালাতে" বলা হয়েছে যে সোনাই বা রুকনি উপত্যকা নিয়ে কাছাড় সমতল অঞ্চল"পূর্বকুল " প্রদেশ নামে পরিচিত ছিল এবং রুকনি নদীতে একটি ডুব দিলে সকল পাপ থেকে মুক্তি লাভ হতো। কুকিরা দূর দূরান্ত থেকে বাঁশের নল বা চুঙ্গাতে করে রুকনি জল নেয়ার জন্য আসতো। এটি একটি বাস্তব বর্ণনা, যা বর্তমান নিবন্ধ লেখক তার বাল্য জীবনে এ জিনিসটি প্রত্যক্ষ করেছেন যে রাজগোবিন্দপুরের কুঙ্গা পুঞ্জির কুকীরা রাজঘাটে এসে রুকনি নদীর জল বাঁশের চুঙ্গায় ভরে নিয়ে যেতো।
বাম এলাকায় এক সময়ে যে ঘন জনবসতি ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় কাছাড়ের ইংরেজ শাসক লেফটেনান্ট টি ফিসারের ১৮৩১ সালের ২৯ জুলাই তারিখে তার ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্মচারী ডেভিড স্কটের নিকট পাঠানো কাছাড় সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে ।তিনি বাম সম্পর্কে বলেছেন রুকনি নদীর তীরের গ্রামগুলোতে পুরাতন ঘরবাড়ির প্রচুর ভগ্নাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেখা যায় -যেগুলি দেখে অনুমান করা যায় যে এক সময়ে এসব স্থানে জনবসতি ছিল কিন্তু বিশেষ কোনও কারণে এলাকা ছেড়ে লোকেরা অন্যত্র চলে গেছে।
ইংরেজ রাজকর্মচারীদের এলাকায় কুকিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গিয়েছিল। কুকিরা প্রায়ই জনপদগুলোতে অতর্কিত হিংস্র আক্রমণ চালাত। এরা মূলত ছিল মার-মিজোদের পূর্ববর্তী জনসম্প্রদায় বিশেষ। এদের আক্রমণের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে পরবর্তীকালে প্রবাদের মত কথা মানুষের মুখে মুখে চলত বলে প্রাচীনেরা বলতেন— ‘কুকির ভাগান’ (কুকিদের ভয়ে পলায়ন), ‘মগর ভাগান’ (মগদস্যুদের ভয়ে পলায়ন)। অনুরূপভাবে ‘জঙ্গির লড়াই' (সিপাহি বিদ্রোহীদের ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ), ‘বর্মার ভাগান’ (বর্মী সৈন্যের অত্যাচারের ভয়ে পলায়ন), ‘ছয়তিশ বাংলার পানি' (১৩৩৬ বাংলার মহাপ্লাবন) ইত্যাদি ।‘ভাগান' শব্দটি বিশেষ কোনও ঘটনা অথবা অত্যাচারের ভয়ে পলায়ন বা আত্ম রক্ষার জন্য বিভ্রান্ত অবস্থায় অন্যত্র চলে যাওয়া। বাম অঞ্চলে এই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছিল বলে ভাগানের গল্প দীর্ঘকাল লোকমুখে প্রচলিত ছিল।
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপুরী রাজত্বের আবসানের পরের পর্যায়ে রুকনি নদী- তীরে মদনরাজা নামে এক ক্ষুদ্র রাজার আবির্ভাব হয় ।তবে মদন
রাজার ঐতিহাসিক কোন বিবরণ পাওয়া যায় নাই । যদিও মদন রাজার সম্বন্ধে বহু জনশ্রুতি ও গ্রাম্য গীত প্রচলিত
ছিল । সম্ভবত বামের উত্তর প্রান্তে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে তারঁ রাজত্ব বিদ্যমান ছিল।
……………………………………………………………………………
No comments:
Post a Comment