Friday, 3 July 2026

42-বামের হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থান-7: পঞ্চমী নাথ মাজুমদার

 

বামের হিন্দু মন্দির সমূহঃ

বাম অঞ্চলে বিভিন্ন মন্দির রয়েছে, প্রত্যেকটি বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতি উৎসর্গীকৃত, যা হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুশীলনের সমৃদ্ধ প্রেক্ষাপট  প্রদর্শন করে।  এই মন্দিরগুলির মধ্যে কয়েকটির বিবরণ  যথাসম্ভব ইতিহাস সহ তুলে ধরা হলো ।

ফ্রেঞ্চ নগর শিব মন্দির

ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত, শতাব্দী পুরানো ফ্রেঞ্চ নগর শিব মন্দির গভীর ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের স্থান। এই মন্দিরটি ভক্তদের আকর্ষণ করে যারা ভগবান শিবের আশীর্বাদ পেতে আসে। মহিলারা প্রতি সোমবার এখানে প্রার্থনা করেন এবং এখানে প্রতি বছর দুর্গা পূজা ও কালী পূজাও অনুষ্ঠিত হয় ।

ফ্রেঞ্চ নগর দুর্গাবাড়িঃ

দেবী দুর্গার ভক্তদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উপাসনালয় ।ফ্রেঞ্চনগর দুর্গাবাড়ি দুর্গা পূজা উৎসবের সময় তার প্রাণবন্ত উদযাপনের জন্য পরিচিত, যেখানে ভক্তরা দেবীর উপাসনা করার জন্য প্রচুর পরিমাণে জড়ো হয়।এখানে প্রতি বছর কালীপুজা ও অনুষ্ঠিত হয় ।

 খুলিছড়া বাসন্তীবাড়িঃ

প্রায় শত বর্ষ পুরাতন খুলিছড়া বাসন্তীবাড়ি হল দেবী দুর্গার প্রতি নিবেদিত আরেকটি মন্দির, যা বাসন্তী  বাড়ি নামে পরিচিত।বিশেষ করে বাসন্তী পূজার সময় মন্দিরটি ধর্মীয় সমাবেশ এবং উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু  হয়ে উঠে। প্রতি বছর বাসন্তী পূজার সময় পাঁচ দিনব্যাপী মেলা হয়। মেলায় সমাজের সকল স্তরের প্রায় দশ থেকে থেকে  পনেরো হাজার মানুষ অংশ নেয়। এ এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কেন্দ্রস্থল ।


                                           খুলিছড়া বাসন্তীবাড়ি



মধ্য চান্নিঘাট সর্বজনীন শিব মন্দিরঃ

চান্নিঘাটের এই সর্বজনীন শিব মন্দিরটি আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের একটি কেন্দ্র।  শিব পূজা ছাড়াও এখানে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

                                     মধ্য চান্নিঘাট সর্বজনীন শিব মন্দিরঃ

সীতাকুণ্ড আশ্রমঃরনফাঁড়ি শিব মন্দির  থেকে সোজা পশ্চিমের দিকে  প্রায় মাইল খানেক দূরত্বে অবস্থিত সীতাকুণ্ড আশ্রম। বামের হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান ।রাম- লক্ষ্মণ-সীতা সহ ভক্ত হনুমান এখানকার আরাধ্য দেবেদেবী।এটি তিন দিকে পাহাড়ে বেষ্টি স্বল্পপরিসরের এক সুন্দর আশ্রম। রেংটি পাহাড়ের বুক চিরে ক্ষীণ দেহী এক সুন্দরী  ঝর্ণা অবিরাম নৃত্যছন্দে আছড়ে পড়ে সৃষ্টি করেছে এক মনোরম কুণ্ডের। এই প্রকৃতি  প্রদত্ত পাষাণ বেষ্টিত কুণ্ডের নামই সীতাকুণ্ড ।আর এই কুণ্ডকে কেন্দ্র করেই গড়ে উেঠেছে এক আশ্রম । সারা বছর ধরে  স্বচ্ছসলিলা এই ঝর্ণা এলাকার মানুষদের জলে  যোগান দিয়ে আসছে । বর্ষায় দুর্গম মনে হলেও শীতকালে  সীতাকুণ্ড আকর্ষণীয় হয়ে উঠে । মকর সংক্রান্তি থেকে  পাঁচদিন ব্যাপী চলে বিশেষ পূজার্চনা ,পাঠ কীর্তন ,ভক্তি সঙ্গীত পরিবেশন সেই সঙ্গে বসে মেলা। বহু বছর ধরে চলে আসা  জীর্ণ  পূজার্চনা স্থল বর্তমানে সরকারী সাহায্যে  বিশেষভাবে সেজে উঠেছে । মেলার দিনগুলো ছাড়া এখানে  জনসমাগম কম থাকে । কিন্তু মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ,নিরালা ধ্যান গম্ভীর আশ্রম মাহাত্ম্য, ভক্ত হৃদয়ে অপার শান্তি প্রদান করে সার্থক তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে ।

রণফাডী শিব মন্দির :রণফাডী শিব মন্দির শিব ভক্তদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, যা তার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং ভক্তিমূলক কার্যাবলীর জন্য পরিচিত।শিব চতুর্দশীতে বিশেষ পূজা ছাড়াও প্রতি বছর এখানে  দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয় । বর্তমানে মহাসড়ক নিরমাণের প্রয়োজনে শিব মন্দিরটির স্থান পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে ।

                                           রণফাডী শিব মন্দির-ে এখন স্থানান্তরিত

 ধলাই শিব মন্দির(বাড়ি)-

ধলাইতে অবস্থিত এই মন্দিরটি ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এবং উপাসনা এবং ধর্মীয় সমাবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

লোকনাথ মন্দির সদাগ্রামঃ

বাবা লোকনাথকে উৎসর্গীকৃত, সদাগ্রামের এই মন্দিরটি ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি স্থান, যা বাবা লোকনাথের শিক্ষার অনুসারীদের আকর্ষণ করে।

শিবমন্দির মহাদেবপুরঃ

শতবর্ষ প্রাচীন মহাদেবপুরের এই শিব মন্দিরটি উপাসনা এবং আধ্যাত্মিক সমাবেশের জন্য  ‘হরগেৌরী মন্দির’ নামে পরিচিত । এই মন্দিরটি তার শান্ত পরিবেশের জন্য  শ্রদ্ধাবান   ভক্তদের কাছে খুব প্রিয়। আগে এখানে  প্রতি বছর সপ্তাহব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হত।  চৈত্র মাসে (বারুণী গঙ্গা স্নান) মধু কৃষ্ণ ত্রয়োদশী উপলক্ষে লোকেরা রুকনি নদীতে  স্নান গ্রহণ করত।

                                       শিবমন্দির মহাদেবপুরঃ

 শ্রী শ্রী কালী মন্দির  লান্টূগ্রামঃ

শতবর্ষ পুরাতন  শ্রী শ্রী কালী মন্দির  লান্টূগ্রাম গ্রামে অবস্থিত একটি বিশেষ মন্দির ।১৯২৪ সালের দিকে স্থাপিত, এই মন্দিরটি হিন্দুধর্মের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দেবী কালীর উপাসনার জন্য নিবেদিত লান্টুগ্রাম শ্রীশ্রী কালী মন্দির ধর্মীয় কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দু।  এটি উৎসব ও সামাজিক সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মন্দিরের ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি একটি সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা এবং অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে মন্দিরের শতবর্ষ উদযাপন করা হয়।

পানিভরা রাধামাধব আখড়াঃ

 রনফাঁড়ী থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত  ‘পানিভরা বড় আখড়া’নামে খ্যাত দেবালায়টি আসলে হলো ”রাধামাধব আখড়া”।প্রেমাবতার গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এবং রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এখান কার পূজ্য দেবতা ।প্রায় শতাধিক বছর আগে  পানিভরা গ্রামের  লক্ষ্যমণি নাথ ( লক্ষ্য মহাজন) মন্দিরের স্থান সহ ক্ষেতের জমি মিলিয়ে  প্রায় ১৮ বিঘা জমি দেবোত্তর জমি হিসাবে দান করেন । বহু বছর  মহাজন  বাড়ীর ব্যক্তিগত  তত্বাবধানে ,পূজারী বৈষ্ণব বৈষ্ণবী নিয়োগ করে , জাঁক জমকের সঙ্গে আখড়ার কাজ চলতে থাকে ।নিয়মিত পুজা পাঠ ,দৈনিক ভোগ আরতিতে  গম গম করতো  নাটমন্দির ।জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী,ঝুলন যাত্রা,দোলযাত্রা , পুষ্প দোল প্রভৃতি বৈষ্ণব ভাবধারার  উৎসব গুলো আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হতো ।  গ্রামের সব পরিবারই আখড়ার প্রতি অনুরক্ত ছিল । আখড়ার কাজে সবাই ছিল  সাহায্যের  হাত বাড়াতে সদা প্রস্তুত ।গ্রামের প্রতিটি বাড়ীর  ধর্মীয়  অনুষ্ঠান যেমন  বৈষ্ণব সেবা ,পিতৃপক্ষের সেবা ,নবান্ন প্রভৃতি এই আখড়াতেই অনুষ্ঠিত হতো । বছরের বেশীর ভাগ দিনই আখড়াটি থাকত উৎসব মুখর । বিভিন্ন কীর্তন ‌যাত্রাপালা,ধামাইল নৃত্য ইত্যাদি মহড়ার  নির্বিঘ্ন স্থান ছিল এই আখড়া ।

বর্তমানে আখড়া পরিচালনার ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে  পরিচালনা কমিটির হাতে । পুজারী  বৈষ্ণবের অভাব,কমিটি মেম্বারদের গাফিলতি, প্রভৃতি নানা কারণে আখড়াটির প্রানোচ্ছল ধারাটি  বাধাপ্রাপ্ত হলেও আখড়ার নামে দান কৃত দেবোত্তর সম্পত্তি যথাযথ থাকায় ভবিষ্যতে আবার আখড়াটি  স্বমহিমায় ফিরে আসবে -এই আশা পোষণ করেন এই এলাকার মানুষ ।

পানিভরা আশুতোষ আশ্রমঃ এই শিবমন্দিরটি পানিভরাগ্রামের প্রাচীনতম দেবালয় । এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই পানিভরা গ্রামের মানুষদের ,বিশেষ করে শিবগোত্রিয় নাথ সমাজের  মানুষদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলো  আবর্তিত হয় ।প্রতিটি শুভ কর্মের প্রারম্ভে   আশুতোষ শিবের আশীর্বাদ কামনা করা হয় ।তাই প্রতিদিনই এই আশ্রমে কোনও না কোনও পরিবারের ব্যক্তিগত পূজা অর্চনা চলতেই থাকে ।তা ছাড়া বিশেষ বিশেষ তিথিতে  সামগ্রিক ভাবে বিশেষ পূজার্চনার ব্যবস্থা  তো হয়ই । গ্রামের যে কোনও  সামাজিক কাজকর্মের ব্যাপারে   সিদ্ধান্ত নিতে এই আশ্রমেই সকলে জমায়েত হন ।

শিলচর মালুগ্রামের বিশিষ্ট জমিদার  প্রয়াত পুলিন দেবের জমিদারি  এতদঞ্চলেও প্রসারিত ছিল।এখানে কোনও দেবালয়  না থাকায়  শতাধিক  বছর পূর্বে রুকনি নদীর তীরের বিশাল  জায়গাটি তিনি শিব মন্দিরের নামে দান করেন । পুলিন বাবুর দুই পুত্র  পঙ্কজ কুমার দেব ও শ্যমেন্দ্র কুমার দেব ধলাই বি এন এম পি স্কুলে  শিক্ষকতা  করার সময় আশ্রমটির উন্নয়ন কার্যে যথেষ্ট সহায়তা করেন । তাদের বদান্যতায় ও গ্রামবাসীদের  সদিচ্ছা তথা সাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডের ফল স্বরূপ শিব বাড়ীটি এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে ।  প্রাচীন বট বৃক্ষটি আশ্রমের এক বিশিষ্ট আকর্ষণ ।

  বামের আনাচে কানাচে  আরো প্রচুর দেবালয় আছে ।বাম অঞ্চলের মানুষ যে ধর্মপরায়ণ ,তারই সাক্ষ্য বহন  করে চলেছে এই দেবালয় গুলো যেমনঃ

ধলাখাল দুর্গা মন্ডপ ,টিলানগর দূর্গা মন্ডপ,ভাগাবাজার শিব মন্দির ,মহাদেব বাড়ি শ্যামাচরণপুর ,বিষ্ণুপুর শিব মন্দির ,দেবীপুর শীতলামাতা মন্দির,বিষ্ণুপুর দুর্গা মন্ডপ ,মথুরাপুর শিব মন্দির ,ভৈরব বাবা মন্দির, ধনিপুর;সর্বজনীন দুর্গা মন্ডপ ধনিপুর ,ককাইপুঞ্জি কালী মন্দির ,মহাদেব বাড়ী শ্যামাচরণপুর কলোনী ,উত্তর চান্নিঘাট শিব মন্দির,টিলানগর শিব মন্দির ,শিব মন্দির-হাডম্বা ,শিব মন্দির জয়নগর  ফরেস্ট ভিলেজ ,জারুলতলা শিব মন্দির প্রভৃতি

    দক্ষিণ কাছাড়ে বামের মন্দিরগুলি কেবল উপাসনালয় নয়; এগুলো সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক জীবনের কেন্দ্রস্থল। প্রতিটি মন্দির, তার অনন্য দেবতা এবং ইতিহাস সহ, এই অঞ্চলের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ বাতাবরনে অবদান  রাখে। এই মন্দিরগুলি শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় তাৎপর্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং বিভিন্ন উৎসব  উদযাপনের সময় সম্প্রদায়কে একত্রিত করার ক্ষেত্রে  এগুলোর ভূমিকা ও গুরুত্বপূর্ণ।

…………………………………………………………………………………………….

লেখক পরিচিতি-

পঞ্চমী নাথ মাজুমদার : শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ও কত্থক নৃত্যে বিশারদ লেখিকা শ্রীমতী পঞ্চমী নাথ মজুমদার সঙ্গীত চর্চার সঙ্গে সাহিত্য চর্চায়ও বিশেষ মনোযোগী ।নিজের  নৃত্যালয় পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে  কলকাতার বিভিন্ন ম্যাগাজিনে কবিতা লেখেন । বস্তুত সাহিত্য জগতে কবি হিসাবেই তাঁর বেশি পরিচিতি । এতদঞ্চলের,ভৌগোলিক,ঐতিহাসিক তথা ধর্মীয় পরিবেশ সম্বন্ধে জানার বিশেষ আগ্রহেরই ফল এই প্রতিবেদন –“ বামের হিন্দু   সমাজের ধর্মীয় বৈশিষ্ট ও ধর্মস্থান”।

 

‘’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’’

 

 

No comments:

Post a Comment