Monday, 6 July 2026

45:বৈচিত্রময়ী বামঃএক স্মৃতিচারণ -1 নিশি কান্ত লস্কব়

   আমি আমার বাল্যকাল ও কৈশোর কাটিয়েছি বামের মহাদেবপুর গ্রামে। ষাট বছরেরও বেশি সময় আগে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য  বাম ছেড়ে গেলেও, সেই শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি এখনও আমার মনে উজ্জ্বল ও জীবন্ত। এই স্মৃতিচারণ নিবন্ধটি কাছাড় জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের ঐতিহাসিক ও বৈচিত্র্যময় বামকে কেন্দ্র করে রচিত। এখানে বামের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, জনবসতি, জীবনধারা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম এবং সেখানকার সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির কিছু বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

  বাম একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল, যেখানে পাহাড়, নদী, বনভূমি এবং গ্রামাঞ্চলের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। একসময় এই অঞ্চলে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাস ছিল, কিন্তু মানুষের ক্রমাগত আগমনে এখানকার পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বামের পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা গ্রামগুলো, সেখানকার সংগ্রামী মানুষ এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতির স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে অম্লান।

বামের জনজীবন, অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে সময়ের গ্রামীণ জীবনের একটি স্বচ্ছ চিত্র ফুটে ওঠে।

সময়ের সাথে সাথে বামের প্রকৃতি ও সমাজ অনেক পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি লুকানো ইতিহাস রয়ে গেছে, যা আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। সেই বামের মানুষ, তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে এই স্মৃতিচারণ পাঠকদেরকে এক অন্যরকম যাত্রায় নিয়ে যাবে। বাম অঞ্চলটি একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ স্থান, যা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের জন্য প্রসিদ্ধ। এটি অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর এক  সুযোগ এনে দেবে।

   আনুমানিক ১৮৮৫  সালে বামে বসতি শুরু হয়েছিল। সেই হিসাবে, বামের বয়স এখন প্রায় ১৪০ বছর। রুকনি উপত্যকায় অবস্থিত বাম একসময় ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল, যেখানে বন্য প্রাণীর আধিক্য ছিল । যখন এই এলাকাটি বসতির জন্য খোলা হয়, তখন কাছাড় এবং হাইলাকান্দির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গ্রামবাসীরা এসে এখানে বসতি স্থাপন করে। এছাড়াও, তৎকালীন সিলেট জেলার করিমগঞ্জ থেকেও কিছু মানুষ এসে এখানে বসতি স্থাপন করে। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে মিলিত ভাবে বামকে তাদের বাসস্থান বানিয়ে একটি সমাজ গড়ে তুলেছিল। একভাবে দেখলে, বামে বসতি স্থাপন অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ  এক নতুন ভূমিতে এসে নতুন জীবন গড়ে তুলেছিল এবং এলাকাটির ভবিষ্যৎ গঠন করেছিল। 

বামে যাব়া প্ৰথমে এসে জঙ্গল পরিষ্কার  কব়ে ঘব় বাড়ী তৈব়ী কব়ে বসবাস শুব়ু কব়েন তাব়া প্ৰত্যেকেই খুব সাহসী কৰ্ম্ম তৎপব় ছিলেন। তাদেব়কে নানা ব়কম পব়িস্থিতিব় সন্মুখীন হতে হয়েছিল। বন্য প্ৰাণী বিশেষ কব়ে বাঘেব় উপদ্ৰব, বাঘ গ্ৰামে এসে  গরু ছাগল প্ৰভৃতি গৃহপালিত পশুকে মেব়ে ফেলতো, শিয়ালব়া হাঁস, মুব়গী, ছাগল প্ৰভৃতি নিয়ে যেত, তাছাড়া নানা প্ৰকাব় ব়োগ তাব়মধ্যে মেলেব়িয়া, কলেব়া, বসন্ত, হাম, কালাজ্বব়েব় প্ৰকোপ বেশী ছিল। এই সব সমস্যাব় সঙ্গে তাব়া লড়াই কব়ে প্ৰতিষ্ঠিত হয়েছেন। সমবেত প্ৰচেষ্টায় তাব়া সব ধব়ণেব় পব়িস্থিতিব় সন্মুখীন হতে পেব়েছিলেন।

 জনবসতিব় পব় গৃহস্থব়া প্ৰত্যেক বাড়ীতে আম, জাম, কাঠাল, আমলকি, লেবু, পেয়াব়া, সুপাব়ী জাতীয় বৃক্ষ, আর বব়ুয়া, বেতুয়া, জাই প্ৰভৃতি বাঁশ, মুৰ্ত্তা বেত বাড়ীতে ব়োপন কব়তেন। 

   বামের প্রথম পর্যায়ের বসবাস করা লোকেব়া জঙ্গলেব় কাঠ, বা, বেত, শন, খাগ, ইখড়া দিয়ে সুন্দব় ঘব় তৈব়ি কব়েছিলেন ।

তবে এই ঘরগুলো ঝড়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে কালবৈশাখীর সময় (বামে স্থানীয়ভাবে ‘বারাইয়া তেরাইয়া’ নামে পরিচিত)। সাধারণত প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ১২ এবং ১৩ তারিখে এই কালবৈশাখী ঝড় প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে আছড়ে পড়ত। মাঝে মাঝে এই ঝড় ভঙ্গুর ঘরগুলো উড়িয়ে নিয়ে যেত।

ভয়ঙ্কর ঝড়ের সময় ভীত-সন্ত্রস্ত বাসিন্দারা দরজা বন্ধ করে একসঙ্গে জোরে জোরে প্রার্থনা করত। মুসলমানরা উচ্চস্বরে বলত, "খাগ নলার ঘর, খোদায় রক্ষা কর," আর হিন্দুরা তাদের দেবদেবীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলত, "হরি বল,হরি বল” সঙ্গে- উলুধ্বনি। হিন্দুরাও মুসল্ মানদের মত বলতো- “খাগ নলার ঘর, খোদায় রক্ষা কর" ।ঝড় যত তীব্র হতো, তাদের প্রার্থনার আওয়াজও তত জোরালো হয়ে উঠত। ঝড়ের গর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে প্রার্থনার সুরও উঠানামা করত।

…………………………………………………………………………

প্রিয় পাঠকমণ্ডলী,

বাম হিস্ট্রি ব্লগ আপনাদের আন্তরিক সাড়া ও উৎসাহে ক্রমশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ পর্যন্ত ১২৪৫৮ বার পাঠকরা ব্লগটি পরিদর্শন করেছেন।

যারা বামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছে অনুগ্রহ করে ব্লগটির লিংকটি শেয়ার করুন:bam-history.blogspot.com

এছাড়াও, ব্লগের Comment বিভাগে আপনাদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া জানালে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত হব।

আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাই আমাদের অনুপ্রেরণা।

ধন্যবাদান্তে,

বাম হিস্ট্রি ব্লগ


 

 

 

 

 


 

No comments:

Post a Comment