চোর-পুলিশ খেলায় ছোট ছোট কাগজের টুকরোতে চোর, পুলিশ, ডাকাত ও বাবু লিখে পুলিশের চোর ও ডাকাতকে খুঁজে বার করা খুবই মজার ব্যাপার। এ রকমই ছোট ছোট চারটি চিরকুটে রাম, শ্যাম, যদু ও মধু লিখে 'রাম- শ্যাম - যদু - মধু' খেলাটি থেকেও ছোটরা বেশ আনন্দ লাভ করতো।
মাটিতে কতকগুলো গোলাকার ঘর বানিয়ে অর্থাত গোল দাগ দিয়ে লাফ দিয়ে একঘর থেকে অন্যঘরে যাওয়ার খেলা 'ঘরঘর' বা 'বুড়ির ঘর'ও বেশ মজার খেলা। মুখে 'একটা ভিক্ষা দেও না, ওই বাড়িত যাওনা' ছড়াটি বলে তখন একঘর থেকে অন্যঘরে লাফ দিয়ে যাওয়া হতো ।
শিমুল ফুলের বোঁটার দিক কোন পাথরে ঘঁষে সমান করে ছোট একটি বাঁশের শলাকে পেরেকের মতো ঢুকিয়ে দিয়ে লাটিম বানিয়ে আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে কত আনন্দ লাভ করা যেতো। এরজন্য কাঠের তৈরি লাটিম বা লাট্টুর মতো সুতোর দড়ির প্রয়োজন ছিল না, হাতের আঙ্গুল দিয়ে শলাটি ঘুরিয়ে কোন সমতল ভূমিতে বা হাতের তালুতে এটি ঘোরানো হতো।
আরেকটি মজার খেলা হলো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো বন্দুক দিয়ে গুলি ছোড়া। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পাইপ বানিয়ে তার দু'দিকে দু'টি নালি (পাট) গাছের গুটা (বীজ) ঢুকিয়ে অন্য একটি বাঁশের মোটা শলা দিয়ে ঠেলে বন্দুকের মতো আওয়াজের সাথে সাথে বীজ ছোড়া, - বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেদের এক অতি প্রিয় খেলা। জানি না এর অন্য কোন নাম আছে কি-না, তবে গ্রামের সবাই 'ফটাং' নামেই একে জানেন। তবে ত্রিপুরা অঞ্চলে শুনেছি এই খেলাটিকে 'ঠুসকী' বলা হয়।
'বগার ঠ্যাং' নামের আরেক খেলা ছেলেদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল। এতে বাঁশের আগার দিক থেকে ৭/৮ ফুট লম্বা দু'টি টুকরো নেওয়া হয়। দু'টি বাঁশের টুকরোতে-ই নিচের দিক থেকে ২/৩ ফুট ওপরের আঁখটি রেখে বাকি আঁখগুলো ছেটে ফেলা হয়। তবে দু'টি বাঁশের নিচের আঁখ দু'টির উচ্চতা সমান হতে হবে। এরপর সেই দুই আঁখে পা রেখে ওপরের অংশে হাত দিয়ে ধরে হেঁটে যাওয়া হয়। কেউ কেউ এই খেলাকে 'ঠ্যাং ঠ্যাঙ্গী'ও বলে থাকেন। এটাই হইতো ‘রণ পা’
এসব খেলতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কম ঝগড়াঝাটিও হতো না। তবে সেই ঝগড়ার মধ্যে কোন প্রকার বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসার ক্রূরতা ছিল না। যেমন খেলতে খেলতেই হয়তো তামাশার ছলে কোন একজন অপর একজনকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে দিল, প্রতিপক্ষ হয়তো মাটিতে পড়েও গেল, - কিন্তু এই ধাক্কা দেওয়ার মধ্যে প্রতিপক্ষকে আঘাত বা শারীরিক নির্যাতন করার মানসিকতা কাজ করতো না। নিছক আনন্দলাভই এর উদ্দেশ্য। তাই ধাক্কা খাওয়ার পর যেমন মনে কোন প্রকার প্রতিশোধ নেওয়ার ভাবনার উদয় হতো না, তেমনি যে ধাক্কা দিয়েছে, তার মনে অনুশোচনাবোধও জাগ্রত হতো না । অবশ্য প্রতিপক্ষ আঘাত পাওয়ার পরও যে আনন্দলাভ থেকে একেবারে বঞ্চিত থাকতো, তা কিন্তু নয়। এরমধ্যে যেন দু'পক্ষেরই ভালোলাগা এবং অবশ্যই ভালোবাসার সম্পর্কটা আরও মজবুত হয়ে ওঠতো। যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই এই ঠেলাঠেলি থেকে সামান্য কলহের সৃষ্টি হয়ে যেত, তবে এই কলহটাও যেন খেলার-ই একটা অঙ্গ, - খেলা শেষ, ঝগড়াও শেষ । খুব বেশি হলে হয়তো কখনো কখনো দু'পক্ষের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যেত, তবে তার স্থায়ীত্বও দু-এক ঘণ্টার বেশি নয়। এই 'কাট্টি' যে কখন 'মিল'-এ পরিণত হতো, সেটা কেউ-ই খেয়াল করতো না।
……………………………………………………………………………….