Tuesday, 3 November 2026

111.শতবর্ষের আলোকে রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা ও ‘বাম’ অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার পত্তনের কিছু কথা-1 :সাবির আহমদ চৌধুরী

 

জাগতিক কর্মক্ষেত্র এবং ধর্মীয় সাধনা উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার অপরিহার্যতা ইসলামের প্রারম্ভিক সময় হতেই মুসলিমদের চিন্তাধারায় সর্বাধিক প্রাধান্য লাভ করেছিল। মহানবী (সাঃ) এর ঘোষণা ছিল 'প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর পক্ষে জ্ঞান-শিক্ষা অর্জন করা ফরজ।' পবিত্র কোরআনে আল্লাহর প্রত্যাদেশের সর্বপ্রথম বাণী ‘পাঠ কর' –এর মধ্যেও শিক্ষার কথাই সর্বাগ্রে ব্যক্ত করা হয়েছে। জ্ঞান সাধনার উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্বনবীর অবিস্মরণীয় উক্তি হল — 'জ্ঞান সাধকের দোয়াতের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।' শিক্ষার অতুলনীয় মান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এ ধরণের দ্বিতীয় উক্তি ইতিহাসে বিরল। ইসলামের ইতিহাসে তাই শিক্ষা ছিল অত্যন্ত গর্বের বিষয় এবং যুগে যুগে মুসলিমরা এক্ষেত্রে চরম দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রোর মত জায়গায় মুসলমানরা যে সব শিক্ষাকেন্দ্র, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তা আজও বিশ্বের বিস্ময় উদ্রেক করে। মুসলিমরাই প্রথম শিক্ষার জন্য প্রাথমিক স্কুল (মক্তব) এবং ধারাবাহিক শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের শিক্ষা ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক। মসজিদ ছিল সর্বসাধারণের মিলনস্থল, যেখানে জ্ঞানীদের পাশে সাধারণ মানুষ জমায়েত হতো, তাঁদের বক্তব্য শুনতো, তাঁদের সাথে বই পুস্তক পড়তো এবং এভাবে জ্ঞান আহরণ করতো। ইসলামের অনেক প্রখ্যাত মণিষী এরকম ভাবেই জ্ঞানার্জন করেছিলেন এবং তাঁরা তাঁদের ছাত্রদেরকেও একই পদ্ধতিতে জ্ঞান দান করতেন। ইসলামী আইনের মূল চার ব্যাখ্যাকার— ইমাম আবু হানিফা (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম শাফি (রঃ) সাধারণত মসজিদে একত্রিত পণ্ডিতদের সাথে বসে আলোচনা করতেন এবং ইসলামী আইনে শিক্ষা অর্জন করতেন। মুসলিম বিশ্বের স্থানে স্থানে শিক্ষাচর্চার সেই প্রথার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও অল্পবিস্তর চালু ছিল। ইসলামের তিনটি পবিত্রতম স্থান পবিত্র মক্কা নগরীর হরম শরীফ, মদীনা শরীফের মসজিদে নবয়ী এবং জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায়

ইসলামী পণ্ডিতগণ নিয়মিত বসতেন, বক্তৃতা দান করতেন— যা সবার শুনার এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

প্রচলিত মাদ্রাসা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাদান সর্বপ্রথম মরক্কোর ফেজ নগরীতে শুরু হয়েছিল। ৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত জমিয়ত আল-কার উইনকে বিশ্বের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলে গণ্য করা হয়। ফাতেমা আল ফিহরি নামক এক মহীয়সী নারী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্বের দিকে দিকে ইসলামের বিস্তারের সাথে সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাও বিস্তার লাভ করে।

আমাদের বরাক উপত্যকার মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। যতদূর জানা যায় চতুর্দশ শতাব্দীতে হজরত শাহ জালাল ইয়ামেনীর (রঃ) ঘনিষ্ঠ শিষ্য শাহ জিয়াউদ্দিন বর্তমান করিমগজ্ঞ জেলার বদরপুরে অবিভক্ত সুরমা বরাক উপত্যকার প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় বারাক উপত্যকার সেই প্রতিষ্ঠিত প্রথম মাদ্রাসাটি এবং তৎসংলগ্ন মসদিজটি বরাক নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়।

    বর্তমান নিবন্ধে আমরা যে মাদ্রাসাটির শত বছর পূর্বেকার পেক্ষাপট পর্যালোচনা করতে চেষ্টা করছি সেটি ১৯১৫ ইংরাজীর কোন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে বরাক উপত্যকার প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচশত বছর পরে রাজঘাট দারুল ফয়েজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। একুশ শতকের বামের অধিবাসী আমরা। যোগাযোগ, শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছোঁয়া থেকে আমরাও সম্পূর্ণ বঞ্চিত নই এখন। নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা তো এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু আজ থেকে একশ বছর পূর্বে আক্ষরিক অর্থেই প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক তথা শৈক্ষিক পরিবেশের মধ্যে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা করা এবং সে চিন্তাকে বাস্তব রূপ দান করা যে আজকের দিনের মত সহজ ছিল না সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বুঝানোর অপেক্ষা রাখে না।

বাম তো দূর, ১৮৩২ খৃষ্টাব্দর পূর্ব পর্যন্ত অবিভক্ত কাছাড়ে (বর্তমান কাছাড় ও হাইলাকান্দির সন্মিলিত রূপ) আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবিক অর্থে ছিলনা বললে অত্যুক্তি হবে না । কাছাড়ের প্রত্যন্ততম বাম অঞ্চলে তো ব্যাপারটা এক কথায় অচিন্তনীয় ছিল। তখন পর্যন্ত সমগ্র কাছাড়ে মক্তব, মাদ্রাছা এবং টোলের প্রচলন ছিল যা মৌলবী ও পণ্ডিতদের পাঠদানের মাধ্যমে চলতো। বস্তুতঃ ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দেই শিলচর উচ্চ গ্রামার স্কুল (Silchar High Grammer School) স্থাপিত হয় যা পরবর্তীতে শিলচর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় (Silchar Government High School) নামে নামাকরণ করা হয়। সেটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক স্কুল শিক্ষার পত্তন হয়। এমনকি কাছাড়ের সদর শহর শিলচরে সে স্কুল প্রতিষ্ঠার পরও কিন্তু গ্রামীণ কাছাড় থেকে স্কুলটিত ছাত্রদের উপস্থিতি অত্যন্ত নগন্যই ছিল। ১৮৯১-৯৪ ইংরাজীর মধ্যে শিলচর সরকারী স্কুলের ১৪০জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২০জন ছাত্র প্রকৃত পক্ষে কাছাড়ের মূল বাসিন্দা ছিল। এই ২০জনের মধ্যে ১৭ জনই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের যাতে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে তদানীন্তন গ্রাম কাছাড়ের হিন্দুরাও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে ছিল। শিলচর সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ের বেশীরভাগ ছাত্রই শিলচরের আমলা, চা বাগানের কর্মচারী এবং সিলেট মূলেরই ছিল। ১৮৮৫-৮৬ ইংরাজীর প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে একটি মজার বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায় যে ১৮৮৫-৮৬ ইংরাজী শিলচর উচ্চ ইংরাজী স্কুলের ১৬৪জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২২জন ছাত্র খাঁটি কাছাড়ের ছাত্র ছিল।

সমগ্র অবিভক্ত কাছাড়ের শিক্ষার হাল-চিত্র যখন এরকম তখন বাম অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষার প্রসারকল্পে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা যে কতটা দূরূহ ব্যাপার ছিল তা সহজে অনুমেয়। সুদূর অতীতে পরম প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সেই দুরূহ কাজ সম্পাদন করে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজেকে প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের আলোকে উজ্জীবিত করার সুমহান উদ্যোগ যারা সর্বপ্রথম নিয়েছিলেন মাদ্রাসাটির শতবর্ষ পূর্ত্তিতে তাঁদের সেই অবিস্মরণীয় অবদানের কথা সশ্রদ্ধভাবে স্মরণ করা উচিত।

  .............................................................................................................................................

 

No comments:

Post a Comment